ভোর ছটায় খুপরিতে ঢুকে প্রথম পনেরো মিনিট খুব হাই ওঠে। তারপর চায়ের দোকানে দাদু যখন হজমলা মেশানো এক কাপ কড়া চা দিয়ে যান, তখন হাই ওঠা বন্ধ হয়।
সমস্যা হল চায়ের দোকানের দাদুর আবার ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম রোগ আছে। এই রোগের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কারণে অকারণে পায়খানা পায়। বাড়ি থেকে জামা কাপড় পরে বেরোনোর সময় পায়খানা পেয়ে গেল। সব সেরে আবার বেরোতে যাবেন হঠাৎ মেঘ ডেকেছে, অমনি পায়খানা পেয়ে গেল। যার ফলে দাদুর দোকান খুলতে মাঝে মাঝেই দেরি হয়, আর আমার হাই তোলাও চলতে থাকে।
এরকমই একদিন হাই তুলতে তুলতে রোগীদের সমস্যা শুনছি। নানাবিধ সমস্যা – হাতে পায়ে টাস লাগা থেকে ব্রক্ষ্মতালুতে গ্যাসীয় নৃত্য। এমন সময় গৌর এসে বলল, ডাক্তারবাবু, সাবধানে। এরপর যিনি আসবেন, ভালো মেশিন চালাতেন।
বললাম, কী মেশিন?
গৌর বললো, চুপ চুপ, শুনলে আবার দুঃখ পাবেন। এখন তো আর চালান না।
আবার বললাম, কী মেশিন?
মেশিন বুঝেন না? ওইযে দু নলা, একসাথে দুটো নল দিয়েই বের হয়। দুম… দুম…। দোহাই আপনাকে, শোরগোল করবেন না।
আর শোরগোল! আমার হাই ওঠা বন্ধ হয়ে গেল। সক্কাল সক্কাল এসব কী রোগী!
তারপর মেশিন চালানো ভদ্রলোক যখন ঢুকলেন, চেহারা দেখে আরো ঘাবড়ে গেলাম। অবিকল বাপ্পি লাহিড়ীর কার্বন কপি। গলায় গোটা আটেক সোনার চেন। দুহাতের দশটা আঙুলে অন্তত কুড়িটা আংটি। ভালো মেশিন চালাতে গেলে সম্ভবত এতগুলোই আংটি লাগে।
তবে সব খারাপের মধ্যেও একটু ভালো থাকে। রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন- “মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।” আমি সোনার চেন দেখে আশ্বস্ত হলাম। এনার কাছ থেকে ভিজিট পাওয়া যাবে। আগের দুজন দিতে পারেননি। তাঁদের গলায় তুলসীর মালা ছিল।
ভদ্রলোক অনেক মেশিন চালিয়েছেন। কিন্তু নিজের সব মেশিনপত্তরে গন্ডগোল। সুগার ব্রায়ান লারার টেস্টের হায়েস্ট স্কোর ক্রস করেছে। কোলেস্টেরল শচীন তেন্ডুলকরের হায়েস্ট স্কোর।
জ্ঞান দিচ্ছিলাম খাওয়া-দাওয়া, জীবনযাত্রা এইসব নিয়ে। বললাম, সবকিছুতে সংযম আনতে হবে।
তিনি হেসে বললেন, আমি পুরোপুরি সংযমী হয়ে গেছি। সীতা, মিতা, রীতা সব অতীত। এখন জীবনে একজনই আছে। সেটা গীতা।
এই বলে তিনি ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে কী খুঁজতে লাগলেন। আমি ফ্যালফ্যাল করে গৌরের দিকে তাকালাম। মেশিন- টেশিন যদি বের হয়, আমার আর কোনদিন চা লাগবেনা। চিরতরে হাই ওঠা বন্ধ হয়ে যাবে।
মেশিনের বদলে একটি বই বেরোলো। ইসকন থেকে প্রকাশিত শ্রীমৎ ভগবত গীতা। উনি মধুর হেসে বললেন, কী আর বলবো, গীতা আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। এত সহজে যে মুক্তির উপায় আছে…
মুক্তি? কী থেকে মুক্তি? আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম।
মুক্তি… মানে… ইয়ে… এই তুচ্ছ জীবন থেকে মুক্তি। মহামুক্তি… যাকে বলে ব্রহ্মের সাথে একেবারে বিলীন হয়ে যাওয়া।
সরাসরি ব্রহ্মের সাথে- আমি অবাক হয়ে যাই। গীতা থেকে তো সেক্ষেত্রে উনার পূর্বোক্ত জীবনের মেশিনই অনেক বেশি উপযোগী ছিল। কিন্তু মুখে সে কথা প্রকাশ করার সাহস পাই না।
উনি বলে চলেছেন, এ এক আশ্চর্য গ্রন্থ। কর্ম করার দরকার নেই। শুধু সঙ্গে রাখলেই ফল লাভ। পরিশ্রম ছাড়াই সিদ্ধি লাভ।
আমি বিড়বিড় করে বললাম, একেবারে উল্টো কথা। কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।
উনি বললেন, কী বলছেন?
আপনি ঠিকই বলেছেন। একশ শতাংশ ঠিক। এই নিয়ে কোন তর্কই হতে পারে না।
উনি উদাত্ত হেসে বললেন, ওই যে তামিলনাড়ু না কোথায় একখানা প্লেন দুর্ঘটনা হলো না, ডাক্তারদের হোস্টেলে প্লেন ভেঙে পড়ল। যাত্রীরা মরলই, ডাক্তারও অনেক মরল। কেবল বেঁচে গেল একখানা গীতা।
আমি অবাক হয়ে বললাম, গীতা বেঁচে গেল?
হ্যাঁ, আপনি মোবাইলে রীল দেখেন না? একেবারে অবিকৃত ছিল। গীতা জলে ভেজেনা। আগুনে পোড়েনা। ধারালো অস্ত্রে কাটেনা।
বিড়বিড় করে বললাম,
নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ ।
ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ।
মেশিন চালানো ভদ্রলোক বললেন, কী বিড়বিড় করছেন?
গীতার একটা শ্লোক৷ আত্মা সম্পর্কে বলা হয়েছে। আত্মাকে অস্ত্রের দ্বারা কাটা যায় না, আগুনে পোড়ান যায় না, জলে ভেজানো যায় না, অথবা হাওয়াতে শুকানোও যায় না।আপনার মুখে শোনার পর মনে হচ্ছে শ্লোকটায় গণ্ডগোল আছে, ওটা আত্মার বদলে গীতা হবে।
অ্যাঁ, গীতাতেও লেখা আছে এসব? তাহলে বুঝুন। এই দেখুন না। বলতে বলতে আমার নিজের গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। কী ক্ষমতা একবার ভাবুন বইখানার।
আমি গৌরকে বললাম, গৌর, একখান দেশলাই দাও।
গৌর এতক্ষণ হাঁ করে আমাদের কথা শুনছিল। সে বুঝলো আমি একটা সমস্যা তৈরি করতে চলেছি। বলল, দেশলাই দিয়ে কী করবেন ডাক্তারবাবু?
হাতে কলমে পরীক্ষা করব। তুমি ভাবতে পারছ, আমরা কতবড় একটা ঐতিহাসিক ঘটনার সম্মুখীন হতে চলেছি!
মেশিন চালানো ভদ্রলোক রেগে মেগে বললেন, আপনি গীতার মত একটি পবিত্র গ্রন্থে আগুন ধরাবেন? আপনি সরাসরি ধর্মীয় আবেগে হস্তক্ষেপ করবেন? জানেন গীতা আমাদের সংস্কার।
আমি ঘাড় নাড়ালাম। গীতা অবশ্যই সংস্কার। কিন্তু আপনি যেটা বলছেন, একটা বই আগুনে পোড়েনা, জলে ভেজে না, অস্ত্রে কাটে না – এটা সম্ভবত কুসংস্কার।
গৌর বললো, ইয়ে… ডাক্তারবাবু, একখান কথা বলবো?
বললাম, পরে কথা। এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করব। প্রথমে কাঁইচি দিয়ে একটি পৃষ্ঠা থেকে সামান্য অংশ কাটবো। তাতে বইয়ের বিশেষ ক্ষতি হবে না। আপনার কথা সত্য হলে প্রথম পরীক্ষাতেই আমার ফেল করার কথা। তারপর ওই টুকরোয় আগুন ধরাবো। তারপর জল ঢালবো।
গৌর কাতরস্বরে বললো, আমাকে একখানা কথা বলতে দিন।
বললাম, বলো।
গৌর বললো, ভিডিওয় যেটা দেখিয়েছিল সেটা গীতা ছিলো? না বাইবেল?
মেশিন চালানো ভদ্রলোক বললেন, হ্যাঁ গীতা কিন্তু নাও হতে পারে, বাইবেলই মনে হচ্ছে যেন।
গৌর আরো কাতরস্বরে বলল, ডাক্তারবাবু, আপনি একটু হাত চালান। একজন ডায়রিয়া রোগী আছেন। আর চাপতে পারবেন না বলছেন। শেষে একটা কেলেংকারী হবে।











