১.
আমাদের সাবেক পাড়ায় এক অভিনব পরিবার ছিল। আমরা মজা করে বলতাম – দ্যা গ্রেট লিলিপুট ফ্যামিলি। ঐ বাড়িরই ছেলে নান্টু ছিল আমাদের খেলার সাথী। নান্টুর বাবা চাকরি করতেন রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। যে সময়ের কথা বলছি সেই সময়ে গোল দীঘির পাড়ে ঐ লাল বাড়িটিই ছিল প্রধান সরকারি দফতরখানা – দ্যা নার্ভ সেন্টার। নান্টুর মা নন্দিনী মাসিমাও কোন্ একটা স্কুলে পড়াতেন। নান্টুর বোন নন্দা ছিল আমার বোনের বন্ধু। এই চারজনের খর্বাকৃতি পরিবার যখন রাস্তা দিয়ে একসাথে হেঁটে কোথাও যেতো সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে থাকতো। বিষয়টি নিশ্চয়ই নান্টুদেরও যারপরনাই বিব্রত করতো তবে ওদের কাছে ব্যাপারটা ক্রমশই সহনীয় হয়ে উঠেছিল। গড়পড়তা চার ফুটের বামন পরিবারকে নিয়ে আমরা হাসাহাসি করছি দেখলে মা রীতিমতো ধমক দিয়ে আমাদের বলতেন –” এটা বংশগত সমস্যা। ঠাট্টা ইয়ার্কি করতে নেই এসব নিয়ে।” নান্টুদের মতো দৈহিক সমস্যার বিষয়টি এইসময় সারা দুনিয়া জুড়েই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তবে জিনগত কারণে এমনটা ঘটছে তা হয়তো নয় । বিষয়টি নিয়ে দু- কথা বলতেই এই নিবন্ধের অবতারণা।
২.
বিশ্ব উষ্ণায়ন। এই শব্দবন্ধের সঙ্গে পরিচয় নেই এমন একজনকেও বোধহয় এই মুহূর্তে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এর ফল পৃথিবীর বাতাবরণের ওপরে পরেই ক্ষান্ত হয়নি,ওই পথ ধরে আমাদের জীবন,জীবিকা, স্বাস্থ্য সবকিছুর ওপরই গভীর ছাপ ফেলেছে। এমন আতপ্ত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার আগেই তা আমাদের বিপর্যস্ত করেছে নানাভাবে। বলা হচ্ছে, এমন পরিবর্তনের সঙ্গে মানানসই করে তুলতে হবে আমাদের আগামীর জীবনকে । অবশ্য এই ক্ষত কতটা গভীর তার খোঁজখবর নিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। খুব সম্প্রতি এমনই এক বিষয়ের ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তাঁরা। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আগামী প্রজন্মের হবু নাগরিকদের জন্য। তাঁদের মতে এই ভয়ঙ্কর তাপীয় অবস্থার কারণে ভবিষ্যতের পৃথিবী হয়তো ভরে উঠবে বেঁটে, খর্বাকৃতি মানুষের ভিড়ে। খবরটা পড়ে আমার নান্টুদের কথাই নতুন করে মনে পড়লো।
৩.
বিগত কয়েক দশক ধরে আমাদের পৃথিবী এই প্রবণতার সঙ্গে একরকম লড়াই করে চলেছে। তখন অবশ্য মনে করা হতো সুস্থ সবল শিশুরাই আগামী দিনে শ্রমজীবী মানুষের জোগান অব্যাহত রাখবে,তারা জন্মের সময় একটু বেঁটে খাটো চেহারার হলে ক্ষতি কি ? বরং বলা হয়েছে খর্বতাই নাকি সুস্থতার প্রতীক। তবে তেমন হিসেব নিকেষ বদলে যেতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ নোৎতর দামের একদল গবেষকের দাবিকে ঘিরে। আফ্রিকার ৩৪ টি দেশের ১৬ বছরের তথ্যকে বিশ্লেষণ করে তাঁরা জানিয়েছেন যে মনুষ্যসৃষ্ট এই উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে প্রতি ১ ডিগ্রি পিছু ৩. ৪৫ % হারে খর্বকায় শিশুর জন্ম বাড়ছে। এটা রীতিমতো ভাবনার বিষয়!
৪.
এই গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ভারতীয় বংশোদ্ভুত বিজ্ঞানী অরুণ আগরওয়ালের কথায় – বিষয়টি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এক “ অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা ” সমস্যা । দৈনন্দিন উষ্ণতার ১ ডিগ্রি বাড়া কমাকে আমরা খুব একটা গ্রাহ্যই করিনা। কিন্তু গোটা দুনিয়ার প্রেক্ষাপটে এই সামান্য বৃদ্ধিই শিশুদের জন্মকালীন অবস্থাকে রীতিমতো সঙ্গীন করে তুলতে পারে।” বিশেষ করে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ফলে মানুষের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি এতোটাই প্রভাবিত হয় যে তা প্রসূতিদের উদ্বেগ উৎকন্ঠা বাড়িয়ে দিতে পারে। গর্ভস্থ সন্তানের বৃদ্ধি এর ফলে এমনিতেই প্রভাবিত হয়। জন্ম পরবর্তী বেড়ে ওঠার সময়টাতেও এই সংকটময় পরিস্থিতিতে তাদের যুঝতে হয় ফলে এটিকে একটি কাল্পনিক সমস্যা বলে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়া তাপমানে পুষ্টিকর খাবার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে যা শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্ষমতাকেও নিয়ন্ত্রিত করে গভীরভাবে। পাঁচ বছর পেরোনোর আগেই এই অবস্থা এক আন্তপ্রাজন্মিক দারিদ্র্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে শিশুদের যা থেকে মুক্তির উপায় এখনও অজানা।
৫.
পরিবেশ পরিস্থিতি জটিল সন্দেহ নেই। এমনিতেই এই সময়ের পৃথিবীতে “হ্যাভস আর হ্যাভ নটসদের” ব্যবধান ক্রমবর্ধমান। তার ওপর এই তাপীয় পরিস্থিতি আমাদের মধ্যের বৈষম্য তথা ব্যবধানকে আরও আরও প্রকটভাবে মেলে ধরেছে। আমাদের দেশের কথাই ধরা যাক। এক চরম বৈষম্যের শিকার ভারতীয় জনসমাজ। সাম্প্রতিক খরার ফলে ভারতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩০০০ ছুঁই ছুঁই। এরমধ্যে পরিণত বয়সের মানুষের সঙ্গে পা মিলিয়েছে অপরিণত বয়সের শিশুরা। এ এক গভীর ফাঁদ যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আশা নেই । সম্পন্ন পরিবারের সন্তানরা প্রয়োজনীয় খাবারের বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারে কিন্তু গরীব, হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের সেই সামর্থ্য কোথায়? নিদারুণ অপুষ্টিতে ভোগা এই শিশুরা দেহ মনে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যায়। তারা নিরাপদ আশ্রয় হারায়, ন্যূনতম পুষ্টির জোগান থেকে বঞ্চিত হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে বাড়ে স্বাস্থহীনতা , অকালমৃত্যু। কি মর্মান্তিক পরিণতি।
৬.
আফ্রিকার দেশগুলোর অবস্থা এর থেকে খুব বেশি আলাদা নয়। দুর্বিসহ তাপদাহ, আকস্মিক খরা, রাষ্ট্রিয় স্তরে প্রশাসনিক দুর্বলতা, আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো পরিকাঠামোর অভাব – সবমিলিয়ে এক অসহনীয় পরিস্থিতির শিকার হতে হয় আফ্রিকার অগণিত সংখ্যক মানুষকে। ফলে আফ্রিকার দেশগুলোর আবাসিক নাগরিক বিশেষ করে নবীন প্রজন্মের নাগরিকদের বেড়ে ওঠার গতি শ্লথ হয়ে গেছে। আগামী দিনের আফ্রিকার দেশগুলোর শিশুরা নিদারুণ অপূর্ণতার মধ্যেই বেড়ে উঠতে বাধ্য হচ্ছে।
৭.
আলোচ্য রিপোর্টে এই বিষয়টি যথার্থভাবে উঠে এসেছে যে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব অনুন্নত দেশের ভাবি নাগরিকদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এইসব দেশের গ্রামীণ মানুষদের ওপর দুর্গতির প্রভাব লাগামছাড়া হতে পারে কেননা তারা প্রকৃতি পরিবেশের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। মা ভগ্ন স্বাস্থ্যের হলে সন্তান যেমন রুগ্ন, অশক্ত, অপরিণত হয় আজ ঠিক তেমনি অবস্থা গরীবগুর্বো আফ্রিকান মানুষদের। সামাজিক অপূর্ণতা এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রনের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। “ পৃথিবীর যে সমস্ত দেশের নাগরিকরা মানুষের তৈরি এই বিশ্ব উষ্ণায়নের পেছনে ন্যূনতম ভাবে দায়ি, তারাই আজ সবথেকে বড়ো ক্ষতির সম্মুখীন হতে বাধ্য হচ্ছে।”– এ এক নিদারুণ ট্র্যাজেডি। অপরিণত শরীর নিয়ে এক খর্বাকৃতি প্রজন্ম উপহার দিচ্ছে আফ্রিকা।
৮.
সমীক্ষার ফলাফল এমন এক সময়ে আমাদের সামনে এসেছে যখন এই খর্বতার বিষয়টি বৈশ্বিক উন্নয়নের সামনে এক বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়াতে চলেছে। ইউনিসেফের মতে এই প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী ২০২৬ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৪৫ মিলিয়ন শিশু ছোটো শরীরের মানবক হিসেবে বেড়ে উঠবে।এটা কখনোই অভিপ্রেত নয়। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের গড় বৃদ্ধির হার কমে গেছে। তাদের উচ্চতা বাড়ছে স্বাভাবিকের তুলনায় কম হারে। প্রশ্ন জাগে – আমরা কি এক নাতিদীর্ঘ মানুষের মিছিলে পা মেলাতে চলেছি?
সেপ্টেম্বর ৭. ২০২৬.















