২রা জুলাই ২০০৪!! সেদিন দুপুরের পর সুশীলবাবুর সঙ্গে আর মোবাইলে যোগাযোগ করতে পারেননি তার স্ত্রী কণিকা দেবী। মেডিকাল কলেজের প্রাক্তনী ডাঃ সুশীল পাল ছিলেন শ্রীরামপুর ওয়ালশ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ।
একটু খটকা লেগেছিল কণিকা দেবী-র। এরকম তো কখনও হয় না। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল। তখনও কোনও খোঁজ নেই সুশীলবাবুর। সেদিন রাতেই হাওড়ার সাঁকরাইলের সরস্বতী খালে পাওয়া যায় এক ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ। সনাক্তকরণের পর বোঝা যায় সেই মৃতদেহটি ছিল ডাঃ সুশীল পালের। ময়না-তদন্তে দেখা যায়, দেহে অন্তত ৩৩টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। গলার হাড়ও ভাঙা। ময়নাতদন্তে স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছিল ডাঃ সুশীল পালকে।
চিকিৎসক হিসেবে বেশ নামডাক ছিল সুশীলবাবুর। ছিলেন রোগীদের পরম বন্ধু। একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নরম্যাল ডেলিভারি করবার চেষ্টা করতেন এই ডাক্তারবাবু আজকের দিনে যা এক বিরল দৃষ্টান্ত। ওনার নামই হয়ে গেছিল সুশীল নরমাল পাল।
কিন্তু কেন অকালেই চলে যেতে হল ডাঃ সুশীল পালকে? ঠিক কি ঘটেছিল ডাঃ সুশীল পালের সঙ্গে আজ থেকে ২১ বছর আগে?
বেআইনি গর্ভপাত করতে রাজি না-হওয়াই কাল হয়েছিল সুশীলবাবুর। সন্দেহের তীর ছিল আর এক স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ পিয়ালি দাসের উপর। পিয়ালি দেবী প্রায় পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন তখন। গর্ভস্থ ভ্রূণ ২০ সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ায় গর্ভপাত করানোয় যথেষ্ট ঝুঁকি ছিল। তাই কোন্নগর ও শ্রীরামপুরের দুই ওষুধের দোকানি মারফত তত্কালীন সিপিআইএম নেতা বিশ্বজ্যোতি বসু, পিয়ালি দেবীরা বালির সেবায়তন নার্সিংহোমে ডেকে পাঠিয়েছিলেন অভিজ্ঞ ও দক্ষ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সুশীলবাবুকে। তাঁকে যথেষ্ট আপ্যায়নও করা হয়েছিল গোড়ায়। কিন্তু ২০ সপ্তাহের বেশি অন্তঃসত্ত্বার গর্ভপাত যেহেতু আইন-স্বীকৃত নয় (ব্যতিক্রম, স্বাস্থ্যের কারণে যদি গর্ভপাত একান্ত দরকার হয়), তাই সে কাজে রাজি হননি সুশীলবাবু। এমনকী, ওটি ছেড়ে তিনি বেরিয়ে আসতেও চান। প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন, তাঁকে জোর করলে বিষয়টি তিনি পুলিশকে জানাতে বাধ্য হবেন। এর পরই বিশ্বজ্যোতি, পিয়ালি অন্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওটি-র মধ্যেই খুন করেন সুশীলবাবুকে।
তদন্তে নেমে পুলিশের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় বালির জন সেবায়তন নার্সিংহোমের সচিব বিশ্বজ্যোতি বসু, ডা: পিয়ালি দাস-সহ আরও অনেকে জড়িত খুনের ঘটনায়। তদন্তভার সিআইডি-র হাতে গেলে প্রমাণ মেলে,বালির সেবায়তন নার্সিংহোমেই খুন করা হয়েছে সুশীলবাবুকে।
এর পরের ঘটনা অবশ্য আদৌ সরলরেখায় চলেনি। পুলিশি তদন্তে দেখা যায়, ঘটনায় প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত সিপিএমের একাধিক প্রভাবশালী নেতা। তদন্তভার সিআইডি-র হাতে যাওয়ার পরও তত্কালীন শাসকদলের প্রভাব যে ছায়া ফেলেছিল তদন্ত প্রক্রিয়ায়, তাও একান্তে স্বীকার করেছেন একাধিক সিআইডি অফিসার। যদিও সংবাদমাধ্যমের তুমুল চাপ ও নিয়মিত প্রশ্ন তোলার মুখে একসময়ে নতিস্বীকার করে শাসকদল। তদন্ত প্রভাবমুক্ত করার জন্য প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করেন তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। পার্টি থেকে বহিষ্কারও করা হয় অভিযুক্ত নেতাদের। তার পরও অভিযুক্ত সকলকে তদন্ত প্রক্রিয়ায় একসূত্রে গেঁথে সিআইডি-কে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় অত্যন্ত ধীর গতিতেই। সিআইডি এই খুনে তেরো জনের বিরুদ্ধে খুন, তথ্যপ্রমাণ লোপাট ও ষড়যন্ত্রের দায়ে চার্জশিট দেয়।
ঘটনার ১০ বছরের মাথায় ২০১৪ সালে এই খুনের ঘটনায় অবশেষে দোষী সাব্যস্ত হন অভিযুক্তরা। সুশীল পাল হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয় তেরো জন অভিযুক্ত। এই মামলায় রায় দেন হাওড়া জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক। মামলা চলাকালীন এক জনের মৃত্যু হয়। দোষী সাব্যস্ত বাকি ১২ জনের মধ্যে আট জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাবাসের নির্দেশ দিল আদালত। দোষী আরও চার জনের সাত বছর কারাদণ্ড হয়। হাওড়ার জেলা জজ তন্ময় গুপ্ত ওই নির্দেশ দেন। সুশীল পালকে ষড়যন্ত্র করে খুন ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে বিশ্বজ্যোতি বসু, পিয়ালি দাস মণ্ডল, অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রহ্লাদ সরকার, শুভনারায়ণ ঘোষ, সন্তোষ অগ্রবাল, সুরেন্দ্রকুমার অগ্রবাল ও মুমতাজ আহমেদ খানের। খুনের তথ্যপ্রমাণ লোপাটের দায়ে সাত বছর কারাবাসের নির্দেশ হয়েছে বিশ্বনাথ কংসবণিক, রাজীব নাথ, জয়ন্ত ঘোষ এবং চন্দন ডোম ওরফে গব্বরের। আদালতে রায় ঘোষণার পরই কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত সুশীল পালের স্ত্রী কণিকা পাল এবং দুই মেয়ে শ্রেয়া ও সৃজা।
আজকাল চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে সম্পর্ক তলানিতে। সুচিকিৎসা পেতে আজও বহু কাঠখড় পোড়াতে হয় রোগীদের। অনেক চিকিৎসক ওষুধের কোম্পানি থেকে কমিশন, প্যাথলজি ল্যাব থেকে কমিশন খেয়ে ভুলে গেছেন আদর্শের কথা। ডাক্তার সুশীল পাল ছিলেন এক ব্যতিক্রম। ডাঃ সুশীল পালের বড় মেয়ে শ্রেয়া ডাক্তারি পাশ করে পিজি তে ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দিয়েছে। আশাকরি সেও ভবিষ্যতে বাবার মতই আদর্শ চিকিৎসক হয়ে উঠবে।
ডাঃ সুশীল পালকে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
কৃতজ্ঞতাস্বীকার: অহর্নিশ – Ahornish










