সাবেক পশ্চিম দিনাজপুর জেলা ভেঙে বের করে আনা উত্তর দিনাজপুরের ভৌগোলিক অবস্থান একটু অদ্ভুত ছিল। জেলার সদর শহর ছিল রায়গঞ্জ আর একমাত্র মহকুমা ছিল ইসলামপুর। সদর মহকুমা রায়গঞ্জের অন্তর্গত পাঁচটি ব্লকের অন্যতম ছিল কালিয়াগঞ্জ।
ইসলামপুর মহকুমার একদিকে ছিল বিহারের সীমানা, আবার কালিয়াগঞ্জের লাগোয়া ছিল বাংলাদেশের সীমান্ত।
একদিকে রাজ্যের সীমানা, আবার অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত – রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে উত্তর দিনাজপুরের অবস্থান ছিল ভীষণ স্পর্শকাতর।
হাসপাতালে শিশুমৃত্যুর সেই সংবেদনশীল ঘটনাটির পরে আমি আউটডোর বা ইন পেশেন্ট চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলাম ঠিকই, তবে প্রথম দিকের স্বাচ্ছন্দ্য বা দুঃসাহস কোনোটাই আর ছিল না।
ডক্টর কোলে আমার গুটিয়ে যাওয়া লক্ষ্য করেছিলেন। উনি আমাকে কালিয়াগঞ্জ ব্লকের সেকেন্ড এমও করে দিলেন। অর্থাৎ, সেকেন্ড মেডিক্যাল অফিসার, যার দায়িত্ব মূলত ফিল্ডের কাজকর্মের তদারকি। ‘ফিল্ড’ শব্দের অর্থ আমার বোধগম্য হয়নি প্রথমে।
ডক্টর কোলে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায়, অল্পকথায় বুঝিয়ে দিলেন —
“ইংরেজিতে ফিল্ড মানে কি? মাঠ। এবার তোমার কাজ হবে মাঠে ঘাটে ঘোরা।”
খুব বুঝলুম যেন!
উনি একদিন আমাকে নিয়ে ফিল্ড ভিজিটে বেরোলেন।
“চলো, কালিয়াগঞ্জ ব্লকের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই।”
ছোট্ট দুই অক্ষরের ‘ফিল্ড’ শব্দটির বিশাল ব্যাপ্তির একটা সামান্য আন্দাজ পেয়েছিলাম সেইদিন।
এমবিবিএস কোর্সের তৃতীয় বছরে প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন নামক একটি বিষয়ের থিয়োরি বেশ ভালভাবে মুখস্থ করলেও, ব্লক অঞ্চল উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এইসব শব্দগুলো সম্পর্কে অত্যন্ত ভাসা ভাসা ধারণা নিয়েই রুরাল হেলথ সার্ভিসের আঙিনায় পা বাড়িয়েছিলাম আদ্যন্ত শহুরে আমি।
কোনো এলাকার ইতিহাস, মাটি, জনজীবন, তার আনন্দ-বেদনা, দুর্বলতা, কোনো কিছু না জেনেই যান্ত্রিক ভাবে তার সেবা করব বলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। বুঝিনি, এইভাবে হয় না। কারোর জন্যে আন্তরিক ভাবে কিছু করতে গেলে আগে তাকে জানতে হয়, সম্পৃক্ত হতে হয়, একাত্ম হতে হয়। সমালোচনা আর সংশোধনের চাবুক হাতে অবস্থার পরিবর্তন আনতে গেলে, নৈর্ব্যক্তিক ‘চাকরি করা’ হয় হয়ত, সেবা হয় না।
আমার বিএমওএইচ হাতে ধরে সেই মাটি চেনালেন আমাকে। শোনালেন এই জেলার আদি বাসিন্দা, রাজবংশীদের কথা।শেখালেন, তাদের ভালবাসতে।
আমি জানলাম, একটি ব্লকের অন্তর্গত অনেক গুলি গ্রাম পঞ্চায়েত থাকে – তাদের বলা হয় ‘অঞ্চল’।
কালিয়াগঞ্জ ব্লকের অন্তর্গত গ্রাম পঞ্চায়েত ছিল আটটি – অনন্তপুর, ডালিমগাঁও, রাধিকাপুর, বোচাডাঙা, ভাণ্ডার, মুস্তফানগর, বরুণা এবং মালগাঁ। এর মধ্যে রাধিকাপুর অঞ্চলে ছিল বাংলাদেশ সীমান্ত। রাধিকাপুর গ্রামটি টাঙন নদীর ওপারে – কালিয়াগঞ্জ ব্লকের সঙ্গে তার যাতায়াতের একমাত্র রাস্তা ছিল একটি শীর্ণ রেলব্রিজ। কলকাতা-রাধিকাপুর এক্সপ্রেস ট্রেন তখন ভবিষ্যতের গর্ভে। সারাদিনে দুই জোড়া মিটার গেজের প্যাসেঞ্জার ট্রেন রাধিকাপুর থেকে রায়গঞ্জ সদর শহর ছুঁয়ে বিহারের বারসই স্টেশন পর্যন্ত যাতায়াত করত। কালিয়াগঞ্জেও স্টেশন ছিল বৈকি! তবে স্টেশন, হাসপাতাল, বাস গুমটি, ছোট্ট মফস্বলি বাজার, গোটা পাঁচেক হাইস্কুল আর সবেধন নীলমণি একটি মাত্র কলেজ নিয়ে যে কালিয়াগঞ্জ শহর, সেটি ছিল পুরসভা এলাকা। পৌরসভা এবং পঞ্চায়েত সমিতি দুই বিপরীত মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের দখলে থাকলেও, কালিয়াগঞ্জের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্নে কোনো গুরুতর দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়নি কোনোদিন, এমনই জানিয়েছিলেন ডক্টর কোলে।
এক একটি গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে ছিল একাধিক উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সাব সেন্টার। ‘ভোর কমিটি’-র সুপারিশে প্রতি ৫০০০ জনসংখ্যা পিছু একটি করে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকার কথা বলা হলেও, বাস্তবে ৭০০০-৮০০০ মানুষ পিছু একটি করে সাবসেন্টার ছিল। কোনো কোনো সাবসেন্টারের উপভোক্তার সংখ্যা তো তখনই দশ হাজার ছুঁই ছুঁই করছে।
দেখলাম, প্রতি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে রয়েছেন একজন করে মহিলা এবং একজন করে পুরুষ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট। এই হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট (ফিমেল) আদতে হচ্ছেন একজন অক্সিলিয়ারি নার্স মিডওয়াইফারি ট্রেনিং প্রাপ্ত সিস্টার দিদি, যিনি শিশু ও প্রসূতির টিকাকরণ, নানা রোগ দূরীকরণের সরকারি কর্মসূচির গ্রামীণ স্তরে রূপায়ণ, হাজার রকমের সাপ্তাহিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক রিপোর্ট তৈরি, তৃণমূল স্তরের স্বাস্থ্যকর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে নিয়মিত মিটিং করা, সেন্টারের ওষুধ পত্রের হিসেব রাখা ইত্যাদি থেকে আরম্ভ করে প্রয়োজনে প্রসূতির স্বাভাবিক প্রসব পর্যন্ত করাতেন। এক কথায়, আজকাল জেনারেশন জ়েড যে ‘মাল্টি টাস্কিং’ লব্জটা হামেশাই ব্যবহার করে থাকে, আমার দেখা এই এএনএম দিদিরাই ছিলেন সেই কাজের পুরোধা। তাঁদের সহযোগী মেল হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্টদের সঙ্গী করে এই প্রত্যন্ত জেলার গ্রামগুলির অগণিত অশিক্ষিত, অনাধুনিক, অসহায় মানুষদের মুশকিল আসান হয়ে তাঁরা ঘুরে বেড়াতেন দাপটে। অধুনা এই পুরুষ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্টের পদটি সরকারের বদান্যতায় অবলুপ্ত হয়েছে। যেমন হারিয়ে গিয়েছে ব্লক স্যানিটারি ইন্সপেকটর, ম্যালেরিয়া ইন্সপেকটর, সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অফিসারের মতো আরও কিছু সরকারি পদ।
চার পাঁচটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের তদারকিতে আবার থাকতেন একজন হেলথ সুপারভাইজার। সব হেলথ সুপারভাইজারদের মাথার উপরে থাকতেন একজন ব্লক প্রাইমারি হেলথ নার্স বা বিপিএইচএন।
সব জেনেশুনে, গ্রামীণ প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিসের এই মানচিত্রকে প্রত্যক্ষ করে, ‘ফিল্ড ওয়ার্ক’ নামক বস্তুটিকে চতুর্দিকে অজস্র ডালপালা মেলে দেওয়া, মাটির গভীরে দূরদূরান্তে শিকড় ছড়িয়ে দেওয়া এক পিতামহ বৃক্ষের সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে হলো আমার।
কেন্দ্রীয় সরকারী অসংখ্য রোগ প্রতিরোধী প্রোগ্রাম তখন গুঁজে দেওয়া হয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যের আঙিনায়। ন্যাশনাল ব্লাইন্ডনেস কনট্রোল প্রোগ্রাম, ম্যালেরিয়া ইরাডিকেশন প্রোগ্রাম, রিভাইজ্ড ন্যাশনাল টিউবারকুলোসিস কনট্রোল প্রোগ্রাম বা আরএনটিসিপি, লেপ্রসি ইরাডিকেশন প্রোগ্রাম, সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রাম — কর্মসূচির যেন আর শেষ নেই।
তবে সবচাইতে ঢাকঢোল পিটিয়ে পালিত হতো ইন্টিগ্রেটেড পালস পোলিয়ো ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রাম, কারণ দেশ তথা রাজ্যব্যাপী পোলিয়ো রোগের দাপটের ছবিতে উত্তর দিনাজপুর তখন একটি কুখ্যাত নাম।
গ্রামীণ স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল প্রচার। যে রোগ দূরীকরণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, সেই রোগ সম্পর্কে সচেতনতার প্রচার। প্রচলিত কুসংস্কার ভাঙার প্রচার। জরুরি স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রচার। প্রচার ভ্রান্ত অন্ধবিশ্বাস ত্যাগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি চিকিৎসার সুযোগ নেওয়ারও।
ডক্টর কোলে খুব স্থিতপ্রজ্ঞ ও বিবেচক আধিকারিক ছিলেন বটে, কিন্তু সুবক্তা ছিলেন না আদৌ। ধাত্রীবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন, মহিলাদের বন্ধ্যাকরণ অপারেশনে তাঁর ছুরি চলত স্বপ্নের মতো, কিন্তু কোনো বিষয়ে দু’কথা গুছিয়ে বলতে গেলেই আমার বিএমওএইচ স্যারের যেন জ্বর আসত।এই গুরুদায়িত্ব তিনি অবলীলায় আমার উপর চাপিয়ে দিলেন। সমস্ত ফিল্ড ভিজিটে, জেনারেল চেক আপের পরে আমার কাজের তালিকায় একটি আবশ্যিক বিষয় জুড়ে দিলেন উনি — হেলথ টক।
আন্ডার গ্র্যাজুয়েটে যত ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছি, প্রত্যেকটির আগে আমার নার্ভাস ডায়েরিয়া হওয়া ছিল আবশ্যিক ঘটনা। কতবার লজ্জার মাথা খেয়ে পরীক্ষার হলেই অসুস্থ হয়ে পড়েছি।
সেই মুখচোরা আমাকে ডক্টর কোলে নামিয়ে দিলেন রাজার পার্টে —
“ভোটের প্রচার দেখোনি? যত রাজ্যের আলতু ফালতু প্রার্থীরা যখন ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কথা গলা ফাটিয়ে বকে যায় ঘন্টার পর ঘন্টা, তারা নার্ভাস হয়? আর সেখানে তুমি তো কয়েকটা মাত্র দরকারি কথা বলবে – ভয়টা কিসের শুনি?”
আশ্চর্যের বিষয়, প্রথম ‘স্টেজ পারফরমেন্সে’ই দ্বিধা কেটে গেল আমার।পাড়ায় পাড়ায়, ছোটো ছোটো মন্দির বা মাজার চত্বরে, প্রাথমিক ইস্কুলের ইঁট বের করা ধুলোটে বারান্দায়, পঞ্চায়েত সদস্যের নিকোনো দাওয়ায়, আক্ষরিক অর্থেই হাটে, মাঠে, ঘাটে হেলথ টক দিয়ে বেড়াতে লাগলাম আমি। বাসরাস্তার ধারে, তরঙ্গপুর বাজারের মোড়ে, ছোটোখাটো জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে ‘অমাইক’ গলায় বক্তৃতা করে যাচ্ছি, আর লঝ্ঝড়ে অ্যামবাসাডরে চড়ে আমার দিকে হাসিমুখে হাত নাড়তে নাড়তে কুনোর গ্রামের দিকে চলে যাচ্ছেন কালিয়াগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি — এ দৃশ্য এখনো চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই।
পালস পোলিয়োর ট্রেনিংএ অল্পশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদের, দাই ট্রেনিংএ অশিক্ষিত ধাই-মায়েদের, আইপিপি এইট প্রকল্পে হাতে কলমে নার্সিংএর ট্রেনিংএ স্থানীয় মাধ্যমিক পাশ মেয়েদের পারদর্শী ও স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে অক্লান্ত বকে চললাম আমি। কোথায় গেল আমার অন্তর্মুখিনতা?
কোথায় গেল আমার জনতার মুখোমুখি হয়ে কথা হারিয়ে যাবার ভয়?
আমি আবিষ্কার করলাম, নিজের চেয়ে জ্ঞানীজনদের সভায়, অবমূল্যায়নের ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকা, ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগা মেয়েটা তার নিজের চেয়ে কম জানা, ‘লেস ফর্চুনেট’, পিছিয়ে পড়া গরিবগুর্বোদের অকৃত্রিম অনুসন্ধিৎসা আর তাদের আগলভাঙা ‘আনসেন্সর্ড’ কথোপকথনের মধ্যে একটু একটু করে আবার তার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে।
ওদেরই জন্য আবার খুলে বসেছিলাম পাঠ্যবই, সতীর্থদের থেকে চেয়ে নিয়ে পড়তাম নিত্যনতুন জার্নাল, চেষ্টা করতাম সমস্ত রকম প্রতিরোধী চিকিৎসার প্রাসঙ্গিক খুঁটিনাটি ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকতে। এই সরল, মেঠো মানুষগুলো যে বিশেষ কিছু জানেনা, আন্তরিক জ্ঞান নিয়ে কেউ পৌঁছতেও চায়নি ওদের কাছে — ক্ষুরধার প্রতিপ্রশ্ন করে আমাকে অপদস্থ করার বিদ্যে বা অভিপ্রায় কিছুই ওদের নেই। তাই বলে কি দায়সারা ভাবে শেখাতে পারি ওদের? না, তা আমি পারি না।
একদিন হাসপাতাল অফিসে ঢুকে দেখলাম, ডক্টর কোলের হাতে একটি চারপাতার ট্যাবলয়েড সদৃশ লোকাল খবরের কাগজ, আর সেটিকে আন্দোলিত করে স্বভাব বিরুদ্ধ উত্তেজিত স্বরে তিনি আমাদের অফিসের এলডিসি, প্যাথলজি টেকনিশিয়ান দাদাদের উদ্দেশ্যে হেঁকে বলছেন – “পরেশদা, গজেনদা, মহিম, সব দেখে যাও -এত ডাক্তার তো এসেছে কালিয়াগঞ্জে – বক্তৃতা করছে, পেপারে ছবি বেরিয়েছে, এইরকম এসেছে কেউ, বলো তো?”
উঁকি মেরে দেখলাম, রায়গঞ্জ ট্যুরিস্ট লজের কনফারেন্স হলে, কলকাতার এক এনজিও দ্বারা আয়োজিত জেলার মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত একটি ওয়ার্কশপে শালমুড়ি দিয়ে, হাত পা ছুঁড়ে বক্তব্য পেশ করছি আমি আর কোনো ধৃষ্ট স্থানীয় সাংবাদিক সেই ছবিটি ছেপে আমাকে কৃতার্থ করেছেন।
কালিয়াগঞ্জে জব্বর ঠান্ডা পড়ত। এতটাই জব্বর যে আমার কলকাত্তাইয়া শৌখিন সোয়েটার আর পাতলা শালে সে শীত মানানো অসম্ভব ছিল। কোয়ার্টার পাওয়ার আগে যে ভদ্রলোকের বাড়িতে অল্প কিছুদিন ভাড়াটে হিসেবে থেকেছি, সেই পপুলার ড্রাগ হাউসের মালিক সুনীলদার মুখে শুনেছি, কালিয়াগঞ্জ থেকে দার্জিলিংএর হাওয়াই দূরত্ব নাকি মোটে পঞ্চাশ কিলোমিটার। অথচ কালিয়াগঞ্জ পুরোপুরি সমতল – কাছেপিঠে পাহাড় টাহাড় কিচ্ছু নেই।
মধ্য ডিসেম্বর জানুয়ারির রাতে নাইট ডিউটি করতে বড্ড কষ্ট হতো আমার। গ্রুপ ডি দাদা প্রণবেন্দুদা মাঝরাতে পেশেন্ট এসেছে বলে ডাকতে এসেছে কোয়ার্টারে – আর আমি পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো ডবল কম্বল আর লেপের পরত ছাড়িয়ে বেরোচ্ছি। গায়ে ফুল সোয়েটার, তার উপর পশমি জ্যাকেট, সবার উপরে মোটা শাল, পায়ে উলের মোজা, হাতে দস্তানা, মাথা-গলা মাফলারে ঢাকা। প্রণবেন্দুদার পোশাকও তথৈবচ – কণ্ঠস্বরে মানুষ চেনা যাচ্ছে কেবল। দাদা টর্চ বাগিয়ে আগে হাঁটছে, পিছনে আমি। চলতে চলতে সাবধানবাণী শুনছি -“সিধা হাঁটেন দিদি, যা কুয়াশা, কিসুই তো দেখা যাইতাসে না, ডাইনে বাঁয়ে একটু এদিক সেদিক করলেই সোওজা নর্দমার জলে গিয়া পড়বেন”
বাস্তবিক, সামনে সরু মুখের টর্চের সরল আলোকরেখার সামনে তাল তাল ভুতুড়ে কুয়াশা কুণ্ডলী পাকাচ্ছে, আর পাশের অন্ধকার থেকে ভাপের মতো ধোঁয়া উঠছে। আমি জানি, ওদিকে জল রয়েছে, রাস্তার ধারের নয়ানজুলির জল।
মা বাবা এই অসভ্য ঠান্ডার জন্য শীতের সময় কালিয়াগঞ্জে আসতে চাইত না। তা ছাড়া, ওদের বয়স হয়েছে, এলে কষ্টও হতো খুব। আমার কোয়ার্টারে টিউবওয়েল ছিল। এদিকে বাড়িতে কল খুললেই জলে অভ্যস্ত ওরা, অসুবিধে হতো খুবই। তার উপর ফ্রিজ নেই, আমার একার জন্য রোজের বাজার রোজই হতো – বাবা মা মানিয়ে নিতে পারত না। ততদিনে অবশ্য ঘরে টেলিফোন এসেছে, এসটিডি কানেকশন সমেত — গ্যাসের সংযোগও নিয়েছি, আর কোয়ার্টার আলো করে এসেছে চোদ্দ ইঞ্চি রঙিন টিভি, তাতে সর্বক্ষণ চলছে কালিয়াগঞ্জ কেবল নেটওয়ার্কের প্রোগ্রাম। তবুও দিন কয়েক থাকার পরেই বাবা মায়ের প্রাণ বেহালার বাড়ির জন্য হাঁপিয়ে উঠত।
তাই দেড় দু’মাস অন্তর আমিই চার পাঁচ দিনের জন্য চলে আসতাম কলকাতায়।
একবার বাড়ি এসে মাসির বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছি। বোনের তখনো বিয়ে হয়নি। বোন আর হবু ভগ্নীপতিকে (যে কিনা আমার বিশিষ্ট বন্ধুও বটে) নিয়ে একদিন বেরোলাম, গন্তব্য গড়িয়াহাট। ওখানে বোনের প্রিয় রেস্তোরাঁয় ওদের খাওয়াব — আমার পাকা সরকারি চাকরির ‘ট্রিট’ ওদের পাওনা রয়েছে। চাকরি পুরোনো হতে চলল, এদিকে খাওয়ানো আর হয়ে ওঠেনি।
খাওয়াদাওয়ার শেষে তিন জনে অটো করে তারাতলায় এসে নেমেছি। ওখান থেকে ফিরতি অটোয় বাড়ি ফিরব সবাই। বোন আর আমি যাবো বেহালা চৌরাস্তা, বিক্রম যাবে পর্ণশ্রী।
হঠাৎ আমার কি মনে হতে বললাম, “চলো না, একটু হেঁটে যাই পাঠকপাড়া অবধি, তারপর ওখান থেকে অটো নেব না হয়।”
কেন বলেছিলাম জানিনা। ফেলে আসা বালানন্দ হাসপাতালটার জন্য খুব মন কেমন করে উঠেছিল বুঝি।
রাত বেশি হয়নি — আটটা সাড়ে আটটা হবে। ওরা দুজনেই রাজি হয়ে গেল তাই। তাছাড়া বোন আমার সঙ্গে বেরিয়েছে, মাসী বিশেষ চিন্তা করবে না, জানতাম।
সেই অতি পরিচিত রাস্তা, গুপ্তা সুইটসএর সামনে অবাঙালি ছেলে ছোকরাদের আড্ডা, কেমিস্ট কর্নারে রোগীদের উদ্বিগ্ন আত্মীয়ের ভিড়, ইতিউতি পার্ক করা স্যারেদের গাড়ি — সব যেন একই রকম আছে।
আবার একরকম নয়ও। মাথা উঁচিয়ে দেখলাম পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ড, গাইনি ওয়ার্ড, স্পেশ্যাল ওয়ার্ডের খোলা জানলা দিয়ে টিউবলাইটের রশ্মি আসছে, কিন্তু আমাদের ছাদের ঘরের চারপাশে চাপ চাপ অন্ধকার। মিসিসিপিও তখন আর বালানন্দে নেই। হেলথ সার্ভিস পরীক্ষার পরের লিস্টেই নাম তুলে সে তখন কালিম্পঙে পোস্টেড। আমাদের শূন্য ঘরটা নির্জনতা মেখে একলা পড়ে আছে, আর কোনো লেডি আরএমও আসেনি এই হাসপাতালে। সব ফাঁক তাহলে সময় ভরাট করতে পারে না? কিছু স্মৃতিময় গহ্বর তার বিকট শূন্যতা নিয়ে ভ্যাংচাতে থাকে আগামীকে।
মনটা একটু ভার লাগছিল। চুপচাপ হাঁটছিলাম তাই। বালানন্দের গেটের সামনে থেকে ফিরতে যাবো, একটা হই হই শুনে পিছনে তাকালাম। হাসপাতাল-অফিসের দুই স্টাফ দেবাশিসদা আর গৌতমদার মুখোমুখি হয়ে গেলাম আমি।
আমার মতো বাড়ি আর কলকাতা অন্তপ্রাণ মানুষ যে ঐ অজ গাঁয়ে এতদিন টিকে আছে চাকরিতে, এতে ওঁরা যারপরনাই বিস্ময় প্রকাশ করলেন। নানা কুশল সংবাদ বিনিময়ের পরে যখন ফিরে আসছি, দেবাশিসদা ডেকে বললেন — “ভালো করে ভেবে দেখুন ডক্টর ব্যানার্জি, ডক্টর বিবেক দত্ত আর ডক্টর দিলীপ সাহা এখনো আপনার কথা খুব বলাবলি করেন, বেশ ভালো কাজ করতেন তো আপনি – চিলড্রেন ওয়ার্ড একেবারে টিমটিমে হয়ে গেছে আপনাকে ছাড়া। কখনো যদি মনে হয়, দুচ্ছাই সরকারি চাকরির মুখে ইয়ে — সোজা এখানে চলে আসবেন, পরের দিন থেকেই জয়েনিং। বুঝলেন তো?”
প্রসঙ্গত, ডক্টর অনুতোষ দত্ত তখন প্রয়াত হয়েছেন। ওঁর ছেলে ডক্টর বিবেক দত্ত বালানন্দ হাসপাতালের পরিচালনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
আমি ধন্যবাদ জানিয়ে চলে আসছি, বিক্রম হঠাৎ বলে উঠল —
“বাপরে, লোকে চাকরি চাকরি করে হেদিয়ে মরছে, তাও একটা জুতসই চাকরি জোটাতে পারছে না, আর এদিকে তোমাকে রাস্তা থেকে ডেকে ডেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে! কি কপাল তোমার, সত্যি!”
খুব হেসেছিলাম কথাটা শুনে, মনে আছে।
দেবাশিসদার কথাটা কয়েকটা দিন মনে ঘুরপাক খেয়েছিল, মনে আছে তাও।
কিন্তু ছোট্ট ছুটির শেষে, হিমজড়ানো উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণের বাসটা যখন মালদা পার হতো ভোররাতে, সামনের সিটে কম্বুলে চাদর জড়িয়ে গুটিশুটি হয়ে বসে রাতজাগা চোখে আমি দেখতাম একটু একটু করে ফর্সা হচ্ছে পুবের আকাশ, কুয়াশার পর্দা উঠে যাচ্ছে ঘুরন্ত ক্ষেতের উপর থেকে, আর ঘুমন্ত হাটের জড়াজড়ি করে শোয়া দোকানঘরগুলোর শিশির চোঁয়ানো সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে লেখা — ইটাহার, উত্তর দিনাজপুর। মনটা কেমন চনমন করে উঠত।
এই তো ইটাহারের পরেই আসবে রায়গঞ্জ, তারপর কর্ণজোড়া, হেমতাবাদ ছাড়ালেই বাঘনের মোড় পেরোব। আরেকটু এগোলেই প্রণবানন্দ ইস্কুলের গোলাপি পাঁচিল দেখা দেবে। আর তারপরেই শীতে জবুথবু বিবেকানন্দ মোড়ে,একটা শাড়ি শাল সোয়েটারের পুঁটলিকে ছোটো ভিআইপি সমেত নামিয়ে দিয়ে গুমটিতে চলে যাবে কলকাতার বাস।
ছুটে আসবে কোনো অপেক্ষমান মুখচেনা রিক্সাওয়ালা, সুটকেস তুলে নেবে যত্নে।
আমি রিক্সায় চড়ে পেরিয়ে যাবো মহেন্দ্রগঞ্জ বাজার। মনে পড়বে, বাজারের পাশেই হাসপাতালপাড়ায়, মনা পাটোয়ারির বারোয়ারি দুর্গাপুজোয় এবারের অষ্টমীতে অঞ্জলি দিয়ে গেছে মা – ওরা বড় যত্ন করে ভোগ পাঠিয়ে দিয়েছিল কোয়ার্টারে।
বাজার ছাড়িয়ে আরও কিছুটা এগোলেই ডান হাতে বিশাল বাড়ির ততোধিক বিশাল গেট পড়বে, ফলকে নাম লেখা রয়েছে – ডক্টর এস কে কোলে, ডক্টর মিসেস মঞ্জু কোলে। রিক্সা থেকে মাথা তুলতেই দেখতে পাবো দোতলার জানলায় মঞ্জুদির মুখ – চা খাচ্ছেন। ডক্টর কোলে তখন ছাদের টবের গাছ গুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত।
ব্লক অফিসকে বাঁয়ে ফেলে এগিয়ে যাবে রিক্সা, ঢুকে পড়বে গেট বিহীন সঙ্কীর্ণ চত্বরে।
ঐ দূরে দেখা যাচ্ছে আমার জাফরি কাটা দরজার কোয়ার্টার, একটা ঝাঁকড়া কুলগাছ ঝাঁপিয়ে পড়েছে পিচচট মাখানো ছাদের উপর। রিক্সা থামবে। শ্রীহীন দরজার মাথায় নীল বোর্ডের উপর বড় বড় সাদা অক্ষরে পরিচিত লেখাটা আরাম এনে দেবে চোখে — কালিয়াগঞ্জ গ্রামীণ হাসপাতাল।
ঝকঝকে রাজধানীর আলোয় ধোয়া রাস্তাঘাট, স্কাই স্ক্র্যাপার, জমজমাট দোকানপাট, ধাবমান জীবন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে সরে যাবে দূরে, অনেক দূরে।
গেঁয়ো প্রকৃতি চুপ করে দেখবে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার গঙ্গাপারের মেয়ে যেন অনেক দিন পরে উত্তর দিনাজপুরে, তার নিজের বাড়িতে ফিরেছে।
(ক্রমশ)











