৯ আগস্ট, ২০২৬
দু’বছর আগে এই দিনটা।
দুপুর নাগাদ খবর পেলাম, আরজিকরে অন-ডিউটি ডাক্তার – পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ছাত্রী – রাতের বেলায় খুন হয়ে গিয়েছে। শুধু খুন নয়, ধর্ষণ ও খুন।
স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম।
কামদুনির ঘটনা পুরনো হয়ে গেছিল অনেক আগেই, কিন্তু মফস্বলের নির্জন রাস্তার ঘটনা খাস কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়াটা হতবাক হওয়ারই মতো।
তবে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ইনসাইডার হিসেবে এটুকু খবর রাখতাম, সন্দীপ ঘোষের শাসনাধীন আরজিকর তখন সত্যিই এক Impossible is Nothing-এর বাস্তবায়িত মডেল। বছরদুয়েক আগেই মেডিকেল কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নিয়েছি – সেখানে অবিশ্বাস্য অনাচার প্রত্যক্ষ করেছি – বিজয়ী প্রার্থীদের (যাঁদের অনেকে ইদানীং বর্তমান শাসকদলে মিশে গিয়েছেন/ মিশে যাবার চেষ্টা করছেন) সঙ্গে সবুজ আবীর মেখে সন্দীপ ঘোষের দুই আঙুলে ভিক্ট্রি সাইন দেখানো ছবিও দেখেছি – এবং অবশেষে ভুক্তভোগী হয়ে… যাক গে! তো কাজেই…
ওইদিনই আরজিকরে দেখেছিলাম, হতবাক জনসাধারণের তীব্র ক্ষোভ – এবং বিপরীতে, আরজিকরের গড়-রক্ষার জন্য সন্দীপ ঘোষের একশ্রেণীর চামচা-ছাত্রের মরিয়া প্রয়াস।
ভেবেছিলাম, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো জনগণের ‘পালস’-বোঝা রাজনীতিক অন্তত এই ঘটনা ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করবেন না। হ্যাঁ, পার্ক স্ট্রীট থেকে কামদুনি, সব ঘটনাই, বিপুল গণবিক্ষোভের পরেও, সফলভাবে ধামাচাপা দিতে পারার অবিশ্বাস্য ‘কৃতিত্ব’ সত্ত্বেও, ভেবেছিলাম, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অন্তত বুঝবেন যে খাস কলকাতার সরকারি প্রতিষ্ঠানে ডিউটিরত ডাক্তারি ছাত্রীর ধর্ষণ-খুন হয়ে যাবার ঘটনার অভিঘাত অন্যস্তরের হতে বাধ্য – এবং সেজন্যই, তিনি অন্তত এক্ষেত্রে, রাজধর্ম পালন করে মানবিক ও সুশাসিকা হওয়ার বার্তা দেবেন।
না। ওইদিনই চটজলদি (?দায়সারা) পোস্টমর্টেম করে অতিদ্রুত সৎকার হয়ে গেল। শোকগ্রস্ত বাবা-মায়ের হাতে টাকা গুঁজে মুখ বন্ধের চেষ্টাও হলো। ধর্ষক তথা খুনী চটপট ধরাও পড়ে গেল – ‘অপরাধী’ এমন এক সুবিধেজনক মানুষ যার সপক্ষে বলার মতো কেউ নেই, সুতরাং ধর্ষণ-খুনের মতো অপরাধের দায় তার নামে জুড়ে দিলেও কেউ আপত্তি করবে না। অতএব…
আরও অনেক অনেএএক কিছু হলো… আপনারা সবই জানেন, সুতরাং পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন।
এরপর রাস্তায় রাস্তায় কেটে গিয়েছে অনেকগুলো দিন… সপ্তাহের দিনগুলো ঝাড়গ্রামে কেটে যেত বলে, আমার ক্ষেত্রে বলা উচিত, রাস্তায় রাস্তায় কেটে গিয়েছে অনেকগুলো সপ্তাহান্ত… ট্রেন থেকে নেমে সটান এসপ্ল্যানেডের ধর্নামঞ্চে পৌঁছেছি কখনও, কখনও বা স্বাস্থ্যভবনে…
কিন্তু তখনও জানতাম, অর্গানাইজড পুলিশ ফোর্স যেখানে চার-পাঁচদিন ধরে ধীরেসুস্থে প্রমাণ লোপাট করে, সেখানে পরবর্তী তদন্ত থেকে ‘প্রমাণ’ জোগাড় করা অসম্ভব। আর পরবর্তী তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত করতে কতখানি আগ্রহী ছিল, তা শেয়ালদা কোর্টের প্রসিডিংস যাঁরা নিয়মিত খেয়াল করেছেন, তাঁরা জানবেন। তদুপরি সুয়ো মোতো আগ্রহ প্রকাশের শেষে উচ্চতম আদালত ঠিক কী বিচার করেছিলেন, সে প্রসঙ্গে না-ই বা গেলাম!
কিন্তু আমার শুধুই মনে হতো, হাসপাতালের ভেতরে এত বড় ঘটনা ঘটে গেল – আর সেখানকার জুনিয়র/সিনিয়র ডাক্তার থেকে নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী, কেউই কিচ্ছুটি জানতে পারল না – এ তো অসম্ভব! কেউই কি কোত্থাও মুখ খুলবে না?! কোনও না কোনও একদিন, কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও…
তো যা হয়, আস্তে আস্তে সবই থিতিয়ে গেল। বিপুল বিক্ষোভের পরেও, অন্তর্বর্তী উপনির্বাচনে, শাসকদল বিপুলতর জয়ের স্বাদ পেলেন। এবং বিশ্বাস করলেন যে তাঁরা ‘জনতার আদালতে’ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। কিন্তু…
তারপর…
মন্তব্য বা বিশদ ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন।
মেয়েটির মা আপাতত বিধায়ক।
রাজ্যে আপাতত নতুন সরকার। যাঁরা এই অপরাধের বিচার করবেন এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। মাসতিনেক আগে।
ব্যাস, এটুকুই।
বাকি সবই আগের মতো চলছে। আইন আইনের পথে চলছে, আর বিচার বিচারের পথে।
এবং প্রতীক্ষা, প্রতীক্ষার পথে।
ও হ্যাঁ, অভয়া-র স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখাতে, আজ, দু’মিনিটের নীরবতা পালনের সরকারি নির্দেশ এসেছে।
থালা বাজিয়ে কোভিড না যাক, অন্তত নীরবতার শক্তিতে অভয়া বিচারটুকু পাক – আপাতত এই আশায় থাকছি। আমাদের মতো ক্ষমতাহীনের হাতে আশা (আর সীমাহীন বিরক্তি, এবং কখনও কখনও অক্ষম রাগ) ছাড়া আর কী-ই বা থাকে!









