প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় অনেককিছু নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু দেশের ভবিষ্যত বাচ্চাদের পাত থেকে যে প্রোটিনের মূল উৎস ডিম উবে গেল তা নিয়ে সংবাদমাধ্যম, সমাজমাধ্যম, নাগরিক সমাজের মধ্যে আলোচনা নেই কেন?
আমাদের দেশে দারিদ্র্য, আর্থিক বৈষম্য, খাদ্যের অসম বণ্টন, দুর্গমতা, সমাজের প্রান্তে বাস, শিক্ষা ও সচেতনতা র অভাব প্রভৃতি কারণে জনসংখ্যার এক বড় অংশের মধ্যে অপুষ্টির (Malnutrition) প্রাদুর্ভাব। শিশুদের মধ্যেও। ‘ ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভে – ৫ (NFHS – 5)’ এ দেখা গেছে পাঁচ বছরের কম বয়সীদের ২৩.৭ % বয়সের তুলনায় কম ওজনের (Retarded as per Weight – for – Age) এবং এদের বেশিরভাগ Protein Energy Malnutrition (PEM) এ ভুগছেন। এছাড়াও কম বেশি আয়রন, আয়োডিন, ভিটামিন এ, জিঙ্ক প্রভৃতির অভাব (Deficiency) রয়েছে।
মিড ডে মিলের অনেক উদ্দেশ্য ছিল। তার মধ্যে ছাত্র ছাত্রীদের পুষ্টি, শারীরিক ও মানসিক গঠন, স্কুলে যোগদান বৃদ্ধি ছিল প্রধান। বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে দেশে কেন্দ্রীয়ভাবে বেশ কয়েকটি পুষ্টি কর্মসূচি (Nutritional Programmes) গ্রহণ করা হয়। মাদ্রাজ প্রদেশে ১৯২৫ সালে প্রথম পুষ্টি কর্মসূচি চালু হয় যেটি ১৯৮২ থেকে তামিলনাড়ুতে রাজ্যের সর্বত্র সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করা হয় যেখানে সপ্তাহে পাঁচ দিন ডিম এবং পরবর্তীতে দুপুরের খাবারের সঙ্গে সকালের প্রাতরাশও দেওয়া হতে থাকে। ফলে ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ে আসা বেড়ে যায় এবং তাদের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হয়। ভারত সরকার ১৯৬২ – ‘৬৩ থেকে এই কর্মসূচি গ্রহণ করেন। অন্যান্য রাজ্যেও নানাবিধ পুষ্টি কর্মসূচি চলতে থাকে।
একদিকে প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে তামিলনাড়ুর সাফল্য দেখে ভারত সরকার নতুন করে আরও সংগঠিতভাবে সারা দেশের জন্য কয়েকটি পুষ্টি কর্মসূচি গ্রহণ করেন যার মধ্যে ০ – ১৪ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ‘ Integrated Child Development Services (ICDS) ‘ এবং ‘ Midday Meal Programme ‘ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নারী ও শিশু মন্ত্রকের অধীনে ICDS ১৯৭৫ এ শুরু হল যেখানে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ছয় বছর বয়সী অবধি শিশুদের এবং গর্ভবতী ও স্তনদুগ্ধ প্রদানকারী মায়েদের অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের বিষয় টি দেখা শুরু হল। ২০০৯ এ এটা সংশোধিত হয় এবং ২০১৩ তে National Food Security Act (NFSA) এর আওতায় আসে। Anganwadi কেন্দ্রের মাধ্যমে তিন থেকে ছয় বছরের শিশুদের বছরে ৩০০ দিন জলখাবার ( দুধ / কলা / ডিম / মরশুমি ফল / পুষ্টি গুণমান সম্পন্ন তৈরি খাবার) এবং তারপর গরম তৈরি খাবার (Hot Cooked Meal) দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আর ছয় মাস থেকে তিন বছরের শিশু এবং গর্ভবতী ও স্তনদায়িনী মায়েদের জন্য Take Home Rations (THR) অথবা Premixed / Ready to eat food এর ব্যবস্থা হয়। শিশুদের খাদ্যের জন্য বরাদ্দ জনপ্রতি আট টাকা, ৫০০ ক্যালোরি এবং ১২ – ১৫ গ্রাম প্রোটিন এর সংস্থান। খেয়াল করবেন বাজার দরে এগুলো দেওয়া কখনই সম্ভব নয়।
১৯৯৫ এর ১৫ আগষ্ট থেকে ভারত সরকার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের পরিচালনায় সমস্ত দেশে সমস্ত সরকারি ও সরকার পোষিত বিদ্যালয়ে National Programme of Nutritional Support to Primary Education (NP – NSPE) মিড ডে মিল কর্মসূচি চালু করেন। সর্ব শিক্ষা অভিযানে এই কর্মসূচিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০০৪ সালে এই কর্মসূচিটি বর্ধিত হয়ে ১৪ বছর বয়স অবধি আপার প্রাইমারি ছাত্রছাত্রীদের অন্তর্ভুক্ত করে যেখানে তৈরি করা দুপুরের খাবারের (Cooked Mid-day Meal) মাধ্যমে সহযোগী পুষ্টির ব্যবস্থা (Supplementary Nutrition) করা হয়।
বরাদ্দর মাত্রা সামান্য হলেও কয়েকটি রাজ্য নিজেরা ভর্তুকি দিয়ে এবং নজরদারি রেখে ভালভাবে চালাতে থাকে। যেমন তামিলনাড়ু, কেরল, কর্নাটক, গোয়া, মেঘালয়। আবার অনেক রাজ্যে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে।
২০২১ – ‘২২ এ কর্মসূচিটির নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় PRADHAN MANTRI POSHAN SHAKTI NIRMAN (PM POSHAN)। POSHAN অর্থ Prime Minister’s Overarching Scheme for Holistic Nourishment। যেখানে প্রতিটি সরকারি ও সরকার পোষিত বিদ্যালয়ে গরম তৈরি খাবার দেওয়া হবে। লক্ষ্য পুষ্টি বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে যোগদান বৃদ্ধি এবং খরা কবলিত অঞ্চল গুলোতে গরমের ছুটির সময়েও খাদ্য সরবরাহ। প্রাইমারি ও আপার প্রাইমারির ছাত্রছাত্রীদের জন পিছু দৈনিক যথাক্রমে ৪৫০ ক্যালোরি ও ১২ গ্রাম প্রোটিন এবং ৭০০ ক্যালোরি ও ২০ গ্রাম প্রোটিনের ব্যবস্থা স্থির হল। দৈনিক একটা করে ডিম, ৩০ গ্রাম ডাল, ৭৫ গ্রাম সব্জি এবং ৭.৫ গ্রাম ভোজ্য তেল।
কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ৬০%, রাজ্যের বরাদ্দ ৪০%। উত্তর পূর্বাঞ্চল ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের ক্ষেত্রে (৯০%:১০%) এবং (১০০%)। নজরদারি র জন্য স্থানীয় পঞ্চায়েত, Parent Teacher’s Association, Mothers’ Committee প্রভৃতি কে দায়িত্ব দেওয়া হল। সামান্য কিছু সংশোধনের পর প্রাইমারি (বাল ভাটিকা) ও আপার প্রাইমারি র জন্য বর্তমানে জনপ্রতি বরাদ্দ মাত্র যথাক্রমে ৬.৭৮ ও ১০.১৭ টাকা।
যাদের থলে নিয়ে বাজারে যাওয়ার অভ্যাস আছে তারা জানেন এই সামান্য টাকায় কিছুই হয়না, না ভরে পেট, না হয় পুষ্টি। মোদিজির স্বাধীনতার অমৃত কালে এবং মাননীয়ার এগিয়ে বাংলায় দ্রব্যমূল্য আকাশ ছোঁয়া। মাছ মাংস ডালের দাম ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ভোজ্য তেল মহার্ঘ্য। শীতের মরশুমি সব্জি র দাম জিজ্ঞেস করলে ছ্যাঁকা লাগে। ডিমের দাম এই মুহূর্তে একেকটি আট টাকার আশেপাশে। খাদ্যদ্রব্য গুলির মূল্য ছাড়াও জ্বালানি ইত্যাদির খরচ আছে। সুতরাং শিশুদের পাত থেকে একে একে উধাও যাচ্ছে পুষ্টিকর উপাদান গুলি। সম্প্রতি ডিম। এতদিন কমিয়ে কমিয়ে একদিনে ও আধখানা রাখা হয়েছিল। সয়াবিন, সস্তা সব্জি দিয়ে ঠেকা দেওয়া চলছিল। এখন ডিম এবং সব্জি দুজনেই নিরুদ্দেশ। পড়ে আছে শুধু ভাত আর তৃতীয় শ্রেণীর আলুর চোখা। ডিম নির্ধারিত হয়েছিল কারণ ডিম সহজলভ্য, সহজপাচ্য, সুস্বাদু , উন্নতমানের খাদ্য। ডিমে কার্বোহাইড্রেট ও ভিটামিন ছাড়া সমস্ত খাদ্যগুণ আছে। ডিমের প্রোটিনে প্রয়োজনীয় নয়টি অ্যামাইনো অ্যাসিডস সঠিক পরিমাণে আছে। একটা ৬০ গ্রাম ওজনের ডিমে ছয় গ্রাম প্রোটিন, ছয় গ্রাম ফ্যাট, ১.৫ গ্রাম আয়রন, ৭০ ক্যালরি শক্তি (Energy), ক্যালসিয়াম, অন্যান্য ভিটামিনস ও ট্রেস এলিমেন্টস রয়েছে। আই সি এম আর (২০২০) জানাচ্ছেন ৪ – ৬ ও ৭ – ৯ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন যথাক্রমে ১৬ ও ২৩ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। উচ্চ প্রাইমারি র জন্য প্রয়োজন ৩২ – ৪৫ গ্রাম প্রোটিন।
এমনটা নয় যে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার অন্য কোন খাতে খরচ করতে পারছেন না। চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে অনেক অপচয়, হরির লুঠ, নির্বাচনের সময় দেদার খরচ চলছে। রাজ্য সরকার কেন্দ্র কে দায়ী করছেন? ঠিকই কেন্দ্র সরকারের বরাদ্দ অনেক বৃদ্ধি করা দরকার এবং বাজারের তারতম্যের কারণে প্রতিনিয়ত সংশোধন করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত বিশ্ব ভ্রমণের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, অপারেশন সিঁদুর নামক পাকিস্তানের সঙ্গে লোক দেখানো যুদ্ধ যুদ্ধ রাজনৈতিক খেলায় ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দরিদ্র শিশুদের খাদ্যের ক্ষেত্রে জনদরদী কেন্দ্র সরকারের যত কার্পণ্য।
অন্যদিকে বেহাল হয়ে যাওয়া শিক্ষা, দেশের সবচাইতে বেশি শিশু বিবাহ হার, ব্যাপক স্কুল ছুট, সর্বাধিক নারী ও শিশু পাচারের অধিকারী আমাদের রাজ্যে মেলা, উৎসব, উপহার, সুপ্রিম কোর্টে তিলোত্তমা হত্যা নিয়োগ দুর্নীতি ডিএ মামলা, দুর্গা পুজো তে ক্লাবকে অনুদান ও বাৎসরিক ডিএ প্রদান, জগন্নাথধাম দুর্গাঙ্গন মহাকাল মন্দির স্থাপনে রাজ্য কোটি কোটি টাকা অপচয় করে চলেছেন। মুখ্যমন্ত্রী ঘন ঘন উত্তর বঙ্গ সফরে যান, মুখ্যমন্ত্রী এবং অভিষেকবাবুর যাতায়াতের হেলিকপ্টার, বিশাল কনভয়, অগুন্তি পুলিশ এবং তাদের থাকা – খাওয়া – যাতায়াত ইত্যাদির জন্য সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল খরচ হয়। অথচ ভুখা শিশুদের ন্যূনতম খাবারের জন্য আরও কিছু টাকা বরাদ্দ করা যায় না!










