
“ আমি চক্রব্যুহ ভাঙব, সেই প্রকৌশল আমার অজ্ঞাত নয়। জ্যেষ্ঠতাত , আপনি আমাকে অনুমতি দিন। আমি ব্যুহ ভঙ্গ করে শস্ত্রবিদ্যায় আমাদের মহান পারিবারিক পরম্পরাকে গরিমান্বিত করি”। – বীরদর্পে ঘোষণা করেন অভিমন্যু। সভাস্থ মানুষরা প্রথমে আৎকে ওঠেন। তারপর ক্ষাত্রধর্মের কথা স্মরণ করে সকলে একযোগে বলে ওঠেন – “ সাধু! সাধু! এমন কথা তোমার মুখেই শোভা পায়। তুমি বিজয়ী হও।
এরপরের কাহিনি,করুণ পরিণতির কাহিনি তা ১আমাদের সকলেরই জানা। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন অভিমন্যু জ্ঞাত হয়েছিলেন চক্রব্যুহ ভাঙার কৌশল সম্পর্কে, কিন্তু ব্যুহ ভেঙে বেরিয়ে আসার উপায় জানা ছিলনা তাঁর। তাই কুরুপক্ষের বাঘা বাঘা যোদ্ধাদের সম্মিলিত অন্যায় আক্রমণে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ত্রয়োদশতম দিবসে প্রাণ হারালেন অমিতবিক্রম কিশোরবীর অভিমন্যু। মহাভারতের এ এক অতীব বিয়োগান্তক কাহিনি।
মাঝেমাঝেই আমার মনে হয় আমাদের দশা ঐ অভিমন্যুর মতো। আমরা কেবল উন্নয়নের ব্যুহে ঢোকার গা জোয়ারি ছলাকলাটাই জানি, সেখান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসার উপায় সম্পর্কে আমরা অজ্ঞাত। ফলে শুধু গুটিকয় মানুষ নয়, পৃথিবীতে বসবাসকারী সকলেই আজ বিপন্ন। মুখে মুখে টেকসই ব্যবস্থাপনার, টেকসই যাপনের কথা যতই বড়াই করে বলিনা কেন, আদতে আমরা এক ভঙ্গুর জীবনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছি। আমাদের কাজকর্ম যতই বিকাশ বা উন্নয়নমুখী বলে প্রচার করা হোক সত্যিই তা তেমন নয়। আমরা অভিমন্যুর মতো উন্নয়নের চক্রব্যুহে আটকে পড়েছি আর তিলতিল করে শেষ প্রহরের (!) অপেক্ষা করছি।
কিন্তু এই পরিণতিকে সবাই নিঃশব্দে মেনে নিচ্ছেন তেমনটাও নয়। সীমিত সামর্থ্য আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে কিছু প্রাণবন্ত লড়াকু মানুষ নিজের নিজের একান্ত পরিমন্ডলে, নিভৃতে, কোনো রকম প্রচারের অপেক্ষা না করেই কাজ করে চলেছেন গোপনে গোপনে। আর হয়তো এইসব মানুষের কর্মপ্রচেষ্টার কারণেই পৃথিবী এখনও মরুভূমি হয়ে ওঠেনি। এদের চোখ দিয়েই এখনও আমরা নতুন এক পৃথিবীর নির্মাণের স্বপ্ন দেখি। আজ এমনই সপ্তসারথির সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো, যাঁদের কাজের কথা শুনলে বা পড়লে আমরা ঐ চক্রব্যুহ থেকে পৃথিবীকে হয়তো খানিকটা মুক্তি দিতে পারবো। এঁরা একলব্যের মতোই গোপনে নতুন নির্মাণের কর্মযজ্ঞে নিজেদের সঁপে দিয়েছেন। কেউ সংরক্ষণ করছেন তাঁর এলাকার পাহাড়, কেউবা নিজেই গড়ে তুলেছেন গোটা একটা বনভূমি,কেউ বাঁচিয়ে তুলেছেন নষ্ট হয়ে যাওয়া নদীকে। আসলে কাজের তো কোনো শেষ নেই, ধরিত্রীর প্রতিটি ক্ষেত্রই যে আজ দাবি করে একটু সহানুভূতি,একটু বিবেচনা,একটু ভালোবাসা।
১. ডক্টর শঙ্কর লাল গর্গ
২. পঙ্কজ কুমার
ভারত নদী মাতৃক দেশ । প্রতিদিন বেনারসের গঙ্গার ঘাটে গঙ্গা মাইয়ার উদ্দেশ্যে আরতি করা হয়। হাজার হাজার মানুষ সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। এর পাশাপাশি যমুনা নদীর করুণ দশা দেখলে রীতিমতো আৎকে উঠতে হয়। এমন দ্বৈধতা নিয়েই বাঁচতে আমরা অর্থাৎ ভারতবর্ষের মানুষেরা বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছি। গঙ্গাকে একদিকে মাইয়া বলে অর্চনা করবো পুণ্য লাভের জন্য, অন্যদিকে এই নদীকেই দেশের দীর্ঘতম পয়প্রণালীতে পরিণত করতে আমাদের সামান্যতম লজ্জাবোধ হয়না। অবশ্য সবাই যে একই ছাঁচে ফেলা মানুষ হবেন তেমনটাও নয়। এই যেমন বাবু পঙ্কজ কুমার।

৩.লাকমেন মেরী নোঙ্গখালো

হস্থালির কাজ কর্মের জন্য প্রয়োজনীয় জল সংগ্রহ করতে লাকমেনকে প্রতিদিন পাহাড়ি পথ বেয়ে অনেকটা পথ যেতে হতো। এই ট্রেকিং করতে করতেই লাকমেনের মাথায় খেলে যায় নতুন পরিকল্পনা। আচ্ছা ! পাহাড়ের ঢাল বরাবর গড়িয়ে নামা জলকে যদি আটকে রাখা যায়, তাহলে তো জলের সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব ! যেমন ভাবা তেমন কাজ। লাকমেন গ্রামের অধিবাসীদের তাঁর পরিকল্পনার কথা খুলে বলেন। স্কুলের দিদিমণির কথায় মান্যতা দিয়ে সবাই মিলে নেমে পড়ে জল ধরার কাজে। বর্ষার আগেই শেষ করতে হবে কাজ। সমবেত উদ্যোগে পাহাড়ের ঢালের আড়াআড়ি ভাবে তৈরি করা হয় চারটি চেক্ ড্যাম, পাঁচটি স্টোরেজ পনড্ , সংস্কার করা হয় পুরনো ছয় ছটি ঝর্ণা। এখানেই শেষ নয়। পাহাড়ের ঢালে জলের গড়ানকে নিয়ন্ত্রিত করতে ঢালের অংশে লাগানো হয়েছে ১৬০০০ গাছের চারা।
লাকমেন মেরী নোঙ্গখালো পৃথিবীর সমস্ত সমস্যার একাই সমাধান করতে পারবেন এমনতো নয়, কিন্তু স্থানীয় মানুষের অসুবিধাগুলো খানিকটা অন্তত সমাধানে উদ্যোগী হতে পারি সবাই। এখন কারদেমখলা গ্রামের মানুষের জলের চাহিদা অনেকটাই মিটেছে। ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে জল আনার দিন শেষ ।জল আনার সময় এখন লেখাপড়া শিখতে বা অন্য কোনো কাজে ব্যয় করতে পারছে তাঁরা।আর এসবই সম্ভব হয়েছে লাকমেনের কর্মপরিকল্পনার হাত ধরেই।
৪. ক্যাপ্টেন ডিসি শেখর
ছিলেন মার্চেন্ট নেভির কর্মকর্তা।আর সেই সূত্রেই নদী,জল এসবের সঙ্গে ব্যাঙ্গালুরুর ডিসি শেখর সাহেবের একেবারে আত্মার সম্পর্ক। এই ভালোবাসার জন্যই তাঁর সিদ্ধান্ত হলো একেবারে উৎসস্থলেই নদীকে সম্পূর্ণভাবে বর্জ্যমুক্ত করা যাতে তার জন্য নদীর প্রবাহ কখনোই থমকে অবরুদ্ধ না হয়। শেখর সাহেব বিশ্বাস করেন যে, নদী তাঁর গতি হারালে সমাজও গতিহীন বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়। নদীর মৃত্যু মানে সভ্যতারও মৃত্যু।
নদীর তীরে পরিভ্রমণের সময় এমন আত্মনাশী কর্মকাণ্ড দেখে ভীষণভাবে মর্মাহত হন তিনি। সেদিন থেকেই এর হাত থেকে মুক্তির উপায় খোঁজা শুরু। মাথা খাটিয়ে বের করলেন স্বল্প খরচে তৈরি এক ভাসমান বাঁধ যা আটকে দেবে নদীর জলে ভেসে যাওয়া আবর্জনা। নদী থেকে এই আবর্জনা পরিষ্কার করে ফেলা হলে কেবলমাত্র নদীই তাঁর বহমানতা বজায় রাখবে তা নয়, সাথেসাথে সমুদ্রের জলও অনেক পরিষ্কার থাকবে। আজ অনেক ক্ষেত্রেই ক্যাপ্টেন শেখরের চিন্তা প্রসূত ভাসমান বাঁধ বা ফ্লোটিং ব্যারিয়ারকে কাজে লাগানো হচ্ছে নদীকে বা নালাগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখতে। ক্যাপ্টেন আপনাকে স্যালুট ।













ভালো লেখা। সবাইকে পড়তে অনুরোধ।
আপনি আচরি ধর্ম শেখাও পরেরে…. মন্তব্য পড়ে এই আপ্ত বাক্যটির কথা মনে এলো।