আর জি করের ঘটনায় অভয়ার পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পানিহাটি শ্মশানে তাঁর দেহ সৎকারের সময় অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং প্রমাণ নষ্টের অভিযোগে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। সেই তদন্তের পর একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতার ও অভিযোগের ঘটনা সামনে এসেছে। নির্মল ঘোষের গ্রেফতার এবং একই অভিযোগের সূত্রে প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের গ্রেফতার—এই ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত গুরুতর। একইসঙ্গে পানিহাটি পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সোমনাথ দে-র বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে।
আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই—কোনও রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব বা ক্ষমতার বলয় যেন তদন্তের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন অনুচিত, তেমনই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনও অভিযোগকে ধামাচাপা দেওয়াও গণতন্ত্র, আইন এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তদন্ত হোক নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং প্রমাণনির্ভর; দোষী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা হোক।গ্রেফতার হয়েছে—এতেই তদন্তের দায় শেষ হয়ে যায় না। তদন্ত এমনভাবে এগোতে হবে যাতে পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপিত হয় এবং শুধুমাত্র প্রমাণের দুর্বলতার কারণে গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্তরা পরবর্তীতে সহজেই জামিন পেয়ে বেরিয়ে যেতে না পারেন। একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠবেই—অভয়ার দেহ সৎকারের সময়কার অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং প্রমাণ নষ্টের মতো এত গুরুতর অভিযোগ নিয়ে এতদিন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে CBI কেন কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিতে পারল না? তদন্তের পরিধিতে এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে।
আরও একটি ঘটনা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে, NRS হাসপাতালে অন-ডিউটি নার্স রূপালি বর্মনের রহস্যমৃত্যু।হাসপাতালের অ্যান্টিনেটাল ওয়ার্ড ও অবজারভেশন রুম সংলগ্ন শৌচালয় থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়েছে। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে; অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। দুই কনুইয়ে সূচের চিহ্ন এবং ঘটনাস্থল থেকে ফেন্টানিল ও মিডাজোলামের ভায়াল উদ্ধারের তথ্য এই মৃত্যুকে আরও গুরুতর তদন্তের দাবি জানায়।
তবে প্রাথমিক ময়নাতদন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ফরেন্সিক, টক্সিকোলজি ও প্যাথলজি পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। কিন্তু সেই কারণেই তদন্ত আরও দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং বৈজ্ঞানিক হওয়া জরুরি।
প্রশ্নটি শুধু একজন স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু বা একটি ঘটনার তদন্তের নয়। প্রশ্নটি হল—হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগী-পরিবারের নিরাপত্তা কি রাষ্ট্রের কাছে সত্যিই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার?
অভয়ার মৃত্যুর পর আমরা বলেছিলাম—নিরাপদ কর্মপরিবেশ ছাড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনও নিরাপদ হতে পারে না। আজ রূপালি বর্মনের মৃত্যুর ঘটনাও সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে আনছে।
আমরা পশ্চিমবঙ্গ জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্টের পক্ষ থেকে দাবি করছি—
১. রূপালি বর্মনের মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ তদন্ত করতে হবে।
২. ফরেন্সিক, টক্সিকোলজি ও প্যাথলজি রিপোর্ট দ্রুত প্রকাশ করতে হবে এবং তদন্তের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিক খতিয়ে দেখতে হবে।
৩. হাসপাতালে অন-ডিউটি স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা, প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ, CCTV, ডিউটি-রোস্টার এবং হাসপাতালের সিকিউরিটি ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অডিট করতে হবে।
৪. আর জি কর-কাণ্ডে পানিহাটি শ্মশানে দেহ সৎকার সংক্রান্ত সমস্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং প্রমাণ নষ্ট বা তদন্তকে প্রভাবিত করার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক অভিযুক্তকে একই আইনি মানদণ্ডে বিচার করতে হবে।
৬. কোনও তদন্ত যাতে রাজনৈতিক নির্দেশ, প্রশাসনিক চাপ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে প্রভাবিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলির বাস্তবায়নে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমরা চাই সত্য সামনে আসুক।
আমরা চাই প্রমাণ কথা বলুক,প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না।
আমরা চাই দোষী শাস্তি পাক—পরিচয় নির্বিশেষে।
আর আমরা চাই, আর কোনও স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু যেন হাসপাতালের অন্ধকার কোনও কোণে আর একটি ‘রহস্য’ হয়ে না থাকে।
অভয়ার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি আজও শেষ হয়নি।
রূপালি বর্মনের মৃত্যুর সত্য উদঘাটনের দাবিও তাই কোনও বিচ্ছিন্ন দাবি নয়।
হাসপাতাল নিরাপদ হোক।
স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপদ থাকুন।
তদন্ত স্বাধীন হোক।
বিচার নিশ্চিত হোক।











