আর.জি.করে অভয়া কান্ডের পর রাজ্য জুড়ে এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলন চলছে। ১৪ই আগষ্ট মেয়েদের রাত দখলের ডাক এই আন্দোলনকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ হয়ে ওঠে আপামর জনগণের হৃদয়ের স্লোগান। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন এই আন্দোলন থেকে উঠে আসে। হুমকি-সংস্কৃতি ও ধর্ষণ-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের আন্দোলন এক নতুন বাতাবরণ তৈরি করে। আদ্যন্ত রাজনৈতিক, কিন্তু দলীয় নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই আন্দোলন ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। এই বাতাবরণের মধ্যে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন এক নির্দিষ্টতাতে গড়ে। সহকর্মীর খুন ও ধর্ষণের প্রতিবাদে নিজেদের তারা সংঘবদ্ধ করে, ১০ই আগষ্ট মিছিল করা দিয়ে যা শুরু হয়েছিল। ১৪ই আগষ্ট আর.জি.করে তৃণমূলের হামলা জুনিয়র ডাক্তার ও সিনিয়র ডাক্তারদের ঐক্যকে আরো প্রসারিত করে। ফল কি হলো? যে স্বাস্থ্য সচিব আন্দোলনের প্রথম দিকে জুনিয়র ডাক্তারদের কথা শুনতেই চায়নি, তাকে অপসারণের দাবী জোরালোভাবে সামনে এলো। পরতে পরতে স্বাস্থ্য দুর্নীতির স্বরূপ উন্মোচিত হলো। কি ভয়াবহ পরিস্থিতি স্বাস্থ্যদপ্তরে তৈরি হয়েছে, সেটাও স্পষ্ট হলো। অভয়া-কান্ড যে এই পরিস্থিতি ও তার নাটের গুরুদেরই কাজ, এবং, তার পিছনে যে রাজ্য সরকারের মদত ও তৃণমূল দল আছে, এটাও রাজ্যের মানুষ বুঝতে পারলো। স্বাস্থ্য-ভবনের সামনে অবস্থান থেকে ধর্মতলায় আমরণ অনশন, জুনিয়র ডাক্তারদের মরনপন লড়াইয়ের সাথে বহু বহু মানুষ যুক্ত হন। তাদের ভালোবাসা,আবেগ, সমর্থন জুনিয়র ডাক্তারদেরও অনুপ্রাণিত করে।
এই পর্যায়ে মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য প্রশাসন কি করেছে?
১) অভয়া কান্ডের তথ্য প্রমাণ লোপ করার চেষ্টা করেছে।
২) মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং আন্দোলনকারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়েছেন।
৩) অভিযুক্তদের বাঁচাতে সক্রিয় থেকেছেন।
৪) নানা প্রকার বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও একটি বাজে আইন তৈরী করে নজর ঘোরাবার চেষ্টা করেছেন।
৫) এই আন্দোলনকে তৃণমূল ও বিজেপি বাইনারিতে ভাগ করার প্রানপণ চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু স্বাস্থ্য ভবনের সামনে ১১ দিনের অবস্থান আন্দোলনের চাপে মুখ্যমন্ত্রী ছুটে আসতে বাধ্য হলেন। বারবার আলোচনা হলো। কলকাতা পুলিশ কমিশনারের অপসারণ ও স্বাস্থ্যদপ্তরের ঘুঘুর বাসা ভাঙ্গার প্রক্রিয়া শুরু হলো। সবচেয়ে বড় কথা, ‘এই রাজ্যে মমতাই শেষ কথা বলবে’ বলে যে আবহাওয়া তৈরী করা হয়েছে, সেটাও ভাঙ্গতে শুরু করলো। ‘সব টার্ম একা এক ব্যক্তি ঠিক করে দেবে না’, এই বাতাবরণ সৃষ্টি হলো। রাজ্যের মানুষ প্রত্যক্ষ করলেন শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রতিস্পর্ধা প্রদর্শনের এক নতুন দৃশ্য। কিছু দাবী আদায় হলো, কিছু অমীমাংসিত থাকলো। সাগর দত্ত হাসপাতালের ঘটনা, কিছু অমীমাংসিত দাবী, সুপ্রীম কোর্টে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রতিবাদে আবার পথে নামলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। সমর্থনে পাশে এসে দাঁড়ালেন সিনিয়র ডাক্তার সহ হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। ধর্মতলার অনশন মঞ্চ আন্দোলনের তীর্থ হয়ে উঠলো। ‘দুর্গাপূজার সময়ে আন্দোলন করা যায় না’, এই মিথ ভেঙে গেলো। ষষ্ঠীর দিন পূজামণ্ডপে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দেওয়ার অপরাধে ৯ জন ছাত্রকে ভুয়ো মামলায় হাজতে ঢোকালো পুলিশ। কিন্তু কোথায় কি! প্রবল জনমতের চাপে অষ্টমীর দিনেই বেনজির ভাবে বিশেষ আদালত বসিয়ে তাদের জামিন দিয়ে দিলো কলকাতা হাইকোর্ট! মমতার সাধের কার্নিভাল মুখ থুবড়ে পড়লো দ্রোহের কার্নিভালের কাছে। অনশন আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন আরো বেড়ে গেলো। ১৬দিনের মাথায় আলোচনা হলো। শর্ত দেওয়া হয়েছিল অনশন তুলে আলোচনাতে আসতে হবে। সেই শর্ত খারিজ করে অনশন আন্দোলন জারি রেখেই আন্দোলনকারীরা গেলেন। গিয়ে দেখা গেলো লাইভ স্ট্রিমিং হচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্য ভবনে আলোচনার সময় আন্দোলনকারীরা যখন দাবী করেছিলেন লাইভ স্ট্রিমিং করতে হবে, মমতার যুক্তি ছিলো বিষয়টি সাবজুডিশ আছে বলে লাইভ করা যাবে না। কবে সাবজুডিশ ছিল আর কবে উঠলো? একটা পুরনো গল্প মনে পড়ে গেলো। এক ভিক্ষুক ভিক্ষা করতে এসেছে। বাড়ির দারোয়ান বললো, ভিক্ষা হবে না। ভিক্ষুক ফিরে যাচ্ছিল। উপর থেকে মালিক ডেকে পাঠালো। ভিক্ষুক গেলো। মালিক বললো, ভিক্ষা হবে না। ভিক্ষুক বললো, হবে না তো গেটেই বলেছিল, খামোকা আমাকে উপরে ডাকলেন কেন? উত্তর এলো, বাড়ীর মালিক কে ? দারোয়ান, না আমি?
জুনিয়র ডাক্তাররা যখন লাইভ টেলিকাস্ট চাইলেন, মুখ্যমন্ত্রী বললেন, হবে না। সাবজুডিস। ভাবখানা হলো, ‘হুঁঃ! ওরা বললেই লাইভ করবো! মুখ্যমন্ত্রী কে? আমি না ওরা! লাইভ যখন আমি বলবো, তখন হবে।’ স্তাবক আমলারাও যখন মাননীয়া ‘না’ বলেছিলেন, তখন সুরে সুর মিলিয়ে বলেছিলেন, হবে না হবে না। যেই উনি বললেন ‘হবে’, ওনারাও বললেন, হবে হবে। হীরক রাণীর রাজ্যেই বোধহয় এই নির্লজ্জ চাটুকারিতা সম্ভব!
আলোচনাতে দেখা গেল, মমতা দুর্নীতি গ্রস্থ ও ধর্ষকদের আড়াল করছেন, আর জুনিয়র ডাক্তাররা যূথবদ্ধভাবে তাঁদের বক্তব্য চোখে চোখ রেখে বলছেন। কেউ সমগ্র দাবী রাখছেন। স্বাস্থ্যদপ্তর সহ সমগ্র মেডিকেলের গণতান্ত্রিকরণের বিষয়ে বলছেন। কেউ অভয়ার ন্যায় বিচার, কেউ আর.জি.করে দুর্নীতি ও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে বলছেন। কেউ ‘অভিযুক্ত ও দোষীর পার্থক্য’ মমতাকে ধরিয়ে দিচ্ছেন। কেউ মমতা যখন বলতে দিচ্ছেন না, তখন তার প্রতিবাদ করছেন। মমতা উত্তেজিত করার চেষ্টা করলেও তাঁরা উত্তেজিত হননি। শান্ত অথচ দৃঢ় ভাবে নিজেদের বক্তব্য রেখেছেন। স্বাস্থ্য সচিবের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন। আরও একটা অভয়া-কান্ড যাতে না হয়, সেই পরিবেশ তৈরীর দাবী করেছেন। টোটাল টীম ওয়ার্ক। সবাইকে অনেক অনেক অভিনন্দন।
সংক্ষপে দেখলে, দীর্ঘ এই আন্দোলনের ফলে কি কি হলো?
১) আর.জি.করের অধ্যক্ষ, যিনি ‘আত্মহত্যা’ বলে অভয়ার খুন ও ধর্ষণের ঘটনাকে আড়াল করতে চেয়েছিলেন, তিনি সাস্পেন্ড হলেন, গ্রেফতার হলেন।
২) লোকাল থানার ও.সি-কে গ্রেফতার করা হলো।
৩) স্বাস্থ্য দপ্তরের দু’জন শীর্ষ অধিকর্তা অপসারিত হলেন।
৪) অনেক টালবাহানার পর পুলিশ কমিশনারও অপসারিত হলেন।
৫) আর.জি.কর, কল্যাণী সহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ‘থ্রেট-সিন্ডিকেটের’ সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে এক একটি জায়গায় ৪০-৫০ জন করে বা তারও বেশি ব্যক্তিকে সাস্পেন্ড করা হলো।
৬) মেডিকেল কলেজগুলোয় চিকিৎসকদের সুরক্ষা বাড়ানোর জন্য তড়িঘড়ি কাজ চালু হলো। বিভিন্ন কমিটি তৈরি করে তাতে ডাক্তার সহ স্বাস্থ্যকর্মীদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া চালু হলো। ছাত্রসংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী।
এগুলোই সব নয়। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে, বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি জোর ধাক্কা খেলো। লিঙ্গ-সাম্যের চির-উপেক্ষিত ধারণা সজোরে সমাজের সামনে এলো। ভয়ের বিরুদ্ধে, শাসকের চোখ রাঙানীর বিরুদ্ধে মানুষ মুখ খুলতে শুরু করলো। ‘মমতাই এরাজ্যে শেষ কথা বলবে’, এই মিথ, এই দর্প চূর্ণ হলো। প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর দলীয় নেতৃত্বকে অস্বীকার করেও যে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠতে পারে, সেই সত্য প্রতিষ্ঠা হলো।
হ্যাঁ, একই সাথে এটাও ঠিক, যে আন্দোলনের সব দাবী অর্জিত হয়নি। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘এক মাঘে শীত যায় না।’ শাসকের চক্রান্তও চলবে, তার বিরুদ্ধে আন্দোলনও চলবে। নিজের জীবন দিয়ে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটা জনজাগরণের সূচনা ঘটিয়ে গেলো ‘অভয়া’, যা সহজে থামার নয়। সেই বিচারে, একটা বড় আন্দোলন শেষ নয়, শুরু হলো মাত্র! অভয়ার বাবা ও মায়ের অনুরোধে অনশন প্রত্যাহার করেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত জুনিয়র ডাক্তাররা নিলেন, তা সময়োপযোগী, সর্বান্তকরণে সমর্থনযোগ্য।
সীমিত সামর্থ নিয়ে দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে জুনিয়র ডাক্তাররা যেভাবে লড়লেন, কোন প্রশংসাই তার জন্য যথেষ্ট নয়। অভয়া কান্ডের পর যেভাবে অসহনীয় পরিস্থিতির বিরুদ্ধে মানুষ পথে নেমেছে, তাকে সুনির্দিষ্ট ভাবে আরো এগিয়ে নিয়ে গেলো জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন। অবশ্যই নাগরিক সমাজের সমর্থন এই আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করেছে। কিন্তু আমরা যদি শুধু চিকিৎসকদের আন্দোলনের দিকেই তাকিয়ে থাকি, সম্ভবত ভুল করবো। যে নারীরা সমগ্র বন্ধন ভেঙে পথে নেমেছিলেন ১৪ই আগষ্ট, তাঁরাও এই লড়াইকে আরো শক্তিশালী করুন। পাড়ায় পাড়ায় শাসকদের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে কথা বলুক সাধারণ মানুষ। গ্রামে গ্রামে গ্রাম-সভার দাবী জোরালোভাবে সামনে আসুক। শ্রমজীবী মানুষেরা অধিকার আন্দোলনে পথে নামুন। দিকে দিকে গড়ে উঠুক প্রতিবাদী মানুষের মহা-জোট। সাহসের সাথে কোমর বেঁধে বাংলায় সার্বিক ভাবেই শুরু হোক ইতিহাস তৈরির এক নতুন লড়াই।
‘ভয় যেমন সংক্রামক, সাহসও তেমনি সংক্রামক’!
লেখকঃ কুশল দেবনাথ








