সম্প্রতি আমার এক বাল্যবন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল ফোনে। কথা প্রসঙ্গে সে বলল –‘জানিস, কলকাতার সামাজিক চালচিত্তিরের অসম্পূর্ণ বৃত্তটা আজ পূর্ণ হয়ে গেল’।
আমি বললাম –‘কি রকম?’
সে বলল, ‘শহর কলকাতার বুকে দিনের আলোয় স্কুলের ছাত্র তার বন্ধুকে ছুরি মেরে খুন করছে, এই জিনিসও দেখে ফেলতে হলো আমাদের।’
এবারে আপনারা হয়ত ভাবছেন, আমি সেই ‘কি সুন্দর কাল কাটাইতাম’এর গতে বাঁধা গীত শুরু করব।
না, করব না।
কারণ, আমি মনে করি না যে আমরা বা আমাদের আগের প্রজন্ম খুব সুন্দরভাবে কাল কাটিয়ে গিয়েছি। অপ্রাপ্তি এবং তজ্জনিত অতৃপ্তির ভার বুকের উপর নিয়ে দিনাতিপাত করেছেন আমাদের পূর্বপ্রজন্ম, তাই চেয়েছেন সন্তানসন্ততিরা যেন থাকে ‘দুধে ভাতে’।
দুধ ভাত ছাড়িয়ে তাঁদের চাহিদাটা যে আকাশকেও ছিঁড়ে ফেলে অনন্তের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, সেটা তাঁরা বোঝেননি সে ভাবে। বুঝেছি আমরা। এই বীভৎস ‘সব পেয়েছির যুগে’র অসহায় কুশীলবরা। যারা লোডশেডিংএ হ্যারিকেনের আলোতে পড়াশোনা করেছি, ছেলেবেলায় ভাইবোনে ভাগ করে ডিমসেদ্ধ খেয়েছি, পুজোয় ফুটপাথি হকার্স কর্নারের জামা-শাড়িতে সেজে ঠাকুর দেখে বেড়িয়েছি অলজ্জ আনন্দে, দূরপাল্লার ট্রেনে থ্রি টিয়ারের রিজার্ভেশন পেলেই লটারি পেয়ে গিয়েছি মনে হয়েছে, সেই দুর্ভাগা মধ্যবর্তী প্রজন্মের মানুষেরা প্রতিনিয়ত টের পাচ্ছি, মস্তিষ্কের satiety centre এর খিদে মিটে গেলে কি মর্মান্তিক অবস্থার জন্ম হয়। মানুষের সব আশা মিটতে নেই। নইলে মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়, ভালবাসতে ভুলে যায়, সময়বিশেষে ভুলে যায় নিজেকেও।
মধ্যবর্তী প্রজন্ম। The generation in the middle….
Middleman মানে দালাল। আমরা ছেলেবেলার অতৃপ্ত বাসনাপূরণের সিংহদরজার সামনে দাঁড়িয়ে সুসময়ের দালালি করেছি। কাদের কাছে? পূর্বজ এবং উত্তর প্রজন্ম — দুজনেরই কাছে। বাবা মাকে আরও দামি, আরও ভাল চিকিৎসা দিতে, শহরের বুকের ভিতরে নিজের ‘এতটুকু বাসা’ তৈরির লোভে, সন্তানকে উচ্চবেতনের রোবট তৈরি করতে আমরা সযত্নে ভুলেছি মূল্যবোধ, সংবেদ, মানবিকতা, সামাজিকতা এবং সর্বোপরি, প্রকৃতিকে।
ভুলেছি এবং ভুলিয়েছি আমাদের চারপাশের সকলকে — যে, প্রযুক্তির উন্নয়ন নিশ্চয় কাম্য, কিন্তু তারও সীমা টানা প্রয়োজন। আর সেই সীমারেখা মানুষকেই নির্ধারণ করতে হবে।
মৌলিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হবার আগেই যে মানুষ প্রযুক্তিকে হাতের খেলনা বানাচ্ছে, তার দ্বারা প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারের পরিবর্তে অপব্যবহারই হবে, এ কথা বুঝেও আমরা নিশ্চুপ থেকেছি।
সামাজিকতা এখন আর সমষ্টিগত ভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নাম নয়, সামাজিকতা মানে দ্বৈরথ, অসুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর যূথবদ্ধ হিংস্রতা। যে মানুষ নিজের প্রকৃতিদত্ত মগজকে খাটানোর বদলে হাতের মুঠোর প্রযুক্তিকে প্রতিপদে ব্যবহার করে নিজেকে চালাক ভাবে, তার মতো বোকা আর কেউ আছে কি? তার চেয়েও উন্নততর দালালেরা তার এই অব্যবহৃত, কাঁচা মগজকে কিনে নেয় মোটা দামে আর ব্যবহার করে ধ্বংসকাজে। এই উন্নততর দালালদেরও আবার অত্যুন্নত মালিক রয়েছে। তারাও প্রতি মুহূর্তে বুঝে নিচ্ছে নিজেদের ফায়দা — অর্থের নিক্তিতে, ক্ষমতার নিক্তিতে, প্রভুত্বের লালসায়। তারা চিরন্তন জীবনদেবতাকে হ*ত্যা করে নিজেরাই ঈশ্বর সাজছে। তাদের হাতিয়ার কখনও ধর্ম, কখনও যুক্তি, কখনও বা উন্নয়ন।
এরই বিষময় ফল হাতে বিবর্ণ বর্তমান কোলে নিয়ে বসে আছি হতাশ কিছু মানুষ — চারিদিকে তল্লাশ করেও আলোর সামান্যতম দিশাটুকুও চোখে পড়ছে না যাদের।
আমরা সবাই শশী ডাক্তার। নষ্ট পারিপার্শ্বিককে জিজ্ঞাসা করে ফিরছি — “শুধু বাইনারি আর হোয়াট্যাবাউটারি — তোমার বোধ নেই, সমাজ?”











সুকন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা যতই পরি ততই মুগ্ধ হই! তীক্ষ্ণ অথচ সংবেদী