এক
মহারাষ্ট্রের পূর্বদিকে বিদর্ভ অঞ্চলে নাগপুর ডিভিশনে রয়েছে চন্দ্রপুর বা চান্দা জেলা। পাহাড় – অরণ্য নদী -উপত্যকা পূর্ণ প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই প্রান্তিক বড় জেলাটির দক্ষিণে তেলেঙ্গানা রাজ্যের কুমুরাম ভীম জেলা। পূবে দণ্ডকারণ্যের অংশ অরণ্যময় গাডচিরোলি জেলা পেরোলেই ছত্তিসগড়ের অরণ্যঘন বাস্তার ও দাঁতেওয়াদা জেলা। এই চন্দ্রপুর জেলাতেই রয়েছে মহারাষ্ট্রের সবচাইতে পুরনো (১৯৫৫ তে গঠিত) ও বৃহত্তম সংরক্ষিত অরণ্য। তাদোবা – আন্ধেরি ব্যাঘ্র প্রকল্প বা টাইগার রিজার্ভ। সমগ্র জাতীয় উদ্যানের আয়তন ১৭২৭ বর্গ কিমি এবং কোর এরিয়া ৬২৫.৪ বর্গ কিমি। কাছেই রয়েছে চিমুর পাহাড়; বোর ও কাওয়াল ব্যাঘ্র প্রকল্প; পাওনি, সুন্দরনগর, প্রাণহিতা, নয়েগাঁও, মালেয়াদা, গাডচিরোলি প্রভৃতি অভয়ারণ্য। এই তাদোবা – আন্ধেরি ব্যাঘ্র প্রকল্পে সারা দেশের মধ্যে বাঘের ঘনত্ব সবচাইতে বেশি। বর্তমানে প্রায় ১৫০ টি বাঘ রয়েছে এখানে। তাদের মধ্যে অনেকে কোর এরিয়াতে বাস করে, অন্যরা তার বাইরে সংরক্ষিত অরণ্যে অথবা দুটি এলাকা মিলিয়ে। আপনারা জানেন যে বাঘ দলবদ্ধ প্রাণী নয়, এককভাবে থাকে এবং একেকটি বাঘ অনেকটা অঞ্চল নিয়ে তাদের থাকার জায়গা চিহ্নিত করে। ফলে দেখা গেছে তাদোবা অরণ্য থেকে বেশ কিছু বাঘ জঙ্গলের পথ বা করিডোর ধরে আশপাশের বা দূরের অরণ্যগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকৃতির অদ্ভুত লীলা বাঘেরা গাছে আঁচর এবং মূত্র ও অন্যান্য শারীরিক তরলে ফেরোমেন ইত্যাদি ছিটিয়ে তাদের এলাকা চিহ্নিত করে। এই উগ্র গন্ধ বিশিষ্ট তরলের (মার্কিং ফ্লুইড বা সেন্ট মার্কিং) গন্ধ দীর্ঘদিন থাকে। এই রাসায়নিকগুলির মাধ্যমে প্রতিটি বাঘের স্বকীয়তা প্রকাশ পায় যা অন্য বাঘরা বুঝতে পারে। এছাড়াও প্রজননের সময় বিশেষ ডাক এবং এই তরলগুলির মাধ্যমে বাঘ ও বাঘিনী পরস্পরকে আকৃষ্ট করে।
অন্যদিকে ওড়িশা রাজ্যের উত্তর – পূর্বে ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য লাগোয়া ময়ুরভঞ্জ জেলায় রয়েছে ২৭৫০ বর্গ কিমি আয়তনের চিরহরিৎ অরণ্যের সিমলিপাল জাতীয় উদ্যান। এরমধ্যে রয়েছে সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্প এবং হাদগড় ও কুলডিহা অভয়ারণ্য। সিমলিপাল অরণ্যের আশপাশে রয়েছে হরিচন্দ্রপুর ও টিকরপাড়া অভয়ারণ্য; সাতকোশিয়া ব্যাঘ্র প্রকল্প; বামুর, দেওঘর, বামরা, সারান্ডা প্রভৃতি অরণ্য। পূবে ১১৫ কিমি গেলে বঙ্গোপসাগর। সিমলিপাল অরণ্যেও বেশ কিছু রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে এদের মধ্যে ক্রমাগত অন্তঃপ্রজনন বা ইন ব্রিডিং হওয়ার ফলে মেলানিস্টিক কালো বাঘের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এখানকার বাঘদের জিন বৈচিত্র্যের উন্নতি ঘটাতে সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তাদোবা – আন্ধেরি অরণ্য থেকে দুটি সদ্য যুবতী বাঘ যমুনা ও জিনাতকে নিয়ে এসে সিমলিপাল অরণ্যে ছেড়ে দেন। এখানে বলে রাখা দরকার জাতীয় উদ্যান (ন্যাশনাল পার্ক) হল একটি বিস্তৃত সংরক্ষিত অরণ্য ভুমি, উদ্যান বা জলাশয় যেখানে পর্যটকরা নিয়ম মেনে যেতে পারেন। অভয়ারণ্য (ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি বা বায়স্ফিয়ার) হল উদ্ভিদ এবং / অথবা জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণের উদ্যান বা অরণ্য। বিশেষভাবে সংরক্ষিত অরণ্যতে (রিজার্ভ বা প্রটেক্টেড ফরেস্ট) বিলুপ্তপ্রায় বা বিরল প্রাণীদের সংরক্ষণের জন্য সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। টাইগার রিজার্ভ হল ব্যাঘ্রদের জন্য সংরক্ষিত বনভূমি।
কোন কোন ব্যাঘ্র বিশেষজ্ঞ মনে করেন বাঘেরা যখন নিজস্ব নতুন এলাকার (টেরিটোরি) সন্ধানে নিজেরাই অন্য জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ে সেটাই হয় তাদের সঠিক পুনর্বাসন। কিন্তু বিশেষ কারণে তাদের ধরে এক জঙ্গল থেকে অন্য জঙ্গলে পুনরস্থাপন করলে প্রথমদিকে সেখানকার অচেনা ও সামগ্রিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়। তাই প্রথম কিছুদিন তাদের নতুন জঙ্গলের মধ্যে একটি ঘেরা জায়গায় বা সফট এনক্লোশারে রেখে শিকার এবং খাদ্য ও জলের ব্যাবস্থা করা হয়। সেই সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এভাবে তাদের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। পৃথক ঘেরা টোপে রাখার পর যমুনাকে সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্পের দক্ষিণে এবং জিনাতকে উত্তরে ছাড়া হয়েছিল। হয়তো তাদের নতুন জায়গা মানিয়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছিল। কারণ পশ্চিম ভারতের তাদোবা হল পর্ণমোচী শুকনো পাতার ন্যাড়া সমতল বনভূমি আর পূর্ব ভারতের সিমলিপাল চিরহরিৎ সবুজপাতার বন্ধুর অসমতল বনভূমি। তাদোবায় রয়েছে শান্ত আন্ধেরি নদী এবং তাদোবা ও কালসো হ্রদ। সিমলিপালে রয়েছে বেশ কিছু জলাশয় ছাড়াও জোরান্ডা ও বড়হাপানি জলপ্রপাত এবং বুড়িবালাম, বৈতরণী, সুবর্ণরেখা, পলপলা, সালান্ডি, খৈরি, দেও প্রভৃতি স্রোতস্বিনী নদী। ভূপ্রকৃতি ছাড়াও আবাহাওয়া ও তাপমাত্রাও ভিন্ন। আজন্ম লালিত নিজেদের বনের কথাও মনে হতে পারে। তাই তারা হয়ত সেখানে ফিরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের ঘুমন্ত বাধা অবস্থায় প্লেনে করে দীর্ঘপথ নিয়ে আসা হয়েছিল। তাই তারা ভুল করে যথাক্রমে পূর্ব ও উত্তর পূর্ব দিকে রওনা দিয়েছিল। সদ্য যুবতী বাঘিনীরা পুরুষ বাঘের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে। এখানেও হয়তো কোন পুরুষ বাঘের ঘ্রাণে তারা ভয় পেতে পারে। যমুনা পূব দিকে হাঁটা লাগিয়ে কুলডিহা বালেশ্বরের দিকে চলে গেল। তাদের দুজনেরই রেডিও কলার লাগানো ছিল। তাই সিগনাল দেখে তাদের গতিবিধি বোঝা যাচ্ছিল। প্রায় ১০০ কিমি যাওয়ার পর বনদপ্তর কাপ্তিপদা রেঞ্জ থেকে যমুনাকে কোনক্রমে সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্পের মধ্যে ফেরাতে সক্ষম হল।
দুই
অন্যদিকে জিনাত উত্তর – পূর্ব দিকে অনেকটা এগিয়ে সিমলিপাল অরণ্য ও ওড়িশার সীমানা ছাড়িয়ে ঝাড়খণ্ড রাজ্যে প্রবেশ করল। তারপর জঙ্গলাকীর্ণ পূর্ব সিংভুম জেলার পাহাড়, জঙ্গল, সুবর্ণরেখা সহ অন্যান্য নদী, জাতীয় সড়ক, ধলভূমগড়ের পরিত্যক্ত রানওয়ে, জনজাতি গ্রাম, লোকালয় ইত্যাদি পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ঝাড়গ্রাম জেলার বেলপাহাড়ির জঙ্গলগুলোতে আশ্রয় নিল। বেশ কিছুদিন ব্যাপী প্রায় আড়াইশো কিমি পথ পরিক্রমায় জিনাত কোন মানুষকে আক্রমণ করেনি, নিজেকেও অক্ষত রেখেছিল। সে দিনের বেলায় কোন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকত এবং বেশি রাতে চারিদিক শুনশান হলে হাঁটা শুরু করত। তৃষ্ণা পেলে ঝর্না, নদী বা জলাশয় থেকে জল খেত, খিদে পেলে বনশুয়োর, খরগোশ বা ছাগল মেরে খেত। বেলপাহাড়ির জঙ্গলে স্থানীয় জনজাতির মানুষ তার অস্তিত্ব টের পেল। জ্বালানির জন্য শুকনো ডালপালা সংগ্রহ করতে, ছাগল চড়াতে – এরকম অনেক কাজে তাদের জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে হয়। তাছাড়া এখানকার গ্রামগুলো জঙ্গল সন্নিকটে অথবা জঙ্গল দিয়ে ঘেরা। কোথাও যেতে হলেও জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ। তারা কিছুদিন ধরে বড় জন্তুর পায়ের ছাপ দেখতে পাচ্ছিলেন। বন দপ্তরকে জানালে তারা সেগুলো বাঘের পায়ের ছাপ হিসাবে সনাক্ত করে।
ওদিকে সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্পে তিন বছরের জিনাতকে ১৪ নভেম্বর ২০২৪ তাদোবা থেকে এনে প্রথমে সফট এনক্লোশারে রাখার পর ২৪ নভেম্বর মূল জঙ্গলে ছাড়া হয়েছিল। কিন্তু ৮ ডিসেম্বর থেকে সে নিখোঁজ হয়ে যায়। তার রেডিও কলার থেকে কোন সিগনাল পাওয়া যাচ্ছিল না। ভারতের জঙ্গলে চোরাশিকার (পোচিং) একটা বড় বিপদ। সিমলিপাল ও সাতকোশিয়ায় আগে কয়েকবার হয়েছে। তাই ওড়িশার বনদপ্তর খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। এদিকে শীতের ভরা টুরিস্ট মরশুমে ঝাড়গ্রামে নতুন করে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি প্রচার মাধ্যমে হৈ চৈ ফেলে দিল। তাছাড়া ২০১৮ তে বান্ধবগড়, পালামৌ হয়ে একটি প্রাপ্তবয়স্ক বড় চেহারার বাঘ এসে আশ্রয় নিয়ে বেশ কিছুদিন থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের বনদপ্তর তার কোন বিধি ব্যাবস্থা করতে পারেনি। সেই বাঘটি কোথাও কাউকে আক্রমণ না করা সত্ত্বেও লালগড়ে উন্মত্ত জনতা লাঠি, রড, বল্লম দিয়ে তাকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে ও খুঁচিয়ে মারে। তাই এবার বনদপ্তর তৎপর হয়ে ওঠে। বেলপাহাড়ির জঙ্গলের বাঘের বিষয়ে ওড়িশার বনদপ্তর পশ্চিমবঙ্গের বনদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তার পায়ের ছাপ, পরে জঙ্গলে লুকনো ট্র্যাপ ক্যামেরায় তোলা ছবি এবং রেডিও কলারের সিগনালে বোঝা যায় যে বেলপাহাড়ির জঙ্গলে জিনাতেরই আগমন ঘটেছে। এরপর রাজ্য বনদপ্তর ওড়িশা বনদপ্তরের সাহায্যে জিনাতকে ধরার জন্য উঠে পড়ে লাগে।
জিনাত ঝাড়খণ্ডের দিক থেকে আমঝর্না, আমলাশোল, কাঁকড়াঝোর হয়ে এসে চকডোবা, বাঁশপাহাড়ি, বেলপাহাড়ির বিভিন্ন জঙ্গলে ঘুরেফিরে বেরাচ্ছিল। এবার বনদপ্তরের লোক – লস্কর, গাড়ি, খাঁচা, জাল ইত্যাদি দেখে এবং হৈ হট্টগোল শুনে উত্তর – পশ্চিম দিকের জঙ্গলপথে এগিয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী পুরুলিয়া জেলার বন্দয়ানে দলমা পাহাড়ের জঙ্গলে আশ্রয় নিল। ঐ অঞ্চলেও বনদপ্তরের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে সে কিছুটা পুবে গিয়ে পুরুলিয়ার রাইকা পাহাড়ে আশ্রয় নিল। রাইকা পাহাড় তার বেশ পছন্দ হয়েছিল। ঘন জঙ্গল। আশপাশের গ্রামে প্রচুর ছাগল। ঘন জঙ্গলের কারণে তার রেডিও কলারের সিগনাল ঠিকমত পাওয়া যাচ্ছিল না, ড্রন উড়িয়েও তার ঠিকমত সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। এখানে সে কিছুদিন ছিল। গ্রামবাসীদের কাছ থেকে জেনে যখন বনদপ্তর তিনদিকে জাল লাগিয়ে একদিক দিয়ে হুলা পার্টি ঢুকিয়ে এখানেও তার তত্ত্বতালাশ শুরু করল তখন রাতের অন্ধকারে কুইলাপাল ও ঝিলিমিলি হয়ে জিনাত বাঁকুড়ার রানিবাঁধের জঙ্গলে প্রবেশ করল।
বারবার খাঁচা পেতে তাতে ছাগল রেখে টোপ দিলেও জিনাত তা একবারও গ্রহণ করেনি। দিনের বেলা জঙ্গলে বা গ্রামের পাশে ঘন ঝোপে লুকিয়ে থাকত, রাতে জায়গা পালটাত। এরপর তাড়া খেয়ে সে মুকুটমনিপুর জলাধারের পশ্চিমে মানবাজার ব্লক ২ ও ১ ব্লক হয়ে বাঁকুড়ার ছাতনার ঝাঁটিপাহাড়ি অবধি পৌঁছে গেছিল। কিন্তু বনদপ্তরের বিশাল বাহিনী তাকে ঘিরে ফেলায় সে পালিয়ে ১৫ কিমি দূরে গোঁসাইডিহি গ্রামের একটি ঝোপে শ্রান্ত ক্লান্ত দেহে আশ্রয় নিল। এবার বনদপ্তর ঝোপের চারপাশটা দুই স্তর জাল দিয়ে ঘিরে তার গায়ের কাছে আর্থ মুভার চালিয়ে তাকে উত্যক্ত করে ঝোপের বাইরে নিয়ে এসে তিন বার ঘুমপাড়ানি গুলি চালিয়ে অবশেষে কাবু করতে পারল। ২১ দিন পালিয়ে থাকার পর ২৯ ডিসেম্বর’ ২৪ তাকে ধরা সম্ভব হল। টেলিভিশনের পর্দায় সকলে দেখতে পেলেন এক উজ্জ্বল দৈহিক সুষমার সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী তরুণী বাঘিনীকে। তারপর জিনাতকে অজ্ঞান অবস্থায় বেঁধে খাঁচা গাড়িতে কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানার পশু হাসপাতালে পরীক্ষা ও চিকিৎসা করে সিমলিপালের জঙ্গলে ফেরত পাঠানো হল। শোনা যাচ্ছে জিনাতকে ধরতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনদপ্তর ৩৫ কোটি টাকার বিল করেছে। অতীতে আমরা ব্যাঘ্র প্রকল্প নিয়ে জনজাতি গ্রাম উচ্ছেদ, ধাপ্পাবাজি, কোটি কোটি টাকার ব্যাবসা, সংগঠিত চোরা শিকার ও বিক্রির কথা শুনেছি, এই রাজ্যে হাতি তাড়ানোর ভাঁওতা দেখেছি। এবার বাঘ ধরার সাংঘাতিক কাণ্ড দেখা গেল।
তিন
যৌবনপ্রাপ্ত হলে জীব দেহমনে প্রকৃতির নিয়মে এবং বিবিধ জৈবরাসায়নিক – স্নায়বিক প্রক্রিয়ায় প্রেম আসে। উপস্থিত হয় অপর লিঙ্গের সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার তীব্র জৈবনিক তাড়না। কিন্তু উপযুক্ত সঙ্গিনী না পেলে কি করে সম্ভব? সঙ্গিনীর যে বড্ড অভাব। কোনভাবে সঙ্গিনী জুটলেও প্রতিযোগী পুরুষ বাঘেরা হাজির হয়। তারপর তাদের মধ্যে ভয়ানক সংঘর্ষ চলে। চোট আঘাত রক্তারক্তি। যে বাঘ যুদ্ধে জয়ী হয় সেই বাঘিনীর অধিকার পায়। এবার অনেক সন্ধান করে উপযুক্ত সঙ্গিনী না পেয়ে তাই মধ্য ভারতের এক অরণ্যের একটি প্রাপ্তবয়স্ক শক্তিশালী বাঘকে সঙ্গিনীর খোঁজে বেড়িয়ে পড়তে হল। পাহাড়, নদী, লোকালয়, গ্রাম, রাজপথ, জাতীয় সড়ক, রেল লাইন পেড়িয়ে; দ্রুতগামী ট্রেন, গাড়ি, ভারী ট্রাকদের এড়িয়ে; দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে; দু পেয়েদের দর্শন না দিয়ে সে কয়েকটি জঙ্গল খুঁজে অবশেষে সিমলিপালের জঙ্গলে বাঘিনীর খোঁজ পেল তাদের ঘ্রাণ পেয়ে। একটি বাঘিনী কালো ডোরা, সে এক তরুণ সঙ্গী পেয়ে তখন প্রেমে মশগুল। তারপর আরেকটি বাঘিনীর খোঁজ পেল অনেকটা দূরে, সেও ততক্ষণে এক তাগড়া জোয়ান সঙ্গী জুটিয়ে ফেলেছে। এই বাঘটি ওয়ারধা আশ্রমের আশপাশে ছিল কিছুদিন। সে স্বভাবে কিছুটা শান্তিপ্রিয়। সংঘর্ষ এড়িয়ে সে নতুন বাঘিনীর খোঁজ শুরু করল।
হেমন্তের শেষে বুক ভরা প্রেম নিয়েও সঙ্গিনীর অভাবে বিরহে কাতর এই স্বাস্থ্যবান সুদর্শন বাঘটি জঙ্গলের অন্যদিকে সঙ্গিনীর খোঁজে চলে এসে এক মনোমুগ্ধকর ঘ্রাণ পায়। সেদিকে গিয়ে দূর থেকে সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত খুবসুরত জিনাতকে এক ঝলক দেখতেও পায়। যেন বিদ্যুৎলতা। আহা, কি তার রূপ! কি তার যৌবন! তাকে দেখামাত্র শার্দূলরাজ প্রেমের জোয়ারে এবং মিলনেচ্ছায় পাগলপারা। ভাবখানা এমনঃ
” হো, এক লড়কি কো দেখা তো এইসা লাগা –
যেইসে খিলতা গুলাব, যেইসে শায়র কা খোয়াব,
যেইসে উজলি কিরণ, যেইসে ভান মে হিরণ। … ”
কিন্তু সুন্দরী তরুণী বাঘিনী যে দূর থেকে তার আঁশটে পুরুষালী ঘ্রাণ ও অস্তিত্ব টের পেয়ে ভয়ে দে ছুট। প্রেমে পাগল বাঘও তার দেহভরি সুবাস আর ছিটিয়ে দেওয়া ফেরোমেনের গন্ধ শুঁকে তার পিছু নিল। চলার যেন শেষ নেই। আরে! পাগলি তো এই জঙ্গল থেকেই বেরিয়ে গেছে। আর এগোনো কি ঠিক হবে? দুপেয়েদের সব গ্রাম, রাস্তা, রেলপথ আরও অজানা কত কি? দেখতে পেলেই কাতারে কাতারে ছুটে আসবে আর ঘিরে ফেলে পিটিয়ে বা গুলি করে মেরে ফেলবে। তার চাইতে এই জঙ্গলে থেকেই অন্য বাঘিনীর খোঁজ করা যেতে পারে।
কিন্তু মন যে মানে না। তাই সেও উন্মাদের মত জিনাতের পিছু নিল তাকে পাবার আশায়। তবে সে প্রাপ্তবয়স্ক, সতর্ক হয়ে পথ চলা শুরু করল। পথে ভাল দেখে কোন জঙ্গলের গভীরে দিনের বেলায় আশ্রয় নেয়, অন্ধকার ঘন হলেই হাঁটা শুরু করে। মাইলের পর মাইল। যতটা পারে এগিয়ে যায়। কোনদিন খাবার জোটে, কোনদিন জোটে না। তাও সই। জিনাতকে যে পেতে হবে। পথে গ্রামগুলোতে গরু মোষ অনেক। তাদের মারাও সহজ। একটাকে মারলেই সাত দিনের খোরাকি নিশ্চিন্ত। কিন্তু মেরি জানের অনুসরণ ছেড়ে কে সাতদিন পড়ে থাকবে। গ্রামগুলোতে ছাগল, ভেড়া, শুয়োর, কুকুরও অনেক। তার দেখা না পেলেও সে দু পেয়েদেরও দেখেছে অনেক। একেবারে অরক্ষিত। কেউ জঙ্গলের পাশে চাষ করছে, কেউ জঙ্গলে গরু – ছাগল চড়াতে ঢুকেছে। কেউ পাতা কুড়চ্ছে, কেউবা একটু আড়ালে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছে। কিন্তু প্রেম হচ্ছে একাগ্র সাধনা! তাই কয়েকশো মাইল চলার পথে একবারও কোন ঝামেলায় জড়ায় নি সে। জঙ্গলে হরিণ, শুয়োর, খরগোশ জুটলে তাদের খেয়েছে। নইলে উপবাস। মাঝেমাঝে জলকষ্টেও ভুগেছে, তখন একেবারে নির্জলা উপবাস।
পথে দু পেয়েদের নানারকম কাণ্ডকারখানা দেখে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেলেও নিজেকে অতিকষ্টে সংযত রেখেছে। কিভাবে গাছ কেটে জঙ্গল ধ্বংস করছে এরা ভাবাই যায় না। যেখানে সেখানে কংক্রিটের ঘরবাড়ি নির্মাণ চলছে। মাটি আর নদী ফুঁড়ে তুলে আনছে রাশিরাশি লোহা, কয়লা আর বালি। মনে হয় প্রবল গর্জন করে লাফিয়ে পড়ি এদের মধ্যে, আঁচড়ে কামড়ে সব ব্যাটাকে জখম করে দেই। কিন্তু প্রেম যে খুব মনসংযোগের কাজ! তাই এসব এড়িয়ে যায় সে। বাইরে থেকে লোক জড়ো করে নদীকে আটকে দু পেয়েরা একটার পর একটা বাঁধ, ব্রিজ, রাস্তা বানাচ্ছে। জঙ্গল কেটে, পাহাড় ফাটিয়ে, পিচ পুড়িয়ে রাস্তা বড় করছে। অরণ্য গ্রাম উজাড় করে বানাচ্ছে স্পঞ্জ আয়রন প্রভৃতি ক্ষতিকর কারখানা। ইচ্ছে করে এক লাফে হাতের থাবা দিয়ে একেকটার ঘাড় থেকে মাথা নামিয়ে দেই। কিন্তু প্রেম যে ত্যাগের পথ! এই সময় উদভ্রান্ত হলে চলে না, সঙ্গিনীর অনুসরণে কোন খামতি রাখা যায় না। দিনে ধার্মিক সেজে ভিক্ষা করা লোককে দেখছে রাতে চুরি করছে। অর্থের অভাবে মরদ জোয়ান বউ আর কিশোরী মেয়েদের রেখে ফুরনের কাজে বাইরে গেছে, গাঁয়ের জমিদার মুখিয়া আর শাহু মহাজনদের রাতে ঐ বাড়িগুলোতে ঢুকতে দেখছে। হাইওয়ের ধারে ধাবা হোটেল ও রিসোর্টগুলোয় গরীব আদিবাসী মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি লুটছে সব লম্পটের দল। ভাবে এক কামড়ে ব্যটাদের গলার টুটি ছিড়ে ফেলে। কিন্তু প্রেম যে ভালোবাসার কাজ! প্রেমের সময় কোন হিংসা মারামারি সংঘর্ষে জড়াতে নেই। সারান্ডা কিংবা দুমারিয়ার শাল জঙ্গলে দৈত্যের মত হাতির পাল এগিয়ে আসে। অন্যসময় হলে দিত একটা ভয়ঙ্কর হাঁকারি। কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে হাতির দল অন্য পথে চলে যেত। কিন্তু প্রেম যে নিরুচ্চার সংগ্রাম! তাই নিঃশব্দে ওদের পথ ছেড়ে সরে যায়।
চার
প্রায় আড়াইশো কিমি পথ হেঁটে পূর্ব সিংভূমের ঘাটশীলার জঙ্গল থেকে ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির জঙ্গলে এসে সে পেল তার আকাঙ্ক্ষিত প্রেয়সীর টাটকা ঘ্রাণ। এত দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রার পরেও প্রিয়তমার সঙ্গে মিলিত হওয়ার সম্ভবনায় সে উত্তেজিত হয়ে উঠল। বেলপাহাড়ির জঙ্গলগুলো সে তোলপাড় করে সঙ্গিনীর খোঁজ করে চলল। বিভিন্ন জঙ্গল ঘুরে সঙ্গিনীর দেহের ঘ্রাণ উত্তর দিকে চলে গেছে। সেদিকে যেতে গিয়ে দেখল দু পেয়ে সান্ত্রীরা সব বন্দুক হাতে টহল দিচ্ছে। রাজ্যের গাড়ি, জাল, খাঁচা, সার্চ লাইট, ড্রন, হুলা পার্টি জড়ো করা হয়েছে। জিনাতের জন্য খুব দুশ্চিন্তা হলেও সে মাথা ঠাণ্ডা রাখল। এদিকটা এড়িয়ে লুকিয়ে আবার পশ্চিম দিকের ঝাড়খণ্ডে ঢুকে জঙ্গল পথে অনেকটা ঘুরে সরাইকেলা – খারসয়ান জেলার চান্ডিল দিয়ে পুরুলিয়ার জঙ্গলে ঢুকল।
এই সময় তার পায়ের ছাপ দেখে স্থানীয় জনজাতির মানুষ তার অস্তিত্ব টের পেয়ে বনদপ্তরকে সতর্ক করে। দীর্ঘ চেষ্টায় বনদপ্তর জিনাতকে ধরতে পেরে সামান্য অবকাশের পরেই জঙ্গলমহলে নতুন বাঘের আত্মপ্রকাশের খবরে সচকিত হয়ে ওঠে। কিন্তু এই বাঘটির গলায় কোন রেডিও কলার ছিল না। তার উপর বাঘটি ছিল খুব সতর্ক। দিনের বেলায় কোন গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকত, রাতে গড়ে ২৫ কিমির মত হাঁটাচলা করে জায়গা বদল করত। গ্রামবাসীদের সঙ্গে কোন সংঘর্ষে যেত না, তাদের গৃহপালিত পশুদের ছুঁত না, খুব সন্তরপনে চলাফেরা করত। ফলে কারুর চোখে পড়ত না। বনদপ্তর তার পায়ের ছাপ দেখে বুঝল যে সে প্রমাণ সাইজের একটা পুরুষ বাঘ। পরে বনদপ্তরের লুকনো ট্র্যাপ ক্যামেরায় বন্দয়ানের রাইকা পাহাড়ে ও যমুনাগোড় গ্রামের কাছে তার ছবি ধরা পড়ে। স্বাস্থ্যবান এক প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ। আন্দাজ করা হয় বাঘটা চান্ডিলের দিক থেকে ঢুকে দলমা দুয়ারসিনি হয়ে বন্দয়ানের লেউসা ও রাইকা পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে এলাকা জুড়ে তন্নতন্ন করে জিনাতের সন্ধান করতে থাকে।
ইতিমধ্যে বনদপ্তর রাইকা পাহাড়ে চিরুনি তল্লাশি শুরু করায় বুদ্ধিমান বাঘটি পশ্চিমদিক দিয়ে আবার ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। সেখান থেকে আবার ঝাড়গ্রামের আমঝর্না, আমলাশোল, কাঁকড়াঝোড়, ময়ূরঝর্না, চকডোবা, লালজল রুট ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বনদপ্তরকে ফাঁকি দিয়ে সঙ্গিনীর খোঁজে বাঁকুড়ায় ফুলকুসুমা দিয়ে প্রবেশ করে রাইপুরে কংসাবতী নদীর তীরে উপস্থিত হয়। এখানকার ইন্দ্রঝোড়, বেনচাপড়া, পড়রাশ্যাল গ্রামে তার পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। এই পর্বে সে মরিয়া হয়ে জিনাতের সন্ধান চালাতে থাকে। কয়েকজন গ্রামবাসী কাকভোরের কুয়াশায় তার আবছা দর্শন পেয়েছেন দাবি করেন। সে কাউকে বিরক্ত করে না। সারেঙ্গার জঙ্গল অবধি ঘুরে জিনাতের ঘ্রাণ পেয়ে রানিবাঁধের জঙ্গলে প্রবেশ করে। এখানকার মহাদেবসিনান, পুনাশ্যা, হুয়াংখানা ও সুতান গ্রামে এবং পার্শ্ববর্তী বন্দয়ানের পুকুরকাটা ও বাগডুবি গ্রামে তার পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। এতদিন হয়ে যাওয়ায় এবং এত দীর্ঘ পথ চলার ধকলেও সে হাল ছাড়ে না। হন্যে হয়ে জিনাতের খোঁজ চালিয়ে যায়। বহু লোকের দাপাদাপি, বনদপ্তরের বহু কর্মীর যাতায়াত, প্রচুর গাড়ি চালানো ইত্যাদি কারণে এই জায়গায় জিনাতের ঘ্রাণের খেই হারিয়ে যাওয়ায় সে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে জঙ্গলমহলে এতদিন ধরে একটি বাঘের উপস্থিতির কারণে আতঙ্ক ছড়ালে বনদপ্তর সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা আবার এই অঞ্চলে চিরুনি তল্লাশি শুরু করলে বাঘটি বারো মাইলের জঙ্গল ছেড়ে সুতানের গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। রাতে বহুদিন পর একটি চিতল হরিণ শিকার করে খেয়ে ঝোড়ার জলে তৃষ্ণা মিটিয়ে পরেরদিন ভোরে ক্লান্ত শরীরে যখন আকাশছোঁয়া পিয়াশাল গাছের নিচে একটা ঘন ঝোপে ঘুমাতে যাচ্ছে তখন পাশের কুসুম গাছ থেকে সদ্য ঘুম থেকে জাগা এক বৃদ্ধ দাঁড়কাক তাকে প্রশ্ন করে সে কোথা থেকে এখানে কেন এসেছে। সে উত্তর দেয়। এরমধ্যে পাশের মহুল গাছে ঘুম থেকে ওঠা হনুমানের দল কিচির মিচির করতে করতে তাকে জানায় যে দু পেয়েরা জিনাত বাঘিনীকে কিছুদিন আগে গোঁসাইডিহি গ্রাম থেকে ধরে ফেলেছে। দু পেয়েদের কথা শুনে ওরা জানতে পেরেছে জিনাতকে আবার সিমলিপালের জঙ্গলে ছাড়তে নিয়ে গেছে। শোনার পর থেকে তার দু চোখের পাতা এক হয়নি। দিনের বেলাটা কোনরকমে কাটিয়ে অন্ধকার নামতেই সে বনদপ্তরের কর্ডন এড়িয়ে ঘুরপথে প্রায় ৩০০ কিমি দূরবর্তী সিমলিপাল অরণ্যের দিকে আবার যাত্রা শুরু করে। পরেরদিন সকালে দলমা পাহাড় ছাড়িয়ে কুকরু ও অপো গ্রামে জনজাতিরা তার দক্ষিণ – পশ্চিমমুখী পায়ের ছাপ দেখতে পান।
০৬.০২.২০২৫










