এমন সব মন ভালো করা খবর নিয়ে মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার সামান্যতম আগ্রহ নেই। আর তাদেরই বা খামোখা দোষ দিই কেন? সংবাদমাধ্যম সেই সব খবরই পরিবেশন করে যা পাবলিক সহজে খায়। আর তাই সংবাদমাধ্যম জুড়ে এখন বিকৃত জীবনের খণ্ডচিত্র তুলে ধরা হয় নানান রসে চুবিয়ে। সামাজিক অভিরুচির চরম অধঃপতনের এ এক মানক। উত্তর দিনাজপুরের এক নীরব কৃষি বিপ্লবের কথা প্রথম জানি জেলার অনামা স্থানীয় এক পত্রিকার পাতা থেকে। খুব ভালো লাগে খবরটি। সেই খবরই একটু বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরা হলো আপনাদের জন্য। পড়ুন ও পড়ান।এক আশ্চর্য নীরব মন্ত্রসাধনার সমশরিক হোন। 
উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা ভূমধ্যসাগরীয় তেজপাতা গাছ ছাড়াও আরও পাঁচ ধরনের তেজপাতা গাছের খোঁজ পেয়েছেন পৃথিবীর নানান প্রান্তে। মূলত আর্দ্রতা যুক্ত উপকূলীয় জলবায়ু আংশিক ছায়া এবং খুব ভালো জল নির্গমন ব্যবস্থা বিশিষ্ট বেলে দোআঁশ মাটিতে এই গাছ ভালো হয়। এমন সুবিধা থাকায় – পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ , ইন্দোনেশিয়া , ভারতবর্ষ , ক্যালিফোর্নিয়া এবং মেক্সিকোতেও এই তেজপাতা গাছের দেখা পাওয়া যায়।
আয়ুর্বেদিক ভেষজ গুণাবলীর জন্য আমাদের দেশে এই তেজপাতা গাছের কদর অনেকদিনের। ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে উত্তরাখণ্ড সবথেকে বেশি পরিমাণে তেজপাতা উৎপাদন করে। তারপর একে একে জায়গা করে নিয়েছে কেরালা, কর্ণাটক সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো। এই তালিকায় আমাদের বাংলার ঠাঁই অনেক পেছনে ছিল। কিন্তু সম্প্রতি আমাদের রাজ্যের চমকপ্রদ উন্নতি ঘটেছে এই তেজপাতা উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে। সেই উত্থানের কথা শোনাতেই আজ হাজির হয়েছি।
সুকুমারের সাফল্যের কথা ছড়িয়ে পড়েছে জেলার অন্যান্য অঞ্চলে। রায়গঞ্জ ব্লকের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে হেমতাবাদ , কালিয়াগঞ্জ এবং ইসলামপুর ব্লকের কৃষকরাও তেজপাতার মতো জনপ্রিয় মশলা চাষে ক্রমশই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। পাশের জেলা দক্ষিণ দিনাজপুরের কুশমান্ডি ব্লকের কৃষকরাও আজ অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছে। চাষের এলাকার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তেজপাতা উৎপাদনে দ্রুত সর্বভারতীয় মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। এই সাফল্যের জন্য আমরা গর্বিত।
আইলো রে আজ নতুন দিনের আলো
উত্তর দিনাজপুর জেলার এই সাফল্য কেবলমাত্র তেজপাতা উৎপাদনেই সীমিত নেই, তা আজ জেলার আর্থিক বিকাশ তথা এলাকার গ্রামীণ মহিলাদের স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সুকুমার বর্মনের প্রচেষ্টা নিছক গ্রামীণ কৃষির স্থানান্তরেই আটকে থাকেনি তা আজ বার্ষিক ৪০০ কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। সবথেকে আনন্দের খবর হলো ,এই সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছেন এলাকার সাধারণ ঘরের মহিলারা।
আজ থেকে মাত্র দু দশক আগে ভারতের অগ্রণী তেজপাতা উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোর তালিকায় নাম না থাকা একটি রাজ্যের এভাবে শিরনামে উঠে আসা সত্যিই আমাদের বিস্মিত করে। নতুন করে প্রমাণ করে চাষীর ছেলে চাষী হলে ক্ষতি নেই। মশলা বাজারে কুইন্টাল পিছু ৫০০০ টাকা দরে বিকিয়ে যায় দিনাজপুরের তেজপাতা। কৃষকদের আয় বেড়ে যাবার থেকেও বড়ো খবর গ্রামের সাধারণ মহিলারা আজ নিজেদের পায়ে সম্মানের সঙ্গে দাঁড়িয়েছেন। স্বাবলম্বনের এই কাহিনি আজ রূপকথার গল্পের মতো মুখে মুখে ফিরছে। পাশাপাশি নারী- পুরুষের যৌথ কর্ম প্রয়াসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই তেজপাতা উৎপাদন।
গ্রামের পুরুষদের কাজ হলো গাছের পরিচর্যা করা এবং যথাসময়ে গাছ থেকে পাতা পাড়া। এর পরেই মাঠে নেমে পড়েন মহিলারা। তাঁদের কাজ হলো নিখুঁত পাতাগুলোকে ডাল থেকে ছাড়িয়ে রোদে শুকিয়ে নেওয়া। এই কাজটি করতে হয় কঠোর তদারকিতে। কোয়ালিটির সঙ্গে কোনো আপোষ করতে রাজি নয় উৎপাদনকারীরা।
কথা হচ্ছিল মহিলা শ্রমিক আলো রায়ের সঙ্গে। বছর তিরিশের যুবতী গৃহবধূ। তাঁর কাছে এই আয়ের বিষয়টি একাধারে অস্মিতা ও স্বাধীকারের বিষয় । আজ তিন বছর ধরে আলো এই কাজ করছেন। আর এই সময়ের মধ্যেই পাতা ছাড়ানোর কাজে বিশেষ ধরনের দক্ষতা অর্জন করেছেন তিনি। আলোর মতে,– আপাতদৃষ্টিতে কাজটাকে খুব সহজ বলে মনে হয়, কিন্তু খুব দ্রুততার সঙ্গে কাজটা করতে চাই তীক্ষ্ণ নজর আর দক্ষতা। অনেকটাই চা বাগানের মহিলা প্লাকার্সদের মতো। আলোর কাজের সময় শুরু হয় ঠিক সকাল ৯ টায়।চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এই ৮ ঘন্টায় আলো ৪৫- ৫০ কিলোগ্রাম পাতা ছাড়াতে পারেন। এখানে দুটি ভাগে মজুরি ভাগ করা হয় – ডাল থেকে পাতা ছাড়ানোর জন্য পাওয়া যায় কে জি পিছু ৩ টাকা, আর পাতা বাছাইয়ের জন্য মজুরি মেলে কে জি প্রতি ৪.৫০ টাকা। দু ধরনের কাজেই আলোর দক্ষতা প্রশ্নাতীত।
সুকুমারের সাফল্যের সূত্রে আজ এক নতুন জীবনের স্বাদ পেয়েছেন আলো রায়ের মতো অনেক মহিলা যাঁরা একসময় কৃষি অর্থনীতির গ্রীন রুমে নেপথ্য কুশীলব হিসেবে অপেক্ষা করে থাকতেন । আজ আলোর মতো নেপথ্যচারিণীরাই অর্থনীতির মূল মঞ্চে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এটাই বিপ্লব, পরিবর্তনের দিশারী।
তেজপাতার হাত ধরে তেজিয়ান দিনাজপুরের অর্থনীতি
নানান ভেষজগুণ সম্পন্ন তেজপাতা আজ বলবর্ধক টনিকের মতো তেজিয়ান করেছে উত্তর দিনাজপুরের কৃষি অর্থনীতিকে। এমনিতেই উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর অর্থনীতি দক্ষিণবঙ্গের তুলনায় খানিকটা কমজোরী। আজ তেজপাতার হাত ধরে সেই ধীরে চলা অর্থনৈতিক কাঠামো নতুন করে চেগে উঠেছে। তবে এতেই খুশি নন স্থানীয় কৃষক ও কৃষিপণ্য বিপণনের সঙ্গে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে থাকা মানুষেরা। তাঁদের আক্ষেপ ৪০০ কোটি টাকা লেনদেনের পরেও এই কৃষিব্যবসাটি এক দুর্বল পরিকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বৃক্ষ ফসল হবার কারণে তেজপাতা গাছের রক্ষণাবেক্ষণ ও যত্ন আত্তির ঝুঁকি অনেকটাই কম। এই কারণে আরও বেশি সংখ্যক ছোট ও মাঝারি চাষিরা তেজপাতা গাছের প্রতিপালনে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এটা সুলক্ষণ সন্দেহ নেই।
সাধারণ ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি জেলার হর্টিকালচার অফিসার ও জেলা হর্টিকালচার বিভাগের সহকারী ডিরেক্টর সন্দীপ মহান্তর কথাতেও ঝরে পড়েছে খানিকটা হতাশার সুর। তাঁর আক্ষেপ,২০২০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে জেলায় তেজপাতার উৎপাদন বাড়ছে। বাড়ছে তেজপাতা গাছের চাষের এলাকা। কিন্তু তৎসত্ত্বেও এই ব্যবসার ক্ষেত্রটি অসংগঠিত শিল্প হিসেবেই পরিচিত। এই বিষয়ে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান তিনি।
মহান্ত সাহেব চান গোটা বিষয়টিকে একটা সংহত রূপ দিতে যাতে তেজপাতা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত সকলেই সমানভাবে লাভবান হতে পারেন। এই মুহূর্তে প্রায় ১০০০০ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে তেজপাতার চাষ ও প্রাথমিক প্রসেসিং এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। জেলার হেমতাবাদ ব্লকে তেজপাতা গাছের চাষ সবথেকে বেশি।মহান্ত সাহেবের মতে, “এই চাষে ঝুঁকি কম, নিয়মিত তীক্ষ্ণ নজরদারির প্রয়োজন নেই। সবথেকে বড়ো কথা হল এই চাষে জলের চাহিদা কম। এইসব কারণেই এলাকায় তেজপাতা গাছের চাষ বাড়ছে।”
সোনালী স্বপ্নের অন্বেষনে তেজপাতা গাছের চাষ
তেজপাতা গাছের চাষ উত্তর দিনাজপুরের এতোদিনের চেনা কৃষি উৎপাদনের চরিত্রে লক্ষনীয় পরিবর্তন এনেছে। সুকুমার বর্মনের মতো প্রগতিশীল কৃষকেরা ঐ একই জমি থেকে বাড়তি আয়ের লক্ষ্যে একাধিক সাথী ফসল চাষ করছেন সুবিধা মতো। এতে করে সুস্থিত যাপনের সুযোগ অনেকটাই বেড়েছে। সঙ্গে বেড়েছে জমি কেন্দ্রিক ব্যস্ততা। এতে খুশি সকলেই। সকলেই বলছেন খেলা আসলে বদলেছে এই তেজপাতা গাছ। এই গাছই হল আসল Game Changer.
সুকুমার কথায় কথায় জানান – একদম শুরুতে আমি কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম তেজপাতা গাছের চাষের সাফল্য নিয়ে। বুঝে উঠতে সময় লাগবে জেনেই আমি সবুর করেছি। আমাদের দেশে তিন ধরনের তেজপাতা গাছের চাষ হয় – বেঙ্গল ভ্যারাইটি, ব্যাঙ্গালুরু ভ্যারাইটি এবং শিলং ভ্যারাইটি। আমি ব্যাঙ্গালুরু ভ্যারাইটির গাছ বসিয়েছি, কেননা এই ধরনের গাছ থেকে অনেক বেশি পরিমাণে পাতা পাওয়া যায়। আমাদের এখানে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে এই প্রজাতির গাছেরা।দু বছরের মধ্যেই পাতা কাটার মতো উপযুক্ত হয়ে যায়, আর এক নাগাড়ে ২৫ বছরের মতো পাতা দিতে পারে। বছরে দুইবার করে পাতা কাটা হয়। প্রতিবারে সর্বাধিক ২৫ কিলোর মতো পাতা পাওয়া যায় এক একটি গাছ থেকে।
আজকাল বাগান দাদনে দিয়ে দেন চাষিরা। ব্যবসায়ীদের হাতে একবারে তিন বছরের জন্য লিজ দিয়ে দেন চাষিরা। ইজারাদার এই তিন বছর বাগানের ভালো মন্দের দায়িত্বে থাকেন নির্দিষ্ট ইজারাদার। বিনিময়ে জমির মালিক কৃষক পান থোক টাকা। এরফলে এখন আরও নিশ্চিন্ত মনে থাকেন বাগান মালিক কৃষকেরা। এই নিশ্চিত যাপনই উত্তর দিনাজপুরের কৃষি অর্থনীতিকে এক শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। বিকাশের নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষেরা।এর থেকে বড়ো সাফল্য আর কি বা হতে পারে!
আগস্ট ২৫,২০২৫
















মন ভালো করা খবর।লেখককে অনেক ধন্যবাদ এমন সব খবর পরিবেশনের জন্য। অক্ষয় হোক আপনার লেখনী।
এতোদিন ছিপ ফেলে বসেছিলাম যদি কেউ বড়শিতে ঠোক্কর দেয়। সকলেই ব্যস্ত। অথচ এমন সব মানুষ, এমনসব ইতিবাচক প্রয়াসগুলোর কথা সকলের সামনে তুলে না ধরলে নিজেকেই নিজে অপরাধী মনে করছিলাম। এমন খবর আছে। অনেক অনেক আছে। চেষ্টা থাকবে সেগুলো সাধ্যমত তুলে ধরার। আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ভালো পাঠক কোথায়?
পাঠকদের মধ্যে ভালো লেখা পড়ার মানসিকতা না গড়ে উঠলে এমন প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া সত্যিই কঠিন। আমরা পাকে বাঁধা পড়ে যাচ্ছি না তো! তেজপাতার তেজেও পাঠকদের হুঁশ না ফিরলে তা সত্যিই উদ্বেগের বিষয়।