স্বর্গ হেথায়: কেউ বলতো মর্ত্যের স্বর্গ, কেউ বলতো মধ্য এশিয়ার সুইজারল্যান্ড। অসীম নীল আকাশের মাঝে ভেসে রয়েছে পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘ, তাতে ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে কতগুলি শক্তিশালী ঈগল। সুনীল ভূমধ্য সাগরের অনন্ত ঢেউগুলি লেবাননের উপকূলে মুখর ধ্বনি তুলে শেষ হচ্ছে। কর্মমুখর বন্দরগুলি। অপূর্ব সব সৈকতের বালুকাবেলায় আবালবৃদ্ধবনিতা সূর্য অথবা সমুদ্র স্নানরত। বৃহত্তম রিফ্ট ভ্যালির অন্তর্গত উত্তর – পূর্ব থেকে দক্ষিণ – পশ্চিম সমান্তরাল লেবানন পর্বত, সবুজঘন বেকা উপত্যকা এবং পূর্ব লেবানন পর্বত কে ঘিরে প্রাচীন সিডার ও পাইন অরণ্য; ৪০০ প্রজাতির পাখি সহ কত উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্র্য; হারমন ও কারনাতের তুষারধৌলি পর্বতচূড়া; নয়নাভিরাম সব নিসর্গসুন্দর স্থান; বিবলো, বালবেক, কাদিশা, আনজার প্রভৃতির মত প্রাচীন ফিনিসিয়ান, রোমান, বাইজেন্টাইন, উমেদিয়ান সভ্যতার উৎকৃষ্ট স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। লিটানি সহ নদীগুলির জলসিঞ্চিত বেকা সহ উপত্যকা গুলিতে ছবির মত গ্রাম ও সেখানকার শান্তিপূর্ণ জনজীবন; গম, ভুট্টা, সব্জি ক্ষেত; আপেল, অলিভ, পিচ, আঙুর, বিভিন্ন ধরনের লেবুর ভরভরন্ত বাগান। জুন থেকে সেপ্টেম্বর ভূমধ্যসাগরীয় নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া, বাকি সময় ঠাণ্ডা এবং মাঝেমাঝে বরফ ও বৃষ্টি। বিভিন্ন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মেলবন্ধনের এক মিশ্র সমাহার। বেইরুট, ত্রিপোলি, একরে, সিডন, টিয়ার প্রভৃতি আধুনিক শহর এবং সেখানকার নাগরিকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা সহ সারা বছর নাচ, গান, বাজনা, উৎসব, আকর্ষণীয় খাওয়াদাওয়া ও অপ্রতিরোধ্য নৈশ জীবন। ফলে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকদের ঢল নামত। এখানকার স্থিতিশীল পরিস্থিতি ও অর্থনীতির জন্য আরব মুলুকের অনেকে এখানকার ব্যাংকে টাকা জমা রেখে দিতেন। এই ছিল লেবানন। যা আজকে ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।
কৌতূহলদ্দীপক জনমিতি (Demography): এখন অনেকটাই বদলে গেছে, ভালো করে বললে বদলে ফেলা হয়েছে। লেবানন ছিল মূলত আরব মারোনাইট খ্রিস্টানদের দেশ। এছাড়াও ছিল একোপাশক দ্রুজ সম্প্রদায়। এছাড়াও আর্মেনীয়, অর্থোডক্স গ্রিক, জ্যাকোবাইট, অ্যাপোসটালিক প্রভৃতি খ্রিস্টীয়; ইহুদি এবং শিয়া, অলুইট, ইসমাইলি, সুন্নি বিবিধ ইসলামি ধারা।
ফিনিসিয়, রোমান, বাইজেন্টাইন, উমেদিয়ান, অটোমান তুর্ক সমস্ত সভ্যতার পদরেণু যেমন পড়েছে লেভান্তের এই অঞ্চলে তেমনি বিভিন্ন আগ্রাসন, যুদ্ধবিগ্রহ, ইহুদি – খ্রিস্টান – মুসলমানদের দ্বন্দ্ব – সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে একদা যীশুখ্রীষ্টের কর্মভূমির একাংশ বলে পরিচিত এই অঞ্চলে।
ভূমধ্যসাগর অববাহিকা এবং আরব উপদ্বীপের মধ্যে অবস্হিত ১০,৪৫২ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ৫৪ লক্ষ জনসংখ্যার এই ছোট এশীয় দেশটির উত্তর ও পূর্বে ঘিরে রয়েছে সিরিয়া। পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর। সমুদ্রপথে ২৬৪ কিমি সাইপ্রাস দ্বীপ রাষ্ট্র। দক্ষিণে ইজরায়েল।
১৫১৬ তে প্রথম এখানে রাষ্ট্র গঠন হয়। নাম হয় Emirate of Mount Lebanon। তারপর বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের পরে মারোনাইট খ্রিস্টান ও দ্রুজ দের দ্বন্দ্ব নিরসন করে ১৮৬১ তে গড়ে ওঠে Mount Lebanon Mutasurrifat। যা ১৯১৮ অবধি চলে। এরপর শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। প্রথমে আরব রাজ সাময়িক দখল করলেও ফ্রান্স দ্রুত পুনর্দখল করে নেয়। এরপর এটি হয়ে যায় ফ্রান্সের উপনিবেশ। নাম হয় Greater Lebanon। তারপর ১৯২০ তে সিরিয়া কে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সের Mandate of Syria and the Lebanon। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি ১৯৪০ থেকে ‘৪৪ ফ্রান্স দখল করে রাখায় সেইসময় এটি হয়ে যায় জার্মানির উপনিবেশ। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ১৯৪৩ এ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৪৫ এ লেবানন এবং ১৯৪৬ এ সিরিয়া ফ্রান্সের থেকে স্বাধীন হয়।সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়। সংবিধান লাগু ও দেশ গঠন শুরু হয়। মিশ্র জনমিতিকে সম্মান জানিয়ে স্থির হয়: দেশের প্রেসিডেন্ট হবেন একজন মারোনাইট খ্রিস্টান, ভাইস প্রেসিডেন্ট একজন গ্রিক অর্থোডক্স খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী একজন সুন্নি মুসলমান, পার্লামেন্টের স্পিকার একজন শিয়া মুসলমান এবং ডেপুটি স্পিকার একজন জ্যাকোবাইট খ্রিস্টান। এই নিয়ম এখনও চলছে।
যদিও পরিস্থিতি ক্রমাগত আঞ্চলিক যুদ্ধ, দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, মৌলবাদী ইসলাম বনাম খ্রিস্টান ও ইহুদি সংঘর্ষ, বিপুল পরিমাণ প্যালেসতিনিও বা ফিলিস্তিনি সুন্নি মুসলমান ও সিরিয় শিয়া মুসলমান উদ্বাস্তুদের আগমন; আর্মেনীয়, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বড় অংশের ইউরোপ, আমেরিকা প্রভৃতি মহাদেশে অভিবাসন পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। ২০২৪ এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে মুসলমান দের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে জনসংখ্যার ৫৮% হয়ে গেছে যার মধ্যে শিয়া জনসংখ্যাই সর্বাধিক।
ইরান সমর্থিত শিয়া ধর্মীয় – সামরিক শক্তি হেজবোল্লা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশের মধ্যে আরেকটি শিয়া ইসলামিক দেশ করে ফেলেছে। রাজধানী বেইরুট থেকে সমগ্র দক্ষিণ লেবানন এদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে। আধুনিক সমরাস্ত্র মায় ভয়ংকর ব্যালাস্টিক মিসাইল সম্বলিত এবং ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে সমানে সমানে টেক্কা দেওয়া হেজবোল্লার সামরিক শক্তির কাছে লেবানন রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি দুধের শিশুর মত। ফলে হেজবোল্লার এবং ওপর লেবানন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেই, বিপরীতে লেবাননের সংসদ থেকে নীতি – কর্মসূচি, সামরিক ও বিদেশ নীতিও হেজবোল্লা নিয়ন্ত্রণ করছে।
মিশ্র বসবাসের জায়গা ছেড়ে খ্রিস্টানরা লেবাননের উত্তর দিকে আশ্রয় নিয়েছেন। সমগ্র দক্ষিণ লেবানন একচ্ছত্র শিয়াদের নিয়ন্ত্রণে। সুন্নিরা আছে মূলত পূর্ব ও উত্তর অংশে। বড় ধারাগুলির চাপে দ্রুজ রা প্রায় বিলোপের মুখে।
কেন এমনটা হল? ১৯৪৮ এ লেভান্তের একাংশে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত The Mandate for the Palestine এর একাংশে ইহুদিদের একমাত্র ও নতুন রাষ্ট্র ইজরায়েল জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম প্রধান মিশর, ট্রান্স জর্ডান, ইরাক, সিরিয়া ও লেবানন – আরব দেশগুলি একসাথে ইজরায়েলকে আক্রমণ করে। যুদ্ধে ইজরায়েল বিজয়ী হয়। লেবাননের হাত পোড়ে। দক্ষিণ লেবানন – উত্তর ইজরায়েল সীমান্ত ও সংলগ্ন গ্রাম ও জনবসতি গুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন থেকেই এই অঞ্চল গুলিতে লাগাতার যুদ্ধ, সীমান্ত সংঘর্ষের সূত্রপাত। ১৯৫৬ এর যুদ্ধেও ইজরায়েল মিশরকে হারিয়ে দেয়। ১৯৬৭ র ছয় দিনের যুদ্ধে ইজরায়েল সিরিয়ার থেকে রণকৌশলগত ও জলের উৎসর দিক থেকে (সী অফ গ্যালিলি) গুরুত্বপূর্ণ গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। সেইসময় লেবাননের থেকেও তারা গোলান সীমান্তে রণকৌশলগত একটি এলাকা সেবা ফার্ম বা দোনভ দখল করে নেয়।
জর্ডান ইজরায়েলের সঙ্গে বোঝাপড়া করার পর ফাতা ব্রিগেড সহ প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতা কর্মীরা জর্ডান থেকে লেবানন চলে আসেন। এরসঙ্গে জেরুজালেম, ওয়েস্ট ব্যাংক প্রভৃতি ইজরায়েলের দখলীকৃত এলাকা থেকে প্যালেস্তানি উদ্বাস্তু রা দলে দলে লেবাননে চলে আসতে থাকেন। রুশপন্থী বাথ পার্টির নেতা আসাদ ১৯৭০ সালে সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করার পর বিরোধী সুন্নি ইত্যাদি গোষ্ঠী গুলির উপর অত্যাচার করায় সেখান থেকেও দলে দলে উদ্বাস্তু লেবাননে চলে আসেন।
এরফলে লেবাননের সমগ্র জনমিতি র ভারসাম্য বদলে যায় এবং রাষ্ট্র জুড়ে এক রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট ও পরিবর্তনের সূচনা করে। লেবাননের দক্ষিণে পিএলও, সহযোগী বাম দলগুলি প্রমুখেরা ইজরায়েল কে ধারাবাহিক আক্রমণ এবং ইজরায়েল সীমান্তে গেরিলা লড়াই ও অন্তর্ঘাত শুরু করে। প্রতিক্রিয়ায় ইজরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অপারেশন শুরু করে। আর রাজধানী বেইরুট এবং লেবানন রাষ্ট্রের দখল নিয়ে পিএলও, বিভিন্ন মুসলিম সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে খ্রিস্টানদের বিভিন্ন মিলিশিয়ার এক ভয়ানক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ১৯৭৫ থেকে শুরু হয়ে যা ১৯৯০ অবধি চলে এবং যার পরিণতি এক লক্ষ নাগরিকের মৃত্যু, তিন লক্ষ নাগরিক গুরুতর আহত এবং অন্তত ১০ লক্ষ মানুষ গৃহহীন উদ্বাস্তু। তার সঙ্গে ১০ লক্ষ মানুষ মূলত মারোনাইট ও অন্য খ্রিস্টান রা শরণার্থী হিসাবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেন। ধর্মকে কেন্দ্র করে মর্ত্যের স্বর্গ নেমে চলে যুদ্ধের নরকে। ঘন ঘন বোমা বিস্ফোরণ ও গুপ্ত স্নাইপার রাইফেলের গুলিতে বেইরুটের উপভোগ্য নিশিযাপন হয়ে পড়ে আতঙ্কের বিভীষিকা। পর্যটন, ব্যবসা, অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
লেবাননের গৃহ যুদ্ধ এবং লেবানন যুদ্ধ: অচিরেই সিরিয়ার স্থল ও ট্যাঙ্ক বাহিনী লেবাননে ঢুকে পড়ে উত্তর ও পূর্ব লেবানন দখল করে গৃহযুদ্ধে অংশ নেয় এবং তাদের অত্যাচারে ৬৫ হাজার লেবাননের নাগরিকের মৃত্যু হয়। পিতা আসাদ প্রায়ই বলতেন লেবানন সিরিয়ার অংশ। সিরিয়ার সেনা লেবাননের উপরোক্ত অংশ দখল করে ১৯৭৬ থেকে ২০০৫ অবধি পুত্র আসাদের সময় পর্যন্ত ছিল।
এবার রঙ্গমঞ্চে উদয় হয় ইজরায়েল। তারা দক্ষিণ লেবাননে কোণঠাসা হয়ে পড়া মারোনাইট ও অন্যান্য খ্রিস্টান দের নিয়ে গঠিত ‘ সাউথ লেবানন আর্মি ‘ মিলিশিয়া কে সমর্থন করে এবং দক্ষিণ লেবাননের পিএলও ঘাঁটিগুলিতে আগ্রাসী বোমা বর্ষণ করে। এর সঙ্গে ১৯৭৮, ৮২ ও ৮৩ তে স্থল অভিযান চালিয়ে প্রায় লুটানি নদী অবধি চলে যায়। তারা লেবানন সরকারের লেবানন আর্মি, সাউথ লেবানন আর্মি মিলিশিয়া এবং নিজেরা মিলে পিএলও কে পরাস্ত করে এবং পিএলও ১৯৮৩ থেকে তার দপ্তর ও কর্মকাণ্ড তিউনিশিয়া তে স্থানান্তরিত করে। লেবানন থেকে পিএলও পর্ব চুকে যাওয়ার পর আলোচনার মাধ্যমে ইজরায়েল তাদের সেনা দক্ষিণ সীমান্তের আট মাইলের বাফার এলাকা অবধি ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ঐ এলাকায় রাষ্ট্রপুঞ্জের বাহিনী আসে।
পরে ১৯৮৯ তে খৃষ্টানদের তুলনায় মুসলমানদের রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্ব বাড়িয়ে, প্রেসিডেন্টের তুলনায় সুন্নি দের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রধানমন্ত্রী পদের গুরুত্ব বাড়িয়ে তাইফা চুক্তি করে ১৯৯০ তে লেবাননের গৃহযুদ্ধ থামে। কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে। শিক্ষিত সক্ষম মানুষেরা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। সম্প্রদায়গুলির মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ভেঙ্গে গেছে। অশিক্ষিত মৌলবাদী ইসলামি যোদ্ধায় ভরে গেছে যুদ্ধবাজ তারা সহজেই হয়ে পড়ছে বিভিন্ন অশুভ অথচ প্রভাবশালী শক্তিগুলির দাবার বোড়ে। প্রচুর টাকা আসছে তাদের হাতে। গাঁজা, হাশিশ, ড্রাগ উৎপাদন হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান কৃষি ও শিল্প। গৃহযুদ্ধ শেষ হলেও এর পর থেকে নিয়মিত জাতি ও ধর্মীয় অশান্তি ও সংঘর্ষ, অন্তর্ঘাত, বিস্ফোরণ, হত্যা – গুপ্ত হত্যা লেবাননের নিয়মিত বিষয়। রুশ সামরিক সাহায্যে বলীয়ান সিরিয়ান সেনা আরও ক্ষয়ক্ষতি করে উত্তর ও পূর্ব লেবানন থেকে সরে যায় অনেক পরে ২০০৫ এ। সেখানেও রাষ্ট্রপুঞ্জের বাহিনী আসে।
হেজবোল্লা – ইজরায়েল যুদ্ধ: পিএলও কে লেবানন থেকে বিদায় করে তদানীন্তন ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাচেন বেগিন বলেছিলেন ৪০ বছরের শান্তি এল। কিন্তু ঘনিয়ে এল আরও অনেক বড় অশান্তি। ১৯৭৯ এ মার্কিন প্রভাবিত শাহ্ কে হটিয়ে মৌলবাদী ইমাম আয়াতোল্লা খোমেনি র নেতৃত্বে ইরানের ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে এক কট্টর শিয়া মোল্লাতন্ত্র এবং সহযোগী ধর্মীয় – সামরিক দুর্ধর্ষ ‘ ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আই আর জি সি) ‘। তারা মার্কিন ষড়যন্ত্র, ইরাক যুদ্ধ সামলেও সমগ্র মধ্য এশিয়ার সম ধর্মী শক্তিগুলির এক চক্র (Axis) গড়তে উদ্যোগী হলেন। তেলে পরিপূর্ণ মধ্য এশিয়ায় মার্কিন ও ইজরায়েলের আধিপত্য রুখতে তাদের সহায় হল রাশিয়া, চিন ও উত্তর কোরিয়া। অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি তাদের হাতে চলে এল, তার সঙ্গে তেল বিক্রির কাঁচা অর্থ। এছাড়াও তাদের সহায় হল শিয়া শাসিত সিরিয়া। ততদিনে সিরিয়ার লাতাকিয়া ও তারতুসে রাশিয়া বিমান ও নৌ ঘাঁটি বানিয়ে ফেলেছে। লেবাননে প্রায় ৪০ % জনসংখ্যা হয়ে ওঠা আরব শিয়াদের জঙ্গী অংশকে সংগঠিত করে আইআরজিসি এর কাড শাখা ১৯৮২ তেই তৈরি করল ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স’ ও ‘আমল’ দুটি সংগঠন। এরা ১৯৮৩ তে একের পর এক ভয়াবহ অন্তর্ঘাত ও ফিদায়ে হানা চালিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘মাল্টি ন্যাশনাল ফোর্স’ এর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, হত্যা করে লেবানন থেকে তাদের বিদায় করলো। সন্তুষ্ট ইরানের সুপ্রিম লিডার সংগঠনের নাম দিলেন হেজবোল্লা অর্থাৎ ঈশ্বরের সংগঠন। এবার এদের ওয়ান পয়েন্ট কর্মসূচি ধরিয়ে দেওয়া হল – দুনিয়া থেকে বিধর্মী ইহুদি ইজরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে ফেলা। এরপর এরা ইজরায়েল আক্রমণ শুরু করলো। প্রথমেই এরা ইজরায়েল সহযোগী ‘ সাউথ লেবানন আর্মি ‘ কে নির্মম যুদ্ধ চালিয়ে ধ্বংস করে দিল। ইজরায়েল এদের প্রতিষ্ঠাতা আব্বাস আল মুশায়ি কে হত্যা করলেও পরবর্তী প্রধান হাসান নাসিরুল্লা ইরানের সাহায্যে একে আরও শক্তিশালী করে লেবাননের মধ্যেই আরেকটি শিয়া – সামরিক রাষ্ট্র তৈরি করে ফেললেন। এদের থামাতে ইজরায়েল দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বোমা বর্ষণ করে ১৯৮৬ ও ১৯৯০ এ স্থল অভিযান করে দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে ঢুকে পড়ে লিটানি নদী র উত্তর অবধি চলে যায়। কিন্তু এদের প্রবল প্রতিরোধে, ভয়ংকর গেরিলা আক্রমণে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে এবং ক্রমাগত রকেট আক্রমণে ইজরায়েল পিছু হটে সীমান্তে ফিরে আসে ইহুদ বারাকের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়। এতবছর ধরে রাখা জায়গা ছেড়ে ইজরায়েলি বাহিনীকে ফিরে যাওয়া হেজবোল্লার অনন্য কৃতিত্ব হিসাবে গণ্য হয় যা আজ পর্যন্ত কোন আরব দেশ পারেনি। বলা হয়ে থাকে হেজবোল্লার সঙ্গে কাশেম সোলেমানির নেতৃত্বে আইআরজিসি, আসাদের সিরিয়ান সেনা লড়েছিল এবং রাশিয়া সাহায্য করেছিল।
এরপর ২০০৬ এ হেজবোল্লা কয়েকজন ইজরায়েলি সেনাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করলে ইহুদ ওলমার্টের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় ইজরায়েল ভয়ঙ্কর আক্রমণ চালিয়ে লেবাননে হেজবোল্লা র অনেক সামরিক কেন্দ্র ধ্বংস করে দিলেও দ্রুত তারা পুনর্গঠন করে নেয়। অমীমাংসিত অবস্থায় ৩০ দিনের যুদ্ধ শেষ হয়। Cease Fire ঘোষণার দিনও হেজবোল্লা না দমে মিসাইল বর্ষণ করে যায়।
এরপর বেশ কয়েকবছর চুপচাপ থাকার পর ২০২৩ এ গাজা থেকে হামাস ইসলামি জঙ্গী গোষ্ঠীর ইজরায়েল আক্রমণ, তারপর ইজরায়েলের গাজার উপর প্রবল হানার সময় হেজবোল্লা নিয়মিত ইজরায়েলে মিশাইল হানা ঘটিয়ে ক্ষয়ক্ষতি করে। সেইসময় ইজরায়েলও বেইরুট সহ দক্ষিণ লেবানন আক্রমণ করে নাসারাল্লা কে হত্যা সহ অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে। ইতিমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রয়োজনে রাশিয়া সিরিয়া থেকে ঘাঁটি তুলে নেয়। প্রবল গণবিক্ষোভ এর মধ্যে আসাদ কে ক্ষমতাচ্যুত করে মার্কিন সমর্থিত আল কায়দা সুন্নি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর একটি শাখা। এরফলে সরাসরি ইরান থেকে ইরাক ও সিরিয়া হয়ে হেজবোল্লার অস্ত্র আসার কিছুটা অসুবিধা হয়। ইজরায়েল গোলানের সিরিয়ার দিকের বাফার অঞ্চল দখল করে নেয়।
সম্প্রতি মার্কিন – ইজরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধে ইরানের মিত্র শক্তি লেবাননের হেজবোল্লা আর ইয়েমেনের হুথি আবার ইজরায়েল আক্রমণ শুরু করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইজরায়েল দক্ষিণ লেবানন এবং কার্যত হেজবোল্লার দখল করে নেওয়া বেইরুটে ভয়ঙ্কর বোমা, ক্ষেপনাস্ত্র ও রাসায়নিক হামলা চালায়। হেজবোল্লার বর্তমান প্রধান নাঈম কাশেম সহ অনেককে হত্যা করে। বহু সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়। স্থল বাহিনী বিভিন্ন নির্মাণ গুঁড়িয়ে লিটানি নদী অবধি পৌঁছে যায়। যুদ্ধ এখনও চলছে।
মর্ত্যের স্বর্গে কবে শান্তি ফিরে আসবে? এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তে লেবানন ও ইজরায়েলের মধ্যে শান্তি বৈঠক হচ্ছে। হেজবোল্লাকে বাদ দিয়ে এই বৈঠক অর্থহীন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু র নেতৃত্বে বর্তমান যুদ্ধবাজ, অমানবিক ও নিষ্ঠুর ইজরায়েল প্রশাসন এবং কেবলমাত্র বদলা, ধর্ম যুদ্ধ, বিধর্মী,খতম, কুরবানি শব্দগুলি হৃদয়ঙ্গম করা এইসব জিহাদি জল্লাদ দের পক্ষে যুদ্ধের নরকে অধোগমন সম্ভব, মর্ত্যের স্বর্গে আরোহণ সম্ভব নয়। একমাত্র রাষ্ট্রপুঞ্জের সক্রিয়তায় শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলি যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় তাহলেই কিছু হওয়া সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্য তেল, খনিজ দখল; অস্ত্র বিক্রি; গোলমাল লাগিয়ে দাদাগিরি, তোলাবাজি; আধিপত্য বজায় রাখার জন্য তারাই তো এগুলি ঘটাচ্ছেন।
১৪.০৪.২০২৬












