২৪ জুলাই, ২০২৬
1942 A Love Story সিনেমায়, যদ্দূর মনে পড়ে, অনুপম খেরের মুখে একটা সংলাপ ছিল। খুব সম্ভবত নায়ক অনিল কাপুর যখন নায়িকা মনীষা কৈরালার প্রতি নিজের প্রেমের কথা জানাতে গেছিলেন, নায়িকার বাবা (অনুপম খের) বলেন – সারা দেশ যখন বিদ্রোহের আগুনে জ্বলছে, তখন তোমরা নিজেদের প্রেম-ভালোবাসার কথা বলতে আসছ!
তো দিনের শেষে এটাই বাস্তব – রাষ্ট্রবিপ্লব হোক বা গণবিদ্রোহ-যুদ্ধবিগ্রহ, সবকিছুর মাঝে ছোট ছোট মানুষের জীবনে ছোট ছোট ঘটনাগুলো স্বাভাবিক সময়ের মতো করেই চলতে থাকে। তার মানে এই নয় যে বিক্ষোভ-বিদ্রোহের ইস্যুগুলো সেই ছোট ছোট মানুষগুলোকে প্রভাবিত করে না বা মানুষের বৃহত্তর ক্ষোভ-দুঃখের কথাগুলো সেই ছোট ছোট মানুষগুলোর মনে দোলা দেয় না।
দিল্লির রাজপথ ছাড়িয়ে মানুষের ক্ষোভ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। পরীক্ষার অব্যবস্থা বিষয়ে মানুষের অত্যন্ত ন্যায্য ক্ষোভ রাষ্ট্রযন্ত্র ধামাচাপা দিতে চাওয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যান্য ভুলত্রুটির প্রতি মানুষের নজর পড়েছে – ক্ষোভ ইস্যু থেকে ইস্যুতে ছড়াতে ছড়াতে ছোট্ট আগুন দাবানলের রূপ নিতে চলেছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ছাত্রছাত্রীদের উপর কাঁটা লাগানো লাঠি নিয়ে তেড়ে আসছে – অভাবনীয়ভাবে ছাত্রছাত্রীদের তাক করে ছররা বুলেট চলেছে। শিউরে ওঠার মতো ছবি সামনে আসতে না আসতেই বিচক্ষণ ব্যক্তিরা বার্তা দিচ্ছেন, এই সব বিক্ষোভই নাকি ‘ডিপ স্টেট’-এর চক্রান্ত, বৈদেশিক ষড়যন্ত্রের ফল। রাষ্ট্রব্যবস্থার অপদার্থতা, প্রশাসনিক নৃশংসতা, আদালতের নিস্পৃহতা, নাকি এই তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তিদের অর্বাচীনতা ও শিশুসুলভ বিশ্বাস করার ক্ষমতা – ঠিক কোনটায় বেশী বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হওয়া উচিত, এ নিয়ে সংশয়ে ভোগার সময়ে দাঁড়িয়ে…
হ্যাঁ, এই অদ্ভুত মুহূর্তে দাঁড়িয়ে… ছোট ছোট মানুষদের একজন হিসেবে… একেবারেই নিজস্ব গণ্ডীর ঘটনাক্রমের কারণে বিষণ্ণ বোধ করছি।
ঝাড়গ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে মুক্ত হলাম আজ। সামনের সপ্তাহে কলকাতার মেডিকেল কলেজে যোগদান। পেশাগত কারণে ঝাড়গ্রামে রাত্রিবাস আজই শেষবার। অন্তত আপাতত। এবারে ফিরে যাওয়া পালা।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে এসেছিলাম – কেননা আমি সরকারে অধিষ্ঠিত দলটির বিরোধী ছিলাম। ক্ষমতার পালাবদলের পরে, হয়তো, সেই প্রতিহিংসার প্রতিবিধান হিসেবে কলকাতা ফেরানোর অর্ডার এলো। যদিও, আমি, এখনও, বর্তমানে সরকারে অধিষ্ঠিত দলটিরও বিরোধী – এবং যে কথা নিশ্চিতভাবেই তাঁদের অজানা নয়।
বাবা-মা অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন, আমিও পড়াতে চাই – মেডিকেল এডুকেশন সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলাম মূলত এই কারণে। চাকরিজীবনের এতগুলো বছর কেটে গেল – কিন্তু সে ইচ্ছে কখনোই পূরণ হয়নি। এবার ইচ্ছাপূরণের সুযোগ। যদিও ষোলো বছর বাদে সে আদি ইচ্ছার কতটুকু অবশিষ্ট আছে বলা মুশকিল, তবু চাপা আনন্দমিশ্রিত উত্তেজনা তো রয়েছেই। দিনের শেষে প্রতি রাতে বাড়িতে ঘুমোতে পারা – সাপ্তাহিক যাতায়াতের অনিশ্চয়তা ও ক্লান্তি থেকে মুক্তি – এসবও তো বাড়তি পাওনা। তারপর… হ্যাঁ, তারপরও… কেমন যেন এক বিষণ্ণতা…
পুরনো কথা মনে পড়ছে। ২০২২ সালের শেষে এখানে যখন এসেছিলাম, তখন মনের মধ্যে রাগ আর প্রবল বিরক্তি ছিল। কেননা, এসেছিলাম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে। মেডিকেল কাউন্সিল ভোটে দাঁড়ানোর পরেই মহামান্য অভীক দে শুনিয়ে রেখেছিলেন – এই মালগুলোকে বাইরে ট্রান্সফার করব। হাজার দোষত্রুটি সত্ত্বেও একথা অনস্বীকার্য, তিনি কথা রেখেছিলেন। আরেক প্রাতঃস্মরণীয় চিকিৎসক, ডা বিরূপাক্ষ বিশ্বাস, ফেসবুকে জানিয়েছিলেন – বিষাণ বসু নামক জন্তুটিকে ঝাড়গ্রাম চিড়িয়াখানায় পাওয়া যাবে। এবং স্থানীয় মানুষজনের প্রতি তাঁর আহ্বান ছিল, যাতে তাঁরা আমার উপযুক্ত ‘ব্যবস্থা’ করেন।
না, উপরোক্ত দুই ব্যক্তির প্রতি আমার রাগ বিরক্তি কিংবা ঘৃণা, কোনও অনুভূতিই নেই। তাঁদের কথাগুলো লিখে রাখলাম স্রেফ সত্যরক্ষার খাতিরে।
তো গত এই সাড়ে তিন পৌনে চার বছরে, সত্যিসত্যিই, ঝাড়গ্রাম শহর ও তার মানুষজন আমার ‘উপযুক্ত ব্যবস্থা’ করেছেন। হাসপাতালের সহকর্মী, চিকিৎসক থেকে স্বাস্থ্যকর্মী, নার্সদিদি থেকে অফিসের বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মী – এমনকি লাগোয়া সিএমওএইচ অফিসের কর্মী – ক্যান্টিনের লোকজন, বিদ্যুতের চপ-মুড়ির দোকান, হাসপাতালের রাস্তার ওপারে লেবু-চা ঘুগনির দোকান… কাকে ছেড়ে কার কথা বলব… আর ঝাড়গ্রামের স্থানীয় মানুষ… আর্ট অ্যাকাডেমীর সঞ্জুদা থেকে শুরু করে রূপক, কুনাল, ‘বনের পাখি’-র মানিক… যাঁদের আশ্রয়ে রইলাম শেষ তিনবছর, সেই শান্তনুবাবু থেকে সৌরভ, অতনু, ক্ষিতীশ… অনেক অনেএএক নাম বাদ পড়ে গেল নিশ্চিত… এঁরা সবাই আমাকে যতখানি ভালোবাসা দিয়েছেন, তেমনটি আর কোথাও পেয়েছি বলে মনে পড়ে না।
এঁরা সকলে মিলে এমন আশ্চর্য মায়ায় জড়িয়ে ফেললেন, যে, আজ বাড়ি ফেরার আনন্দের চাইতে অন্য এক আশ্রয় ছেড়ে যাবার ব্যথাই যেন প্রধান হয়ে যাচ্ছে।
বর্ষার ঝাড়গ্রাম এক আশ্চর্য মায়া। বৃষ্টি, আরও বৃষ্টি… শালের জঙ্গল (উন্নয়নের দাপটে ক্ষয়িষ্ণু যদিও) আশ্চর্য সবুজ… ঝোড়ো বাতাসের দাপটে উথালপাথাল হয়ে যাওয়া ডালপালা… বর্ষার হাওয়ার ঝাপটার অদ্ভুত শব্দ… ভেজা রাস্তা দিয়ে সাবধানে পা ফেলে ফেলে ক্যান্টিনে দীর্ঘ আড্ডা, তেলেভাজা মুহূর্মুহু চা…
এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে এতগুলো দিন কাটানোর পর, আগামীকাল, এই সবকিছু ফেলে ফিরে যাওয়া।
বদলির অর্ডার বেরোনোর পর থেকে গত দু’সপ্তাহ অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে কাটল। ভাবতেও পারিনি, আমার মতো নিজস্ব বৃত্তে স্বচ্ছন্দ বোধ করা এবং প্রায়শই মেজাজ-হারানো ও রুক্ষ কথা বলা মানুষকেও এতজন এত ভালোবাসতে পারে। বিহ্বল লাগছে। এবং খানিক হতভম্বও।
এত ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য আমি নই – এসব কথা বলছি না। কেননা, কথাটা বোকাবোকা, এবং খুব ক্লিশে। তদুপরি, এতখানিই সত্যি যে বলাই বাহুল্য।
এটুকুই বলি, এতখানি ভালোবাসা যদি পেলামই, আগামীদিনে চেষ্টা করব এর যোগ্য হয়ে ওঠার।
ঝাড়গ্রাম আমার দীর্ঘ চাকরিজীবনে বিভিন্ন বদলির একটি পোস্টিং হিসেবে নয় – মনের একটি বিচ্ছিন্ন প্রকোষ্ঠে একান্তে রক্ষিত হীরকখণ্ড হিসেবে রয়ে যাবে। যেকোনও অবসাদ, হতাশা, কিংবা বিষণ্ণতার মুহূর্তে যে হীরকখণ্ড তার ঔজ্জ্বল্য দিয়ে মলিনতা মুছিয়ে দিতে পারে।
আমি কৃতজ্ঞ রইলাম। সব্বার কাছে।










