এই বিপদের উপর বিপদ কথাটা বেশ প্রচলিত। দেখা যায়, সাধারণত একটা কিছু বিপদ হলে তার সাথে আরও দুই একটা ছোট খাট বিপদ এসে হাজির হয়। ব্যাপারটার একটা সাধারণ ব্যাখ্যা আমার কাছে আছে। মূল বিপদের সাথে আসা অন্য বিপদগুলির কারণ একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, পরের বিপত্তিগুলি কেন ঘটেছে।
সম্প্রতি আমার এক আত্মীয় বেশ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। উনি একটি বিখ্যাত কোম্পানির বেশ বড় পদে আছেন। আপিসে থাকতেই অসুস্থ বোধ করলে ওর সহকর্মীরা আপিসের পাশের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা করান। উনি গাড়ী করে বাড়ী ফিরে এসে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাড়াতাড়ি কাছের একটি কর্পোরেট হাসপতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। মাথার সি টি স্ক্যান করে কিছু সমস্যা দেখা যায়। পরদিন আরও বড়, স্পেশালিস্ট হাসপতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। দিন তিনেকের চিকিৎসায় অনেকটা সুস্থ আছেন, কিন্তু এখনও ছুটি হয়নি। এই হল প্রাথমিক বিপদ।
এবার ওনার পরিবারের খবর একটু না বললে পরের বিপত্তির ব্যাপারটা বোঝানো যাবে না। বাড়ীতে জন্মগত অসুস্থতা নিয়ে রয়েছে একটি ছেলে। ওনার স্ত্রীও বছর তিনেক হল একটি জটিল অসুখের জন্য নিয়মিত ওষুধ খান, মাস তিন চার অন্তর হাসাপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আসতে হয়। বাড়ীতে দুইজন বৃদ্ধা মা। একজন নিজের মা, বয়স প্রায় পঁচাশি। অন্যজন ওনার শাশুড়ী মা; তিনিও প্রায় পঁচাত্তর। ওনার শ্বশুর মশাইয়ের প্রয়াণের পর, শ্বশুর মশাইয়ের ফ্ল্যাট বিক্রী করে, নিজের পাড়ার ভেতরে একটি ফ্ল্যাট কিনে, শাশুড়ী মাকে কাছেই নিয়ে এসেছেন। ঐ নাতিটিকে সামলানোর জন্য দুই বৃদ্ধাকেই সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়। সম্ভবত মেয়ের অসুস্থতার সময় থেকে ঐ শ্বাশুড়ী মা আর নিজের ফ্ল্যাটে যাওয়ার সুযোগই পান না।
সম্প্রতি ঐ শ্বশুর মশাইয়ের ফ্ল্যাট এ কিছু কাজ করানোর জন্য মিস্ত্রী লাগানো হয়েছিল। মিস্ত্রীদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে উনি আপিসে গেছিলেন; ফিরে এসে আর ঐ ফ্ল্যাটে যাওয়ার সুযোগ পাননি। এদিকে বাড়ীর কর্তা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাই মিস্ত্রীদের কাজ কদিন বন্ধ রাখতে হয়েছে। আমার আত্মীয় ঐ অফিসার ভদ্রলোক আপিসের কাজে খুবই ব্যস্ত থাকতে হয় বলে, সপ্তাহে একদিন , সারা সপ্তাহের মাছ মাংস কিনে ফ্রীজে রেখে দেন। ঐ শ্বশুর মশাইয়ের ফ্ল্যাটের ফ্রিজেও বেশ কিছু মাছ মাংস রাখতে হয়। এই বারের বিপদের সময়, ওনার শ্বাশুড়ী মা ঐ নির্জন ফ্ল্যাট থেকে মাছ আনতে গিয়ে দেখেন, গোটা ফ্ল্যাট, মাছ মাংস পচা গন্ধে ভরে গেছে। ফ্ল্যাটে ঢোকাই দুষ্কর। ফ্রিজ খোলার পর আর ঐ ফ্ল্যাটে দাঁড়ানোই অসম্ভব। এদিকে মেয়ে জামাই দুজনেই হাসপাতালে। ঐ পচা মাছ মাংস ফেলতে হলে, পাড়ার অন্য প্রান্তে নিয়ে গিয়ে ময়লা ফেলার ভ্যাটে ফেলতে হবে। ভাগ্যক্রমে রাস্তা দিয়ে একজন শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ যাচ্ছিলেন; তাঁকে দুশো টাকা দিয়ে ঐ ময়লা ভ্যাটে ফেলেছেন।
ব্যাপারটা কি হয়েছিল? মিস্ত্রীর কোন বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানোর জন্য ফ্রিজের প্লাগ খুলে সেখানে ঐ যন্ত্রের প্লাগ লাগিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। পরে আবার ফ্রিজের প্লাগ লাগানো হলেও, মিস্ত্রী সেই প্লাগের সুইচ অন করতে ভুলে গেছেন।
একটা বিপদের সাথে আর একটার সরাসরি কোন যোগ নেই। কিন্তু এই যে মিস্ত্রী কাজ করে চলে যাওয়ার পর ঐ ফ্ল্যাটে কেউ গিয়ে একবার দেখে আসবেন সেইরকম কেউ তো ছিলই না। এবার ভেবে দেখুন, আমরা সামান্য একটু বিপদে পড়ে গেলেই নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবাই দস্তুর। অথচ কত মানুষ আমাদের থেকেও কত কত বেশী বিপদে আছেন। আমার এই আত্মীয়ের কথাই ভেবে দেখুন; এনার কোন বিপদটা প্রধান? একটি জন্মগত ভাবে অসুস্থ সন্তানকে সারা জীবন ধরে দেখে রাখা। ঐ সন্তানের মায়ের জটিল অসুখের বছরের পর বছর ধরে চলা চিকিৎসা। নিজের অতি বৃদ্ধা মাকে সামলে রাখা; তার উপর শ্বশুর মশাই মারা যাওয়ার পর থেকেই একাকী শাশুড়ি মায়ের দায়িত্ব। এতেই শেষ নয়; আমাদের মত নিকট আত্মীয়দের পরিবারে একটার পর একটা মারাত্মক অসুখ; সেখানেও কখনও মামা হিসেবে, কখনও ভাই হিসেবে দায়িত্ব পালন; সবই রয়েছে। তবুও তো মানুষ হাল ছাড়ে না।
১৪.৪.২০২৬.











