(এক)
এক অদ্ভুত ছ্যাবলামো শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে! ‘বিজেপি বিরোধী’ হিসেবে নাটুকে ভূমিকা চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী, তৃণমূল কংগ্রেস। জন্মলগ্ন থেকেই এঁরা আরএসএস-বিজেপি’র আশির্বাদ ও সহযোগিতা প্রাপ্ত। এঁরা না কোনও ‘দল’; না কোনও ‘মঞ্চ’; না কোনও ‘জোট’। এঁদের নেই কোনও ঘোষিত আদর্শ, কোনও নীতির ঝামেলা। এঁরা এক বিশুদ্ধ ঘোঁট বা জটলা। যাঁদের নিয়ে এঁদের পথচলা শুরু হয়েছিলো, তাঁরা: ১) নিকৃষ্ট কংগ্রেসী; ২) হতাশ বিপ্লবী; ৩) দুর্নীতিগ্রস্ত ‘বামপন্থী’; ৪) ধান্দাবাজ আমলা; ৫) সুবিধাবাদী ‘বিদ্বজ্জন’; এবং ৬) অত্যাচারী পুলিশ। এইসব রামধনু চরিত্রের সুবিধাবাদীদের মহামিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছিলো এই জটলাটি। একটাই লক্ষ্য নিয়ে, “সিপিআই(এম) হঠাও।” ব্যাস্। এটাই আদর্শ, এটাই নীতি। সিপিআই(এম) ক্ষমতা থেকে হঠে গিয়েছে, তাই এঁদেরও আর রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকার কথা না। মোক্ষলাভ তো হয়েই গেছে! কিন্তু ‘ক্ষমতা’ আঁকড়ে তো থাকতেই হবে। ওখানেই তো আসল মধু। সম্পত্তি গড়ে তোলার এবং নাম-খ্যাতি প্রচারের আসল চাবিকাঠি তো ওখানেই।
জনবিরোধী রাষ্ট্রযন্ত্রের পাহারাদার এবং সেবাদাস হিসাবে কাজ করাই হলো সংসদীয় পথে ‘নির্বাচিত’ যেকোনো ‘রাজ্য সরকার’-এর ‘সংবিধানসম্মত কর্তব্য’। ১৯৬৭ পর্যন্ত কংগ্রেস, ১৯৬৭ থেকে ‘যুক্তফ্রন্ট’, ১৯৭৭ থেকে ২০১১ ‘বামফ্রন্ট’ (প্রধানত সিপিআই-এম); ২০১১ থেকে ২০২৬ তৃণমূল কংগ্রেস – সকলেই এই সত্যের একেকটা উদাহরণ। নানা সরকার, হরেক ঝাণ্ডা, বিভিন্ন কায়দা, বিচিত্র ছলচাতুরি। কিন্তু এমন কোনও সরকার গঠিত হয় নি, যাঁদের আমলে শ্রমজীবী জনগণ অপমানিত ও নিগৃহীত হয় নি। কংগ্রেস বা সিপিআই (এম)-এর রাজত্বে বারবার গণ-আন্দোলন ফেটে পড়েছে। তাই, শাসকের গণহত্যাকারী স্বৈরাচারী ভূমিকাও প্রকাশ হয়ে পড়েছে। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের ছুপা-ফ্যাসিস্ট নেতৃত্ব কোনোরকম সংগ্রাম ফেটে পড়ার সুযোগই দেয় না। তাঁরা চরম প্রতিক্রিয়াশীল স্বৈরাচারীর মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘোষণা করে, “কোনও ধর্মঘট চলবে না।” সরকার বিরোধী সবরকম জমায়েত বা মিছিল এঁরা পুলিশ-গুণ্ডা-লুম্পেন বাহিনী দিয়ে বারবার পিটিয়ে ঠাণ্ডা করেছে। হত্যাও করেছে। আন্দোলন বা সংগ্রাম গড়ে উঠতেই দেয় না এঁরা। তাই, গণহত্যার প্রয়োজনও হয় না; প্রথমিক স্তরেই এঁরা আন্দোলন-সংগ্রামকে গুঁড়িয়ে দেয়। অথচ সর্বদা ধুরন্ধর প্রচার চালানো হয়, ‘তৃণমূলের আমলে কোনও গণহত্যা হয় না।’ পাশাপাশি ব্যাপক কর্মহীনতা, শিক্ষাহীনতা, স্বাস্থ্যহীনতা, চিকিৎসাহীনতা, ইজ্জত-হীনতা… এসবের বিরুদ্ধে কখনও টুঁ শব্দটিও করে না সরকারি মোড়লগণ বা তাদের স্তাবকবৃন্দ। চাকরিপ্রার্থীদের, অথবা চাকরিরত কর্মীদের, কিংবা ছাত্রছাত্রীদের যখন সরকারি পুলিশ-গুণ্ডা-লুম্পেন বাহিনী পিটিয়ে ঠাণ্ডা করে, তখনও ছুপা-ফ্যাসিস্ট সরকারের স্তাবকদের মুখে টুঁ শব্দটিও শোনা যায় না।
সরকারবিরোধী কোন আন্দোলন পশ্চিমবাংলায় শাসকের হামলার মুখে পড়ে নি? ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, – কাদের রেয়াত করেছে এঁরা? আরজিকর হাসপাতালের ডাক্তার ‘অভয়া’কে পরিকল্পিত, সংগঠিত, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও খুনের বিরুদ্ধে লক্ষলক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত, অকল্পনীয় ও ঐতিহাসিক প্রতিবাদ আন্দোলনও কী ছুপা-ফ্যাসিস্টদের নির্লজ্জ আক্রমণ থেকে ছাড় পেয়েছে? প্রতিবাদীদের চরিত্র হননের মতো ইতরামোর শেষ পর্যায়েও নামে নি তথাকথিত ‘ফ্যাসিস্ট বিরোধী’ (!) সরকারের মাতব্বররা? একেরপরএক ধর্ষনকে “সাজানো ঘটনা”, “প্রেগনেন্ট কিনা দেখতে হবে”, “লাভ অ্যাফেয়ার্স ছিলো” ইত্যাদি অতি নিম্নমানের ক্লেদাক্ত মন্তব্য করেন নি তৃণমূল সরকারের মহিলা সুপ্রিমো? প্রতিবাদী অধ্যাপকের উপর পুলিশের ছুপা-ফ্যাসিস্ট হামলার পর দাপুটে মন্ত্রী বলেছিলেন, “পুলিশ ঠিক করেছে”! নেত্রীর বে-সরম দালালি করতে গিয়ে বিবেক বন্ধক রাখেন নি এই মন্ত্রী মহোদয়? সেই ছুপা-ফ্যাসিস্ট হামলা কোন দিক থেকে বিজেপি’র পুরো-ফ্যাসিস্ট হামলা থেকে একটু হলেও ‘মিষ্টি’? একটু হলেও গ্রহণযোগ্য? ব্যথা একটু কম লাগে? একটু হলেও ‘গণতান্ত্রিক’ চরিত্রের বুঝি এইসব বর্বরতা? বিজেপি সরকারের নেতৃত্বে মানুষকে ধর্ষণ বা হত্যা করলে মৃতের কানে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি বাজতে থাকে, আর তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের নেতৃত্বে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড হলে মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর আগে তাঁর কানে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি শুনতে শুনতে মারা যান বুঝি! ‘মোমো’ কারখানার প্রায় পঞ্চাশজন শ্রমিক বোধহয় ঝলসে নারকীয় মৃত্যুর সময়ে, “এগিয়ে বাংলা”-র সুখ স্বপ্নে বিভোর হয়ে, একটু নিশ্চিন্তেই চিরবিদায় নিয়েছেন! তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ‘মানবিক’ (!) অনুদান ‘দশলক্ষ টাকা’ মৃত শ্রমিকদের হতভাগ্য পরিবারগুলোকে নিশ্চিতভাবেই ‘বাংলার উন্নয়ন’ সম্পর্কে আশাবাদী করবে!
২০২৬-এ ভোটের আগে, সবসময়ে এক অদ্ভুত যুক্তি হাজির করছেন তৃণমূলের মাতব্বররা! সরকারের কোনোকিছুর বিরুদ্ধে কোনও প্রশ্ন তুললেই, কোনও প্রতিবাদ করলেই, এঁরা জুজুর ভয় দেখায়, “ফ্যসিস্ট বিজেপি’র সুবিধা হবে যাবে”! যেনো, বিজেপির ভয়ে এঁদের আমলের প্রতিটি খুন, ধর্ষণ, চুরি, জালিয়াতি, ভণ্ডামি, মিথ্যাচার, সাম্প্রদায়িকতা … সব কিছুকেই ছাড়পত্র দিতে হবে জনগণকে! চোখের সামনে ঘটে চলা শাসককূলের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পদের ঐন্দ্রজালিক বাড়বৃদ্ধি; দলীয় নেতা-নেতৃদের হঠাৎ বিস্ময়কর আর্থিক স্বচ্ছলতা; – সবকিছু প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়াই যেনো জনগণের কর্তব্য! বিজেপির ‘রাম মন্দির’ যদি ফ্যাসিস্ট কর্মসূচি হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের ‘জগন্নাথ মন্দির’ কিংবা ‘মহাকাল মন্দির’ কীভাবে ফ্যাসিস্ট-বিরোধী কর্মসূচির অঙ্গ?
একশো বছর আগে (১৯২৫) রবীন্দ্রনাথের একটি অনবদ্য কথা হলো, “যুক্তি পেয়েছি বলে বিশ্বাস করি, কম ক্ষেত্রেই; বিশ্বাস করি বলেই যুক্তি জুটিয়ে আনি, সেইটেই অনেক ক্ষেত্রে।” (প্রবন্ধ: ‘স্বরাজসাধন’।) তৃণমূল কংগ্রেস এক্ষেত্রে যথার্থ রবীন্দ্র-পন্থী! যখন যা-ই অপকর্ম করে, তার সমর্থনেই যাহোক কিছু “যুক্তি জুটিয়ে আনে”!
অটলবিহারী বাজপেয়ী, রাজনাথ সিং, তথাগত রায়… এদের সঙ্গে হরিহর-আত্মা হয়ে পথচলা ছুপা-ফ্যাসিস্টরা হঠাৎ ‘বিজেপি-বিরোধী’ সাজার চেষ্টা করলেই চলবে! জন্মাবধি আরএসএস-বিজেপির আশীর্বাদ নিয়ে পথচলা তৃণমূল কংগ্রেস, দুমদাম ‘বিজেপি বিরোধী’ ভাষণবাজী করলেই তো সাতখুন মাপ হয়ে যাবে না। কঠিন সত্য হলো, বিজেপির থেকেও বহুগুণ বেশি আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী এই তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপি তো ‘সংসদীয় নির্বাচন’-এর পথ দিয়েই ক্ষমতা দখল ও সংহত করে চলেছে। সেই নির্বাচনে জেতার জন্য সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, ধর্মীয় বিভাজন, গণহত্যা, দাঙ্গা, পারস্পরিক বৈরিতার চাষ, … সবকিছুতেই তারা ওস্তাদ। তৃণমূল কংগ্রেস সেই ধৈর্যটুকুও রাখতে রাজি না! পঞ্চায়েত হোক বা পৌরসভা অথবা বিধানসভা কিংবা লোকসভা, ১০০% আসনই তাঁদের চাই। “একটা আসনও যেন বিরোধীরা না পায়।” এটাই এঁদের ঘোষিত ‘গণতান্ত্রিক’ লক্ষ্য! তার জন্য কংগ্রেসী ঘরানায় ভোটলুঠ, মারদাঙ্গা, খুনোখুনি, সবকিছুতেই তাঁরা ওস্তাদ। এঁদের মোদ্দা কথা, ‘জান কবুল, কিছুতেই ক্ষমতা ছাড়া চলবে না। ক্ষমতা চা-ই চাই। ১০০%-ই চাই।’ “ভুলেও অন্য কোথাও ভোট দেবেন না।” সরকারি কোষাগারের (অর্থাৎ জনগণের পকেটের) হাজার হাজার কোটি টাকায় প্রচারের প্লাবন ঘটিয়ে প্যাথলজিক্যাল মিথ্যাবাদীকে ‘সৎ’; লুম্পেন-গুণ্ডাদের ‘সোনার ছেলে’ ইত্যাদি প্রমাণ করার চেষ্টা – ছুপা-ফ্যাসিস্টদের নয়া কৌশল। খুনি, ধর্ষক, চোর, জোচ্চোর, জালিয়াত ইত্যাদি বাংলার কলঙ্কদের বাঁচানোর জন্য, আদালতে সরকারি তহবিলের বিপুল অর্থব্যয় করা এঁদের রেওয়াজ হয়ে উঠেছে। ‘গণতন্ত্র’র নামে, সমাজের প্রতিটি স্তরে পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করাও এঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সরকারি কোষাগারকে, অর্থাৎ জনগণের পয়সাকে এঁরা পিতৃপুরুষের সঞ্চিত সম্পদ মনে করে; সেগুলো ইচ্ছে-খুশিমতো নয়ছয় করা যেনো এঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার! ‘গণতন্ত্র’-র হদ্দমুদ্দ করেই ছাড়ছেন তাঁরা। গো-বলয়ের বিপুল ক্ষমতাশালী কদর্য-ফ্যাসিস্ট বিজেপি পরিত্যাজ্য, আর বাংলা বলয়ের ‘সীমিত’ ক্ষমতাসম্পন্ন ছুপা-ফ্যাসিস্ট তৃণমূল কংগ্রেস আদরণীয়, এমন বিচিত্র নীতি-নৈতিকতা কোথায় / কবে ঠিক হলো!
আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, সব সরকারের আমলেই কিছু মিথ্যাবাদী-চোর-জোচ্চোর-জালিয়াত-লুম্পেন সরকারি দলের ছত্রছায়ায় ছিলো। কিন্তু মিথ্যাবাদী চোর জোচ্চোর জালিয়াত লুম্পেনরা নিজেরাই একটা সংগঠিত ‘রাজনৈতিক শক্তি’ হয়ে উঠবে, সৎ-ভালো মানুষদের অনুবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে খুঁজে বের করতে হবে সেখান থেকে, এমনটা কখনও কল্পনাই করতে পারতো না পশ্চিমবাংলার মানুষ! তার অনিবার্য পরিণতিও যা হবার, তা-ই হয়েছে। স্বরাষ্ট্র, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, আইন বিভাগ থেকে শুরু করে পুরো সরকারটাই এখন ক্লেদাক্ত, পুঁতিগন্ধময় হয়ে উঠেছে। টাকা… টাকা… টাকা… যেদিকে তাকানো যাক, সর্বত্র ও সর্বদা এটাই হয়ে উঠেছে ‘সাফল্যের চাবিকাঠি’! সভ্যতা, মানবিকতা, সততা, মূল্যবোধ … সবই এখন শুধু অভিধানের শব্দমাত্র। সৎ, সুস্থ, স্বাভাবিক, মানবিক বলে কিছুরই আর অবশিষ্ট নেই। তেলেভাজা, ঘুগনি, কাশফুল… এইসব ‘শিল্প’ নির্ভর জীবনযাপনের ফাজলামোপূর্ণ নিদান দিচ্ছেন অর্থনীতির দিকপাল, মুখ্য প্রশাসক মহোদয়া! আর ‘শিক্ষিত’ স্তাবকের দল তাতেই নির্বিকারভাবে ‘গণ্ডায় অণ্ডা’ মিলিয়ে চলছেন! রাজ্য, জেলা, থানা, মহল্লা… সব জায়গাতেই মাস্তান-লুম্পেনদের রাজত্ব কায়েম হয়েছে নিরঙ্কুশভাবে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, লালন ফকির, রবীন্দ্রনাথ, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, রাসবিহারী বসু, ক্ষুদিরাম বসূ, বাঘা যতীন, সুভাষচন্দ্র বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত ভট্টাচার্য, কাজি নজরুল, অরবিন্দ ঘোষ, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, প্রমুখদের স্মৃতিধন্য বাংলা ও বাঙালির অন্যতম উত্তরসূরি পশ্চিমবাংলার এই লজ্জাজনক হাল হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের পাল্লায় পড়ে! সমাজের কোনও ক্ষেত্রে, কোনও বিষয়ে, কোনোরকম সুস্থতা আর রইলো না এখানে! শুধুই বাচালতা, রণহুঙ্কার, মিথ্যাচার, স্তাবকতা আর নীতিহীনতার স্তুপিকৃত জঞ্জাল!
(দুই)
আক্ষেপের বিষয় হলো, মনেপ্রাণে আরএসএস-বেজেপির চরম সাম্প্রদায়িকতাবাদী দর্শনের এবং বাঙালি-বিরোধী আধিপত্যবাদী মানসিকতার বিরোধী অনেক মানুষই বর্তমানে বিস্ময়করভাবে জড়ো হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের ছত্রছায়ায়। এঁদের অনেকেই নিজেদের মেধা, সাহিত্য-প্রতিভা, সঙ্গীত-প্রতিভা, নাট্য-প্রতিভা, ইত্যাদি বেদনাদায়কভাবে স্বৈরাচারী শাসকের সেবায় নৈবেদ্য হিসাবে দিয়ে চলেছেন। এঁরা বুঝতেই পারছেন না, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদী ফ্যাসিস্ট বিজেপির দোসর হিসাবে, শুধুমাত্র ইতিহাসের পাদটিকা হয়েই থাকবেন নিজেরা! আরএসএস-বিজেপির প্রতি এঁদের ঘৃণা, ক্ষোভ বিক্ষোভ, জনস্বার্থরক্ষার তাগিদ, … সবকিছু ইতিবাচক গুণ কী আশ্চর্যজনকভাবে ভস্মে ঘি ঢেলে চলেছে! শ্রমজীবী জনগণের সঙ্গে একযোগে এঁদের সম্মিলিত শক্তি যে ফ্যাসিস্ট-বিরোধী ঐতিহাসিক ও দুর্বার ভূমিকা পালন করতে পারতো, সেই সম্ভাবনা চূড়ান্তভাবে নষ্ট হচ্ছে! চোর-জোচ্চোর-জালিয়াত-লুম্পেন ইত্যাদির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ‘ভোটে জেতা’-র ঘটনা যে ভবিষ্যতের ইতিহাসে শুধুই ধিক্কার পাবে, তা কেন এঁরা বুঝতে পারছেন না, জানি না! সকল বাঙালি মনীষীদের সম্পর্কে সীমাহীন অজ্ঞতা এবং বাংলা সম্পর্কে হাস্যকর রকমের মূর্খতা যাঁদের পুঁজি – এমন ব্যক্তিদের নেতৃত্বে ‘বাংলা বাঁচানো’ অসম্ভব। একথা কী এঁদের বোধে কাজ করছে না! জনগণের পকেট থেকে সংগৃহীত অর্থ-বিলি, পারিতোষিক-বিলি, মিথ্যাচার, গুণ্ডামি, মারদাঙ্গা ইত্যাদির মাধ্যমে ভোটে জিতে ‘সরকার গঠন’ করা যেতেই পারে। কিন্তু সেই পথে বাংলা ও বাঙালিকে প্রকৃত অর্থে বাঁচানো কোনোভাবেই সম্ভব না। বাংলা ও বাঙালি বিরোধীদের সজুত করা সম্ভব না। এই কথাটুকু না বোঝার মতো উজবুক এঁরা কখনোই না। তা-ও, সংসদীয় ক্ষমতার গায়ে লেপ্টে থাকার মোহ এঁদের কোথায় টেনে নামিয়েছে! জনবিরোধী ‘রাষ্ট্রযন্ত্র’র সেবাদাস ও পাহারাদার হয়ে কোনোদিনই যে বৃহত্তর ‘সমাজ’-এর বন্ধু হওয়া যায় না, এই মৌলিক সত্যকে আড়াল করার কী সচেতন চেষ্টা! নিজেদের ইজ্জত ও সামর্থ্যকে নিজেরাই কীভাবে ভুলুন্ঠিত করছেন! বয়সের প্রবীণত্ব, অভিজ্ঞতার মূল্য আর দীর্ঘ চলার পথে অর্জিত উপলব্ধি – এই সবকিছুকে কীভাবে নষ্ট করছেন! জীবনে একদিনের জন্যেও জনগণের স্বার্থে একমুহূর্ত ব্যায় না-করা বাচাল অর্বাচীন ‘নেতা’র স্তাবক হয়ে উঠতে হয়, তার লজ্জাজনক উদাহরণ তৈরি করলেন বাঙালি সমাজে! ‘সমাজ’ এঁদের কাছে আর বিবেচ্য বিষয়ই না; আত্মস্বার্থের তাগিদে, ক্ষমতার লোভে, – ‘রাষ্ট্র’ রক্ষার কাজেই এঁরা এখন আত্মনিবেদিত। প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরে ঢুকে প্রগতিশীলদের তরফ থেকে ‘জনস্বার্থরক্ষা’র চেষ্টা, বহু পুরানো রাজনৈতিক কৌশল। তবে, যাঁরাই এই ‘মহান’ (!) লক্ষ্যে প্রতিক্রিয়ার শিবিরে গিয়ে ভিড়েছেন, ব্যতিক্রমহীনভাবে তাঁরা সকলে নিজেরাই প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তবুও, “সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।”
সমাজবদলের স্বপ্ন দেখা হাজার হাজার বাঙালি স্বর্ণসন্তানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা ও নির্যাতিত করার মাধ্যমেই যাদের ‘রাজনৈতিক’ দীক্ষা হয়েছে, বাঙালি-হত্যার সেনাপতিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই যাদের পথচলা, – তারা হঠাৎ ‘বাংলা ও বাঙালি’ স্বার্থের ঠিকাদার হয়ে উঠেছে! ফলতঃ, বিপর্যয় অনিবার্য! চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির এবং বাঙালি-বিরোধী বেনিয়াদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক শিষ্যসামন্তরা যদি ‘বাংলা-রক্ষা’র দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে ওঠেন, তবে আর বাংলা-বাঙালির দুর্দিন ঠেকাবে কে!
ধর্ষিত ও নিহত সরকারি আরজি কর হাসপাতালের চিকিৎসক ‘অভয়া’-র ন্যায় বিচারের দাবি আজও তাজা আর সমান প্রাসঙ্গিক। প্রায় দুবছর যাবৎ, কাজের দাবিতে যোগ্য শিক্ষকরা রাস্তায় বসে। একেরপরএক ইস্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা প্রায় লাটে ওঠার অবস্থায়! সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য আর্থিক দাবিদাওয়া বছরের পর বছর অগ্রাহ্য করে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। ‘আশা’ এবং ‘অঙ্গনওয়ারী’ মহিলা কর্মচারীরা দীর্ঘকাল ধরে তাঁদের ন্যায্য দাবিসমূহ নিয়ে আন্দোলনরত। সংগঠিত ও অসংগঠিত শ্রমিকদের জীবনযন্ত্রণা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায় সরকারের! কিন্তু সরকারের মোড়ল প্রতিনিধিদের এবং সরকারের ‘জো-হুকুম’ তাঁবেদার-মাতব্বরদের লক্ষলক্ষ টাকার নিয়মিত আর্থিক আয় অবশ্য নিশ্চিত করাই আছে।
ধর্মীয়-ফ্যাসিস্ট বিজেপি আর ছুপা-ফ্যাসিস্ট তৃণমূল কংগ্রেস, দুই পক্ষের কেউই বাংলা-বাঙালিদের বাঁচানোর জন্য আদৌ আগ্রহী না। অজস্র ঘটনা থেকে একথা তর্কাতীতভাবে প্রমাণিত যে, তাঁরা শুধুমাত্র নিজেদের রাজনৈতিক ‘ক্ষমতা’ আর আর্থিক প্রাপ্তির বিষয় নিয়েই লালায়িত।
এটাই বর্তমানে পশ্চিমবাংলার বেদনাদায়ক রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি!










