আজ খুব সকালে ঘুম ভাঙ্গল বড়দিদি স্থানীয়া এক রোগীনির ফোনে। তাঁর দু-পায়ের হাঁটু বদলে দেওয়ায় তিনি এখন সুস্থ। বললেন,
“শুভ বিজয়া, ভালো থাকবেন।”
একটু থতমত খেয়ে বললাম, “শুভ বিজয়া, আশীর্বাদ করুন।”
“অবশ্যই। কালী পুজোয় আমাদের বাড়িতে আসবেন।”
“চেষ্টা করব।”
“আজ চেম্বার খোলা?”
“ না, আজ ধর্মতলায় অনশনমঞ্চে যাব।”
“আমার ভালোবাসা জানিয়ে আসবেন ওদের।”
এই সব শুভাকাঙ্খীদের জন্যেই এই আপাতঃ নির্লিপ্ত, নিষ্ঠুর সমাজেও আরো কিছুদিন বেঁচে থাকা যায়, চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া যায়।
এই বছর আমার আর আলাদা করে কাউকে ব্যক্তিগত শুভবিজয়া জানানোর মত মনের অবস্থা নেই। মার্জনা করবেন।
সমাজের আকাশে এখন তুমুল ঝঞ্ঝা। ডাঃ অনিকেত ও ডাঃ আলোকের পরে আমাদের আরো একজন অনশনকারী ভাই ডাঃ অনুষ্টুপ গুরুতর অসুস্থ হয়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছে গতরাত্রে। সত্যিকারের অনশনে একসময় এইরকম দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী। তবুও প্রবল দুশ্চিন্তা হচ্ছে এদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে।
ইতিহাস বইতে পড়েছি, স্বাধীনতা সংগ্রামী ঠাকুর্দার মুখে গল্প শুনেছি- পরাধীন ভারতে জেলবন্দী অনশনকারীদের ব্রিটিশ পুলিশ গায়ের জোরে নাকে নল গুঁজে খাওয়ানোর চেষ্টা করত। তাতে কেউ কেউ অসুস্থ হত, আর বাধা দেওয়া সত্ত্বেও হয়ত কারো করো পাকস্থলীতে কিছু খাদ্যবস্তু প্রবেশ করে আরো কিছুদিন তাদের সচল রাখত। নয়ত, অনশনকারী যতই নীরোগ তরতাজা যুবক-যুবতী হোন না কেন, স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় নিয়মেই আট-দশদিন পর থেকে তার রক্তের শর্করা কমবে, রক্তচাপ কমতে থাকবে, রক্তে কিটোন বডি পাওয়া যাবে, কিডনি ও লিভার খারাপ হবে। তাই হতে দেখা যাচ্ছে।
আজ ভারী অবসন্ন মনে ভাবছি সেই মেয়েটির কথা- যে তার বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজনকে আর কোনোদিন শুভবিজয়া বলতে পারবে না। তার বাবা মায়ের মনের অবস্থা বর্ণনা করার সাহস বা সাধ্য – কোনোটাই আমার নেই।
এই সেদিন ইউটিউবে অভয়ার দেখা শেষ রোগীর ইন্টারভিউ দেখছিলাম। তিনি বলছিলেন,
‘অনেক তো ডাক্তার দেখেছি, ডাক্তারদিদির মত এমন ভালো ডাক্তার জীবনে দেখিনি। মানুষের আপদে-বিপদে সবার পাশে দাঁড়াতেন। এমন সুন্দর ব্যবহার! এমন সুন্দর হাতের লেখা!’
সত্যি, সে হয়ত সততা,আপোষহীনতা এবং লড়াকু মানসিকতার সাথে সাথে আমাদের আরো অনেক কিছু শিখিয়ে গেছে!
সততা।
ভাল ব্যবহার।
চারিত্রিক দৃঢ়তা।
হয়ত ইচ্ছে থাকলেও আমরা সবসময় তা পারি না।
কিন্তু অভয়া আমাদের প্রত্যেককে কম-বেশী ভাবতে বাধ্য করেছে। জীবন দিয়ে সে শিখিয়ে গেছে যে, জীবনটা অনেক বড়। আর তাই, ঈশ্বর (যদি থাকেন) তাকে ডেকে নিয়েছেন ঁবিজয়ার আগেই। সেই একটা কথা আছে না, “He (she) whom Gods love, dies young.”
মেরুদন্ডের সার্জারি করি।
আজকাল মাঝে মাঝে ভাবি, কাদের মেরুদন্ডের চিকিৎসা করি?
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। মাঝে মাঝে নিজের পিঠে হাত দিয়ে দেখি, নিজের মেরুদন্ডটা আছে তো!
আমরা যারা সুবিচার চাইছি তারা তো বটেই। যারা চাইছে না তারাও হয়ত- আবারও বলছি ‘হয়ত’- সারাদিন জুড়ে প্রভুর পদলেহন শেষে, টিভি প্রোগ্রামের ঝগড়া বা রাজনৈতিক চুলোচুলির শেষে, প্রভু-র নজরদারির বাইরে আসার সুযোগ পেলে, মুখোশ খুলে রেখে নিজের পিতা-মাতা-স্ত্রী-সন্তানের কাছে বা কোনো নিভৃত রাত্রে নিজের বিবেকের কাছে হয়ত বলতে বাধ্য হয়,
‘যা করে চলেছি, তা ঠিক করছি কি?’
সেই একবার দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন,
“There is no God. But don’t tell this to my servant. Lest he will k*i*ll me at night.”
একইভাবে, এই সুবিচারের আপাত বিরোধীরাও হয়তো মনে মনে সুবিচার চায়, কারণ তার ঘরেও স্ত্রী-সন্তান আছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তা বলতে পারে না। তারা হয়ত ভাবে, “I also support justice. But don’t tell this to my master. Lest…..!”
তাই আজ মা উমার কাছে প্রার্থনা করি, তোমার প্রিয় কন্যাকে কাছে টেনে নিয়েছ তো নিয়েছ- কন্যার আত্মবলিদান যেন ব্যর্থ না হয়। মানুষ যেন তার হারিয়ে যাওয়া মেরুদন্ড খুঁজে পায়। দূর্নীতির স্রোতের মুখে সে যেন মাথা উঁচু করে প্রতিরোধ গড়তে পারে। ভয়ের আবহাওয়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। ভয়ের মায়াজাল সে যেন ছিঁড়ে ফেলতে পারে।
এটুকুই চাওয়া।
সত্যিকারের অনশনরত যোদ্ধাদের, আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তার ভাই-বোনদের বলি,‘পাশে আছি। সাথে আছি। সুস্থ থেকো।
বিজয়ী ভবঃ।’
আর যারা আমায় মেসেজ করে শুভবিজয়া জানিয়েছেন, তাঁদের তো বটেই- সবাইকেই জানাই,
‘শুভায়ঃ ভবতু।’
শুভ বিজয়া।











