‘এবিপি আনন্দ’ এ দুদিন আগে শুভময় মৈত্র প্রশ্ন করলেন, আগামী প্রজন্ম কোনটায় উৎসাহী হবে, রাতজেগে বসে পড়াশোনা করা বা প্রচুর খেটে কঠিন অঙ্ক সমাধান করা, না, পাড়ার সোনার চেন পরা ক্ষমতাশীল তৃণমূলী বাহুবলীর পদাঙ্ক অনুসরণ করার??
‘সীমাবদ্ধ’ সিনেমায় বরুণ চন্দের প্রশ্ন ‘মানে ভবিষ্যৎ অন্ধকার'(কল্পিত বিপ্লবী প্রেমিকের রেফারেন্সে) এর উত্তরে শর্মিলা ঠাকুরের জবাব ছিল ‘না, অনিশ্চিত’!
এই রাজ্যে, বর্তমানে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের আগামী দিনগুলো অন্ধকার কিনা জানিনা, তবে ঘোরতর অনিশ্চিত এ সম্পর্কে কোনো রকম সন্দেহ নেই। ফলে, দ্বিতীয় পন্থাই যে অনেক আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, এ নিয়ে আর সংশয়ের কী আছে?!
উনি ঠিক কী চাইছেন জানা না থাকলেও, এটা পরিষ্কার যে সরকারি পরিষেবায় পড়াশোনা করার পথ যত ভাবে সম্ভব রুদ্ধ করা যায়, তার সব কটি পদ্ধতি যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গেই পালিত হচ্ছে।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবার পর তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, কলেজে ভর্তির বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ শূন্য বললেও বোধহয় বেশি বলা হয়। সর্বশেষ সংযোজন হলো রাজ্যে মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রক্রিয়া স্থগিত করা। অথচ NMC এর পরিষ্কার নির্দেশ আছে, নির্দিষ্ট দিনের পর সেই অ্যাকাডেমিক বর্ষের কোনো ভর্তি হবে না। সুতরাং, Director of Medical Education এর করা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ভর্তির প্রক্রিয়া ঠিক কোন জটিলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা একেবারেই অজানা !
ইঞ্জিনিয়ারিং এ তো ২৭শে এপ্রিল তারিখে হওয়া পরীক্ষার রেজাল্টই এখনো বার হলো না!!
সবচেয়ে অবাক লাগে এর প্রতিক্রিয়ায়। যাদের পকেটে পয়সা আছে, তারা নাহয় রাজ্যের বাইরে বেসরকারি কলেজে চলে যাবে। কিন্তু, যাদের ক্ষমতা নেই বা তুলনামূলক ভাবে কম, তারা কি করবে? নিশ্চিত ভাবে তাদের সংখ্যাই অনেক বেশি। কিন্তু, এতো বড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কি সেই ভাবে আন্দোলন সংগঠিত হচ্ছে, না জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে?? মুশকিল হলো কোনোটাই না, আসলে এসব দেখতে দেখতে আমরা বোধহয় একটা refractory phase এ চলে গেছি, যেখানে কোনো কিছুই আর আমাদের সেভাবে উত্তেজিত করে না। একটাই উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছিল ‘Justice for R G Kar’..!! অবশ্য ভুলটা তখনই হয়েছে। বলে না, devil কে একবার বাগে পেলে ভালো করে ধরে ফেলো, সে তোমাকে দ্বিতীয় সুযোগ নাও দিতে পারে।
যাক, কী করা যাবে ! এরপর আবার সেই অপার নির্লিপ্ততা। অভিভাবকদের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম, সত্যিই তো চরম উদ্বেগে দিন কাটানো ছাড়া তারা কীইবা করতে পারেন।
কিন্তু ছাত্র আন্দোলন? তা কি শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট মিছিল, বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকবে? পশ্চিম বাঙলার এরকম হাল তো কখনো ছিল না। এই পরিস্থিতিতেও যদি সেই নিয়মমাফিক আন্দোলনেই আটকে থাকতে হয়, তাহলে তো সত্যিই কিছু বলার নেই।
‘৮০এর দশক থেকেই দেখেছি, যারা নিজেরা পড়াশোনা করেনি বা নানা কারণে করে ওঠা হয়নি, তাদের মধ্যে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানোর জন্য বিশেষ ভাবে তৎপরতা। শুধু স্কুলে পাঠানোই নয়, বিশেষ ভাবে জোর দেওয়া হয় প্রাইভেট টিউশনির উপর। এমনকি খেটে খাওয়া মানুষ বা দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলেমেয়েরাও চলে আসে প্রাইভেট টিউশনির আওতায়। বস্তুতঃ, পশ্চিম বাঙলার মতো প্রাইভেট টিউশনির এতো রমরমা আর কোথাও আছে কিনা সন্দেহ। দুর্ভাগ্যবশত বা সৌভাগ্যবশত, এই রাজ্যের শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের কাছে এটাই এখন গ্রাসাচ্ছাদনের প্রায় একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের সামনে বিভিন্ন সুযোগুলো যেভাবে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জানিনা কতদিন বাবা-মায়েরা এই উৎসাহ ধরে রাখতে পারবেন !
কালিগঞ্জের তামান্নার বাবা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে উড়িষ্যায় কাজ করতে গিয়েছিলেন শুধুমাত্র মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াবেন বলে। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থাটা একবার ভাবার চেষ্টা করুন।
সারা রাজ্যে এতো শিক্ষিত জ্ঞানীগুণী বিদ্বান বুদ্ধিমান মানুষজন, শিক্ষক অধ্যাপক, অথচ শিক্ষার এতো বড় দুঃসময়েও প্রতিরোধ ছেড়ে দিন, কোনো সংঘবদ্ধ জোরালো প্রতিবাদও কোথাও আছে কি? মানুষের যা কিছু উদ্যোগ, তা এখন সবই আদালতকেই কেন্দ্র করে, বর্তমান কালের সমস্ত আন্দোলনই হলো আদালত মুখী!! সমাধান ও সমস্যা, সবই তো সেই একই জায়গায়..
আসলে যাই ঘটুক, অর্থবানদের অনেক বিকল্প আছে, সব সময়েই। কিন্তু, বাকি সকলে যারা সেই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে পড়েন না, সমস্যা তাদেরই। তাদের সন্তানদের কী হবে?
কী আর হবে? হয় তৃণমূলী মাস্তান, নাহলে পরিযায়ী শ্রমিক, ডেলিভারি বয় বা গাড়ির চালক?
আর তো কোনো alternative দেখছি না……..
তবে, শুভময়বাবুর কথাই বোধহয় ঠিক, প্রথমটাই অনেক বেশি ‘আকর্ষণীয় অপসন’…….











