আমি মানুষটা খুব সামান্য হলেও আমার পরিচিতজনদের সকলে কিন্তু কিঞ্চিৎ সামান্য নন। এটা আমার জীবনের একটা সার্থকতা বলতে পারেন, সৌভাগ্যও বলতে পারেন। মেডিক্যাল কলেজে পড়াকালীন কিছু কিংবদন্তী মানুষদের সান্নিধ্য লাভ করেছিলাম, সঞ্জয় চ্যাটার্জী স্যার তাঁদের মধ্যে অন্যতম। চ্যাটার্জী স্যারের নাম জনগণের মুখে মুখে ফেরে না, ডাক্তারি করে বিখ্যাত হওয়ার উপায়গুলো যত দিন গেছে জেনেছি, বুঝেছি। আমি হলফ করে বলতে পারি শুধু ডাক্তারি করে ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় লেজেন্ড হয়ে ওঠেননি, যাক সেসব বিতর্কে গিয়ে কাজ নেই! চ্যাটার্জী স্যারের হাতে আমাদের মেডিসিনের হাতে খড়ি, একদম খুদে ছাত্রদের পড়াতে খুব ভালোবাসতেন। বেসিক জিনিস পড়াতেন, যা অ্যানাটমি, ফিসিওলজির সামান্য জ্ঞান দিয়ে বোঝা যায়। স্যার যেদিন ফিসিকাল এক্সাম পড়াবেন, সেদিন একজন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত মেয়ের প্লীহা পরীক্ষা করাতে নিয়ে গেছিলেন। এখনো মনে আছে, ক্রনিক ফিমেল ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে স্যার পড়াচ্ছেন – থ্যালাসেমিয়া নিয়ে কোনো কথা না, পরীক্ষায় কীভাবে স্প্লিন প্যালপেট করতে হবে সেই নিয়েও কোনো কথা না – রোগীর গায়ে হাত দেওয়ার আগে এথিক্সের পাঠ…
একজন ডাক্তারের কাছে একজন মানুষ সম্পূর্ণরূপে উলঙ্গ হয়ে আসে, তার জীবনের এমন কিছু জিনিস সে ডাক্তারের কাছে বলতে বাধ্য হয় যা হয়তো নিজের জীবনসঙ্গীকেও সে বলেনি। সেই গোপনীয়তাকে সম্মান করা একজন ডাক্তারের কর্তব্য। ডাক্তারি গোপনীয়তা বজায় রাখার ফলে ইতিহাস বদলে গেছে এই প্রমাণও আছে। জিন্নাহর যক্ষ্মারোগের হদিশ যদি সবাই পেয়ে যেতো, আজ দেশভাগ হতো কিনা সেটা আমরা জানিনা। আলেকজান্ডারের অসুস্থতার কথাও নাকি চেপে যাওয়া হয়েছিল সেনাবাহিনীর মনোবল বজায় রাখতে…
ডাক্তারের কাছে একজন রোগী শুধু একটা রোগাক্রান্ত শরীর, এর বাইরে কোনো পরিচয় নেই। এবং তাকে সুস্থ করে তোলাই ডাক্তারের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। তার জন্য রোগীর সব হাঁড়ির খবর ডাক্তারকে খুঁচিয়ে জানতে হবে, কিন্তু সেই খবর যেন বাইরে না আসে…
এরকম অনেক কথা আমরা সেদিন শুনেছিলাম। শেষ পাঁচ মিনিট স্প্লিন পালপেট করে পালিয়ে এসেছিলাম। দিনটা আজও মনে পড়ে, কথাগুলোও। কেন স্যার এতগুলো কথা বলেছিলেন, সেটা যত দিন যায় আরও যেন বুঝতে পারি। একটা বয়সের পর, রোগ ধরা ও চিকিৎসা করা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। সত্যি বলতে যারা ডাক্তারি পাশও করেনি, গ্রামে গঞ্জে হাতুড়ে গিরি করে বেড়ায়, তারাও কত রোগ ধরে ফেলে, ওষুধও দিয়ে দেয়। পার্থক্য থেকে যায় শুধু এথিক্সে… আমি রোগ সারাতে নাও পারি, রোগ ধরতেও না পারি, ক্ষতি নেই; কিন্তু যদি মরালিটি হারাই, তাহলে দিনের শেষে আমি হেরো…
মেডিক্যাল এথিক্স অনেক গভীর টার্ম। ফরেন্সিক মেডিসিনে এর অনেক লম্বা চওড়া সংজ্ঞা পড়েছিলাম। দিনের শেষে ব্যাপারটা নিজের। কোন ডাক্তার কোন সময় কতটা সেই গণ্ডি লঙ্ঘন করছেন, সেটা নিজেও বোঝেন, তাই সেলফ ডিফেন্সে নিজের অজান্তেই নিজেকে বারবার ভ্যালিডেট করার চেষ্টা করেন, জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন…তার একটা জ্বলন্ত উদাহরণ সমাজ মাধ্যমে এখন জ্বলজ্বল করছে।
আমি এ আই কে জিজ্ঞেস করলাম ডাক্তাররা রাজনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে এরকম উদাহরণ কী? সে গুচ্ছের উদাহরণের ডালি সাজিয়ে নিয়ে এলো। তাতে ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়, ডাঃ নীলরতন সরকার, ডাঃ লক্ষ্মী সায়গল ইত্যাদি অনেক বড় বড় নাম আছে। এটাও বলা আছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ডাক্তাররা স্বাধীনতা বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়েছেন, শুশ্রূষা করেছেন, দরকারে নিজেদের চাকরি এমনকি জীবন বিপন্ন করে তাদের সাহায্য করেছেন।অগ্নীশ্বর সিনেমায় আমরা এর ঝলক দেখতে পাই। এই ডাক্তারদের ইতিহাস চেনেনি, কিন্তু ভারত স্বাধীনতা কিন্তু পেয়েছে। আমরা তাঁদের নাম জানিনা, কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য কিন্তু ঠিকই হাসিল হয়েছে। লক্ষ্য থেকে উপলক্ষের ঢক্কা নিনাদ যখন বেশি হয়, তখন বুঝতে হয় উদ্দেশ্যটা বৃহতের জন্য নয়, বরং সংকীর্ণ।
কোনোদিন শুনেছেন সেই ডাক্তারদের বলতে, স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত হলে দশ টাকা কম ভিজিট নেবো? স্বাধীনতা পরবর্তী যুগেও কত ডাক্তারেরা রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িয়েছেন। তারা সমাজের জন্য কম অবদান রাখেননি, কিন্তু এরকম গোত্রের দাবি কেউ জানান নি। বললে যে তার বিরুদ্ধে কমিশন স্টেপ নেবে, এই ভেবে কেউ বলেননি তেমনটাও ঠিক নয়। যে দেশে সুপ্রিম কোর্ট অব্দি বিক্রি হয়ে গেছে, সেখানে কমিশন তো কোন ছাড়! কিন্তু এরকম যে বলা যায়, ক্লিনিকে আসা রোগীদের দিয়ে যে ভিডিও করে স্লোগান দেওয়ানো যায়, এই কাঙালপনাটা কারোরই মাথায় আসেনি। কেন আসেনি জানেন? হিপক্রেটিক ওথের শেষ লাইনটা হলো, “I make these promises solemnly, freely and upon my honour”. এই অনারটাই যদি না থাকলো তাহলে আর প্রফেশানটার বাকি কী থাকলো!!













