মনোরোগ বিজ্ঞানে আরশোলার প্রতি ভয় কে উপরোক্ত নামে উল্লেখ করা হয়। এটি একটি উৎকণ্ঠা জাতীয় মানসিক অসুখ (Anxiety Disorder) এবং তার অমূলক ভীতি (Phobia) অংশে পড়ে। কিন্তু সেটি যখন দেশের সর্বেসর্বা সর্বশক্তিমান ৫৬” ছাতি বিশিষ্ট একমেদ্বিতীয়ম শাসক এবং তার শক্তিধর সহযোগীদের মধ্যে প্রবল ভীতি সঞ্চার করে এবং রাতের ঘুম কেড়ে নেয় তখন সেটি অবশ্যই চিন্তার বিষয় বৈকি।
আরশোলা এবং সিজেপি: বিবর্তনের পথে আদি মানুষের সৃষ্টি আফ্রিকা মহাদেশে প্রায় ৬০ লক্ষ বছর আগে। আর বিবর্তনের পথে পৃথিবীতে আরশোলার আগমন ৩২ কোটি বছরেরও আগে জুরাসিক পরবর্তী সময়ে। ৪৬০০ রকম আরশোলার মধ্যে ৩০ রকম বেশি দেখা যায়। এরা একধরনের ক্ষতিকর পতঙ্গ (Pest) যারা খাদ্যে সংক্রমণ ঘটায় এবং আমাদের মত ক্রান্তীয় জলবায়ুর পরিমণ্ডলে খুব সক্রিয় থাকে। ঘরে, রান্নাঘরে, হোটেলে, ট্রেনে, নর্দমায়, নির্গমন পাইপে প্রায় সর্বত্র খাদ্য ও বর্জ্যের কাছাকাছি বিভিন্ন খাঁজে, ফাটলে, আড়ালে আস্তানা গাড়ে এবং বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। যেখান থেকে এদের সহজে হটানো যায় না এবং কীটনাশক ইত্যাদি প্রয়োগ করেও সহজে মারা যায় না।
রাষ্ট্র পোষিত আম্বানি, আদানি সহ কতিপয় অতিধনী পরিবারের বিপুল বিত্ত দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যতই দেশকে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতি (আসলে পঞ্চম) আখ্যা দিন না কেন তাঁর ১২ বছরের রাজত্বে আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি, বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ, রাষ্ট্রায়ত্ত সেক্টরের পুঁজি সরানো, অপরাধ বিশেষ করে নারী ও দলিতদের উপর অপরাধ, সাইবার অপরাধ, দেশের সম্পদ লুঠ করে বিদেশে পাচার প্রভৃতি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বগামী। এর উপর তাঁর নোট বন্দী থেকে কোভিড মোকাবিলা, আর্থিক – শুল্ক – বাণিজ্য – বিদেশ নীতি দেশের অনেক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। তাঁর নাটুকেপনা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও অজ্ঞের ‘ মন কে বাত ‘ শুনে আর হাম্বরাই ভাব, দামি সাজগোজ – পোশাক, ঘনঘন বিদেশ ভ্রমণ, ট্রাম্পের কাছে আত্মসমর্পণ, মণিপুরে গৃহযুদ্ধ সহ দেশের যাবতীয় সমস্যায় চুপ থাকা এবং অবহেলা, সমস্ত প্রতিষ্ঠান দখল, মিডিয়া ও সমাজ মাধ্যম দখল করে কেবলই আত্ম ও মিথ্যা প্রচার, নির্বাচনে কারচুপি, মধ্যযুগীয় পশ্চাদপদ আদর্শ চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতি, মার্কিন ও চিনের ক্ষেত্রে বার্থতাগুলিতে নীরব থেকে শুধু পাকিস্তান বিরোধী যুদ্ধ জিগির জাগিয়ে তোলা (এবং সেখানেও অপারেশন সিঁদুরে ব্যর্থতা) ইত্যাদি দেখে দেশের মানুষ খুবই ক্লান্ত ও বীতশ্রদ্ধ ছিলেন।
১৫ জুন সঙ্ঘ পরিবার স্থাপিত শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারক সূর্যকান্ত যখন শীর্ষ আদালতে একটি রায় দান উপলক্ষে কর্মহীন বেকার যুবকদের পরজীবী আরশোলার সঙ্গে তুলনা করেন এবং তাঁর এই কুমন্তব্যের প্রতিবাদে প্রবাসী ভারতীয় স্নাতকোত্তর ছাত্র মহারাষ্ট্রের সম্ভাজী নগরের বাসিন্দা মারাঠি দলিত পরিবারের সন্তান অভিজিৎ দীপকে কৌতুক (Joke) ও ব্যঙ্গ (Satire) করে নিজেকে এবং দেশের ছাত্র – যুবদের আরশোলা ঘোষণা করে শাসক বিজেপি দলকে বিদ্রূপ (Mockery) করে সমাজ মাধ্যমে ‘ সিজেপি (ককরোচ জনতা পার্টি) ‘ গোষ্ঠী (Amulgamation) গঠন করেন তখন পাঁচ দিনের মধ্যে দেড় কোটি এবং কিছুদিনের মধ্যেই আড়াই কোটি অনুসারী (Followers) সিজেপির যুক্ত হয়ে পড়েন।
জন সমর্থনে বলীয়ান তিনি দেশে ফিরে অন্যান্যদের নিয়ে NEET সহ সর্বভারতীয় পরীক্ষায় নিয়মিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরোধিতা করে ০৬ জুন থেকে নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় সমগ্র দেশ এবং সমস্ত ক্ষমতা দখল করে ফেলা অতি আত্মবিশ্বাসী বিজেপি নেতৃত্ব তাঁকে তেমন গুরুত্ব দেন না। তাঁদের ধারণা ছিল সর্বভারতীয় পরীক্ষা নিয়ে তাঁদের পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কোন বিরোধী রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে এদের মাধ্যমে কিছুটা প্রকাশিত হলে ক্ষতি নেই বরং ভাল।
প্রাথমিকভাবে এই অবস্থান বিক্ষোভ অতটা দৃষ্টি আকর্ষণ না করলেও আস্তে আস্তে সেখানে এই স্বৈরাচারী জমানায় বঞ্চিত নিপীড়িত বিভিন্ন শক্তি যোগ দিতে থাকেন বিশেষ করে কর্মহীন শিক্ষিত বেকার এবং ভবিষ্যতহীন বিভিন্ন বিশ্ব বিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র ছাত্রী রা। অন্য অনেকে সমর্থন করেন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, পরিবেশ সংরক্ষক, অধিকার ও সমাজকর্মী প্রত্যন্ত লাদাখবাসী সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন ধরনা মঞ্চে যোগ দিয়ে অনশন শুরু করলে আন্দোলনের গুরুত্ব বাড়ে। এআইএসএ ছাত্র সংগঠনের সভাপতি নেহা বোড়াও দুজন সহকর্মীকে নিয়ে অনশন শুরু করেন। অন্যদের সঙ্গে অবস্থান বিক্ষোভে যোগ দেন এসএসএস, এসএফআই সহ বিভিন্ন সমাজবাদী ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা।
১৮ জুলাই সকালে কেন্দ্র সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী বলপূর্বক সোনমকে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করলে এবং অবস্থান মঞ্চে ভাঙচুর চালিয়ে আন্দোলনকারীদের জোর করে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে ছাত্র – যুবরা সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং সারা দেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদের জন্ম হয়। আন্দোলনের সমর্থনে দিল্লি ও আশপাশের রাজ্য গুলি থেকে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থান প্রাঙ্গণে জনতার আসার ঢল নামে। একের পর এক ব্যারিকেড ও পুলিশের বাধা, আশপাশের ১৬ টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রেখে, দেশজুড়ে সরকার ও বিজেপির তরফ থেকে বিরুদ্ধপ্রচার সত্ত্বেও ১৯ জুলাই এর মধ্যে তিন লক্ষ মানুষ অবস্থান মঞ্চে ঘুরে যান, তাদের অনেকে থেকেও যান। সাধারণ মানুষ বিপুল পরিমাণে অর্থ, খাদ্য ইত্যাদি দান করেন। অনেকে স্বেচ্ছাসেবা করে যান। ২০ জুলাই সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনে সিজেপির ডাকা সংসদ অভিযানে অভূতপূর্ব সাড়া মেলে। অমিত শাহের পুলিশ উচু ব্যারিকেড, বেধড়ক লাঠি চার্জ, পেরেক পোঁতা লাঠি দিয়ে মার, জল কামান, কাঁদানে গ্যাস, পেলেট গুলি ছুঁড়ে ছাত্রছাত্রী দের আটকানোর চেষ্টা ও তাঁদের রক্তাক্ত করলেও দমাতে পারে না। তাঁদের একাংশ সব বাধা পেরিয়ে সংসদে পৌঁছে যায়। বিজেপির দমনপীড়ন অত্যাচারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংঘর্ষ করে উঠে আসা উত্তরপ্রদেশের নাগিনা কেন্দ্রের দলিত সাংসদ ‘ আজাদ সমাজ পার্টি (কাঁশিরাম) ‘ এর কর্ণধার চন্দ্রশেখর আজাদ রাবণ এই আন্দোলনকে সর্বতোভাবে সমর্থন করেন, উত্তর ভারতের যুবদের যোগ দিতে আহ্বান জানান এবং নিজে সংসদ প্রাঙ্গণে বাবসাহেব আম্বেদকরের মূর্তির নিচে দিনরাত প্রবল বর্ষার নিচে অবস্থান করতে থাকেন।
ছাত্রযুব দের আন্দোলনে নিষ্ঠুর পুলিশি আক্রমণ দেশে বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় তোলে। বিক্ষোভে সংসদ মুলতুবি হয়ে যায়। এতদিন এই আন্দোলন থেকে দূরত্ব রাখা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি আন্দোলনকে সমর্থন করে, সরকারের বিরোধিতা করে। তাঁদের একাংশ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গৃহের সামনে গিয়েও প্রতিবাদ করে। বিভিন্ন রাজ্যে মায় মোদি – অমিত শাহের রাজ্য গুজরাতে প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। বিহারে বন্ধ ডাকে বিরোধীরা। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় ২৪ জুলাই বিভিন্ন বাম দলের ছাত্র সংগঠনের বিশাল যৌথ মিছিল হয়। অবশেষে সরকার পিছু হটে আলোচনায় বসতে রাজি হয়। আলোচনায় সরকার পক্ষ সময় নষ্ট করে চললেও ছাত্র যুব রা তাঁদের প্রধান দাবি শিক্ষা দুর্নীতির দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা তে অনড় থাকেন এবং এরপর বৃহত্তর আন্দোলন ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইস্তফার দাবি করবেন জানিয়ে দেন। শেষমেশ পরিস্থিতির চাপে ক্ষমতায় মদমত্ত, উদ্ধত মোদি সরকার তার ১২ বছরের শাসনে এই প্রথম নত হয়ে ২৫ জুলাই ক্যাবিনেট মন্ত্রী এবং বিজেপি – আরএসএসের গুরুত্বপুর্ণ নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধান কে পদত্যাগ করাতে বাধ্য হয়। বিজয়ী ছাত্র যুব রা বিজয় উৎসব করতে করতে গৃহে ফেরেন।
সব পরিকল্পনা মাটি: অটল বিহারী বাজপেয়ীর ১৯৯৬ সালে অল্প সময় এবং ১৯৯৮ – ২০০৪ পর্বে ক্ষমতায় থাকার ১০ বছর পর নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ২০১৪ তে বিজেপি বিপুল ভোটে পুনরায় ক্ষমতা দখলের পর আরএসএস – বিজেপি ক্ষমতার স্থায়িত্বের জন্য সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ধর্মীয় মেরুকরণ ইত্যাদির সঙ্গে বিরোধী শূন্য করার প্রকল্প নেয়। তাতে তাদের সুবিধা করে দেয় অর্বাচীন রাহুল গান্ধীর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা, অথচ কোন সংগঠনিক দায়িত্ব না নেওয়া এবং কিছু উপরিসৌধ বক্তব্য রেখে হারিয়ে যাওয়া বা বিদেশে চলে যাওয়া। ভারতের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির বেশীরভাগ নেতাই সুবিধাবাদী ও দুর্নীতিগ্রস্ত। কব্জা করা এজেন্সিগুলি দিয়ে তাদের ভয় দেখিয়ে বা ঘুষ দিয়ে নিজেদের দিকে নিয়ে আসা। আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপাদমস্তক দুর্নীতিপরায়ণ অথচ গণভিত্তি সম্পন্ন আঞ্চলিক দলকে দিয়ে কংগ্রেস ও বিরোধী ইন্ডিয়া জোটকে দুর্বল ও অকার্যকর করে দেওয়া। বিপরীতে মমতা এবং তাঁর আত্মজ ও সঙ্গীসাথীদের যাবতীয় লুটপাট অপরাধে চোখ বুজে থাকা। এরপর প্রয়োজন ফুরোলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূলকে উৎপাটিত করা এবং ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেওয়া। এভাবে কংগ্রেস, আপ, শিব সেনা, এনসিপি, আরজেডি, বিজেডি প্রভৃতি দলকে ভেঙ্গে দুর্বল করে, নির্বাচন কমিশন কে কব্জা করে এসআইআর প্রমুখ ফন্দিফিকির ও নির্বাচনে নানারকম কারচুপি করে, পাশাপাশি জাতপাত, ধর্মীয় মেরুকরণ, উপরিসৌধ কিছু উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের ২৮ টি রাজ্য ও ৮ টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মধ্যে ২৪ টি দখল করে ২০৪৯ অবধি কেন্দ্রে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করে রাখছিল। বিরোধীরা ছিলেন একেবারেই হতোদ্যম। কংগ্রেস তামিলনাড়ু তে জোট ভেঙ্গে টিভিকে মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ায় ডিএমকেও ইন্ডিয়া জোট থেকে বেরিয়ে গেছিল।
সেই লক্ষ্যে এবারের সংসদের বাদল অধিবেশনের আগে বিরোধীদের আরও ভাঙন ঘটিয়ে দুই তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা দেখিয়ে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের জন্য সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল শাসক দল বিজেপি। এছাড়াও এক দেশ এক ভোট বিল, অপরাধে আটক প্রধানমন্ত্রী – মুখ্যমন্ত্রী দের অপসারণ বিল, বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল, আইএসআই বিল, এফসি আরএ বিল ইত্যাদি পাশ করিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। সিজেপির নেতৃত্বে ছাত্র যুবদের আন্দোলন সব মাটি করে দিল।
বিরোধিদের হল্লায় খুব কম সময় অধিবেশন চলল। যুবদের আচ্ছে দিন আসার স্বপ্ন দেখিয়ে চূড়ান্ত ব্যর্থ ২০৪৯ তো অনেক দূর ২০২৯ এর নির্বাচনে অশনি সংকেত দেখে নরেন্দ্র মোদি আপাতত শৌখিন বিদেশ ভ্রমণ স্থগিত রেখে বন্ধু মোহন ভাগবত কে নিয়ে যুবদের খুশি করার রিল, ভিডিও, বক্তব্যে ব্যস্ত রইলেন। কারণ বিজেপি জমানায় প্রবল ক্ষুব্ধ হতাশ এই যুবদের সংখ্যা ৯৪ কোটি (জনসংখ্যার ৬৫%)। আবার এদের মধ্যে ১৯৯৭ থেকে ২০১২ এর মধ্যে জন্মানো ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী জেন জি দের সংখ্যা ৩৮ কোটি (২৭%)। তারপরে আছেন জেন আলফা। অন্যদিকে বিজেপির পরিকল্পনার মূল কারিগর অমিত শাহ সংসদে এলেন শেষ দিনের শেষ বেলায় বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম, যা দিয়ে রবীন্দ্রনাথের জনগণ কে প্রতিস্থাপিত করা হচ্ছে (এতদিন দুটোই ছিল কোন সংঘাত ছিল না), সেটি গাইতে।
বহু অতিকথার পতন:
(১) ধারণা ছিল শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালে ছাত্র যুবরা ওলটপালট করে দিতে পারলেও ভারতের মত বিশাল, বিকেন্দ্রিত এবং গ্রামকেন্দ্রিক দেশে এটি সম্ভব নয়। এই ছাত্র যুব আন্দোলন সেই ধারণা পাল্টে দিল। প্রত্যন্ত গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবকরাও ক্ষমতার রোয়াবে থাকা বিজেপির বৃদ্ধ অর্ধশিক্ষিত নেতাদের তুলনায় সমাজ মাধ্যমে দড়। আর এই সমাজ মাধ্যমই আজ সংযোগের ভাষা।
(২) কেবল মাত্র রাজনৈতিক দলগুলির মাধ্যমে এবং নির্দিষ্ট নির্বাচন ইত্যাদির মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব। না। একটি ছোট প্রভাব বিস্তারকারী গোষ্ঠী (Pressure Group) সঠিক সময়ে সঠিক দাবি নিয়ে জোরালো আন্দোলন করলে তারাও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করতে পারে।
(৩) সরকার পরিবর্তন না হলে কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। সরকার ফেলে না দিয়েও সরকারকে চাপ দিয়ে পরিবর্তন সম্ভব।
(৪) ‘ কল্পিত ‘ সমাজ পরিবর্তন ছাড়া কোন পরিবর্তন সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, কেরল ও বিহারে দুর্বল হয়ে যাওয়া বাম এবং দণ্ডকারণ্য থেকে প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়া মাওবাদীদের এই তত্ত্বের বিপরীতে বাবাসাহেব আম্বেদকরের সামাজিক ন্যায় এবং মহাত্মার গান্ধীর শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র যুবরা পরিবর্তনের দিশা দেখিয়েছেন।
(৫) চিন, মার্কিন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ সর্বত্র পরাজিত নমোর কব্জা করা প্রচার মাধ্যমের মাধ্যমে মিথ্যা প্রচার করে করে অপরাজেয় ভাবমূর্তি তৈরির কল্পকাহিনি ভেঙে ফেলা। নমোর বিরোধিতা করলেই শেষ এই ভয়টাও কাটিয়ে তোলা।
(৬) গুজরাত দাঙ্গায় আদালত চিহ্নিত অপরাধী বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এজেন্সি দিয়ে ভয় দেখিয়ে এবং পুলিশ দিয়ে অত্যাচার করে বিরোধীদের দমন করার নীতিকে ‘ চাণক্য নীতি ‘ বলে বিজেপি – আর এস এসের প্রচারও মুখ থুবড়ে পড়ল।
(৭) বিজেপির দুর্জয় ঘাঁটি পাটনার বাঁকিপুরে ছাত্র যুব এবং তাঁদের অভিভাবক রা বিমুখ হলে (উচ্চবর্ণ অধ্যুষিত এই কেন্দ্রে মাত্র ৩৫% ভোটার ভোট দিয়েছিলেন) বিজেপিকেও হারানো সম্ভব।
কয়েকটি তুলনা ও প্রতি তুলনা: দিল্লির রাজপথ ১৯৯০ – ‘ ৯১ এর মণ্ডল – কমণ্ডল উত্তাল যুব আন্দোলন, ২০১১ তে আন্না হাজারের নেতৃত্বে জনপ্রিয় নাগরিক আন্দোলনের ঢেউ, ২০১২ তে নির্ভয়া ধর্ষণের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক প্রতিবাদ এবং ২০২০ – ‘২১ এ পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশের ধনী কৃষকদের (Farmers) দের শক্তিশালী আন্দোলন দেখেছে কিন্তু এই দিশারী ছাত্র – যুব আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা চলে ১৯৪২ এর অরুণা আসফ আলি, জয়প্রকাশ নারায়ণ, উষা মেহতাদের নেতৃত্বে আসমুদ্রহিমাচল ‘ ইংরেজ ভারত ছোড়ো ‘ আন্দোলন এবং ১৯৭৫ – ‘৭৭ এ সেই জয়প্রকাশ নারায়ণ এর নেতৃত্বেই ইন্দিরা স্বৈরতন্ত্র ও জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলন – দুই দিশারী এবং পরিবর্তনকারী আন্দোলনের সঙ্গে।
অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা দের নেতৃত্বে এই ছাত্র যুব দের আন্দোলন শুধু ৫৬” কে হেলিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা আদায় করেনি, অন্ধ আনুগত্য (Blind Loyalty), আধিপত্য (Hegemony), অন্ধতা (Dogma), প্রতীকী (Symbolic), প্রবল উৎকণ্ঠার (Dystopia) রাজনীতি ও তার আখ্যানগুলিকে পরিত্যাগ করেছে। ক্ষমতার বাইরে থেকেই জন্ম দিয়েছে নতুন ও আধুনিক রাজনৈতিক ভাষ্য ও বিতর্কের এবং জোরালো প্রতিস্পর্ধার।
থলপতি ও সিজেপি, নতুন রাজনৈতিক কৌশল: খ্রিস্টান পিতা ও হিন্দু মাতার সন্তান ধর্মনিরপেক্ষ তামিল সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক বিজয় যোশেফ থলপতির না ছিল কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ, না ছিল কোন সংগঠন। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ডিএমকে – এআইডিএমকে র পারিবারিক স্থিতাবস্থার রাজনীতি তে বীতশ্রদ্ধ মানুষ বিশেষত নতুন প্রজন্ম বেছে নেন বিজয় কে। এই তরুণদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের মাধ্যম ছিল সমাজ মাধ্যম বিশেষত ইনস্টাগ্রাম।
সেরকম সাবেকি রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত ও বিরোধীদের তছনছ করে দেওয়া বিজেপি নেতৃত্ব কে বিগত বিশ্বকাপ ফুটবলে যেমন তরুণ স্পেন জাতীয় দল তার তিকিতাকা নির্ভর হাই লাইন ডিফেন্স কৌশলে ফুটবলের মহারথী দলগুলিকে বধ করেছে সেরকমই সিজেপির তরুণ নেতৃত্ব দেশব্যাপী তরুণদের সঙ্গে সমাজ মাধ্যমের আধুনিক ভাষায় সংযোগ করে পরাস্ত করেছে।
নীল উত্থান: এই আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষ এবং ছাত্র যুব রা অংশ নিলেও এর মূল চালিকা শক্তি ছিল বাবাসাহেব আম্বেদকরের আদর্শপুষ্ট সামাজিক ন্যায়ের আদর্শ এবং দলিত সংগঠনগুলি। দীপকে ও রাবণ তো ছিলেনই, প্রথম দিন থেকে বাবাসাহেবের ছবি, বাণী এবং নীল পতাকা ও ‘ জয় ভীম ‘ ধ্বনি আন্দোলন স্থলকে মুখরিত রেখেছে। ঘন ঘন বাজানো হয়েছে হীরালাল কাম্বলে, বিপিন তাতাদ প্রমুখের জাতিভেদ বিরোধী আম্বেদকরপন্থী জনপ্রিয় সঙ্গীতগুলি। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণে দরিদ্র প্রান্তিক দলিত ছাত্র যুবরা যোগ দিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে বড় মাত্রায় যোগ দিয়েছেন মুসলমান, শিখ, গণতান্ত্রিক, সমাজবাদী, বাম, লিবারেল, তৃতীয় লিঙ্গের ছাত্র যুবরা। মুকেশ মোহন, দলিত ভয়েস, অনুরাগ মাইনাস ভার্মা, লক্ষ লাকি প্রমুখ প্রভাব বিস্তারকারীরা (Influencer) রা আন্দোলনের সঙ্গে সংপৃক্ত ছিলেন। আনন্দ তেলতুম্বলে র মত মার্ক্সীয় দলিত তাত্বিকরা সমর্থন করেছেন। বিজেপির ঘাঁটি উত্তর ও পশ্চিম ভারতে এর প্রভাব এবং দলিতদের ব্যাপক অংশগ্রহণও বিজেপি – আর এস এসের কপালে ভাঁজ ফেলার আরেকটি কারণ।
নরেন্দ্র মোদির লাল কেল্লার ভাষণ: ১৫ আগষ্ট ২০২৬ এ ৮০ তম স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লায় আমলা ও প্রযুক্তিবিদদের তৈরি করে দেওয়া ভাষণ দিতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদী টেলিপ্রমপটার গোলযোগে দুবার খেই হারিয়ে ফেলেন। কিভাবে হচ্ছে বা হবে কিংবা কবে কোথায় হচ্ছে কেউ জানেনা তবে তিনি উৎপাদন শক্তি, কৃষি, প্রযুক্তি, গতি শক্তি (উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা), আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব ও সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি (গ্রিন অ্যান্ড ব্লু ইকোনমি) এবং দেশের মেধা ও কৃষ্টি শক্তি (সফট পাওয়ার) – এই সপ্তধারার বিকাশের মাধ্যমে বিকশিত ভারতের ঘোষণা করেছেন। এছাড়াও তিনি জোর দিয়েছেন সম্পূর্ণ পণ্য তৈরি করা, নির্ভুল কাজ, সুন্দর প্যাকেজিং, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সঞ্জাত বিশাল বাজারকে ধরা, ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলির বিশ্ব ব্র্যান্ডিং, ডেটা সেন্টার, মেড ইন ইন্ডিয়া ৬ জি টেলি পরিষেবা, এক্সপ্রেসওয়ে সড়ক ও বন্দর কেন্দ্রিক উন্নয়ন, ড্রোন ও কাউন্টার ড্রোন, গ্রিন হাইড্রোজেন, পুনর্নবীকরণ শক্তি উৎপাদন ও সঞ্চয়। এছাড়াও তাঁর মুখ থেকে শোনা গেছে ডিজিটাল গণনা, কৃত্রিম মেধা, সেমি কন্ডাকটর প্রভৃতি শব্দ।
কিন্তু তাঁর বক্তব্যে ঘুরে ফিরে বারবার তিনি তরুণদের মন জয় করার চেষ্টা করেছেন। মাওবাদ দমন করার কৃতিত্ব দাবি করে ‘ দিমাগি নকশাল ‘ দের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ডাক দিয়েছেন।
অমাবস্যার অন্ধকার বনাম পূর্ণিমার জ্যোৎস্না: পরিবেশ, পরিস্থিতি, সময়, সমাজ, মানুষ, চিন্তা, কাজ সব সময় পরিবর্তনশীল। একটি সফল আন্দোলন শেষ কথা নয়। তাছাড়া আন্দোলনকারীদের জীবন জর্জরিত করে দেওয়ার নানারকম প্রক্রিয়া চলছে, চলবে। সেইসঙ্গে দেশজুড়ে বিজেপির শক্তিশালী আইটি সেলের অপপ্রচার।
এছাড়া বিজেপি – আরএসএস এক বিরাট রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক শক্তি। তাঁদের হাতে কেন্দ্র ও ২৪ টি রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত সরকার এবং সব কটি প্রতিষ্ঠান। নরেন্দ্র মোদী প্রমুখ অভিজ্ঞ পোড় খাওয়া সব নেতা এবং অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। আন্তর্জাতিক, দক্ষিণ এশিয়া এবং দেশের পরিস্থিতিও যথেষ্ট উদ্বায়ী (Volatile)।
এতদসত্ত্বেও সিজেপির নেতৃত্ব না থেমে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তাঁরা নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গ্রামীণ ভারতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পুনর্গঠনের জন্য জনগণ কে আহবান জানিয়েছেন। তাঁদের পথ ঘোষণা করেছেন বাবাসাহেবের সাম্য ও ন্যায়, গান্ধীজির শান্তিপূর্ণ গণ আন্দোলন এবং পণ্ডিত নেহরু র সার্বিক উন্নয়ন।
সুতরাং আমরা আশা করতে পারি যন্তর মন্তরের গণ অবস্থানের এক আন্দোলনকারীর কবিতায় লেখার – ” তুম রাত লিখো, হম চাঁদ লিখেঙ্গে। ” – লাইনটি বাস্তবে ফিরে আসতে পারে।
১৬.০৮.২০২৬









