“রাজছত্র ভেঙে পড়ে; রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে;
জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে;
রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি”
নিজেকে অপরাজেয় মনে করা স্বৈরাচারী, অত্যাচারী, দাম্ভিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত এক শাসনের পতন ঘটেছে।
অভয়ার ধর্ষক-খুনিকে আড়াল করা অপশাসনকে গদি থেকে সরিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ।
আবার প্রমাণিত সাধারণ মানুষকে চিরদিন ভয় দেখিয়ে, বিভ্রান্ত করে রাখা যায় না।
অভয়া আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছিল দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভয়কে জয় করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। এই আন্দোলন বাংলার জনগণকে সাহস জুগিয়েছিল- যে চরম শক্তিশালী শাসকের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া টান করে, নিঃস্বার্থ ভাবে দাঁড়ালে সেই শাসকেরও ভিত কেঁপে ওঠে।
১৪ই আগস্ট অতীন ঘোষের পোষ্য গুণ্ডাদলের ভাঙচুর, অনশনক্লিষ্ট ছেলেমেয়েদের পাশে ভাবলেশহীন কার্নিভালের ডান্ডিয়া, প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রতিহিংসা, মাঝরাতে বাড়িতে পুলিশের হানা, একজনের নামে ১২-১৩টি করে মিথ্যে এফআইআর, শুধু নেতৃস্থানীয় জুনিয়র ডাক্তার নয় কম বয়সী মেডিকেল ছাত্র যারা থ্রেট কালচারের মাথা বিরূপাক্ষের বিরুদ্ধে থানায় ডায়েরি করেছিল, খুঁজে খুঁজে তাদের নামে একাধিক এফআইআর।
অনিকেত, আসফাক, দেবাশিসদের মামলায় পরাজয়ের পর মেধাভিত্তিক কাউন্সেলিং সম্পূর্ণ তুলে দিয়ে পরবর্তী একটা গোটা ব্যাচের সিনিয়র রেসিডেন্টদের উপর র্যান্ডম “পানিশমেন্ট পোস্টিং” চাপিয়ে দেওয়া, সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্র থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি, জাল স্যালাইনে প্রসূতিমৃত্যু আর তার প্রতিবাদ করায় বলির পাঁঠা করে জুনিয়র ডাক্তারদের সাসপেন্ড করা – এসব কিছুই ভোলেনি মানুষ।
রাত ৮টার পরে মেয়েদের বাইরে না বেরোনোর নিদান দিয়ে ও মহিলাদের রাতে ডিউটি না করতে বলাকেই নারী নির্যাতন রোধের সমাধান হিসেবে দেখানো— এই মানসিকতাকেও প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলার মানুষ।
এই গণ রায় এই প্রতিটি অন্যায়, প্রতিটি ঔদ্ধত্য, প্রতিটি প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে মানুষের জবাব। অতীতেও বাংলার মানুষ ক্ষমতার দম্ভে মত্ত শাসককে নামিয়েছে, ভবিষ্যতেও প্রয়োজনে দ্বিধা করবে না।
তবু লড়াই শেষ নয়, অভয়ার বিচার এখনও বাকি।
আমরা জানতে চাই—
১) কেন ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখার্জি অভীক বিরূপাক্ষকে “ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট” বলে প্রেস কনফারেন্স করেছিলেন?
২) কেন ৯ তারিখ ভোরবেলায় পুরো থ্রেট সিন্ডিকেটের লোকেরা আর জি কর হাসপাতালে উপস্থিত ছিল?
৩) কার নির্দেশে, কেন সেমিনার রুমের দেওয়াল ভাঙা হয়েছিল?
৪) ১৪ই আগস্ট অতীন ঘোষের পোষ্য গুণ্ডারা ঠিক কোন তথ্যপ্রমাণ লোপাট করতে এসে ইমার্জেন্সি ভেঙে তছনছ করেছিল?
সব সত্য সামনে আসুক। (এতদিন কেন সামনে আসেনি, সেই প্রশ্নও রয়ে যায়)
আমরা দেখতে চাই –
অভীক বিরূপাক্ষ সহ থ্রেট কালচারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নথিবদ্ধ সমস্ত অভিযোগের ফাইল খোলা হোক, নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। শশী পাঁজা, নির্মল মাজির মতো নেতা নেত্রীদের মাধ্যমে থ্রেট কালচারের মাথাদের নিয়ে ডাক্তার সংগঠনের নামে ভয়ের রাজনীতি জিইয়ে রাখার যেই প্রচেষ্টা চলেছিল তাদেরকেও চিহ্নিত করে দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি দেওয়া হোক। (যদিও থ্রেট কালচারের অনেক মাথাই ইতিমধ্যে গেরুয়া আবির মেখে নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে)
আমাদের তরফ থেকে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত করতে যে কথাগুলো আমরা বারবার বলেছি, আজ আবার বলছি—
অভয়ার বিচার বা ভবিষ্যতে আর একটি অভয়ার ঘটনা আটকানো কেবল শাসক বদলের ওপর নির্ভর করে না।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে তৈরি হওয়া অগণতান্ত্রিক, ভয়ের পরিবেশ ভেঙে ফেলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
প্রয়োজন প্রতিটি মেডিকেল প্রতিষ্ঠানে সুস্থ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ। প্রয়োজন নিয়মমাফিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন।
ক্যাম্পাস ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে কার্যকরী ইন্টার্নাল কমপ্লেইন কমিটি, এবং সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
প্রয়োজন ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট, গ্রুপ ডি কর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীদের স্থায়ী নিয়োগ এবং শূন্যপদ পূরণ।
রোগী হয়রানি রুখতে দরকার ডিজিটালাইজড, কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরড রেফারেল সিস্টেম।
মেধাভিত্তিক কাউন্সেলিং ফিরিয়ে এনে স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়োগনীতি গড়ে তুলতে হবে, প্রতিহিংসামূলক অগণতান্ত্রিক নিয়োগের SOP বাতিল করতে হবে।
ক্ষমতার অলিন্দে বসে থ্রেট কালচার, স্বজনপোষণ, পানিশমেন্ট পোস্টিং ও ট্রান্সফার বন্ধ করতে হবে।
ছাপ্পা ভোটে গঠিত এবং মিথ্যে অভিযোগ দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন নম্বর বাতিলের ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত মেডিকেল কাউন্সিলের পুনর্গঠন জরুরি।
সমস্ত দুর্নীতির কান্ডারী নারায়ণ স্বরূপ নিগমের অপসারণ, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট এমন একটি সংগঠন, যে নিজের মগজ ও মেরুদণ্ড কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে বন্ধক দেয়নি, ভবিষ্যতেও দেবে না।
অভয়ার ন্যায়বিচার এবং আর একটি অভয়ার ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই লক্ষ্যে কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিতে- লিঙ্গবৈষম্য সহ সমস্ত বৈষম্য, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সচেতন নাগরিক স্বর হিসেবে।
পরিশেষে এবারের নির্বাচন ও বাংলার মানুষ আবার এই কথাটাই সুপ্রতিষ্ঠিত করল-
People shouldn’t be afraid of their government. Governments should be afraid of their people.
#wbjdf #justiceforRGKar











