আমাদের যাত্রাটা শুরু হলো বেশ টান টান উত্তেজনা নিয়ে। যে ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার কথা ছিল, ট্রেন ছাড়ার কয়েক ঘন্টা আগে তাতে আমাদের টিকিট ক্যানসেল হলো। শিয়ালদা থেকে দার্জিলিং মেল সাড়ে সাতটায় ছাড়ে। আমরা দেড়টার সময় খবর পেলাম ট্রেন ক্যান্সেলের।
এদিকে নেপালের দুর্ঘটনা বিধ্বস্ত নুয়াকোট এ আগেই মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করা হয়েছিল। আমাদের প্রথম গন্তব্য নুয়াকোট, পরেরটা রাসুয়া। ত্রিশুলা নদীর তীরে অবস্থিত রাসুয়া নুয়াকোটের থেকেও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সেখানকার বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ। মৃতদের সংখ্যা গুনে বলা যাবে না। টিমের চারজনেরই যাওয়া হবে মনস্থির করাই ছিল, তাই অন্য ট্রেনের টিকিট খোঁজা শুরু হল। আড়াইটে নাগাদ আগরতলা গরিব রথের চারটি টিকিট কনফার্ম করা গেল। আমরা ৯টা ৪৫ নাগাদ ট্রেনে উঠে বসলাম। শুরু হলো আমাদের নেপাল রিলিফ জার্নি ।
আমাদের টিমে আছে ডাক্তার সাবিত হোসেন, ডাক্তার আজিঙ্কা বর্মা, দুজনেই কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। আর ডাক্তার অবনি উন্নি, যিনি সুদূর কেরল থেকে কলকাতায় এসেছিলেন লিঙ্গ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি এনজিও-র সঙ্গে কাজ করতে। পরে চেঙ্গাইলে শ্রমজীবীর কাজের ধরন পছন্দ হওয়ায় অবনি থেকে গেছেন এখানেই। আর আমি পিয়ালী দে বিশ্বাস। অন্যরা ডাক্তার কিন্তু আমি একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবেই ওনাদের সঙ্গে এই রিলিফ ক্যাম্পে যাচ্ছি।
এর আগে ন্যাচারাল ক্যালামেটির জন্য আমার বেশ কয়েকটি রিলিফ ক্যাম্পের অভিজ্ঞতা আছে। তবে সেটা বাংলার ভেতর। এই প্রথম বাংলার থেকে পা বাড়িয়ে বিদেশের পথে এবং এত বড় বিপর্যয়ের জন্য রিলিফ প্রোগ্রামের অংশ হওয়া। আসলে যে কোন মেডিকেল ক্যাম্প চালানোর জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদেরও প্রয়োজন। চিকিৎসার বাইরে ওজন দেখা, বিপি মাপা, ওষুধ দেওয়া বা কাউন্সিলিং করার মতন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে। তখনো জানিনা আমরা ফিল্ডে গিয়ে কি কি দেখব।
গত ৬ সেপ্টেম্বর আমরা ট্রেনে উঠেছিলাম। ৭ তারিখ রাতটা ট্রেনে কাটিয়ে সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ এনজিপির আগের স্টেশন রাঙ্গাপানিতে নামলাম। রাঙ্গাপানিতে নেমে টোটোয় করে লালিগুরাসের অফিসে দ্রুত স্নান আর প্রাত:রাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম নেপালের উদ্দেশ্যে।
রাঙ্গাপানির অফিস থেকে ফাঁসি দেওয়া ছাড়িয়ে পানি ট্যাংকি পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম টোটোয়। এবার বর্ডার পার হওয়ার পালা। আসার পথে দীর্ঘ রাস্তা নকশালবাড়ির উপর দিয়ে। মনে পড়ে গেল একসময় ইতিহাসের এই পুণ্যভূমি জন্ম দিয়েছিল এমন একটি আন্দোলনকে যার গভীরতা আজকের প্রজন্মকেও প্রভাবিত করে। মনে হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তর ভাবে আমরা নকশালবাড়ির জিন বয়ে বেড়াচ্ছি। টোটোতে আসতে আসতে মাথার ভিতর এসবই ভাবনাচিন্তা চলছিল।
সারাটা রাস্তাতেই ঝিরঝিরি বৃষ্টি আমাদের সঙ্গী। তার উপর নকশালবাড়ির অতীত চার্ম। শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের চারজন আর লালি গুরাসের চার জন সদস্য মিলে নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
লালিগুরাসের শমীক চক্রবর্তী সম্পর্কে আগে জানলেও উজ্জ্বল ছেত্রী, উৎসব থাপ্পা, গ্রেসি রাই এর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ এখানেই।
কেন জানি না বর্ডারে আধার কার্ডকে তেমন মান্যতা দিল না বিএসএফ। প্রায় প্রত্যেকের ভোটার আইডি দেখতে চাইলো। যেখানে আধার কার্ড এর নাম্বার স্ক্যান করে খুব সহজেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে কার্ডটির অথেন্টিসিটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেখানে ভোটার আইডি কার্ডকে মান্যতা দেওয়ার প্রয়োজন কি? যেখানে ইন্টারনেটে ভোটার আইডির সত্যতা যাচাই করাই সম্ভব নয়। আমার কাছে ফোনে ভোটার কার্ডের ছবি ছিল। টিমেরই এক সদস্যার ভোটার আইডি কার্ড না থাকার জন্য বেশ কিছু সময় কাঠখড় পোড়াতে হলো। এইসব সামলে নেপাল বর্ডার পার হলাম।
বর্ডার পেরোতে খুব বেশি তামঝাম লাগলো না। তবে অনেকটা ক্যাশ টাকা নিয়ে ঢোকার উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, আর বারবার যে জিনিসটি বিএসএফ রা চেক করছিল যে আমাদের মেডিকেল টিমের সঙ্গে কোন ওষুধ যাচ্ছে কিনা। কারণ সরকারি আদেশে ভারত থেকে ওষুধ নিয়ে যাওয়া যাবে না নেপালে। বিএসএফ কর্তাদের কথায় জানলাম ভারত সরকার ইতিমধ্যেই নেপালের বিপর্যস্ত এলাকার জন্য ওষুধ এবং জরুরী প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পাঠিয়ে দিয়েছেন। এর বাইরে ওনারা আর ব্যক্তিগতভাবে মেডিকেল সাহায্য করার প্রয়োজন বোধ করছেন না।
কাকরভিটার এই বর্ডারটা বেশ ছিমছাম। তবে শুনলাম পাশের পশুপতি মার্কেটের বর্ডার এর চেয়ে জমজমা। রক্সল বর্ডারও বেশ জনবহুল। যে পথ দিয়ে আমি আগের বছর নেপালে গিয়েছিলাম।
নেপালিদের মধ্যেও শ্রেণীগতভাবে বেশ কিছুভাগ রয়েছে। রাই, ছেত্রী, থাপা, সব আলাদা আলাদা বংশোদ্ভুত এবং আলাদা আলাদা জায়গাকে রিপ্রেজেন্ট করে, সেই মতো তাদের খাওয়া দাওয়াও আলাদা। যদিও আমরা বাইরে থেকে আসা মানুষেরা সেটা আলাদাভাবে বুঝবো না, যদি না আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া যায়। অঞ্চলভেতে খাবার পৃথক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাষাতেও গভীর তারতম্য আছে। নেপালের এপাশে মানে ভারতবর্ষে বসবাসকারী নেপালিদের সঙ্গে ওপাশের নেপালির অনেক পার্থক্য আছে।
যাই হোক নেপালের রাস্তা বেশ খারাপ। বেশ কিছু এলাকায় গাড়ির মধ্যে দিয়ে প্রায় লাফাতে লাফাতে অনেকটা পথ বের হবার পর রাত্রি হবার মুখে এক জায়গায় গাড়ি আটকালো। আগের দিন রাতে ট্রেন জার্নি তারপরের দিন রাতে গাড়িতে বসে বসে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা । কিন্তু গাড়ি চললে এক রকমের স্বস্তিও বটে। ওই অন্ধকারে নিশুতি রাতে দীর্ঘ গাড়ির লাইনে আটকে পড়ে সে এক অন্য অভিজ্ঞতা, যেখানে কয়েক মিনিটে চোখে দূরের পাহাড়ের টিমটিমে আলো আর ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া পৃথিবীতে অন্য অস্তিত্ব আছে কিনা সংশয় জাগে, সেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম প্রায় তিন চার ঘন্টা।
রাঙ্গাপানিতে থেকে আমরা যখন বেরিয়েছিলাম তখন বাজে সকাল সাড়ে নটার কাছাকাছি। আর কাঠমান্ডু পৌঁছালাম পরের দিন অর্থাৎ ৮ ই সেপ্টেম্বর সকাল ছটায়।
এ দিনটা নেপালের ইতিহাসে একটা বিশেষ একটি দিন, আজ জেন জি বিপ্লবের এক বছর। সেই মারাত্মক উত্তাল সময়ের মধ্যে দিয়ে নেপালে এক নব সূচনা, সারা বিশ্ব চোখ মেলে দেখেছিল।











