গুরু দত্ত যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, আমার জন্ম তার অনেক দূরের ঘটনা। তাঁর রহস্যমৃত্যু (মতান্তরে আত্মহনন) সম্পর্কে নানা ফিল্ম ম্যাগাজিনে পড়েছি। পরে ইন্টারনেট ঘেঁটেও জেনেছি অনেক কিছু।
এই যে মারাত্মক একটা সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছি আজ, যখন সত্যিই জীবন আর মৃত্যুর তেমন করে ফারাক করে উঠতে পারছে না মন — এর আগে সেভাবে গুরু দত্ত এবং তাঁর জীবনের উপর আকস্মিক যবনিকা পতন নিয়ে গভীর ভাবনার অবকাশ মেলেনি।
কেচ্ছা বলে, একজন মানুষকে ভালবেসে না পাওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে, নিজের বিবাহিত জীবনের সকল দায়দায়িত্বকে অবহেলায় সরিয়ে দিয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করে নিয়েছিলেন তিনি।
কেচ্ছা বলে। আমি বলি না।
কারণ, কোনো আধ্যাত্মিক/দার্শনিক জ্ঞানাঞ্জনশলাকার সাহায্য ছাড়াই আমি আজ জেনে গিয়েছি, ভালবেসে মরা যায় না। তীব্রভাবে ভাল না বাসতে হয়। ভরা শ্রাবণের দিগন্তলীন ধূসর আকাশের মতো উদাত্ত বৈরাগ্য বিনা আত্মহনন চিন্তা আসে না। গুরু দত্ত যদি সত্যিই ভালবেসে থাকেন, তবে তিনি আত্মহত্যা করেননি — যা কিছুর মাঝে সান্ত্বনা খুঁজতে গিয়েছিলেন, সেই রাসায়নিকগুলোই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাঁর শরীরের সঙ্গে। আত্মহত্যার নকাব পরানো থাকলেও, সম্ভবত সেটা দুর্ঘটনা — দুর্ভাগ্যজনক, মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
এই উপলব্ধির নিরিখে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছি?
ভিখারি থেকে শিল্পপতি, নির্মম হত্যাকারী থেকে সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, হরিপদ কেরানি থেকে প্রতিভাধর শিল্পী — প্রত্যেকেরই বেঁচে থাকার একটা লক্ষ্য থাকে, একটা purpose….
আমার নেই।
একাকিত্ব আমাকে বিড়ম্বিত করে না। আপনজনের অবহেলা আর স্পর্শ করে না সেভাবে। যশ-খ্যাতি-অর্থ ইত্যাদি ঐহিক অর্জনেও স্পৃহা নেই তেমন। হলেও হয়, না হলেও হয় গোছের নির্লিপ্তি এসে গিয়েছে মনে। তবে এই যে উদ্দেশ্যহীন বাঁচা, এর কোনও অর্থ আমি আর খুঁজে পাচ্ছি না।
আমি কি খুব শোকগ্রস্ত? না। ক্ষুব্ধ? উঁহু। হতাশ? তা-ও না। তবে কি?
আমার জীবনে অসংখ্য পথ রয়েছে — আঁকাবাঁকা, পিচ্ছিল, বাধাহীন অনেক রকম রাস্তা। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই।
‘ইন উম্র সে লম্বি সড়কোঁ কো,
মঞ্জিল পে পহুঁচতে দেখা নহী’ —
আমার বাড়ির সামনের জলে ডুবে থাকা পথের ধারের অনামা ঘাসফুলের কুঁড়িটি জানে, আগামীকাল তাকে সূর্যের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য ফুটতে হবে। ভোরের প্রথম আলোর উদ্ভাসের সঙ্গে সঙ্গে নীরব হয়ে যাওয়া ঝিঁঝিপোকারাও জানে, জংলা মাঠের আশেপাশের বাড়িগুলোর ছাদে ঝুপ করে সন্ধের ঝুঁঝকো আঁধার নেমে আসার মুহূর্তটিতে আবার আরম্ভ করতে হবে তাদের জলসা।
শুধু আমি জানি না, কিসের টানে মঙ্গলবারের পরে বুধবার আসবে, তারপর মিলিয়ে যাবে বৃহস্পতিবারের বুকে, আর সাপ্তাহিক অদৃশ্য কালচক্র ঘুরতেই থাকবে আমার জীবনে — অকারণে।
খুব ছোটবেলায় কোনও এক ইংরেজি সংবাদপত্রে, স্টেটসম্যানই হবে, একটি নাগরিক আত্মহত্যার উপাখ্যান পড়েছিলাম। এক সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা কোনও ফ্ল্যাটবাড়ির উঁচুতলার বারান্দা থেকে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন ডানাহীন উড়ানে। তাঁর ঘর থেকে মিলেছিল একটি পাতায় লেখা একটিই লাইন – A happy suicide.
তাঁর পরিবার ছিল, সংসার ছিল, আত্মীয়স্বজন ছিলেন। কোনও আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্য বা রোগের হদিশ পাওয়া যায়নি অণুবীক্ষণেও। জীবনের পূর্ণতার আস্বাদ নিতে নিতে তাঁর হয়ত মনে হয়েছিল, everything around me is too perfect to be true…
সেই অবাস্তব পরিপূর্ণতার বুদ্বুদের মধ্যে থাকতে থাকতেই তিনি মিলিয়ে যেতে চেয়েছিলেন মহাশূন্যে। হয়ত তাঁর মনে হয়েছিল, এই অবিশ্বাস্য আনন্দ যদি স্বপ্ন হয়? স্বপ্নভঙ্গের বেদনা তো সইবে না।
‘মোর বসন্তে লেগেছে তো সুর, বেণুবনছায়া হয়েছে মধুর —
থাক না এমনি গন্ধে বিধুর মিলনকুঞ্জ সাজানো।
————-
সেই ভালো, সেই ভালো ‘
আমার জীবনের একমাত্র আনন্দ আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার দেড় বছরের মাথায় বুঝতে পেরেছি — কোথাও গিয়ে আর দেখা হবে না তার সঙ্গে। সে আমার হাত ছাড়িয়ে এগিয়ে গিয়েছে বহু, বহুদূরে।
মৃত্যুপরবর্তী আমার বন্ধনে আর বাঁধা পড়তে সে চায় না — তাই তো মুক্তি নিয়ে গিয়েছে আমার থেকে।
নিষ্ঠুরভাবে জীবনের নাগপাশে তাকে বেঁধে রাখতে চেষ্টা করেছিলাম শেষ তিন মাস। তার জন্য আমার অনেক নির্মম আচরণ সহ্য করতে হয়েছে তাকে — মূর্খ চিকিৎসকের ভ্রান্ত অপচেষ্টা!
সে আমাকে ক্ষমা করেনি।
এখন জেনে গিয়েছি, কোনোদিন করবেও না।
আর প্রায়শ্চিত্ত করতে ভাল লাগছে না। অনুতাপে, অনুশোচনার আগুনে আমার অন্তর শুদ্ধ হয়েছে কি না জানিনে, তবে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে সেটা জানি। সেই ভস্মটিকা কপালে লাগিয়ে নির্বোধ আনন্দে মেতে আর কত বৃথা কালক্ষেপ করব?
আমার বড় প্রিয় ফুল রুদ্রপলাশ। আর রজনীগন্ধা। কি বিচিত্র বৈপরীত্য, নয়?
রজনীগন্ধা সারা বছর মেলে। দয়িতের কণ্ঠ থেকে চিরনিদ্রায় শায়িতের শরীর, কবি সম্মেলনের সাজ থেকে রবি আরাধনার আয়োজন, সবেতেই তার অকুণ্ঠ উপস্থিতি। পলাশ মেলে এই ক্ষণিক বসন্তেই।
আমার বন্ধুরা, এই বসন্তে তোরা/তোমরা/আপনারা কেউ একটি পলাশফুল সংগ্রহ করে রেখে দিবি/দেবে/দেবেন কোনও বইয়ের ভাঁজে? বেশি নয়, একটি ফুলই যথেষ্ট।
কেন? বলছি।
আমি তো ডাক্তার। যত অনুজ্জ্বল, অসফলই হই না কেন — দিনের শেষে এটাই আমার সত্য পরিচয়। এখানে কোনও ফাঁকি নেই, দেখনদারি নেই, অপরিচিতের আসরে সেজেগুজে অনাহূত উঁকি মারা নেই — এ আমার নিজস্ব সাম্রাজ্য। একজন প্রকৃত ডাক্তার নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবতে পারলেও সক্রিয়ভাবে জেনেশুনে কখনো জীবনকে শেষ করে দিতে পারে না ।
আমিও পারি না। যতই অকিঞ্চিৎকর হোক মার্কশিটের অর্জিত নম্বর, চিকিৎসকের ধর্ম থেকে আমি বিচ্যুত হতে পারি না।
তাই আমার হৃদস্পন্দন ধীর হতে হতে থেমে যাওয়ার দিনক্ষণের সঠিক নির্ঘন্ট আমি বলে যেতে পারি না।
হয়ত সেই মুহূর্ত বসন্তে আসবে কিংবা প্রখর গ্রীষ্মের দুপুরে। মন খারাপ করা ঘ্যানঘেনে বর্ষার বিকেলে বা শারদোৎসবের বোধনের লগ্নেও আসতে পারে। প্রৌঢ় হেমন্তের নির্জনতায় অথবা কুয়াশায় শ্বাসরুদ্ধ শীতার্ত রাতে এলেও বা আটকাচ্ছে কিসে?
সেই ক্ষণটিতে আমার শহর কিরীটশীর্ষে লাল পলাশের আগুন জ্বেলে না-ও তো জেগে থাকতে পারে। তাই বন্ধুদের কাছে অনুরোধ, সতেজ রজনীগন্ধার গুচ্ছের সঙ্গে একটি শুকনো পলাশও যেন আমার শেষযাত্রার সঙ্গী হয় — একটি সবুজপেড়ে মুর্শিদাবাদি সিল্কে জড়ানো আমার এলেবেলে শেষযাত্রা। সেই মুর্শিদাবাদি সিল্ক, যেটা আমার প্রিয়তম স্বজনকে পুজোয় পরাব বলে কিনেছিলাম, কিন্তু সেই বছর পুজো আর আসেনি আমার উঠোনে। শাড়িটা বালিশের নিচে নিয়ে শুই — কখন সময় ছেড়ে যাবে হাত জানা নেই — কে আলমারি হাঁটকে খুঁজবে আমার প্রিয় পরিধান? এত বড় পৃথিবীতে কারোরই তো সে দায় নেই।
নিজেকে বড্ড ভালবাসতাম। সেই ‘জব উই মেট’এর গীতএর মতো, যে বলেছিল — ‘ম্যায় অপনি ফেভারিট হুঁ’।
এই আকুল ভালবাসাটা ফিকে হয়ে আসছে ইদানিং। আলগা হয়ে আসছে নিজের হাতে ধরা নিজের মুঠি। দিন আর রাত, সুখ আর দুঃখ, ভাল লাগা মন্দ লাগার তফাত ঘুচে আসছে ধীরে ধীরে।
আমি বসন্তকুমার শিবশঙ্কর পাড়ুকোন (গুরু দত্ত) হতে পারব না। রক্তিম বসন্তও হতে পারব না কোনওদিন।
আমি একমুঠো অন্ধকার, যে শূন্যে জন্মে কোনও অজানা প্রহরে শূন্যেই বিলীন হয়ে যাবে একদিন।
অনেক, অনেককাল আগে কৃষ্ণচূড়ার পরাগরেণুতে মাখামাখি এক তীব্র চৈত্রের বিকেলে আমি জন্মেছিলাম।
কোনো নতুন চৈত্রদিনে, নতুন উৎসবে, নতুন মানুষদের সঙ্গে হয়ত আবার আমার দেখা হবে।











