হোয়াটসঅ্যাপে একটি ছবি প্রায় ভাইরাল হয়ে ঘুরছে। শিরোনাম, স্বাস্থ্য সিন্ডিকেট। সেখানে, প্রত্যাশিতভাবেই, কিছু চিকিৎসকের নাম। কেননা স্বাস্থ্যব্যবস্থা আদতে টিমওয়ার্ক হলেও সেখানে ডাক্তারের স্থান অবিসংবাদিত নেতার। ভালো বা মন্দ, যা-ই হোক, দায় অনেকখানিই ডাক্তারের। তো সিন্ডিকেটের সেই তালিকায় মুখ্যমন্ত্রী-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এক চিকিৎসকের নাম থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য-দফতরের শীর্ষকর্তা সকলেই আছেন। রয়েছেন শাসকদলের বিশ্বাসভাজন কিছু তরুণ তুর্কী চিকিৎসকও।
আমি ছবিটি এখানে শেয়ার করছি না। কেননা, যথেষ্ট প্রমাণাদি ছাড়া জনাকয়েক প্রভাবশালী চিকিৎসকের নাম ধরে নিন্দেমন্দ করা – বা বড় অভিযোগ করা – কাজের কথা নয়। বিশেষত এই ঢালাও গুজবের বাজারে তেমন কাজ অত্যন্ত অনুচিত, দায়িত্বজ্ঞানহীনও বটে।
তো সেই তালিকার মধ্যে ডা সন্দীপ ঘোষ, আরজিকর-এর সদ্য-প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ইতোমধ্যেই সিবিআইয়ের জেরার মুখে। লম্বা জেরা।
আরজিকর-এর নতুন অধ্যক্ষ, যিনি স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন বিভিন্ন দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ – তথ্যের অধিকার আইনের সুবাদে আমাদের একটি চিঠির উত্তরে, স্বাস্থ্য-বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, তাঁর অপসারণের পর, যা যা বলেছিলেন, তাতে স্বজনপোষণ ইত্যাদি অভিযোগের যথেষ্ট স্বীকৃতি রয়েছে। তো তালিকায় তিনিও রয়েছেন।
তালিকার আরেক নাম যাঁর, তিনি নাকি ধর্ষণ-খুনের পরদিন সকালে, মেয়েটির বাবা-মাকে খবর দেওয়ারও আগে অকুস্থলে পৌঁছে গেছিলেন। কথাটা এই গুজবের বাজারে ‘নির্ভরযোগ্য সূত্রে’ জানাটানা নয়, রীতিমতো সংবাদপত্রের সুবাদে জেনেছি। তাঁকেও নাকি সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদ করবে, এমনটাই পড়লাম।
যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের কাছে এসবের কোনও কিছুই, তালিকার কোনও নামই তেমন নতুন কিছু খবর নয়। এসব নিয়ে আরও বিশদে লেখা-ই যায় – সময়কালে লিখবোও হয়ত – কিন্তু আপাতত অন্য একটা কথা বলি।
রাজ্যের মেডিকেল কাউন্সিল নির্বাচনে ব্যাপক দুর্নীতি বিষয়ে সেসময় বিস্তর লেখালিখি করেছিলাম। আমরা পরাজিত হয়েছিলাম – যাকে বলে নিষ্ফলের হতাশের দলে ছিলাম – সে তো বলাই বাহুল্য। তৎসংক্রান্ত মামলাটির ক্ষেত্রেও – আইন আইনের পথে চলছে, অতএব বছরকয়েকের মধ্যে ফয়সালা হবে এমন আশা নেই। কারও কারও হয়ত সেসবের কিছু কিছু মনে আছে। নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন ঘটনা এমন ন্যক্কারজনক অবস্থায় পৌঁছে গেছিল, যে, মূলধারার সংবাদপত্র ডাক্তারদের কাউন্সিল নির্বাচনের পরিস্থিতি নিয়ে সম্পাদকীয় লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ পরিস্থিতি এককথায় নজিরবিহীন।
তো সেই মেডিকেল কাউন্সিল নির্বাচনে জয়ের পর, জয়ীরা ও জয়ের কুশীলবরা এসে সর্বপ্রথম হাজির হয়েছিলেন আরজিকর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে। সবাই মিলে সবুজ আবীর মেখে ছবিটবি তুলেছিলেন – হাস্যোজ্জ্বল মুখে মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ডা সন্দীপ ঘোষ। আরজিকর-এর বর্তমান ঘটনায় লতায়পাতায় যাঁদের নাম চলে আসছে, তাঁদের বেশ কয়েকজন সেদিনের ওই ছবিতে হাজির।
স্বাস্থ্য-সিন্ডিকেট শিরোনামে যাঁদের নাম বেরিয়েছে, দুয়েকজন বাদে, তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ নির্বাচিত সদস্য হিসেবে, কেউ মনোনীত সদস্য হিসেবে – কেউ আবার কোনও না কোনও কমিটিতে আহূত সদস্য হিসেবে।
রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল ইদানীং কলেজে কলেজে গিয়ে ডাক্তারি-শিক্ষার্থীদের ডাক্তারির নীতিবিদ্যা তথা মেডিকেল এথিক্সের পাঠ দিয়ে থাকেন। সেখানে এঁরা পড়ান। যেমন, আরজিকর-এর নতুন অধ্যক্ষ, যিনি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত, তিনি এথিক্স ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নৈতিকতা এসব বিষয়ে পড়ান। কিছুদিন আগে তোলাবাজির দায়ে অভিযুক্ত আরেক চিকিৎসক চিকিৎসকের দায়বদ্ধতা বিষয়ক ক্লাস নিয়ে থাকেন।
এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছুই নেই। যে রাজ্যে কুণাল ঘোষ অহরহ নৈতিকতার কথা বলেন, সেখানে এটুকুতে ঘাবড়ানোর কী আছে! আইন ও এথিক্স মেনে চিকিৎসা হচ্ছে কিনা, তা দেখা রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিলের দায় হলেও কাউন্সিলের সদস্যরা (যাঁরা এথিক্সের বিচারকও বটেন) যে নীতিবান হবেনই, তা কোথায় লেখা আছে!!
তো এসব নিয়ে বলার মানে হয় না। তবু আমি কথাগুলো তাঁদের জন্য বলছি, যাঁরা ভাবছেন – এবং বিশ্বাস করতে চাইছেন – সমস্যাটা শুধুই আরজিকর-এ সীমাবদ্ধ। মূর্খের স্বর্গে বাস করে আরাম পেতে চাইলে আলাদা কথা, কিন্তু জায়গাটা যে আদতে ‘মূর্খের স্বর্গ’, সেটুকু জেনে রাখা সবার পক্ষেই ভালো।
এবং আরও কয়েকজনের উদ্দেশে বিশেষ করে বলছি। রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিলের নির্বাচিত সদস্য মোট চোদ্দজন। যাঁরা সেই নির্বাচনে ‘জয়ী’ হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে অন্তত কয়েকজন – দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি – সুচিকিৎসক ও যথেষ্ট শ্রদ্ধার যোগ্য।
মেডিকেল কাউন্সিলের সদস্যদের নাম সরাসরি দুর্নীতি তোলাবাজি ধর্ষণ খুনের মতো ঘটনায় জড়িয়ে যাচ্ছে – এরপরও, সেই কাউন্সিলের সদস্য হয়ে থাকতে খারাপ লাগছে না? এরপরও, কাউন্সিলের অংশ হয়ে থাকলে, আপনাদের ক্ষেত্রে ‘শ্রদ্ধার যোগ্য’ শব্দবন্ধ আর ব্যবহার করা যাবে? করাটা উচিত হবে?










