গড়গড়িয়ে চললো গাড়ি
বছর কয়েক আগের কথা। তখনো কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার মাস খানেক বাকি , তবে রকেট ছাড়ার আগে যেমন কাউন্ট ডাউন পর্বে উল্টো গণনা করা হয় ১০..৯..৮..৭.. করে আমারও তখন ঠিক তেমনই অবস্থা। অবশ্য এক্ষেত্রে পার্থক্য খালি একটাই – রকেট উড়বে মাটি ছেড়ে মহাকাশে, আর আমি কর্মজীবনের বিস্তৃত ব্যস্ত পরিসর ছেড়ে উল্টো পথে গোত্তা খেয়ে ঘরে ঢুকে পড়বো। সে যাই হোক , এসব দার্শনিক সুলভ কথাবার্তা ছেড়ে কাজের কথায় আসি।
“–আরে ভাই শোননা , খুব জরুরি কাজের কথা। আসছে রবিবার আমার নতুন গাড়ির ট্রায়াল রান।
আমি সকালে এসে তোকে বাড়ি থেকে তুলে নেব। তুই ছ টার মধ্যে তৈরি হয়ে থাকিস”। ঝড়ের গতিতে এই কথাকটি বলে ফোন কেটে দিল চন্দ্রিল। ছেলেটা বরাবরই এমন। পেশায় চিকিৎসক, আর নেশায় স্বজনকৃত্য।
গাড়ি ছুটছে তুড়ন্ত্ গতিতে। অনেকদিন পর এমন সকাল সকাল বের হওয়া। দেগঙ্গা ছাড়িয়ে এগোতেই বিশ্বস্ত শকটে সংকট দেখা দিল। হঠাৎ করেই মনে হলো গাড়ির গতি যেন একটু ঝিমিয়ে পড়েছে, মাঝে মাঝেই ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, গাড়ির ভেতরেও বেশ গা গরম গরম ভাব। একটা ফুয়েল পয়েন্টের কাছাকাছি গাড়ি দাঁড় করায় চন্দ্রিল।একটু বিব্রত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম – কিরে হঠাৎ করে কী হলো? চন্দ্রিল উৎকণ্ঠা উড়িয়ে মৃদু হেসে উত্তর দিল “– তেমন কিছু না, হাইপোভোলেমিয়া, গাড়ির শরীরে ফ্লুইডের ঘাটতি পড়িয়াছে। এক্ষুনি ঠিক হয়ে যাবে। চল, সামনের ঐ দোকানে খুব ভালো কচুরি আর ছোলার ডাল বানায়। আমাদেরও তো ফুয়েল নিতে হবে না কি!”
গাড়ি থেকে নেমে পড়ি আমরা।
তরল তালে শরীর চলে
আমাদের এই দেহ যন্ত্র চালাতে তরল পদার্থের বড়ো প্রয়োজন। অনেকটা ওই গাড়ির ইন্ধন তরল হাইড্রোকার্বনের মতো। প্রশ্ন হলো আমাদের শরীরের আবশ্যকীয় তরলগুলো কী কী ? এর উত্তরে বলা যায় রক্ত, লিম্ফ বা লালা রসের মতো তরল পদার্থ যেগুলো আমাদের শরীরেই তৈরি হয় এবং শরীরের নানা অংশে সঞ্চালিত হয়ে দেহ যন্ত্রকে সচল ও সক্রিয় রাখে। এই তরল পদার্থরা হলো আমাদের দেহ শকটের ফুয়েল। এদের মজুদ ভাণ্ডারে অভাব বা টান পড়লে গাড়ির মতো দেহ যন্ত্রও বিকল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় । এমন অবস্থাকে চিকিৎসা শাস্ত্রের পরিভাষায় বলা হয় হাইপোভোলেমিয়া। আর দেহের আভ্যন্তরীণ তরলের ঘাটতি জনিত উপসর্গকে বলা হয় হাইপোভোলেমিক শক্। আমাদের আজকের আলোচনা এই সমস্যাকে নিয়েই।
তপন তাপে বিকল তনু
ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশ আমাদের ভারতবর্ষ , ফলে এ দেশে গরমের দাপট বেশি। এ বছর উষ্ণায়নের প্রভাবে এক দীর্ঘমেয়াদি তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে গোটা দেশ । মৌসুমী বায়ুর গতিপ্রকৃতি বোঝা ভার! পশ্চিম ভারতের অবস্থা অসহনীয়।
সরকারি নথি থেকে জানা গেছে যে এখনো পর্যন্ত দেশে ১১০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে হিটস্ট্রোকে। যদিও এই সংখ্যা আরও বেশি বলেই আশঙ্কা সরকারি মহলেই। দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো কিছুটা কম।
হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন,হাইপোভোলেমিক শক্

হিটস্ট্রোক বা তাপাঘাত হলো সবথেকে সাধারণ গ্রীষ্মকালীন শারীরিক সমস্যা। আমাদের শরীর প্রতিনিয়ত বাইরের তাপীয় অবস্থার সঙ্গে আভ্যন্তরীণ তাপের ভারসাম্য বজায় রেখে চলে। তবে কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। স্বেদ বা ঘাম নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায় এবং শরীর ঠাণ্ডা না হয়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় তাপমান বেড়ে যায় ( ১০৫– ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। খুব দ্রুত এমন রোগীর চিকিৎসা করতে হবে।
ডিহাইড্রেশন এবং হাইপোভোলেমিক শক্ কে অনেক সময় সমার্থক বলে মনে করা হলেও বাস্তবে এরা এক নয়। এদের পার্থক্যটা বুঝে নেওয়া খুব জরুরি। শব্দ দুটোকে একটু কাটাছেঁড়া করলেই ফারাকটা ধরতে পারা মোটেই কঠিন নয়।
হাইড্রা শব্দের অর্থ জল । আর ডি এই ইংরেজি উপসর্গের মানে ,বাদ বা বিয়োজন। তাহলে ডিহাইড্রেশনের অর্থ হলো শরীর থেকে জল বেরিয়ে যাওয়া। প্রবল উষ্ণতার ফলে শরীরের জল ঘামের আকারে বাইরে বেরিয়ে আসে। ইদানিং হাইপারটোনিসিটি শব্দের দ্বারা এই শরীরী জলের অবচয়কে বোঝানো হয়ে থাকে।
অন্যদিকে হাইপোভোলেমিক শক্ হলো শরীরের ভেতরের তরলের আয়তন বা ভলিউম কমে যাওয়া। হাইপারটোনিসিটির বেলায় তরলের অন্ত:কোষীয় পরিমাণ কমে যায় ; আর হাইপোভোলেমিক শক্ এর বেলায় রক্তের আয়তন হ্রাস পায়। চিকিৎসকেরা শরীরী তরলের স্থান বদলের পরিবর্তনশীল গঠন পরীক্ষা করে আক্রান্ত রোগীর সমস্যা যাচাইয়ের চেষ্টা করেন। এই বছর হিট ওয়েভ বা তাপ প্রবাহের দাপট ও স্থায়িত্বকাল আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় দিল্লি, রাজস্থান, হরিয়ানা,পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও ওড়িশার মতো খরাগ্রস্থ রাজ্যগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই তাপজনিত শারীরিক সমস্যার উপসর্গ নিয়ে বহু মানুষ চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে এসে ভিড় করছেন। এঁদের মধ্যে হাইপারভোলেমিক শক্ এ আক্রান্ত রোগীরাও আছেন যাদের জন্য আই সি ইউনিট খোলা হয়েছে।
তাপপ্রবাহের জেরে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কতগুলো সাধারণ শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। বিশিষ্ট চিকিৎসকরা সেগুলো সম্পর্কে আম আদমিদের সতর্ক করে দিয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে এইসব উপসর্গ কারও মধ্যে প্রকট হলে তাঁকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে যাদের মধ্যে কো- মর্বিডিটি রয়েছে তাঁদের চিকিৎসা নিয়ে কাল হরণ করা চলবে না।
একথা ভুললে চলবে না যে আমাদের অঙ্গগুলোকে যথাযথ কার্যকর রাখতে শরীরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তরল বা রক্ত থাকা একান্ত প্রয়োজন। কেননা নির্দিষ্ট পরিমাণ তরলের অভাবে শরীর শুকিয়ে যেতে থাকে। এই অবস্থায় শরীরে পরিপূরক তরলের জোগান দিতে হবে। কেননা পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল সঞ্চালিত না হলে হার্ট তার কার্যকারিতা হারাবে।হাইপোভোলেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্রায় ২০ শতাংশের মতো তরলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই তরলের আবশ্যিক সংযোজন প্রয়োজন হয়।
কোন্ কোন্ শরীরী উপসর্গ দেখলে আমরা সতর্ক হবো ? হাইপোভোলেমিয়ার সাধারণ উপসর্গগুলো হলো– শুকনো উষ্ণ ত্বক, মাথাব্যথা,জিভ শুকিয়ে যাওয়া, পিপাসা বেড়ে যাওয়া, পেশিতে টান ধরা, জ্বর,বমি বমি ভাব, পেটে ব্যাথা, পাতলা পায়খানা, পেচ্ছাপ কমে যাওয়া ইত্যাদি। জটিলতা বেড়ে গেলে মানসিক বিভ্রান্তি, বিরক্তি , ভারসাম্যের অভাব, এমনকি অকস্মাৎ চেতনা লোপ পেতে পারে। রোগী এমন অবস্থায় পৌঁছনোর আগেই জরুরি ভিত্তিতে তাঁর চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
এখন সময় সতর্ক হবার
সংবেদনশীল চিকিৎসকেরা সবসময় বলেন সতর্কতা সবথেকে ভালো ব্যবস্থা। তাই গরম এড়িয়ে ভালো থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতির সঙ্গে যুঝতে পারাটা খুব জরুরি। আপনাকে বাইরে যেতে হবে তাই সাবধানতা অবলম্বন করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। হাইপোভোলেমিয়ার বাহ্যিক কারণগুলোকে আমরা প্রতিরোধ করতে পারবোনা, তবে কিছু বিধিনিয়ম মেনে চলে আমরা আক্রান্ত হবার ঝুঁকিকে কমাতে পারি।কী কী করতে হবে?
১) আপনার সংক্রমণ, আঘাত, অসুস্থতার চিকিৎসা জারি থাকুক। বন্ধ করবেন না কোনোভাবেই।
২)অতিরিক্ত ঘাম ঝরানো কাজকর্ম কম করুন , কেননা এরফলে শরীরের তরল ভাণ্ডারে টান পড়তে পারে।
৩) পরিমিতি পরিশুদ্ধ জল পান করুন এবং শরীরে তরলের জোগান বজায় রাখুন। ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে ভুলবেন না। বিশেষ করে যাঁদের শরীরে আঘাত জনিত ক্ষত বা দহন জনিত ক্ষত রয়েছে তাঁরা সাবধানে থাকবেন।
চন্দ্রিলরা পাশে পাশে আছে , তবুও …..
লেখাটা এখানেই শেষ করবো বলে ঠিক করেছিলাম, কিন্তু একটা খবরে চোখ পড়তেই চিন্তা ও উদ্বেগ দুইই বেড়ে গেল। গোটা বিশ্ব জুড়েই তীব্র দহনের পর্ব চলছে। প্রচণ্ড তাপদাহের শিকার হয়েছেন ১০০০ জনের বেশি হজ যাত্রী। এদের মধ্যে ১০০ জন ভারতীয়। এই মুহূর্তে গোটা ইউরোপ মহাদেশ তাপ দৈত্যের আস্ফালনে তটস্থ। এবছর ফ্রান্সে শুরু হতে চলেছে উষ্ণতম অলিম্পিকের আসর। এমন অসহনীয় তাপদাহের ফলে অ্যাথলিটদের অবস্থা কী হতে পারে তাই
নিয়ে চলছে বিপুল জল্পনা। অন্যদিকে সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র তাপদাহের পূর্বাভাস দিয়েছে সেই দেশের আবহাওয়া দপ্তর। গতবছর তাপদাহের কারণে মার্কিন মুলুকে ২৩০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যাটা এবছর আরও বাড়তে পারে বলে এখনই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। তাপদাহের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় অর্থ হলো হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন এবং হাইপোভোলেমিক শক্ এ আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। এ এক নীরব ঘাতক। আমরা যেন সবাই সতর্ক থাকি। ভয়ের কিছু নেই। চন্দ্রিলরা আমাদের পাশে পাশে আছে।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
আমি এই লেখাটি লিখতে গিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সাহায্য নিয়েছি। সাহায্য নিয়েছি বায়োলজিক্যাল ডিকশনারির। এই সব উৎস সূত্রের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। ছবিগুলো প্রচলিত নেট মাধ্যম থেকে নেওয়া।
মধ্যমগ্রাম
২০.০৬.২০২৪


















Well researched write up. Keep it up Somnath babu !