আমরাই ইতিহাসের সবচেয়ে “গর্বের” জেনারেশন — জেনারেশন এক্স । একটা অস্কার পাওয়া উচিত আমাদের, বিভাগ: সর্বকালের সেরা স্বার্থপরতা।
আমরাই শেষ ব্যাচ, যারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত ঘর থেকে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছি — আর ওপরে পৌঁছেই সিঁড়িটা ভেঙে ফেলেছি, যত্ন করে, যাতে পেছনের কেউ ভুলেও উঠতে না পারে। যাদের কাঁধে চড়ে এতদূর এসেছি, তাদের মাথায় লাথি মারাটাই এখন আমাদের প্রিয় সান্ধ্যকালীন বিনোদন।
জীবনের একমাত্র মিশন, একমাত্র “জাতীয় কর্তব্য” — কীভাবে আবদুল চাচাদের একটু বেশি টাইট দেওয়া যায়। এইটাই তো দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ রূপ, তাই না? আর কিছু লাগে না দেশ গড়তে।
নিজেরা জন্মেছি সরকারি হাসপাতালে, একদম বিনা পয়সায় — জনগণের করের টাকায়। কিন্তু সেই হাসপাতালটাই যখন সরকার চিতায় তুলে দেয়, আমরা তখন গর্বের সঙ্গে মেডিক্লেম পলিসির প্রিমিয়াম-রসিদ দেখাই, যেন সেটাই মোক্ষলাভ। বাকি যারা এখনও সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভরসায় বেঁচে আছে? আহা বেচারা, মরুক না, আমাদের কী এসে যায়!
নিজেরা ফ্রি-তে সরকারি স্কুলে, বা প্রায় ফ্রি-তে বেসরকারি স্কুলে পড়েছি, জনগণের ভর্তুকিতে মেডিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ঢুকেছি, আর নিজেদের “স্বনির্ভর মেধাবী” বলে বুক ফুলিয়েছি। এখন সেই শিক্ষাব্যবস্থা ধুঁকছে দেখে আমরা একদম নির্বিকার — ছেলেমেয়েকে বিদেশ পাঠিয়ে সেলফি তুলি, ক্যাপশন দিই “প্রাউড প্যারেন্ট”, আর মনে মনে ভাবি বাকিরা গোল্লায় গেলে আমাদের বয়েই গেল।
বাবা-মার সঙ্গে সেকেন্ড ক্লাসে ভারত ঘুরেছি কানাকড়ি খরচ করে। আর আজ যখন সেই সাধারণ মানুষের কামরার সিটই বছরে বছরে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে , আমরা বন্দে ভারতের এসি কামরায় বসে জাতীয় গর্বে চোখে জল আনি। কী অসাধারণ ধারাবাহিকতা, তাই না?
আসলে আমাদের জেনারেশন যে কোনো সমস্যার একটাই “সমাধান” জানে — সমস্যাটা মেটানো নয়, নিজেকে তার থেকে কিনে বাঁচানো। জল বিষাক্ত? RO ফিল্টার বসিয়ে নাও। বাতাস বিষাক্ত? এয়ার পিউরিফায়ার কিনে ফেলো, ঘরটা সিল করে দাও। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে? প্রাইভেট মেডিক্লেম আছে তো, চিন্তা কী! সরকারি স্কুল-কলেজ ধ্বংস? চড়া বেতনের প্রাইভেট স্কুল আর বিদেশি ইউনিভার্সিটি তো আছেই। সমস্যাটা মেটানোর কোনো দরকার নেই — তার ওপর টাকা ছুঁড়ে দিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নাও, বাকি দেশটা যেভাবে খুশি ডুবুক। এটাই আমাদের “ইনোভেশন”, এটাই আমাদের “সমাধান” — যার সামর্থ্য নেই, সে বিষ খাক।
সত্যি বলতে, আমাদের নেওয়ার আর কিছু বাকি নেই। সমাজটাকে চুষে-চিবিয়ে-ছিবড়ে করে যা পাওয়ার নিয়ে নিয়েছি, প্লেটটাও চেটেপুটে সাফ। এখন শুধু লুটের মালটা বুকে চেপে বসে আছি — কেউ একটু হাত বাড়ালেই আমাদের সংবিধান, ঐতিহ্য, “মেধা” নিয়ে বক্তৃতা শুরু হয়ে যায় ।
Gen Z ঠিকই ধরে ফেলেছে — আমরাই ওদের ভবিষ্যৎ বেচে খেয়েছি। খাবার জলে বিষ মিশিয়েছি, নিঃশ্বাসের বাতাস বিষিয়েছি, শিক্ষা-চাকরির পথ বন্ধ করেছি। জল-জঙ্গল-জমি, দেশের সম্পদ — সব তুলে দিয়েছি অলিগার্কদের হাতে, আর নিজেরা ব্যস্ত ছিলাম হোয়াটসঅ্যাপ ফরওয়ার্ডে হিন্দু-মুসলমান, জাতপাত বাছাই করতে। বাহ, কী দূরদর্শী প্রজন্ম আমরা!
তাও যা বাঁচোয়া — Gen Z অন্তত সাম্প্রদায়িকতাকে সরাসরি “cringe” ঘোষণা করে দিয়েছে। এই একটাই সান্ত্বনা আমাদের প্রজন্মের — অন্তত ওরা আমাদের ব্যর্থতার কার্বন কপি হয়নি।
সেলাম, Gen Z। ধ্বংসস্তূপ যা রেখে গেলাম, তা সামলানোর দায়িত্বটাও তোমাদেরই — শুভকামনা।
আমাদের জেনারেশনের আত্মসমালোচনা নেবার ক্ষমতা আর পরস্পরের প্রতি অনলাইন সৌজন্যবোধ বিখ্যাত, তাই কমেন্ট রেস্ট্রিক্ট রাখা হলো।
#জেনজি #GenZ #সাম্প্রদায়িকতা #সরকারিব্যবস্থা #ভণ্ডামি #স্যাটায়ার #ব্যঙ্গ #ROফিল্টার










