ছেলে/মেয়ে-র স্কুলে পিটিএম-এ (পেরেন্ট-টিচার মিটিং) গেছেন নিশ্চয়ই কখনও না কখনও। তাহলে ক্লাসরুমটা দেখে চেনা চেনা লাগবে।
ছোট্ট ছোট্ট বেঞ্চ। টিচারের সঙ্গে আগের গার্জেন যদি বেশীক্ষণ কথা বলেন, তাহলে আপনাকে অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়েছে। এরকমই একখানা বেঞ্চে। বসে থাকতে থাকতে ভেবেছেন, ইশ, এত সরু বেঞ্চে সারাদিন বসে থাকতে বাচ্চাটার তো কষ্ট হয়… স্কুলটা এত্তো এত্তো টাকা নেয়, অথচ স্টুডেন্টের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা একটুও ভাবে না…
ছেলে/মেয়ে-র ক্লাসরুমের দেওয়ালে – ঠিক এরকমই – ছবিছাবা পোস্টার লাগানো। দেখেছেন আর ভেবেছেন – স্কুল থেকে প্রোজেক্টের জন্য যখন বানাতে দিয়েছিল তখন বিরক্ত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু এখন বেশ লাগছে দেখতে…
ওই তো… ওই ছবিটা আপনার ছেলের আঁকা… ওই পোস্টারের লেখার অক্ষরগুলো আপনার মেয়ের… ফিনিশিং টাচ দিতে আপনিও হাত লাগিয়েছিলেন, বিরক্তও লাগছিল আবার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে…
খামেনি খুব খারাপ লোক। গোঁড়া, উগ্র, মধ্যযুগীয় মনোবৃত্তির মানুষ।
কিন্তু এই ক্লাসে বসে থাকা কিশোর-কিশোরীরা, আপনার ছেলে/মেয়ে-র মতোই… কেউ দুষ্টু, কেউ চুপচাপ, কেউ লাজুক, কেউ ক্লাস অতিষ্ঠ করে রাখে… মানে, রাখত…
যে ক্লাস-টিচার স্নেহে শাসনে নরমে গরমে এই বাচ্চাগুলোকে আগলে রাখতেন… তাঁরও চিরতরে ছুটি হয়ে গেছে কিনা জানিনা, কিন্তু বাচ্চাগুলোর ছুটি হয়ে গিয়েছে…
আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়েছেন? পড়তে পড়তে চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল, হয়ত, নিজের অজান্তেই… ইহুদি-নিধন, জেনে এসেছি, সভ্যতার কলঙ্ক…
ইজরায়েলী বিমান-হানায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আগে এই বাচ্চাগুলো অমন কোনও ডায়েরি লেখার সময় পায়নি। তদুপরি এদের কেউ পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গও নয়। নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, প্যালেস্টাইনের বাচ্চাদের মতোই, এদের গল্পও কোত্থাও লেখা থাকবে না।
যাক গে! ক্লাসরুমের ছবিটা দেখে রাখুন। অ্যানুয়াল পরীক্ষার পর রেজাল্ট বেরোলে পিটিএম-এ তো যাবেনই। মিলিয়ে দেখবেন। ঘেন্না-বিদ্বেষ জিইয়ে রেখে যুদ্ধ করার জন্য যে যা যুক্তিই দিক না কেন, এই ছবিটা ভুলে যাবেন না, প্লিজ।
বেঞ্চে বসা ছাত্র/ছাত্রীটি আপনার ছেলে/মেয়েও হতে পারত।
গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ-এর তোড়ে, তথাকথিত ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ হিসেবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় যারা, তারা প্রত্যেকে এরকম একজন একজন মানুষ। শিশু। কিশোর। কিশোরী। সাধারণ মানুষ। সুবিধে-অসুবিধের মধ্যে লড়াই করতে করতে বেঁচে থাকা একজন মানুষ।
আপনার মতো। আমার মতো।
ছবি – Chinmoy Guha -দার দেওয়াল থেকে নেওয়া।










