ডাক্তারবাবু এক রোগীর টাইফয়েডের চিকিৎসা করছিলেন। দিনকয়েক বাদে, চিকিৎসায় আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না দেখে রোগীর ছেলে চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করলেন : “ডাক্তারবাবু, আপনি নিশ্চিত তো যে বাবার অসুখটা অন্য কিছু না, টাইফয়েডই? আসলে পরশুদিন আমার এক বন্ধুর বাবা মারা গেলেন। তাঁরও টাইফয়েডের চিকিৎসা চলছিল। মারা যাবার পর ডাক্তারবাবু বললেন, রোগী নিউমোনিয়ায় মারা গেছে।”
অত্যন্ত চটেমটে ডাক্তারবাবু বললেন : “দেখুন, আমাকে যেমনতেমন ডাক্তার ভাববেন না! আমি যখন রোগীর টাইফয়েডের চিকিৎসা করি, তখন সেই রোগী টাইফয়েডেই মরে – নিউমোনিয়ায় নয়।”
রোববারের সকালে চিকিৎসক হয়ে ডায়াগনোসিস বিষয়ক একটি লেখা লিখতে বসে এমন একখানা চটুল ও অসংবেদনশীল গল্প শোনানোর চাপল্য মার্জনা করবেন। তাছাড়া, গল্পটা সত্যিও নয়, ওরিজিনালও নয় – তারাপদ রায়ের একটি লেখা থেকে ঝেড়ে দেওয়া। তো মোদ্দা কথাটা হলো, গল্পের ডাক্তারবাবু নিজের করা ডায়াগনোসিস-এর ব্যাপারে যতখানি আত্মবিশ্বাসী – সব চিকিৎসক মোটেই ততখানি নন। এবং এধরনের আত্মবিশ্বাসের ফলে রোগীর যে সবসময় ভালো হয়, বা এমন আত্মবিশ্বাস যে রোগীপক্ষ সবসময় ভালোভাবে নেন, তাও হয়তো নয়।
Diagnosis – অ্যামব্রোজ বিয়ার্স তাঁর সুবিখ্যাত ডেভিলস ডিকশনরি-তে, এই শব্দের অর্থ করেছিলেন : A physician’s forecast of disease by the patient’s pulse and purse. বিয়ার্স-এর অনেকগুলো পরিচয়ের অন্যতম, তিনি ছিলেন সুবিখ্যাত সাংবাদিক। সুতরাং এই শ্লেষাত্মক অর্থের শেষ শব্দটুকুর দ্যোতনা অনুসারে এটুকু বলাই যায় যে, আগেকার দিনের তুলনায় চিকিৎসকরা নাকি ইদানীং অত্যন্ত অর্থগৃধ্নু হয়ে পড়েছেন, সমাজমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা এই অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা – কেননা, ব্যাপারটা ইদানীং-এর নয়, প্রায় সোয়া শতাব্দী আগেও চিকিৎসক ও চিকিৎসা বিষয়ে সাংবাদিকের তরফে এমন অভিযোগ তোলা হয়েছে। কিন্তু আবারও, গুরুতর বিষয় নিয়ে লিখতে বসে হাসিঠাট্টার দিকে চলে যাওয়া হচ্ছে। অতএব, বিয়ার্স-এর সংজ্ঞার শেষ শব্দটুকু ছেড়ে বাকিটুকুতে মনোনিবেশ করি। তাঁর কথায় স্পষ্ট, সেই সময়ে চিকিৎসক ডায়াগনোসিস করতেন রোগীর নাড়ি দেখে – এবং সেই ডায়াগনোসিস-এ অনিশ্চয়তা থাকত, কেননা তা নিতান্তই পূর্বাভাস (সম্ভবত আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতোই), সুতরাং অনিশ্চিত। ডা লিসা স্যান্ডার্স – নিয়মিত নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ ‘ডায়াগনোসিস’ নামে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি কলাম লিখতেন – তিনি তাঁর বইয়ের ভূমিকায় বিয়ার্স-এর এই সংজ্ঞা উদ্ধৃত করে বলেছেন : চিকিৎসার ইতিহাস জুড়ে ডায়াগনোসিস ব্যাপারটা এরকমই ছিল। মাত্র কিছুদিন আগেও, ডায়াগনোসিস ছিল যতটা না বিজ্ঞান, তার চাইতে ঢের বেশী আর্ট।
ঠিকই, ডায়াগনোসিস যে উত্তরোত্তর বিজ্ঞাননির্ভর হয়ে উঠেছে, এবিষয়ে ডা স্যান্ডার্স-এর সঙ্গে দ্বিমত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। গত শতাব্দীর দ্বিতীয় চতুর্থাংশ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি চমকপ্রদ। এমন কথাও অত্যুক্তি নয় যে, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পূর্ববর্তী আবিষ্কারের তাৎপর্য স্বীকার করার পরেও, চিকিৎসাশাস্ত্র একটা শক্তপোক্ত বৈজ্ঞানিক কাঠামোর উপর দাঁড়াতে পারল এই সময়েই – কেননা, রোগীর উপসর্গ ও রোগলক্ষণ দেখে চিকিৎসক যে রোগ অনুমান করছেন, বাস্তবে রোগীর সেই রোগই হয়েছে কিনা তা বুঝতে পারা গেল (অর্থাৎ কনফার্মেশন অফ ডায়াগনোসিস) এই সময়েই, এবং অনেক রোগের কার্যকরী চিকিৎসাও আবিষ্কৃত হয় এই সময়কালে। সুতরাং, উপসর্গ গিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া রোগীর রোগনির্ণয় ও সুচিকিৎসা – এবং উপসর্গ দেখে রোগ সারবে কি সারবে না তা বলা (প্রগনোসিস) – এই সবই সম্ভব হয়েছে কমবেশী গত একশ বছরে। হ্যাঁ, তার আগেও চিকিৎসক রোগীর রোগনির্ণয় করেছেন – যুগযুগ ধরেই ‘আরোগ্যনিকেতন’-এর জীবনমশাই বা ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’-র রামকালী চ্যাটার্জির মতো চিকিৎসকরা ছিলেন, যাঁরা উপসর্গ দেখে রোগের গতিপ্রকৃতি ও রোগীর সম্ভাব্য পরিণতি বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতেন – সে ভবিষ্যদ্বাণী মিলতও নিশ্চয়ই অনেকক্ষেত্রে – কিন্তু সেসবই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণশক্তির ফসল, যেখানে বিজ্ঞানের ভূমিকা যতখানি, তার চাইতে ঢের বেশী গুরুত্বপূর্ণ ‘আর্ট’।
তবে এই লেখায় জীবনমশাই বা রামকালী চ্যাটার্জিকে টেনে আনাটা একটু গোলমেলে হয়ে গেল, কেননা তাঁরা চিকিৎসা করতেন যে দর্শন মেনে – অর্থাৎ বহির্জগৎ ও শরীরের আভ্যন্তরীণ পরিবেশের অসামঞ্জস্য অসুখের জন্ম দেয় এবং অসুখ হয় সমগ্র মানুষটিরই, এই দর্শন – চিকিৎসাশাস্ত্র বিজ্ঞান হয়ে উঠতে গিয়ে সেই দর্শন থেকে সরে এসেছে। এবং এমন কথাও অসমীচীন হবে না যদি বলি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের চমকপ্রদ উন্নতি (যা চিকিৎসার ফলাফলে নিত্যদিনই প্রতিফলিত হয়), অথচ দীর্ঘ চিকিৎসার পরেও সেরে-না-ওঠা রোগীপরিজনের মধ্যে – এমনকি সেরে-ওঠা রোগীপরিজনের মধ্যেও – চিকিৎসা-বিষয়ক হতাশা ও ক্ষোভ, তার গভীরে রয়েছে এই পদ্ধতিগত বিচ্ছেদ।
ডায়াগনোসিস – অর্থাৎ রোগনির্ণয়। রোগী উপসর্গ নিয়ে এসেছেন চিকিৎসকের কাছে – চিকিৎসক খুঁজবেন ঠিক কোন রোগ এই উপসর্গসমষ্টির কারণ। এবং তারপর অধীত বিদ্যা থেকে বুঝবেন, কোন উপাদান (জীবাণু নাকি অন্যকিছু) এই রোগের কারণ – যে উপাদান নির্মূল করতে পারলেই রোগমুক্তি সম্ভব। চিকিৎসাতত্ত্ব বলে, রোগ বলতে কোনও না কোনও নির্দিষ্ট অঙ্গের অস্বাভাবিকতা ও উপসর্গ সেই অস্বাভাবিকতার কারণে ঘটে – যে অস্বাভাবিকতা পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব। ডাক্তারবাবুরা দর্শন ব্যাপারটায় বিশ্বাস করেন না – কিন্তু বাস্তবে আমরা যা যা করি, কোন্ কাজে কী হতে পারে সেই অন্তর্গত বিশ্বাস – এমনকি একই বস্তুকে যে যা ভাবে দেখি – সবের মূলেই একটা সুনির্দিষ্ট চিন্তাকাঠামো ও দর্শন থাকে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে উপসর্গের ব্যাখ্যা হিসেবে ডিজিজ থিওরি বা রোগ-তত্ত্ব জনপ্রিয় দুশো বছরেরও বেশী সময় যাবৎ – মানে ডিজিজ-এর কারণ বলতে শরীরে বাইরে থেকে উড়ে-এসে-জুড়ে-বসা কিছু উপাদান, এই তত্ত্ব – তত্ত্বের মূল কয়েকটি বিষয় (যেমন – একই উপসর্গসমষ্টির কারণ সবসময় একটিই রোগ, বা একই রোগের কারণ-উপাদান সবক্ষেত্রে একই হবে, এমন নয়। আবার কিছু রোগ, যেমন উচ্চ-রক্তচাপ ইত্যাদি, অনেকসময়ই, মূল সমস্যার অঙ্গের চিকিৎসা ছাড়াও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব) এদিক-ওদিক হলেও ডাক্তারবাবুদের চিন্তাপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করে এই দর্শনই। গৌতম বুদ্ধ কথিত আর্যসত্য চতুষ্টয়ের মতো করেই বলা চলে এই রোগ-দর্শন – শরীরে রোগ আছে, রোগের নির্দিষ্ট কারণ আছে (যা বোঝা সম্ভব), রোগমুক্তি সম্ভব, কারণ বুঝে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার মাধ্যমে সেরে ওঠা সম্ভব।
রোগী অসুস্থতার কথা বলছে মানে তার রোগ রয়েছে, যে রোগ কোনও না কোনও অঙ্গের অসঙ্গতির মধ্যে প্রতিফলিত হতে বাধ্য – এই দর্শনকে শিরোধার্য করলে, বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে অসঙ্গতির অনুসন্ধানে উত্তরোত্তর নতুন নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা অবশ্যম্ভাবী। কেননা, অমুক অঙ্গের তমুক অসঙ্গতি সিটি স্ক্যানে যতখানি বোঝা যায়, ততখানি সাধারণ এক্স-রে-তে নয় – আবার সিটি স্ক্যানে দেখতে পাওয়া তমুক অসঙ্গতি একাধিক কারণে হওয়া সম্ভব, যা পেট-সিটি স্ক্যান দেখে আলাদা করা সম্ভব – ডায়াগনোসিস-এ নিত্যনতুন টেকনোলজির প্রয়োগের সুবিধের এমন হাজার উদাহরণ দেওয়া যায়। সুতরাং, চিকিৎসাবিজ্ঞানকে যদি নিখাদ বিজ্ঞান হিসেবে দেখতে হয় – তাকে যদি একশ শতাংশ নির্ভেজাল বিজ্ঞান হিসেবে চিনতে হয় – তাহলে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানে টেকনোলজির প্রয়োগ ক্রমশ বাড়বে (যেমন বাড়ছে), এবং এই বৃদ্ধি যে ডায়াগনোসিস-এর ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়েছে (এবং আগামীদিনে আরও বেশী করে নেবে) তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
মুশকিল হলো, রোগ আর অসুস্থতা তো একই নয়। অনেকসময়ই অসুস্থতার পেছনে রোগ খুঁজে পাওয়া যায় না – বাঙালির গ্যাস-অম্বলের ধাতের কথাই ধরুন না – কিন্তু রোগ (অর্থাৎ বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে খুঁজে বেড়ানো অসঙ্গতি) খুঁজে না পেলেই ‘আপনার কিস্যু হয়নি, ব্যাপারটা মেন্টাল’ বলে দাগিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হয় না। আবার এমন অনেক রোগ রয়েছে, যা (অন্তত একটা পর্যায় অবধি) তেমনভাবে অসুস্থ করে না। অসুস্থতাহীন মানুষের মধ্যে রোগ খোঁজা – হেলথ চেক-আপ ইত্যাদি – সে-ও আরেক গেরো।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকরা রোগের চিকিৎসা করেন না, চিকিৎসা করেন রোগীর। অন্তত তেমনটাই হওয়ার কথা। চিকিৎসক ও সামনে-বসা অসুস্থ মানুষটি – দুজন ভিন্ন মানুষ, অসুস্থতা বিষয়ে দুজনের নিজস্ব বিষয়ীগত ভাবনার ভিন্নতা অবশ্যম্ভাবী। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ীগত (সাবজেক্টিভ) ভাবনার প্রবণতাকে বিষবৎ পরিত্যাজ্য হিসেবে দেখতে চাইছে – এবং অসুস্থতার কারণ হিসেবে সুনির্দিষ্ট রোগ না খুঁজে পেলেই অসুস্থ মানুষটির সমস্যাকে অগ্রাহ্য করতে চাইছে। অথচ শুধুই গাণিতিক বিজ্ঞানের নৈর্ব্যক্তিকতার আদলে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে দেখতে চাইলে অসুস্থ মানুষটির সমস্যার প্রতি সুবিচার হয় না – চিকিৎসকও যন্ত্রবৎ হিসেবে প্রতিভাত হন (শুধু প্রতিভাত হওয়ার ব্যাপার নয়, নতুন টেকনোলজি যন্ত্র দিয়েই চিকিৎসকের কাজ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব, এমন কথা বিশ্বাস করাতে চাইছে)। বর্তমান ব্যবস্থা যেভাবে ভাবাচ্ছে, আসলে চিকিৎসাটা করে বিজ্ঞান আর চিকিৎসক সেই বিজ্ঞানের প্রয়োগকারী মাত্র – এ যদি আমরা মেনে নিতে রাজি থাকি, তাহলে নৈর্ব্যক্তিক প্রয়োগকারী হিসেবে উন্নত যন্ত্র (বা যন্ত্রমানব) মানুষ-চিকিৎসকের চাইতে খারাপ হবে কেন?
তৃতীয়ত, বিজ্ঞান বলতে আমরা যা বুঝি তা দেশকালনিরপেক্ষ – এবং value-neutral। গ্যালিলিওর সূত্র ষোড়শ কি সপ্তদশ শতকের ইতালিতে যতখানি প্রযোজ্য, একবিংশ শতকের ম্যাডাগাস্কারেও ততখানিই সত্য – কে কখন কীভাবে প্রয়োগ করছেন, তা নির্বিশেষে সত্য – চিকিৎসাবিজ্ঞানও কি তেমনই? গাণিতিক বিজ্ঞানের অন্যতম ধর্ম, বড় সমস্যাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে সমাধান খোঁজা। সমগ্র মানুষের অসুস্থতাকে নির্দিষ্ট অঙ্গের অসঙ্গতি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে যাওয়ার মধ্যে সেই ভাবনারই প্রতিফলন – বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক টেস্টের মাধ্যমে তারই সন্ধান – কিন্তু আবারও মনে করাই, চিকিৎসক রোগের চিকিৎসা করেন না, চিকিৎসা করেন আস্ত মানুষটারই।
এবিষয়ে আরও অনেক কথা বলা যেতে পারত, তবে গুরুগম্ভীর বক্তব্য শুনিয়ে রোববারের সকালে আপনাকে তিতিবিরক্ত করে তোলাটা তো কোনও কাজের কথা নয়। তাছাড়া, ডায়াগনোসিস নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে, এসব কথা খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু সত্যিই পুরোদস্তুর অবান্তর কি? ডায়াগনোসিস নিখুঁত হয়েছে গত কয়েক দশকে – কিন্তু সেই ডায়াগনোসিস বলতে কী? বিভিন্ন টেস্ট, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ছবি – সে ছবি চিকিৎসকের সামনে কী তুলে ধরে? মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও অঙ্গের ক্রিয়াশীলতার প্রতিচ্ছবি – প্রতিচ্ছবি যেহেতু, কিছু অনিশ্চয়তা অবশ্যম্ভাবী – ছবি দেখে বা পরীক্ষা করে রিপোর্ট করছেন যিনি, তিনি মানুষ যেহেতু, বিষয়ীগত অনিশ্চয়তাও অবশ্যম্ভাবী – কিন্তু চিকিৎসক (এবং আদালত) বিশ্বাস করেন, রিপোর্ট যা বলছে তা একশ শতাংশ নিশ্চিত। তারপরও এটুকু অনস্বীকার্য, ডায়াগনোসিসে নিশ্চয়তার হার বেড়েছে। কিন্তু ডায়াগনোসিস বলতে, রোগনির্ণয়। যার সঙ্গে অসুস্থতার সংযোগ থাকতেও পারে, না-ও পারে। এই ডায়াগনোসিস ও সে ডায়াগনোসিস অনুসারে চিকিৎসা – আবারও বলি, বিজ্ঞানই সেখানে মুখ্য, চিকিৎসক যথাসম্ভব নৈর্ব্যক্তিক প্রয়োগকারী মাত্র – এবং রোগীর দেহ, বা দেহের সুনির্দিষ্ট অঙ্গ, প্রয়োগের ক্ষেত্রমাত্র। গত কয়েক দশকে চিকিৎসকের কাছে এসে রোগগ্রস্ত মানুষের রোগমুক্ত হওয়ার হার বেড়েছে – কিন্তু অসুস্থতার উপশম? চিকিৎসকের বিজ্ঞান-প্রয়োগকারী ভূমিকা এতখানিই অগ্রাধিকার পেয়েছে যে ক্ষেত্রবিশেষে সম্পূর্ণ মানুষটা (যিনি বর্তমানে অসুস্থ) সেই প্রয়োগের পথে অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। বলুন, আপনার সমস্যা কী – এই প্রশ্নের উত্তরে অসুস্থ মানুষটি দীর্ঘ গল্প বলতে বসলে চিকিৎসক বিরক্ত হন – অনেকগুলো সমস্যার কথা বললে চিকিৎসক সেই সমস্যাগুলোকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন যা সুনির্দিষ্ট রোগের ধারণার সঙ্গে উপসর্গ হিসেবে সামঞ্জস্যপূর্ণ – এবং পরীক্ষানিরীক্ষা হয়, অনেকসময়ই, রোগীর চোখে যা মূল সমস্যা সেসব নিয়ে নয়, চিকিৎসক যেটিকে রোগীর মূল সমস্যা হিসেবে ধরেন তদনুসারে। অসুস্থ মানুষটি ডায়াগনোসিস নিয়ে ফেরেন – ক্ষেত্রবিশেষে (বা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই) হয়ত নীরোগও হয়ে ওঠেন – সুস্থ হন কি?
এদেশে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অন্যতম অগ্রণী চিকিৎসক ডা রাজাগোপালের মুখে একখানা গল্প শুনেছিলাম। এক মধ্যবয়সী মানুষ – বাড়াবাড়ি পর্যায়ের ক্যানসারে আক্রান্ত। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন অঙ্গে – হাইডোজে মরফিন গোত্রের ওষুধ দিয়েও যন্ত্রণা যেন কিছুতেই কমছে না, মানুষটি দিবারাত্র ছটফট করছেন, যন্ত্রণায় চিৎকার করছেন। রোগটা সবাই জানে, কিন্তু সমস্যাটা কেউই বুঝতে পারছেন না। ডা রাজাগোপাল গিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন তাঁর সঙ্গে। বুঝলেন, যন্ত্রণা শরীরের তো বটেই, কিন্তু সেই শারীরিক ব্যথা মরফিনে নিয়ন্ত্রিত – আসল যন্ত্রণা উৎকণ্ঠার। মৃত্যুর পর কৈশোরোত্তীর্ণ সন্তানের লেখাপড়া পাছে বন্ধ হয়ে যায়, এই উৎকণ্ঠা। রাজাগোপাল-স্যার কাছেপিঠের এনজিও-র সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে ছেলেটির লেখাপড়া অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করলেন – অসুস্থ মানুষটির যন্ত্রণার চিৎকার বন্ধ হলো তারপরই। বলতে পারেন, এই রোগীর ডায়াগনোসিস কী? কোন্ এমন টেস্ট রয়েছে, যা দিয়ে সেই ডায়াগনোসিস কনফার্ম করা যায়?
রবিবারের ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর সঙ্গে বিতরিত ‘রোববার’ ম্যাগাজিনে ২৮/৬/২০২৬ প্রকাশিত।












