সকাল থেকে চিকিৎসক দিবসের শুভেচ্ছায় ভেসে যাচ্ছি। ওয়াটসঅ্যাপ ভর্তি, যেখানেই যাচ্ছি মানুষজন ফুলের তোড়া, মিষ্টির সম্ভার নিয়ে উপস্থিত 🙏 এসব আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ, নতমস্তকে সব স্বীকার করছি। কিন্তু বাপ মা শিক্ষকদের মতোই চিকিৎসকেরও কোনো দিন হয়না। আর যদি বা হয়, সেই দিনটা এই দিনে মানতে আমার ব্যক্তিগত সমস্যা আছে। বিধান বাবু শতাব্দীর সেরা বাঙালির একজন, পশ্চিমবঙ্গের রূপকার, কিংবদন্তী চিকিৎসক। কিন্তু মেডিক্যাল শাস্ত্রের ইতিহাসে তাঁর অসামান্য অবদান, এমনটা নয় – অন্তত আমার জানা নেই। সুভাষ মুখোপাধ্যায় আমাদের প্রাতঃস্মরণীয়দের তালিকায় নেই, দিলীপ মহলানবীশ নেই। এই দিনটা আমাকে যেন মনে করায় ডাক্তার হয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম তুলতে গেলে শুধু ডাক্তারিটাই যথেষ্ট নয়। আর এই অনুভবটা আমার কাছে খুব একটা পছন্দের নয়।
যাইহোক… এটা এখন লেটেস্ট নিউজ না। লেটেস্ট নিউজ হচ্ছে জনৈক ডাক্তার সিস্টারদের চেঞ্জিং রুমে গোপন ক্যামেরা রেখে দিয়েছে। তাতে লোকে আশ্চর্য হয়েছে। আমি আশ্চর্য নই, এতে আশ্চর্য হওয়ার কোনো কম্পোনেন্ট নেই। আমি বহুদিন ধরেই বলে আসছি ডাক্তারদের মধ্যেই মানুষের শ্রেষ্ঠ রূপের প্রকাশ হয়, নিকৃষ্টতম রূপেরও প্রকাশ হয়। আর জি করের ঘটনার পর আমার সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে। যাইহোক এই কচকচির জন্যেও পোস্ট করিনি। সিস্টার দের রুম নিয়ে কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেলো আর কি…
সিস্টারদের চেঞ্জ রুমটা আসলে তাদের ডিউটি রুম। পেশাগত কারণে ওনাদের নির্দিষ্ট ড্রেস পরে ডিউটি করতে হয় বলে ওটা চেঞ্জ রুম হিসাবেও ব্যবহার করতে হয়। গোটা ওয়ার্ডটা নিজেদের দায়িত্বে সামলাতে হলেও ওইটুকু জায়গাই ওনারা নিজেদের সামান্য ব্যক্তিগত পরিসর হিসাবে পান। মেডিসিন পিজিটি থাকার সময় সিস্টারদের হ্যান্ডওভারের সময় কোনো ইমার্জেন্সী হলে মাঝেমধ্যে ডাকতে যেতে হতো। এইটুকুই স্মৃতি ছিল ম্যাকেনজি ওয়ার্ডে…
তারপর আমরা কেবিল ওয়ার্ডে গেলাম। গিয়ে আমরা হয়ে গেলাম জামাই। মাঝে মধ্যেই আমাদের বেশ খাবার দাবার জুটতো। এখন যেহেতু সিস্টারদের সম্পত্তি বলতে ওইটুকু ঘরই, সুতরাং ওই ঘরেই আমরা পাত পেরে খেতাম। রুমাদি, দীপান্বিতাদি, রিনাদি, অরুণিমাদি, নির্ঝরদি, তনুশ্রীদি ইত্যাদি ইত্যাদি- বেশ ভরা সংসার ছিল আমাদের। পাশ করার পর এস আর হয়ে ছিলাম। মায়ের অসুস্থতার সময় হাসপাতালেই পড়ে থাকতাম সারাদিন। কখনো সময়মতো খাওয়া না হলে ডাক পড়তো। সেই ঘরেই খেয়েছি, আমার বাড়ির মানুষজন খেয়েছে, কথাবার্তা বলে একটু কষ্ট লাঘব করেছি…
কেবিল ওয়ার্ডের সিস্টারদের রুমে যেমন খাওয়া জুটতো, তেমনি জুটতো জিডিএ দাদাদের ঘরে। পুলকদা, বিপুলদার টিফিন থেকে ভাগ করে ডাল ভাত থেকে শুরু করে পায়েস সবই জুটেছে সময়ে অসময়ে।
অমন জামাই আদর আর কোথাও পাবোনা জানতাম। তবে কার্ডিওলজিতেও ঘরে ডেকে গেলানোর ধারা অল্প স্বল্প বজায় ছিল। বিশেষ করে বাসন্তীদির পাল্লায় পড়ে আইসিসিইউ চত্বরে থাকলে না খেয়ে উপায় ছিল না। চা প্রেমীদের জন্য আবার উনি নিজে চা বানিয়ে খাওয়াতেন। কিন্তু কার্ডিওলজির অমৃত ছিল ওটির দাদাদের মাখা ঝালমুড়ি। সোমবার খাওয়াদাওয়া জুটতো না কিছু। সকাল থেকে জুটতো শুধু রেডিয়েশন। বিকেল দিকে যখন দাদাদের কেউ এসে জানিয়ে যেত একবার একটু বাইরে আসবেন, ধরে প্রাণ পেতাম। বাইরে সেমিনার রুমের বাইরে ছোট্ট একটা জায়গা, ওটাই আবার ওদের চেঞ্জিং রুম। একটা বড় গামলায় বিশুদ্ধ ঝালমুড়ি মাখা থাকতো, খিদের পেটে হাঙরের মতো গিলতাম…
স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সবচেয়ে উপরের স্তরটাই ডাক্তারদের। তাই ডাক্তারদের দিন নিয়ে এত মাতামাতি। কিন্তু আসল খেলাটা কিন্তু একটা টিমগেম। ডাক্তার যেমন নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, দিন নেই রাত নেই ডিউটি করে যাচ্ছে, সিস্টারও তাই, জিডিএ ও তাই, টেকনোলজিস্টও তাই। দিন যদি হতেই হয়, সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য হোক – আমরা সবাই সেলিব্রেট করি…












