বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো স্মৃতিরা ঝকঝকে হয়ে ওঠে — আশ্বিনের বৃষ্টিধোয়া আকাশের মতো। নতুন দিন যতই চমকদার হোক না কেন, সেই সাদাকালো অতীতের ঔজ্জ্বল্যের পাশে দাঁড়াতেই পারে না — ফিকে হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে সরে যায় অন্য কোথাও।
ঘ্যানঘেনে আষাঢ়ু সন্ধ্যায় সেই ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল ফেলে আসা দিনের কিছু ঝলক সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হলো।
আমার ছ’বছর বয়সে আমি প্রথমবার পুরী যাই বাবা মায়ের সঙ্গে। পায়ের নিচে সরসরে ভিজে বালির সরে যাওয়ার ভয়ার্ত অনুভব, বাবার আঙুল আঁকড়ে সি বিচের একপ্রান্তে নির্জন ছোট্ট পানের গুমটিতে দুপুরবেলা খাবার পরে মিঠে পান কিনতে যাওয়া আর দারুব্রহ্মের আকাশছোঁয়া মন্দিরের গুণ্ডা বাঁদরবাহিনীর উৎপাত বাদ দিয়ে স্মৃতিতে বিশেষ কিছুই নেই।
না, আছে। একটি জরাজীর্ণ হলিডে হোমে থাকার স্মৃতি রয়ে গিয়েছে। পকেটে রেস্ত কম থাকার ফলে হোটেলের বদলে হলিডে হোমে ঠাঁই নিতে বাধ্য হয়েছিল বাবা। সকালে বাজার হতো, দুপুরে মায়ের হাতের রান্না, রাতে বাবার কিনে আনা মোটা মোটা পুরি আর সকালের তরকারির অবশিষ্ট, ছানাপোড়া বা মদনমোহন সহযোগে খাওয়া হতো মনে আছে তা-ও।
সেই হলিডে হোম ছিল ইনক্যাব কোম্পানির — ১৯২০ সালের ব্রিটিশ সংস্থা ইণ্ডিয়ান এনফিল্ড কেবল কোম্পানি থেকে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পরে যে কারখানার নাম বদলে হয় ইণ্ডিয়া কেবলস, সংক্ষেপে ইনক্যাব।
সেদিন হাইড রোড দিয়ে যেতে যেতে সেই কোম্পানির ভেঙে যাওয়া লোগো দেখতে পেলাম একটা শ্যাওলাপড়া এলারঙের গোডাউনের গায়ে। সিমেন্টের লোগোর গা জড়িয়ে উঠেছে হরেক লতাপাতা। খোঁজ নিয়ে জানলাম, উৎপাদন সংক্রান্ত নানা ঝামেলা আর বিশ্বায়নে অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছোতে পিছোতে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পাকাপাকি ভাবে বন্ধ হয়ে যায় ইণ্ডিয়া কেবলস। ১৯৯৯ সাল নাগাদ চলে যায় লিকুইডেশনে — বিআইএফআর অধিগ্রহণ করে তাকে। আর বেঁচে উঠতে পারেনি সে। হারিয়ে গিয়েছে চিরকালের মতো।
ধর্মতলা বা এসপ্লানেড হচ্ছে এমন একটা জায়গা, যেটাকে বলা চলে crossroad of all destinations….
নিজের গন্তব্য যা-ই হোক, বিভিন্ন অদেখা বসতির আনকোরা বা আধচেনা নামেদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যাবেই ধর্মতলায়।
ধরুন আমি যাবো কালিয়াগঞ্জ, আমার পাশের বাসের গায়ে লেখা জ্বলজ্বল করছে ‘নগরউখড়া’ কিংবা ‘হিলি’।
তেমনি করেই ইশকুলজীবনের শেষাশেষি, এসপ্ল্যানেড থেকে শিয়ালদার বাস ধরতে গিয়ে দেখা হয়ে গিয়েছিল একটা মিনিবাসের সঙ্গে। তার খয়েরি গায়ের উপরে হলদে বর্ডারে মোটা কালো অক্ষরে লেখা ছিল ‘শম্পা মির্জা নগর হইতে হাওড়া’। জায়গাটা যে ঠিক কোথায়, সেই ১৯৮৬ সালে আমার সবজান্তা বাবাও উত্তর দিতে পারেনি। অথচ নামটি এতটাই ভাল লেগে গিয়েছিল আমার যে মনে মনে ঠিক করেছিলাম — পারলে সেখানেই থাকব। আর নিতান্ত না পারলে, একবার গিয়ে দেখে আসব জায়গাটা। কি অদ্ভুত নাম, না? শম্পা মানে বিদ্যুৎ, আমি জানতাম। আর মির্জা তো মুসলমান নাম। তার সঙ্গে আবার নগর। কোনও মিষ্টি ইতিহাস কল্পনা করে নিরর্থক জল্পনায় কেটে যেত অনেকটা সময়।
তারপর চলে গিয়েছে অনেক অনেক বছর।
এখন আমি জানি, মহেশতলা পুরসভার যে চোদ্দ নম্বর ওয়ার্ডে আমার বাড়ি, তার পাশের পনেরো নম্বর ওয়ার্ডেই ‘শম্পা মির্জা নগর হাউজিং এস্টেট’ – কতগুলো ভাঙাচোরা সরকারি কোয়ার্টারের সমষ্টি। কথাটা শম্পাও নয় — সাঁপা। মানে দান করা বা উৎসর্গ করা। মির্জাসাহেব নামক কোনও স্থানীয় ধনী উদার মুসলমানের দান করা জমির উপরে গড়ে ওঠা হাউজিং এস্টেটের নামই রয়ে গিয়েছে রেজিস্ট্রির দলিলে। আজকাল সেই বাড়িগুলির সামনের বজবজ ট্রাঙ্ক রোড দিয়েই আমার নিত্য যাওয়া আসা — যে পথ দিয়ে এককালে চলত আমার কাঁচা বয়সের রোম্যান্টিকতা উসকে দেওয়া মিনিবাস, ‘শম্পা মির্জা নগর হইতে হাওড়া’।
সে বাসও গিয়েছে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে — আমার কাঁচামিঠে স্বপ্নের মতো। আর কেউ জানতে না পারুক, বিধাতা কিন্তু ঠিকই খোঁজ রেখেছিলেন আমার বেয়াড়া ইচ্ছেটার — তাই মনকেমন করা নামের হাটুরে জনপদের প্রতিবেশে পোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন আমাকে।
একনাথ সোলকারের খেলা আমি দেখিনি। ১৯৭৬ সালে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট থেকে তিনি যখন অবসর নেন, তখনও নিয়মিতভাবে দূরদর্শনে টেস্ট ম্যাচের ধারাপ্রদর্শন হতো না। আমাদের বাড়িতে টিভিও ছিল না সেই সময়।
তাঁর কথা আমি জেনেছিলাম আমার অল্পবয়সের ক্রিকেটনায়ক সুনীল গাভাসকারের লেখা ‘সানি ডেজ’ বই থেকে। একনাথ প্রথাগত অলরাউণ্ডার ছিলেন না। কিন্তু বিনা হেলমেটের যুগে ফরওয়ার্ড শর্ট লেগে দাঁড়িয়ে কিছু অবিশ্বাস্য ক্যাচ নিয়েছেন তিনি। টি টোয়েন্টির বহুযুগ আগে নন উইকেটকিপার ফিল্ডার হিসেবে ২৭টি ম্যাচে তিনি ৫৩টি ক্যাচ নিয়েছিলেন, যা ঈর্ষণীয় বলে মনে করা হতো। বর্তমান প্রজন্ম তাঁকে ভুলে গিয়েছে।
আমার বাবার বড় প্রিয় ক্রিকেটার ছিলেন তিনি। কে জানে, জীবনের শক্ত পিচে, এলোমেলো বোলিং করা বাবা হয়ত একজন ম্যাচ বাঁচানো একনাথ সোলকার চেয়েছিল তার পাশে।
২০০৫ সালে সাতান্ন বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে হারিয়ে যান একনাথ।
আমার ছাপ্পান্ন চলছে। পুনর্মিলনের ক্ষণ এগিয়ে আসছে ধীর নিশ্চিত পায়ে। বাবার সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞেস করব — কি গো সর্বজ্ঞ, এইবার বলো, ‘বাপি’ তোমার ম্যাচ বাঁচানো একনাথ সোলকার হয়ে উঠতে পেরেছিল তো নশ্বর জীবনে?









