সার্বজনীন অর্থে মানুষের জীবন কে নিয়ন্ত্রণ করে এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর যে মতবিরোধ তাকেই আমরা বিরুদ্ধতা বলি। প্রত্যেক আধুনিক সমাজে নাগরিকদের বিরুদ্ধতার অধিকার বাক স্বাধীনতার অধিকারের অংশ হওয়া উচিত। বিভিন্ন সমাজের ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে বিরুদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। সমাজ বা জাতির ক্রিয়াশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল নাগরিক এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ক । (রোমিলা থাপার, বিরুদ্ধতার স্বর)
গত ৬ মাস ধরে এক বিরুদ্ধতার স্রোত বাংলার রাজনীতি ও সমাজকে ক্রিয়াশীল করে তুলেছে। ২০২৪ এর আগস্টে আর জি কর হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকের নির্মম হত্যাকাণ্ড ও পাশবিক ধর্ষণের প্রতিক্রিয়ায় সূচনা হওয়া এই আন্দোলন প্রথম বৃহৎ গণ অভ্যুত্থান যা কোন ঘোষিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়াই দ্রোহের অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়। নিমেষে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে উঠে দাঁড়ায় শীত ঘুমে শুয়ে থাকা বাংলার মানুষ, ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে পালাবদলের স্বপ্নে সামিল হয়, গ্রাম শহর মাঠ পাথার বন্দরে ডাক ওঠে –‘জোট বাঁধো তৈরি হও’।
স্বাধীনতার পরের তিন দশকে পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিনি যুদ্ধনীতির প্রধান রূপকার রবার্ট ম্যাকনামারার কলকাতা আগমনকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঐতিহাসিক বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন- এই তিনটি আন্দোলনের পর ২০২৪-২৫ এর এই বৃহৎ গণ জাগরণ ক্ষমতার রাজনীতি আর শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখিয়েছে। তাই দলীয় রং না থাকলেও এই আন্দোলন অবশ্যই রাজনৈতিক।
প্রথম পর্যায়ে আন্দোলনের চালিকা শক্তি জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট। কর্মবিরতির পাশাপাশি অভয়া ক্লিনিক, লালবাজার অভিযান, স্বাস্থ্যভবনে টানা দশ দিনের অবস্থান, অবস্থান তুলে নেবার দিনেই দুর্গত এলাকায় বন্যাত্রাণ নিয়ে পৌঁছে যাওয়া, ধর্মতলায়, উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে ১৭ দিনের অনশন এবং সরকারের সঙ্গে শিরদাঁড়া সোজা রেখে দাবির লড়াইয়ে অগণিত মানুষের সম্মান ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন জুনিয়র ডাক্তাররা।
খুব দ্রুত একেবারে গোড়ার দিকের ঘটনাক্রম একবার দেখে নেয়া যাক।
১। ৯ অগাস্ট ভোরে চেস্ট ওয়ার্ডের সেমিনার রুম দ্বিতীয় বর্ষের মহিলা পি জি টির রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার
২। কর্তৃপক্ষের প্রথম প্রতিক্রিয়া এটা আত্মহত্যা।
৩। জয়েন্ট প্লাটফর্ম অফ ডক্টরস এবং কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য রা খবর পেয়ে ছুটে আসেন। আর জি করের ডাক্তারদের পক্ষ থেকে ম্যাজিস্ট্রেট ইনকোয়েষ্টের দাবি জানান হয়।
৪। তাড়াহুড়ো এবং গোপনীয়তার মধ্যে দেহের ময়না তদন্ত হয়, তাতে শারীরিক অত্যাচার ও ধর্ষণের চিহ্ন পাওয়া যায় । ডাক্তাররা সেই দেহ আটকে রাখার চেষ্টা করেন কিন্তু পুলিশ গা জোয়ারি করে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে যায়, এবং শ্মশানের ইলেক্ট্রিক চুল্লি অন্য সব শবদেহকে ডিঙিয়ে তড়িঘড়ি তা পুড়িয়েও ফেলে।
৫। ২৪ ঘণ্টা কেটে যায়। ১০ তারিখ সঞ্জয় নামক এক হোম গার্ডকে গ্রেফতার করা হয় খুন এবং ধর্ষণের জন্য, সি সি টি ভি ফুটেজে দেখা যায় দেখা যায় সঞ্জয় চারটে নাগাদ সেমিনার রুমে ঢোকে, সাড়ে চারটে নাগাদ বেরিয়ে যায়। যদিও চেস্ট বিভাগের রেসিডেণ্ট ডাক্তার রা তাকে কোন দিন দেখেন নি।
৬। মুখ্যমন্ত্রী মাওবাদী অভিযোগ না করে আন্দোলনকে সমর্থন করেন। দরকার হলে সি বি আই-কে ডাকবেন বলেন। অভিষেক ব্যানার্জি এনকাউনটারে মেরে ফেলার নিদান দেন।
৭। আর জি করের বেশির ভাগ ডাক্তাররাই সন্দীপ ঘোষের ভয়ে কাবু বা স্নেহধন্য
৮। সব কলেজ থেকে আসা ছাত্র ছাত্রীদের মিছিল পাশে থাকার বার্তা আর ন্যায়ের দাবি নিয়ে। এর সঙ্গে সিনিয়র চিকিৎসক ও কয়েকটি বাম ছাত্র যুব সংগঠন ও যোগ দেয়। সরকারি গুন্ডা বাহিনী ও পুলিশ ঢুকতে প্রবল বাধা দেয়। মাথায় আঘাত লাগে, কপাল থেকে রক্তক্ষরণ হয় ডঃ পবিত্র গোস্বামীর।
৯। জোর করেই মিছিল ভিতরে ঢোকে, শুরু হয় জি বি। অধ্যক্ষ সুপার এবং আধিকারিকদের ঘটনার দায় নিয়ে ইস্তফা দিতে হবে, সর্বসম্মতি ক্রমে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেই মাঠে নেমে পড়ে প্রিন্সিপালের চর, তৃণমূলী গুন্ডা এবং সরকারি পুলিশ বাহিনি। ২০০ র বেশি ছেলে মেয়েকে ভিতরে রেখে হলের ইলেক্ট্রিক লাইন অফ করে দেয়া হয়। ভেস্তে যায় জি বি।
১০। মেডিক্যাল কলেজে সমস্ত কলেজের প্রতিনিধিরা মিলিত হন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সবাই একমত হন।
১১। জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতি শুরু হয়। ১১ তারিখ জরুরি পরিষেবাকেও আনা হয় জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতির আওতায়।
সিনিয়র চিকিৎসকরা ঝাঁপিয়ে পড়ে হাসপাতালের পরিষেবাকে স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
১২। চিকিৎসক সংগঠনের প্রতিনিধিরা দেখা করেন অভয়ার মা বাবার সঙ্গে। তখন ই বেরোয় কন্যার মরদেহের সামনে পিতামাতাকে ডি সি নর্থের টাকা দেবার প্রস্তাব।
১৩। ১২ তারিখ। নির্যাতিতার বাড়িতে হাজির মুখ্যমন্ত্রী। ৭ দিনের মধ্যে কিনারা না হলে সি বি আই-এর হাতে কেস তুলে দেবার ঘোষণা।
১৪। সন্দীপ ঘোষের পদত্যাগ, পদত্যাগের ৫ ঘণ্টার মধ্যে ন্যাশনাল মেদিক্যালের অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ। আর জি করের নতুন অধ্যক্ষ সুহৃতা পাল, যার বিরুদ্ধে বিস্তর দুর্নীতির অভিযোগ, হেলথ ইউনিভারসিটির সময় থেকে।
১৫। কলেজ স্কয়ার থেকে আর জি করে মহামিছিল। মিছিলে মানুষের ঢল। পুলিশের ব্যারিকেড হার মানিয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষ এসে যোগ যোগ দিলেন। তৃণমূলী আতঙ্ককে হারিয়ে আর জি করের বুকে সম্ভব হল জি বি মিটিং।
১৬। বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু নিয়ে কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জনের সূচনা। এক ই সঙ্গে সঞ্জয়ের ক্রিমিনাল রেকর্ড নিয়ে নতুন নতুন তথ্য
১৭। ১৩ অগাস্ট হাইকোর্ট কর্তৃক সি বি আই তদন্তের নির্দেশ। ন্যাশনাল মেডিক্যালে বিক্ষোভের মুখে ফিরতে বাধ্য হন সন্দীপ ঘোষ। হাই কোর্ট থেকে ছুটিতে যাবার নির্দেশ।
১৮। “রাতের অন্ধকার কবে যেন ঘুচে গেছে, …আকাশে আলোর …তিলোত্তমা তোমার জন্য গণবিস্ফোরণ…পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায়… দুশ্চিন্তার রাত দখল করে নেয় ঘর সংসারের এলোপাথাড়ি মেয়েরা … we want justice- …ঘরে বাইরে কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায়, সম্পর্কে, ভাবনায় আর কতদিন চলবে এই অবিচারের স্রোত … ভেতরের গর্জন রাতের অন্ধকার কে ছিঁড়ে ফালা ফালা করে দিল। কোন মাইক লাগল না, কোন পার্টির ব্যানার লাগলনা, শুধু অজস্র নির্যাতিতার কণ্ঠস্বর সম্বল করে এগিয়ে চলল আলোকযাত্রা। শিলিগুড়ি থেকে শ্যামবাজার, হায়দ্রাবাদ থেকে পুনে, নিউ জার্সি থেকে কিংস্টন টাউনশিপ।“ সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী, নিৰ্বাচিত গল্পগুচ্ছ, দ্বিতীয় খন্ড (দ্রোহকাল পর্ব)
১৪ অগাস্ট ঐতিহাসিক রাতদখল। পথে নামে প্রায় গোটা দেশ। আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া বা ইংল্যান্ডের লিডসের আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় বাংলায় বহমান আন্দোলনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে ‘Reclaim the Night, Reclain the Right’। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মহানগরের গন্ডি ছাড়িয়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে, অন্যান্য রাজ্যে, এমন কি দেশের সীমানা ছড়িয়ে প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে। মহিলাদের সুরক্ষা দেবার নামে নাইট ডিউটি বন্ধ করার পরিকল্পনা আগুনে ঘি ঢালে।
১৯। এই রাতেই দর্শক পুলিশ-এর উপস্থিতিতে এমারজেন্সি, জেনারাল ওয়ার্ড এ সর্বত্র ভাংচুর করে দুষ্কৃতীরা। ভোরে পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল দায় চাপান প্রেসের উপর।
২০। তারপর অবশেষে তিনি পথে। বিচার আর ফাঁসির দাবিতে। স্বাস্থ্য-আইন-স্বরাষ্ট্র এই তিনটে মন্ত্রকই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। নিজেই বিচার চান নিজের বিরুদ্ধে!
২১। ১৭ অগাস্ট নিরাপত্তার অজুহাতে বাতিল ডার্বি ম্যাচ। আই এম এ র ডাকা ধর্মঘটে ব্যাপক সাড়া। দেশ জুড়ে পেন ডাউন চিকিৎসকদের, মুখ্য সচিব কর্তৃক রাতের সাথি প্রকল্পের সরকারি ঘোষণা। ৪২ জন চিকিৎসকের বদলি স্থগিত। নিরাপত্তার অজুহাতে বাতিল হল ডার্বি শতবার্ষিকী ম্যাচ। প্রতিবাদের শপথ নেয় মোহনবাগান, ইষ্ট বেঙ্গল, মহামেডান স্পোর্টিং এর সমর্থকরা।
২২। বাতিল হওয়া ডার্বি ম্যাচের দিন কলকাতায় তৈরি হল এক ঐতিহাসিক ছবি । বিচারের দাবিতে ১৮ অগাস্ট লাল হলুদ, সবুজ মেরুন, লাল কালো এক হয়ে প্রতিবাদে নামল রাস্তায়। পুলিশের ব্যাপক ধরপাকড়ের পরেও ফুটবলপ্রেমী জনতাকে পরাস্ত করা গেল না, স্লোগান উঠল ‘তিন প্রধানের এক ই স্বর / জাস্টিস ফর আর জি কর। এই দিনেই স্বতপ্রণোদিত হয়ে সুও মোটো কগনিজেন্স মাফিক আর জি কর শুনানির দায়িত্ব গ্রহণ করল সুপ্রিম কোর্ট। প্রতিবাদে মুখর বিনোদন ও ক্রীড়া জগতের অসংখ্য মুখ ।
২৪। সামনে এল ময়না তদন্ত রিপোর্ট। পুলিশের নোটিশ পেলেন ডঃ সুবর্ণ গোস্বামী, ডঃ কুণাল সরকার। সঙ্গে গেল বিরাট মিছিল চিকিৎসক ও অচিকিৎসকদের । নোটিশ ফেরাতে বাধ্য হল পুলিশ।
২৫। ৩০ অগাস্ট ক্রাইম সিনে মাফিয়া অভীক দে, ফিঙ্গার প্রিন্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে চালানোর চেষ্টা ধরা পড়ল ।
২৬। ৩১ অগাস্ট জুনিয়র ডাক্তার দের উদ্যোগে শুরু হল অভয়া ক্লিনিকের টেলিমেডিসিন পরিষেবা। প্রথম দিনেই চিকিৎসা পেলেন ৫০০ র বেশি মানুষ।
২৭। ১ সেপ্টেম্বর কলেজ স্ট্রিট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত বিরাট মিছিল। ভোর চারটে অবধি ধর্মতলায় শিল্পী দের অবস্থান। সারা রাজ্য জুড়ে অনুষ্ঠিত হল অসংখ্য প্রতিবাদী কর্মসূচি। জুনিয়র ডাক্তার দের ডাকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় শুরু হল ‘অভয়া ক্লিনিক’। সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন ডাক্তাররা।
২৮। ২ সেপ্টেম্বর পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের পদত্যাগের দাবি তে লাল বাজার অভিযান। শুভাংশু পাল ‘দ্রোহকালের দিনলিপি’ তে লিখেছেন
“ আমাদের মিছিল শুরুর আগেই ব্যারিকেড পড়ল বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটে । …. ব্যারিকেড ভাঙ্গলেই জল কামান, কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট, এসব তাদের জানা । কিন্তু কেউ ব্যারিকেড না ছুঁয়ে বসে থাকলে কী করা যায় সেটা অজানা। … আগের রাত টা ছিল ডাক্তারদের, পরদিন সকাল টা ছিল সবার। দেশের কোন প্রান্ত থেকে ঠিক কী কী এসেছে আন্দোলনকারীদের জন্যে তার হিসেব করতে বসলে দিস্তা খাতা ফুরিয়ে যাবে। … প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর হার মেনেছে ঔদ্ধত্য… ব্যারিকেড সরেছে, বাস্তিল দুর্গের পতনের মত উল্লসিত জনতা। … স্বাধীনতার পর সম্ভবত প্রথম বার কোন মিছিল ফিয়ার্স লেন পেরিয়ে লালবাজারের দিকে যাচ্ছে। …”
২৯। ৪ সেপ্টেম্বর আবার রাত দখলের আহবান।
৩০। ৭ সেপ্টেম্বর WBMC থেকে সাসপেন্ড করা হল সুশান্ত রায়, অভীক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাস, সৌরভ পাল, মস্তাফিজুর রহমান। একাধিক প্রভাবশালী যোগ আসতে থাকল।
৩১। ৯ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী নিদান দিলেন এবার উৎসবে ফিরুন !
৩২। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে স্বাস্থ্য ভবনে অবস্থান শুরু করলেন জুনিয়র ডাক্তার রা। ২০ সেপ্টেম্বর অবধি চলল অবস্থান।
৩৩। ২০ সেপ্টেম্বর- বিকেল থেকে সারা রাত ব্যাপী মশাল মিছিল হয় হাইল্যান্ড পার্ক থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত । ২১ সেপ্টেম্বর জরুরি পরিষেবায় ফিরলেন জুনিয়র ডাক্তার রা।
৩৪। ২২ সেপ্টেম্বর – বন্যা দুর্গত এলাকায় অভয়া ক্লিনিক ও ত্রাণ নিয়ে পৌঁছালেন জুনিয়র ডাক্তাররা।
৩৫। ২৭ সেপ্টেম্বর- SSKM হাসপাতালে এ গণ কনভেনশন অনুষ্ঠিত হল।
৩৬। ১ অক্টোবর মহালয়ায় ভোর দখলের আহবান।
৩৭। ৫ অক্টোবর- দাবি পূরণ না হওয়ায় ধর্মতলায় অনশনে বসেন জুনিয়র ডাক্তারেরা ।
১৫ অক্টোবর অনশনরত জুনিয়র ডাক্তার দের অবস্থান মঞ্চের নাকের ডগা দিয়ে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন কার্নিভালের ঘোষণা কে চ্যালেঞ্জ করে জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস আহবান করেন দ্রোহের কার্নিভাল। রাত দখলের অভূতপূর্ব জনজাগরণের পরবর্তী তিন মাসে কলকাতা ও জেলা গুলিতে বড় বড় মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে প্রতিবাদ কর্মসূচি চলতে থাকে যার চূড়ান্ত প্রকাশ হয় দ্রোহের কার্নিভালে। ফালাকাটা যাত্রাগাছি কুলতলি ফারাক্কা বর্ধমানের মিছিল এসে মেশে ধর্মতলায় দ্রোহের কার্নিভালে । ২১ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রীর সাথে নবান্নে বৈঠক । অভয়ার মা বাবার অনুরোধে অনশন প্রত্যাহার।
৩৮। ২৬ অক্টোবর আর জি কর হাসপাতালে গণ কনভেনশন ডাকে West Bengal Junior Doctors’ Front.
৩৯। ২৮ অক্টোবর – জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস এর উদ্যোগে এক ছাতার তলায় আশিটি (এখন শতাধিক) সংগঠন একত্রিত হয়ে গড়ে তোলে অভয়া মঞ্চ যার শিকড় একে একে শহর গ্রাম মফস্বলে ছড়াতে শুরু করেছে।
৪০। ৪ নভেম্বর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ‘জ্বালাও আলো দ্রোহের আলো’ কর্মসূচি ।
৪১। ৯ নভেম্বর জনতার চার্জশিট পেশ হয়। ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে মুসলিম মহিলা দের প্রতিবাদ সমাবেশ জনতার চার্জশিটের মঞ্চে এসে মিলিত হয় ।
৪২। ১৭ নভেম্বর বিচারহীন ১০০ দিনের কর্মসূচি – সোদপুর থেকে শ্যামবাজার আব্দি মিছিল।
৪৩। ৩ ডিসেম্বর অভীক দে এবং বিরূপাক্ষ বিশ্বাস কে স্বাস্থ্য দফতরে ফিরিয়ে আনার প্রতিবাদে West Bengal Medical Concil অভিযান এবং অবস্থান,
৪৪। ৪ ডিসেম্বর শিয়ালদহ কোর্টের সামনে জনসভা ।
৪৫। ৬ ডিসেম্বর West Bengal Medical Concil থেকে স্বাস্থ্যভবন পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিল।
৪৬। ১৪ ডিসেম্বর সন্দীপ ঘোষ ও অভিজিত মণ্ডল কে অভয়া হত্যা মামলায় সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট জমা দিতে সি বি আই এর ব্যর্থতা এবং আর্থিক দুর্নীতি মামলায় সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে চার্জশিটে রাজ্য সরকারের অনুমতি না দেবার প্রতিবাদে ধর্মতলা অভিযান ও কুশ পুত্তলিকা দাহ
৪৭। ধর্মতলা অবস্থান ২০-৩১ ডিসেম্বর দ্রোহের বর্ষ বরণ অনুষ্ঠান দিয়ে শেষ হয় অবস্থান।
৪৮। ১৮ জানুয়ারি শনিবার আর ২০ জানুয়ারি সোমবার শিয়ালদহ কোর্ট চত্বর এক উত্তাল সময়ের সাক্ষী হয়ে রইল। আর জি কর হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের মামলার রায়দান ছিল ১৮ জানুয়ারি। ঘটনার ১৬২ দিন এবং বিচার শুরুর ৬৮ দিন পর শিয়ালদহ অতিরিক্ত দায়রা বিচারকের আদালতে রায় ঘোষিত হয়- সঞ্জয় রাই ই একমাত্র দোষী। ২০ জানুয়ারি সাজা ঘোষণা করলেন বিচারক অনির্বাণ দাস – যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ৫০০০০ টাকার জরিমানা।
১৮ এবং ২০ দু দিন ই সব নিয়মের নিগড়কে অগ্রাহ্য করে দূর দূরান্তের বহু সাধারন মানুষ এসে যোগ দেন । প্রতিবাদী গান, কবিতা, স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে শিয়ালদহ এলাকা। ১৮ তারিখ রায় ঘোষণার দিন জুনিয়র চিকিৎসক আন্দোলনের নেতারা অভয়া মঞ্চের কর্মসূচিতে যোগ দেন। জুনিয়র চিকিৎসকরা WBJDF এর পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ লিফলেট বিতরণ করে যেখানে তদন্ত প্রক্রিয়ার ২০ টি গভীর অসঙ্গতি কে তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন বক্তব্যে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজে জাল স্যালাইনে প্রসুতি মৃত্যু আর দুর্নীতি ঢাকতে চিকিৎসকদের অন্যায় সাসপেনসন এবং আস্ফাকুল্লা নাইয়ার বাড়ি পুলিশি অভিযানের প্রসঙ্গ ও উঠে আসে।
এই দু দিনের শেষ কর্মসূচি ছিল শিয়ালদহ থেকে মৌলালি পর্যন্ত মিছিল এবং মানব বন্ধন। ২০ তারিখ মৌলালি তে কুশ পুত্তলিকা দাহ করা হয়।
৪৯। WBJDF এর আস্ফাকুল্লা নাইয়ার উপর পুলিশি জুলুমবাজির প্রতিবাদে ১৬ জানুয়ারি কলেজ স্কয়ার থেকে আর জি কর অবধি মিছিল, ১৭ জানুয়ারি বিধান নগর কমিশনারেট অভিযান ।
৫০। ২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদী চার চিকিৎসকদের আইনি চিঠির বিরুদ্ধে West Bengal Medical Concil অভিযান
দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে উপলবন্ধুর পথে লড়াইয়ের ভরবেগ এক ই থাকতে পারেনা, কিন্তু লড়াই টা জারি আছে আর এই অবিচ্ছিন্ন লড়াইয়ের একটা বিশেষ দিন ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি। আন্দোলনে ভাঁটার টান নিয়ে চর্চা চলছিল আন্দোলনের শত্রু মিত্র দুই শিবিরেই। আবার কলকাতায় হাজার হাজার মানুষের মিছিল দেখিয়ে দিল বারুদ যে কোন মুহূর্তে জ্বলে উঠতে পারে।
বত্রিশতম জন্মদিন আর মৃত্যুর বিচারহীন ৬ মাসের সমাপতন উপলক্ষে অভয়া মঞ্চ মহামিছিলের ডাক দিয়েছিল কলেজ স্কোয়ার থেকে আর জি কর হাসপাতাল পর্যন্ত । অভয়া মঞ্চের দাবি সনদের সঙ্গে সহমত সমস্ত প্রতিবাদী সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ কে দলমত নির্বিশেষে মিছিলে যোগ দিতে আহবান জানানো হয়েছিল । বিকেল সাড়ে তিনটের সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে এই ঐতিহাসিক মিছিলের আনুষ্ঠানিক সুচনা হয় মানবজমিন সংগঠনের মিউজিক্যাল টিম ‘গানপন্থী’র গান দিয়ে – ‘ যদি চাও বন্ধু একা নও বন্ধু/ আছে এক লড়াইয়ের মঞ্চ/ এক সাথে লড়বার দুর্নীতি দুর্বার প্রতিরোধের গণমঞ্চ/ অভয়া মঞ্চ অভয়ার মঞ্চ/ লড়ছে লড়বে অভয়া মঞ্চ …’।
প্রতিবাদের আশ্চর্য সমাপতন ঘটেছে এই আন্দোলনে। সরকারি মদতপুষ্ট এই প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা নারী এবং প্রান্তিক যৌনতার মানুষ দের স্বাধিকার ও নিরাপত্তা কে প্রবল ভাবে আঘাত করে। নারী এবং ট্রান্সক্যুইয়ার গোষ্ঠীর মানুষেরা বিচারের দাবিতে দলে দলে পথে নামেন । কলকাতার রাজপথে বা আন্দোলনের পরিসরে এই বিপুল সংখ্যায় প্রান্তিক যৌনতার মানুষ এর আগে কখনো দেখা যায়নি । যৌন কর্মী রা প্রতিবাদে মুখর হন। আদিবাসী তরুণীর ধর্ষণ ও মৃত্যুর বিচারের দাবি ওঠে রাজপথের মিছিলে। দ্রোহের কার্নিভালে যোগ দেন দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বর্ধমান বীরভূম থেকে আদিবাসী জনজাতির মানুষ। রাতদখল, মানব বন্ধনের সঙ্গে এক হয়ে যায় ডেলিভারি শ্রমিক, মৃৎশিল্পী, রিকশা চালকদের মিছিল।
রাজনৈতিক পরিসরের বিস্তৃতির সঙ্গে সাংস্কৃতিক নতুন রূপরেখা নির্মাণের কাজ শুরু হয় ।
২ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার রবিবাসরীয়তে ‘কলকাতার আকাশে এক আগুনপাখি’ নিবন্ধে অধ্যাপক অশোককুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন-
“ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরাশি বছর পরে। সেই অগাস্ট বিপ্লবের প্রতিবিম্ব ধরা পড়ল অভয়া তিলোত্তমার বিচার চাওয়া ডাক্তারদের আন্দোলনের আয়নায়, এই ২০২৪ এর অগাস্ট এ। এ আন্দোলনের স্বকীয়তা তার নতুন রকমের ভাবনায়। প্রতিবাদের এত বৈচিত্র, এত বিভিন্ন প্রকরণ গত পঞ্চাশ বছরে চোখে পড়েনি “।
নতুন গান, নতুন শ্লোগান জন্ম নিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। হোক কলরব আন্দোলনের শ্লোগান ও নতুন চেহারায় ফিরে এসেছে। রাস্তা জুড়ে গ্রাফিতি, প্রতিদিনের মিছিল, পথসভায় হারিয়ে যাওয়া গণসংগীতের সঙ্গে নতুন গান উঠে এসেছে। প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে দ্রোহসাহিত্যের তালিকা। এক দ্রোহের অভিঘাতে জেগে উঠছে বিগত দ্রোহের চর্চা ।
জোয়ার ভাঁটার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে এই আন্দোলন । আন্দোলনের পথ নিয়ে কিছু নির্দিষ্ট ভাবনার প্রয়োজন।
মেক্সিকোর কবি Homero Aridjis বলেছেন “There are centuries in which nothing happens and years in which centuries pass”.
বিগত সাত মাস ধরে চলমান এই আন্দোলন সমাজ ও রাজনীতির অনেক শিকড় কে নাড়িয়ে দিয়েছে । সমাজের অনেক রুদ্ধদ্বারের মুখ খুলে গেছে। এই অভূতপূর্ব জন জাগরণ বলে দিচ্ছে যে বিপুল জনসাধারণের বিশ্বাস নেই যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুলিশ, প্রশাসন , আদালত তাদের ন্যায় বিচার দিতে সক্ষম- এই বিশ্বাস বিপুল সংখ্যক মানুষের টলে গেছে । আধিপত্যের বিরুদ্ধে জমতে থাকা ক্ষোভ স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় ছিল। রাত দখলের আহ্বান ছিল সেই স্ফুলিংগ। তিলোত্তমার নারকীয় নির্যাতন ও হত্যার প্রেক্ষিতে দুর্নীতি গ্রস্ত এবং বিকৃতমনস্ক অধ্যক্ষ র ‘অত রাতে কী করছিল ?’ মন্তব্য তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এই মন্তব্য কে চ্যালেঞ্জ করেন শিক্ষিকা ও সমাজ কর্মী শতাব্দী দাস ‘আসুন রাতের দখল নিই’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন একটি ডিজিটাল সংবাদপত্রে । নিরাপত্তার কারণে যে রাত কে নারীর নাগালের বাইরে রাখা হয়, সেই রাত কে ভয় না পেয়ে তাকে দখল করার আহবান জানান হয়। এই প্রবন্ধের নিচে মন্তব্যেই প্রাথমিক উদ্যোক্তা রা প্রথম আলোচনা করেন এই রকম একটি অনুষ্ঠানের। রিমঝিম সিংহ, শতাব্দী দাস, মহাশ্বেতা সমাজদার এবং অন্যান্য দের ‘reclaim the night, reclaim the right’ এর উদাত্ত আহবানে কলকাতা সহ পশ্চিম বাংলায় গত ১৪ অগাস্ট এর রাত ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ২০০৭ এ রিজওয়ানুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, ২০১২ তে দিল্লিতে নির্ভয়া কাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলন কে ছাপিয়ে গেছে মেয়েদের রাত দখলের কর্মসূচি এবং পরবর্তী নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, যেখানে ধর্ষিতা ও নিহত চিকিৎসকের প্রতি সহমর্মিতার পাশাপাশি উঠেছে ন্যায়বিচারের দাবি । বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী অধ্যাপক সুজাত ভদ্র এই প্রতিবাদ কে ২০০৬-৭ সালে আমেরিকার কালো নারীর অধিকারের সংগঠক Tarana Burke এর ভাষায় ‘empowerment by empathy’ বলে উল্লেখ করেছেন।
নারী আন্দোলন এবং প্রান্তিক লিঙ্গযৌনতার মানুষ দের আন্দোলন এক বিশেষ মাত্রা লাভ করেছে। প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষের যোগদান এই আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ । বাংলা তথা পৃথিবীর ইতিহাসে ধর্ষণের প্রতিবাদে এত দিন ধরে বার বার এত মানুষের পথে নামার নিদর্শন বিরল। ২০২৪ এর আগে ২০০৪ এ মনিপুর এবং ২০১২ র দিল্লি তে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন বৃহৎ গণ জাগরণের চেহারা নিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ এর আন্দোলন পূর্ববর্তী গণজাগরণের তুলনায় ব্যাপকতর এবং অনেক বেশি শক্তিশালী।
এই অভূতপূর্ব আলোড়নে চিকিৎসক তথা নাগরিক সমাজের আন্দোলনের পাশাপাশি বয়ে চলেছে নারী আন্দোলনের ধারা। অগাস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এই তিন মাসে এমন বহু মহিলা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন যারা আগে কখনো রাস্তায় নামেন নি,কোনদিন কোন মিছিলে যোগ দেন নি ।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণ কোন যৌন লালসার প্রকাশ নয়। ক্ষমতাতন্ত্রের আধিপত্য ও আস্ফালন এবং এক ই সঙ্গে সচেতন যৌন হিংসার প্রকাশ। ধর্ষণ একটি সচেতন হুমকি দেখানোর প্রক্রিয়া যার দ্বারা পুরুষ নারীর জন্য আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে। কোন সন্দেহ নেই অভয়া হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রীয় মদতে ঘটা একটি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা কাণ্ড, যার মূলে আছে দীর্ঘ দিনের দুর্নীতি চক্র । পুরুষ চিকিৎসক হলেও তাকে খুন হতেই হত। যৌন লালসা চরিতার্থ করা এখানে মূল উদ্দেশ্য ছিলনা। কিন্তু তাও ধর্ষণ হয়েছে। এই ভাবেই অভয়া কাণ্ড মিশে যায় জয়নগর যাত্রাগাছি জয়গাঁও উন্নাও হাথরস এবং আরো অজস্র ধর্ষণ এবং হত্যার সঙ্গে । লিঙ্গ রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ষণ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির দীর্ঘমেয়াদি ফসল, যে সংস্কৃতি সব ক্ষেত্রে বিভাজনের মধ্যে দিয়ে পুরুষ এবং নারীর নির্মাণ করে- একদিকে দুর্বল অসহায় আজ্ঞাবাহী নারী যাকে শোষণ এবং ভোগ করা যায়, অন্য দিকে প্রভুত্ববাদী প্রবল পরাক্রান্ত পুরুষ যে ক্ষমতার ধ্বজা প্রতিষ্ঠা করে নারীর শরীর , মন ও শ্রমে। এই সাংস্কৃতিক নির্মাণে তাই গণ্ডী ভেঙ্গে বেরনো মেয়েরা শাসিত হয়, সে শাসন কখনো শোষণ, কখনো দমন, কখনো ধর্ষণ। অন্তর্মুখী সংবেদনশীল কোমল স্বভাবের পুরুষ ‘মেয়েলি’ বলে উপহাসের পাত্র হয়। তাই মেয়েদের শ্রমের অমর্যাদা আর যৌন হেনস্থা এক ই মুদ্রার দুইটি পিঠ- লিঙ্গ অসাম্যই এর উৎস । এই কারণেই অভয়ার জন্য লড়াইয়ে নাগরিক আন্দোলনের পাশাপাশি লিঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া জরুরি, আমরা শুধু একজন অভয়ার জন্য লড়ছি না, ভবিষ্যতে অভয়া হবার সম্ভাবনা কে ধ্বংস করা এই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য। লিঙ্গ রাজনৈতিক সচেতনতার প্রসার ছাড়া শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলে লাভ নেই। আবার এক ই সঙ্গে শুধু লিঙ্গ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে ধর্ষণ কেই একমাত্র আক্রমণের লক্ষ্য এবং আলোচ্য করে ফেলার মধ্যেও একটা রাজনীতি আছে, যে রাজনীতি এক বায়বীয় লক্ষ্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানায় এবং চরম দুর্নীতির উপর গড়ে ওঠা ক্ষমতাসীন শাসক দলের থ্রেট কালচার কে পল্লবিত হবার সুযোগ দেয়। লিঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন আর নাগরিক আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্য হওয়া উচিত দুর্নীতি-সন্ত্রাসতন্ত্র এবং লিঙ্গ-অসাম্য।
অভয়া আন্দোলনে শুরু থেকেই ধর্ষক- শাসকের সমীকরণ কে চিহ্নিত করে ক্ষমতাতন্ত্র কে করা হয়েছে। ‘শাসক তোমার কিসের ভয়, ধর্ষক তোমার কে হয়’, ‘ধর্ষক কে লুকায় কে, প্রশাসন/ চোদ্দ তলা আবার কে’, ‘রাষ্ট্রই ধর্ষক’- এই সব স্লোগান পোস্টার গ্রাফিতি প্রাথমিক রূপরেখা নির্মাণ করেছে এই আন্দোলনের ।
আর জি কর ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যসরকার তড়িঘড়ি ‘অপরাজিতা মহিলা ও শিশু বিল’ পেশ করেছে। এই বিল যৌন হিংসা প্রতিরোধ করতে চেয়েছে শাস্তির কঠোরতা বাড়িয়ে। ধর্ষণ ও হত্যার ন্যূনতম শাস্তি করা হল ফাঁসি। শাস্তি কঠোর হলেই অপরাধের হার কমেনা। আসল প্রয়োজন ছিল অপরাধের প্রতিরোধ আর সহজে অভিযোগ করার ব্যবস্থা। যৌন হিংসা প্রতিরোধ এবং কর্মক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি র সম্পর্কে এই বিল কোন মন্তব্য করেনি।
অভয়া আন্দোলন প্রথম থেকেই শুধু ধর্ষকের শাস্তির দাবি তে থেমে থাকেনি। উঠে এসেছে লিঙ্গসংবেদী বেশ কিছু দাবি- সব কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় ICC (Internal Complaint Cell), সংগঠিত ও অসংগঠিত কর্মক্ষেত্রে এবং রাস্তা ঘাটে নারী সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা, victim blaming কে আইনের আওতায় আনা, সমস্ত কর্মক্ষেত্রে এবং রাস্তা ঘাটে নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষ দের জন্য রাত দিন ব্যবহারের শৌচালয়, কর্মরতা নারী দের জন্য কর্মস্থলের পাশে সরকারি ক্রেশ চালু করা ইত্যাদি। এর সঙ্গে রাত দখল ও পরবর্তী কর্মসূচির মাধ্যমে ছিল রাতের সাথি প্রকল্প বিরোধী ঘোষণা – ‘সব পরিসর কে মেয়েদের পরিসর, সব সময়কে মেয়েদের সময়, সব পথ কে মেয়েদের হাঁটার মত পথ’ করে তোলার দাবি।
এই আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক মেয়েদের অংশগ্রহণ নারী পুরুষের বিভাজন রেখা গুলি কেই চ্যালেঞ্জ করেছে। তাই রাতের সাথি প্রকল্প ঘোষণা করে মেয়েদের রাতে ঘরের বাইরে কাজের অধিকার কে যখন সরকার কেড়ে নিতে চায় নিরাপত্তার অজুহাতে তখন মেয়েরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে । রাতদখলকারী মেয়েদের এই দুর্জয় সাহস কে বুঝতে গেলে মেয়েদের অন্য লড়াই গুলোর দিকে একটু নজর দেয়া দরকার। সরকার এবং মালিক পক্ষের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে আশা কর্মী, মিড ডে মিল কর্মী, চা বাগানের মহিলা কর্মী এবং বিভিন্ন ছোট বড় ট্রেড ইউনিয়নে মেয়েদের বিরামহীন সংগঠিত আন্দোলন ছাড়াও বিভিন্ন গ্রাম শহরতলি তে চোলাই মদের ঠেক ভেঙ্গে দেওয়া অসংগঠিত মেয়েদের লড়াই রাত দখল আন্দোলনের রাস্তা প্রস্তুত করেছে।
লিঙ্গ সাম্যের রাজনীতি যেহেতু অভয়া আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে, তাই স্লোগান, পোস্টার বা গ্রাফিতির বিষয় এবং ভাষা নিয়ে সর্বদা সচেতন থাকা প্রয়োজন। অনশন অবস্থান, বিশেষত দ্রোহের কার্নিভালে জনপ্রিয় হয়েছে কয়েক টি স্লোগান – কালিঘাটের ময়না, বিচার পেতে দেয় না’। কালিঘাটের ডাইনি, বিচার পেতে দেয়নি’। কালিঘাটের ডাইনির ছবি সম্বলিত পোস্টার টিও বহুল প্রচারিত। কালিঘাটের ময়না র উৎস সন্ধানে পিছিয়ে যেতে হবে আরও দশ বছর। এই স্লোগান তৈরি হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হোক কলরব আন্দোলনের সময়। প্রাক্তন নকশাল অধুনা তৃনমূল দলের তাত্ত্বিক প্রখ্যাত সমাজবিদ রণবীর সমাদ্দার এই স্লোগান কে তথাকথিত নিচের তলা থেকে উঠে আসা মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি যাদবপুরের এলিট ছাত্রছাত্রী দের বিদ্রূপ বলে চিহ্নিত করেন। ময়না নামের সঙ্গে কালিঘাটের মন্দির সংলগ্ন এলাকায় দেহোপজীবিনী পল্লীর সংযোগ ইঙ্গিত করা বলে তিনি মনে করেন । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন ছাত্র ছাত্রী অধ্যাপক সমাদ্দারের নানা সমালোচনার শাণিত জবাব দেয়। সেই জবাবে জানা যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অভিজিৎ চক্রবর্তীকে কালীঘাটের ময়না হিসাবে চিহ্নিত করা হয় মুখ্যমন্ত্রীর শেখান বুলি আওড়ানোর জন্য। মুখ্যমন্ত্রী কে আদৌ ময়না বলা হয়নি।
ডাইনি অপবাদের সঙ্গে লিঙ্গ অসাম্য ও আধিপত্যবাদের গভীর যোগ আছে। বিভিন্ন সামাজিক কাঠামোয় প্রান্তিক মহিলা দের ডাইনি অপবাদ দিয়ে নির্যাতন চলে আসছে বহু যুগ ধরে। ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ড থেকে শুরু করে একবিংশ শতকে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত হয় মহিলারা, সমাজের নানা বিপর্যয়ের দায় চাপিয়ে দেয়া হয় তাদের উপর। সঙ্কটগ্রস্ত সমাজ সঙ্কট নিরসনের উপায় খোঁজে নারীর ‘অশুভ শক্তি’র বিনাশে। ডাইনির ধারণা লিঙ্গসাম্যের প্রবল বিরোধী।
অভয়া আন্দোলনের গতি বিশ্লেষণে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এই আন্দোলনে ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যবহার। এই আন্দোলন নিয়ে আলোচনার আগে আবার একবার ফিরে যাই ইতিহাসে- একশ কুড়ি বছর আগে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। শুরুর দিকে ঔপনিবেশিক শাসকের হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন – রাখি বন্ধন, ২৩ শে সেপ্টেম্বর ১৯০৫ এ কলকাতায় ১০০০০ হিন্দু মুসলমান ছাত্রের মিলিত শোভাযাত্রা, দীন মোহাম্মদ, দেদার বকশ, আবুল হুসেন, গজনবী, রসুল, মনিরুজ্জামান, লিয়াকত হুসেন, হুসেন সিরাজি, আব্দুল গফুর, আবুল হুসেন প্রমুখ সক্রিয় স্বদেশি মুসলমান প্রচারক গোষ্ঠীর উপস্থিতি। এ সব সত্ত্বেও কিন্তু খুব অল্প দিনের মধ্যেই এই ঐক্য তাসের দেশের মত ভেঙ্গে পড়ে। নতুন প্রদেশ মানে আরও চাকরি আরও ব্যবসার সুযোগ – এই ব্রিটিশ প্রচার উচ্চ ও মধ্য শ্রেণির মুসলমান দের স্বদেশী আন্দোলন থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে সফল হয়েছিল। কিন্তু শুধু ব্রিটিশ প্রচার দিয়েই এই বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়নি। আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন বলেই ব্রিটিশ প্রচার মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে নিরাপত্তার আশ্বাস হয়ে ওঠে। Barbara Southhard দেখিয়েছেন কী ভাবে ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদ চরমপন্থী রাজনীতিকে ক্রমশ গ্রাস করে ফেলে। ভাগবদ গীতা, হিন্দু দেব দেবীর মূর্তির ব্যবহার, বন্দেমাতরম, সন্ধ্যা, যুগান্তর পত্রিকার চরমপন্থী রাজনীতির সঙ্গে আক্রমনমুখী হিন্দুত্ব ও ‘শক্তি’ র উপাসনা মুসলমানদের দূরে সরিয়ে দেয়। সেই সময়েও দূরদর্শী প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন।সঞ্জীবনী পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্রর সার্কুলারবিরোধী সমিতি অগণিত মুসলমান কর্মী ও সমর্থক দের কথা বিবেচনা করে শিবাজী উৎসব বয়কট করে। প্রবাসী পত্রিকায় শিবনাথ শাস্ত্রী লেখেন – “ যে জাতি নিজ পূর্ব গৌরবের অভিমানে স্ফীত হইয়া বর্তমানের উন্নতি সাধনে বিমুখ তাহারাও অশ্রদ্ধেয় এবং তাহাদের অতীতানুরাগ ব্যাধিবিশেষ “। কিন্তু এই ব্যতিক্রমী স্বর গুলি চাপা দিয়ে পুনরুত্থানবাদী হিন্দুত্বের প্রবল বন্যায় ভেসে যায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন । ইতিহাসের এই বিশেষ অধ্যায়ের শিক্ষা কে মাথায় রেখে রাজনীতির স্বার্থে জনপ্রিয় ধর্মীয় রূপক ব্যাবহার কী ভাবে করা যায় এটা নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন আছে। দুর্গা, কালীর ছবি, শঙ্খ এবং উলুধ্বনি- এই হিন্দু প্রতীকগুলির ব্যবহার সংখ্যালঘু মানুষ কে প্রতিবাদ মঞ্চে শুধু ব্রাত্য করছে তা নয়, হিন্দু আধিপত্যের সাক্ষ্য বহন করছে। হিন্দু উচ্চ বর্ণের দেব দেবীর উপাসনা শুধু মুসলিম নয়, আদিবাসী দলিত সম্প্রদায় কেও বিচ্ছিন্ন করে দেবে প্রতিবাদের পরিসর থেকে। শহুরে ভদ্র সমাজের সঙ্গে গ্রাম বাংলার দলিত আদিবাসী মুসলিম সমাজের ব্যবধান বহু গুণে বাড়িয়ে দেবে এই ধর্মীয় রূপকের ব্যবহার। বর্ধমানের ধর্ষিতা প্রিয়াঙ্কা হাঁসদা, মালদহের ধর্ষিতা আদিবাসী নাবালিকা বা উত্তরাখণ্ডের ধর্ষিতা মুসলিম নার্স – এদের কারোর কাছেই মহিষমর্দিনীর উপাসনা বা দীপাবলি কোন সদর্থক বার্তা দেয় না। বহ্নিহোত্রী হাজরা লিখছেন- “ ১৪ তারিখে যাদবপুরে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা যখন শঙ্খ বাজানো কে রুখে দিতে পেরেছিলাম- হাথরস, উন্নাও, অনিতা দেওয়ান থেকে তাপসী মালিকের নাম উচ্চারণ করেছিলাম জোর গলায় আর জি করের পাশাপাশি তখন একটু হলেও গর্ব বোধ হয়েছিল এটা ভেবে যে লড়াই টা কেবল ঐ বিলকিস বানোর রক্তে রাঙ্গা ধর্ষক দল গ্রাস করতে পারেনি- আমরাও লড়াইয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থাকছি আমাদের ভাষ্য নিয়েই। কিন্তু আজ চারিদিকে এই পিতৃ পক্ষের অবসান, প্রদীপ, তর্পণ এর অনুষঙ্গে যেন আমরা কোনও অতল অন্ধকার গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছি, মনে হচ্ছে- যে খেলার রিং মাস্টার সেই ৩০০০ বছর ধরেই ছড়ি ঘুরিয়ে আসা ঐ চাণক্য রা – তারাই ঠিক করে দেবে কী ভাষায় আমরা প্রতিবাদ করব।“
আবার এর পাশাপাশি অন্য একটা দিক নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে। ধর্মীয় আচার, অনুষঙ্গ গোষ্ঠী বা জাতির সামাজিক অভ্যাস, জীবনচর্চার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কোন কোন ধর্মীয় আখ্যান, mythology অনেক সময় বিরুদ্ধতার স্বর কে সংহত করতে সাহায্য করে। তাই বিভিন্ন সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠী বা আদিবাসী দলিত বা অন্যান্য প্রান্তিক জাতি গোষ্ঠীর ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুসন্ধান প্রতিবাদী রূপকের সংগ্রহ কে সমৃদ্ধ করবে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর ধর্মীয় তথা সামাজিক উৎসব গুলির সঙ্গে প্রতিরোধের স্বর কে মিলিয়ে দিতে পারলে প্রতিবাদের পরিসরের অভূতপূর্ব বিস্তার হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই । পারস্পরিক পরিচিতির গভীরতা সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি বৃদ্ধি করতেও সাহায্য করবে। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত গবেষণা এবং দৃষ্টির প্রসারতা।
সব শেষে এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন। যারা সাম্যের অধিকারে বিশ্বাস করেন, শোষণ মুক্ত সমাজ চান, যেখানে স্বাস্থ্য শিক্ষায় সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বামপন্থী এবং গণতান্ত্রিক শক্তি গুলিকে এক সঙ্গে লড়াই এর ময়দানে থাকতে হবে। বাম শিবির গুলির পারস্পরিক বোঝাপড়া টা উন্নত করার প্রয়োজন। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে সংসদীয় এবং অসংসদীয় বামদের। তত্ত্বের আলাপ আলোচনা বিতর্ক যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি অবিরাম তাত্ত্বিক সংগ্রাম আর গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ন্ত্রণ করে মতের ভিন্নতা কে সম্মান করা, সহিষ্ণুতা প্রদর্শন এবং সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ের পথ খুঁজে নেওয়া। অভয়ার ন্যায়বিচার, ভয়ের রাজনীতির অবসান, স্বাস্থ্যের অধিকার এবং লিঙ্গ সাম্যের দাবি – অভয়া আন্দোলনের এই মূল দাবি গুলি কে নাগরিক পরিসরে প্রসারিত ও শক্তিশালী করতে গেলে ইতিহাসের শিক্ষা কে অস্বীকার করলে চলবে না। আশির দশকের স্বাস্থ্য আন্দোলনকে ভুললে চলবে না কোন ভাবেই। স্বাস্থ্য ভিক্ষা নয় অধিকার – আশির দশকের আন্দোলনেই প্রথম ঘোষিত হয় এই দাবি। সার্বজনীন স্বাস্থ্যের দাবি এবং সংঘর্ষের পাশাপাশি নতুন চিন্তা ও পরিকাঠামোর নির্মাণ – অভয়া আন্দোলনের অগ্রগতির সঙ্গে গভীর ভাবে সম্পর্কযুক্ত। শহীদ হাসপাতাল ও শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নির্মাণ এবং পরিচালন পদ্ধতি সম্পর্কে আলাপ আলোচনা মত বিনিময় সার্বজনীন স্বাস্থ্যের আন্দোলন কে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
অভয়া মঞ্চ গড়ে উঠেছে নাগরিক সংগঠন গুলির মত বিনিময়ের মাধ্যমে। গঠন মূলক মত বিনিময়ই অভয়া আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা ভেঙ্গে ফেলে নতুন নির্মাণের জন্য শিক্ষা শিবির অত্যন্ত জরুরি। ইতিমধ্যে দুইটি শিক্ষা শিবির আয়োজন করেছে অভয়া মঞ্চ। ১ ডিসেম্বর ২০২৪ ভারতসভা হলে লিঙ্গসাম্য রাজনীতি এবং ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ত্রিপুরা হিতসাধিনী হলে সার্বজনীন স্বাস্থ্যের অধিকার নিয়ে শিক্ষা শিবির অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুই টি শিক্ষা শিবিরেই শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি এবং অংশ গ্রহণ চোখে পড়ার মত। স্বাতী ভট্টাচার্য লিখছেন – “বহু বহু দিন পরে ফের শ্রমজীবী মানুষের অপরিমিত, নিহিত শক্তি কে জাগরিত করে তা থেকে নিজের গতিশক্তি আহরণ করতে চাইছে নাগরিক আন্দোলন … শহরের সংগঠকদের ডাকে যখন এক অঘ্রাণের বিকেলে গ্রামের মেয়েরা ভারত সভায় বলেন ‘ আমরা বাড়তি পাঁচশো টাকা সরকারের কাছ থেকে ভিক্ষা চাই না, আমাদের পরিশ্রমের সম্মান চাই ‘, যখন দাবি করেন ‘আমরা যেন যখন ইচ্ছা বাড়ি ঢুকতে পারি, কেউ যেন আমাদের নামে কিছু বলতে না পারে’, তখন পথের একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সংহতির মাধ্যমে সাম্য- এই পথ নতুন নয়, তবু প্রতি প্রজন্মকে নতুন করে সে পথ তৈরি করতে হয়। “
শহরের বড় মেডিক্যাল কলেজে নিরাপত্তার অভাব কে সর্বত্র মেয়েদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে যুক্ত করে থ্রেট আর রেপ কালচারের অবসানের দাবি তে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে রাজপথ থেকে আলপথে । শহুরে এলিট আন্দোলনের গণ্ডী ছাড়িয়ে দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন একান্ত ভাবে প্রয়োজনীয় ।
এই প্রজন্ম বড় হয়েছে গত কয়েক দশকের রাজনীতিতে শুধু নেতাদের কেনা বেচা দেখে। এই প্রজন্ম বড় হয়েছে নম্বরের দৌড়ে সবাই কে পিছনে ফেলে প্রথম হবার সামাজিক আবহে । দলীয় রাজনীতির কর্দমাক্ত স্রোত আর আখের গোছানোর লক্ষ্যে ঘন ঘন ভোলবদল দেখে বড় হয়ে ওঠা দুই প্রজন্ম গত কয়েক দশক ধরে ক্রমেই আন্দোলন নামক রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেকে দূরে সরে গিয়ে নিরাপত্তা খোঁজার চেষ্টা করেছে, এর পাশাপাশি বেড়েছে সামাজিক অসংবেদনশীলতা। গ্রাম শহরের সেতু বন্ধন করে অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ আন্দোলন রূপকথার গল্পে পরিণত হয়েছিল। এই অন্তঃসারশূন্য সময়ে যারা স্বপ্ন দেখতে পারছে, স্বপ্ন সঞ্চারিত করতে পারছে, তারা পথ চলতে চলতে ভুল করবে, চলার পথেই ভুল ঠিক করে নেবে। আন্দোলন কখনো স্তিমিত হবে, সেই সুযোগে সেটিং হবে, সন্দীপ ঘোষ রা জামিনে ছাড়া পাবে, আবার গর্জে উঠবে প্রতিবাদ।
শহীদ তিলোত্তমা মৃত্যুর তপস্যা করেছে সুস্থ জীবনের জন্য। ভোরের অভিযানে আমাদের সবাই কে শামিল হতে হবে । এ লড়াই সহজে শেষ হবার নয়। ছিন্ন পালে জয় পতাকা তুলে সূর্যতোরণ হানা দিতে হবে আমাদের, রাত্রিশেষে সূর্যোদয়ে পৌঁছাতে হবে আমাদেরই-
“থাক না হাজার অযুত বাধা
দীর্ঘ দূর যাত্রা কিসের ভয় কিসের ভয়… “
——————————————————————————
তথ্য সূত্রঃ
১।শুভাংশু পাল, দ্রোহকালের দিনলিপি, ২০২৫
২। সৃজন ভট্টাচার্য (সম্পাদিত), জাগরণের নাম তিলোত্তমা : আর জি কর আন্দোলনের ইতিবৃত্ত
৩। কৌশিক দত্ত, অভয়া এবং লিঙ্গ রাজনৈতিক আন্দোলন, ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম ( সম্পাদিত), দ্রোহকাল ২০২৪, ২০২৪
৪। সুজাত ভদ্র, আর জি কর হাসপাতালের ঘটনা ও ন্যায় বিচারের আওয়াজ, শারদীয় অনুষ্টুপ, ২০২৪
৫। ডঃ পুণ্যব্রত গুণ, জুনিয়র ডাক্তার দের দুটি আন্দোলন ১৯৮৩ আর ২০২৪, শারদীয় অনুষ্টুপ, ২০২৪
৬। স্বাতী ভট্টাচার্য, পথের ইঙ্গিতঃ ‘বিচার চাই’ আন্দোলন যেমন এগোচ্ছে , পরিচয়, নভেম্বর ২০২৪-ফেব্রুয়ারি ২০২৫
৭। স্বাতী ভট্টাচার্য, পাশের আগেই ফেল , মোহিত রণদীপ ও শুভ প্রতিম (সম্পাদিত), দ্রোহকালের দলিলঃ বাধা যত প্রতিরোধ তত, ২০২৫
৮। শতাব্দী দাস, অপরাজিতা বিল প্রসঙ্গে, মোহিত রণদীপ ও শুভ প্রতিম (সম্পাদিত), দ্রোহকালের দলিলঃ বাধা যত প্রতিরোধ তত, ২০২৫
৯। অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়, ৯ অগাস্ট ও তারপর, অপ্রচলিত, সেপ্তেম্বর-নভেম্বর, ২০২৪
১০। শম্পা দাশগুপ্ত, রাত দখল্রের দিনপঞ্জি, ঢেউ উঠছে কারা টুটছেঃ গণ আন্দোলনের এপার ওপার, ২০২৫
১১। বহ্নিহোত্রী হাজরা, নির্ভয়া থেকে তিলোত্তমাঃ মুক্তি কোন পথে, ২০২৪
১২। সুমিত সরকার, আধুনিক ভারত, ১৯৮২
১৩। শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, পলাশি থেকে পার্টিশনঃ আধুনিক ভারতের ইতিহাস, ২০০৪
১৪। রোমিলা থাপার, বিরুদ্ধতার স্বর, ২০২৩
১৫। সুতপা ভট্টাচার্য চক্রবর্তী, নিৰ্বাচিত গল্পগুচ্ছ, দ্বিতীয় খন্ড (দ্রোহকাল পর্ব), ২০২৫
১৬। অশোককুমার মুখোপাধ্যায়, ‘কলকাতার আকাশে এক আগুনপাখি’, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২
১৭। শান্তিলতা গঙ্গোপাধ্যায়, ধর্মের নামে আস্ফালন, উত্তর সম্পাদকীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪ মার্চ, ২০২৫
১৮। ডঃ পুণ্যব্রত গুণের সাক্ষাৎকার , ওয়াচ টাওয়ার (সম্পাদিত), ঢেউ উঠছে কারা টুটছেঃ গণ আন্দোলনের এপার ওপার , ২০২৫, মোহিত রণদীপ ও শুভ প্রতিম (সম্পাদিত), দ্রোহকালের দলিলঃ বাধা যত প্রতিরোধ তত, ২০২৫, শ্রমজীবী ভাষা , ফেব্রুয়ারি ২০২৫
কৃতজ্ঞতা
১। ডঃ পুণ্যব্রত গুণ
২। অধ্যাপক অমিত ভট্টাচার্য










সবিস্তারে সুচিন্তিত লেখা। অভয়া আন্দোলন শুধুই খুন ধর্ষণের আন্দোলন নয় , একটা দুর্নীতি নৈরাজ্যের ব্যবস্থাকে কে যেন টেনো প্রাকারেন টিকিয়ে রাখার শাসকের প্রয়াসের অঙ্গ। তাই লড়াইটা সামগ্রিক সিস্টেম এর বিরুদ্ধে এবং সে কাজটা করতে গেলে এর পরিসর বাড়াতে হবে। যেখানেই অন্যায় সেখানেই অবস্থান নিতে হবে, বিরুদ্ধতায় মেলাতে হবে গলা.. তাই এবার সময় দুর্নীতি নিয়েও কিছু বলার, বোঝানোর সবটাই এক সুতোতে বাধা ।
“অভয়া আন্দোলনের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের পথ নির্দেশ” লেখাটি শুধু আন্দোলনের ডায়েরি নই, এ এক অসামান্য দলিল, যেখানে আছে লেখকের সুচিন্তিত বিশ্লেষণ । সেই বিশ্লেষণে আছে, শ্রেণী, লিঙ্গ ভেদ, গ্রাম-শহরের দ্বন্দ্ব। আছে আরও অনেক উপাদান। সবাই পড়ুন , অন্যদেরও পড়ান।