বাইরে ছিলাম যখন, তখন বেশ কয়েকটি খবর চোখে পড়ল, যা ঠিক সুখকর ঠেকল না। এক, রাস্তা বন্ধ করে নামাজ আদায় করা যাবে না বা পুজো করা যাবে না। সত্যি? পুজোর সময় রাস্তাঘাটের বেহাল দশা আমরা দেখেছি। দুর্গাপুজো সহ নানা পুজোয় অনেক প্যান্ডেলের বর্ধিত অংশ, ক্লাবের মেম্বারদের বসার জায়গা ইত্যাদি রাস্তা দখল করে, আমরা দেখি। সেসব হবে না এরপর? নাকি শুধুই নামাজ? দুটোই যদি হয়, তাহলে সংখ্যাগুরুর পুজোয় নজির গড়ে তারপর সংখ্যালঘুকে বললে ভদ্রজনোচিত হত না?
দ্বিতীয়ত, ধর্মস্থানে মাইক বাজনো যাবে না। এতেও আশ্চর্য হলাম। আমাদের পাড়ায় রামকৃষ্ণ সংঘ নামক একটা মঠে দুবেলা প্রার্থনা হয় মাইকে। আমার তাতে অসুবিধে হয় না। আমার আগের ফ্ল্যাটে আজানের শব্দে ঘুম ভাঙত। তাতেও অসুবিধে হত না৷ দুটোই এবার থেকে আর হবে না? নাকি শুধু আজান হবে না? আগামীকাল পাড়ার মন্দিরে প্রার্থনা শুনলে কি লোকে থানায় যাবে?
শেষত পশুমাংস বিক্রি। আইনটির নামে যদিও ‘পশু’ লেখা আছে, কিন্তু ১৯৫০ সালের যে আইনটা কার্যকর করা হয়েছে, সেখানে ‘animal’ বলতে ‘cow, calf, bull, castratred bull’-কে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। বলা হয়েছে, একজন পশু-ডাক্তার ও একজন প্রশাসনিক ব্যক্তির থেকে শংসাপত্র আনতে হবে যে প্রাণীটি ১৪ বছরের বেশি বয়সী। গরুর গড় জীবনকাল ১৫-২০ বছর। সম্পূর্ণ অকেজো বৃদ্ধ গরুই তাহলে কেনা যাবে, তাও শংসাপত্র সহ। এভাবে ঠিক পশু বিক্রয় হয় না। উন্নত দেশে মাংসের প্রয়োজনেই পশুকে পালন করা হয়। আমাদের দেশেও মুরগি-ছাগল এভাবে চাষ হয়। ব্রয়লারের কনসেপ্ট তবে কী? শুধু ডিম না দেওয়া মুরগীকে খাওয়া?
ধর্মীয় আচার পালন আমার মাথাব্যথা নয়। কিন্তু যাঁরা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে বলি দেন, তাঁরা এরকম বাতিল পশু বলি দেন না৷ ইসলামে যেমন পশুকে খাইয়ে দাইয়ে নধর করে তারপর প্রাণপ্রিয় পশুটির কুরবানি দেওয়াই হল ত্যাগের মকসো, তেমনই অন্য ধর্মেও বাতিল রুগ্ন পশু বলি দিয়ে কেউ ঈশ্বরের অমর্যাদা করে না। পশুবলির সম্পূর্ণ বিপক্ষে আমি। সব ধর্মে সব পশুর বলিই তবে বন্ধ করা হোক। তা না করে, ইদের ঠিক আগে কিছু নির্দিষ্ট পশুর বলি নিষিদ্ধ করা কি এক বিশেষ বার্তা দেয় না? আরও অনেক কথা বলা যায়। বলা যায় যে ঋগবেদে লেখা আছে যে দেবরাজ ইন্দ্র গোমাংস ভালবাসতেন, বিষ্ণুও। সুক্ত তুলে দেখানো যায়৷ বলা যায়, দুগ্ধদোহন করলে কি ‘মাতার’ উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার হয় না? যাকে ‘মা’ ভাবি তার থেকে মাংস বাদে অন্য সব কিছু শোষণ কেন করি? অক্ষম ‘মাকে’ কেন হাটে বেচে আসি হননার্থে?
ফ্রান্সের সেকিউলারিজম আর ভারতের সেকিউলারিজম দুই ভিন্ন ঘরানার। ফ্রান্সে সেকউলারিজম মানে জনসমক্ষে কোনো ধর্মাচরণই সহ্য না করা। অপরদিকে ভারতের সেকিউলারিজমের ধরনটাই হল, তা সবার সব ধর্মাচরণ সমানভাবে সহ্য করেছে। অবশ্য সেকিউলারিজম শব্দটাই আজকাল কারও কারও কাছে একটা অপবিত্র, মন্দ শব্দ। কিন্তু দেখে অবাক লাগে যে তাঁরাই এখন মুখে অন্তত সেকিউলারিজমের ভান বজায় রাখছেন। কথায় কথায় সেকুলার শব্দবন্ধ ব্যবহার করছেন, যেমন: ‘সব ধর্মস্থানে…সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে…পশু হত্যা (গোহত্যা নয়)’ ইত্যাদি। কিন্তু আসলে কি তাঁরা আদৌ সব ধর্মের ধর্মাচরণেই বদল আনতে চাইছেন? নাকি নির্দিষ্ট ধর্মে?
আমরা সবাই দুর্নীতিমুক্ত সরকার চাই, কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনধিকারের মূল্যে নয়। এই পদক্ষেপগুলো ঠিক হচ্ছে না। বেশিরভাগ মানুষ হয়ত সরকারের ভয়ে আপাতত নির্দেশিকা মেনে নেবেন। কিন্তু ক্ষোভ থাকবে। কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সেই ক্ষোভে উস্কানির ঘৃতাহুতি দেওয়ায় কাজটা ভিতর ভিতর করতে থাকবে৷ অন্যদিকে, সংখ্যাগুরু পক্ষকেও ‘কেমন দিলুম’ ‘এবার এসব দেখলে ছেড়ে কথা বলবি না’ ধরনের উস্কানি দেওয়া হবে। উভয় পক্ষের উস্কানিদাতারা এরকম উস্কানিমূলক সরকারি নির্দেশের অপেক্ষাতেই থাকে। এতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সুবিধে হবে। সাধারণ হিন্দু ও সাধারণ মুসলমানদের খেপিয়ে তোলার কাজ এগিয়ে থাকবে।












