সন্ধেবেলা।চন্দ্রিল ডাক্তারের চেম্বার। জন থৈ থৈ অবস্থা । অনেকেই স্থানীয়। বেশ কিছু মানুষ অবশ্য এসেছেন দূর থেকে। ডাক্তারদের এই হলো সুবিধা। সুবাসিত চারের গন্ধে যেমন সারা পুকুরের মাছ এক ঠাঁয়ে এসে ভিড় করে, পশার জমানো ডাক্তারের অবস্থাও অনেকটা তেমনই। সবসময়ই জন পরিবেষ্টিত হয়ে থাকা।
আমি গিয়েছিলাম ও পাড়ায় এক পরিচিত জনের সঙ্গে দেখা করতে। শুনলাম, তিনি গেছেন চন্দ্রিল ডাক্তারের কাছে।একই পথ, তাই আমিও গিয়ে হাজিরা দিলাম ঐ চেম্বারে , এখানেই কথা হয়ে যাবে এই ভেবে। দেখা হয়েও যায়। রোগী ও তাদের সঙ্গে আসা পরিজনদের ভিড়ে চেম্বারের ভিতরে “তিল ঠাঁই আর নাহি রে” দশা। সঙ্গে কথা হলো। রেললাইনের এপাড়ে এখন বিরিয়ানির দোকানে ভিড় ঠাসাঠাসি অবস্থা। এ বলে আমাকে দেখ্ তো ও বলে আমায়। গুণধর মান্না,মানে আমার বন্ধু,ওখান থেকেই বিরিয়ানি খেয়েছিল গত রাতে। আর তারপর থেকেই চোয়া ঢেঁকুর,বুক জ্বালা করা আর থেকে থেকে বমি। গিন্নিকে এতো কথা খুলে বলেনি পাছে হৈচৈ করে পাড়া মাত করে ফেলে।
গুণধরের মতো পরিস্থিতির শিকার আমাদের প্রত্যেককে কখনো না কখনো হতে হয়েছে। এমন সমস্যায় পড়ে ডাক্তার বাবুদের কাছে গেলেই তাঁরা বেশ গুরুগম্ভীর কন্ঠে এই বিষয়ে বলেছেন –
“দেখুন, বমি করাটা ঠিক রোগ নয়, হতে পারে রোগ লক্ষণ। আপনার পাকস্থলীর ভেতরে একটা ঘুরপাক হচ্ছে এটা আপনি টের পেলেন। আপনি অস্বস্তি বোধ করছেন। এটা যখন বেশ পেকে উঠেছে , ঠিক তখনই হঠাৎ করে আপনি আপনার মুখ খুলে পেটের ভেতর থাকা উপাদানগুলোকে উগড়ে দিলেন। মানে বমি করলেন। তাহলে কার্যকারণ সম্পর্কটা কী দাঁড়াল? আগে অস্বস্তি বোধ, পরে বমি । চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় আগে ন্যসিয়া ( nausea) বা বমি ভাব পরে বমি ( vomit)। একে অন্যের পরিপূরক বা অনুবর্তী ক্রিয়া। কখনও কখনও দুজনেই, রামায়ণের খর আর দূষণের মতো,শরীরকে উতল করে, আবার কখনও বমিকে বাদ দিয়েও আপনি ন্যসিয়া বা বমি ভাবের শিকার হতে পারেন। তবে এখানে বমির ঘটনাটাই যেহেতু দৃশ্যমান শারীরিক উপসর্গ সেহেতু এর কথাই আলোচনায় উঠে আসে আগে।”
আগেই বলেছি, বমি করাটা কোন রোগ নয়, তবে হতে পারে রোগ লক্ষণ। এই দুটি উপসর্গ আমাদের শরীরের অনেক অনেক সম্ভাব্য রোগের আগাম বার্তা পৌঁছে দিতে পারে, যেমন –
- গলব্লাডার বা পিত্তথলির রোগের পূর্ব লক্ষণ হতে পারে বমি করাটা।
- খাবারের বিষক্রিয়া হলে বমির প্রকোপ বাড়ে।
- স্টমাক ফ্লুর মতো কোনো রোগের সংক্রমণ হলে বমি হতে পারে।
- নানান কারণে পেটের ভেতর ঘা বা আলসার হলে তার আভাস বমি করার উপসর্গ থেকে টের পেয়ে যান চিকিৎসকরা।
- বুলিমিয়া অথবা অন্যান্য মানসিক অসুস্থতার কারণে বমি করাটা খুব স্বাভাবিক।
মধুমেহ বা ডায়াবেটিস্ রোগীদের মধ্যে গ্যাস্ট্রোপারেসিস ( Gastroparesis ) বা ধীরে ধীরে স্টমাক খালি হবার সমস্যা থাকলে বমি করাটা তার অন্যতম লক্ষণ হতে পারে।
এছাড়াও ন্যসিয়া বা বমি ভাব এবং বমি করার উপসর্গ খুব সাধারণভাবে দেখা যায় –
- কোথাও গিয়ে পাকদণ্ডী পথ বেয়ে কোনো দূরবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরতে গেলে বমি করাটা খুব সাধারণ সমস্যা। সমুদ্র পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বমি করাটাও খুব স্বাভাবিক ঘটনা। একই হাল হতে পারে আকাশ পথে নবীন যাত্রীদের। তবে এটা খুবই স্বাভাবিক। ভয়ের কিছু নেই।
- মহিলাদের প্রথম গর্ভাবস্থার একেবারে গোড়ার দিকে শতকরা ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ মহিলা বমি ভাবের শিকার হতে পারেন। এদের মধ্যে বমি করাটা শতকরা ২৫ থেকে ৫৫ শতাংশ মহিলার ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক। গর্ভবতী মহিলাদের বমি করার বিষয়টি নিয়ে অনেক লোকশ্রুতি প্রচলিত আছে তবে সেসব নিয়ে কথা বলার জায়গা এটা নয়।
- কোনো ক্ষতিকারক বা টক্সিক দ্রব্য খাবার ফলে।
- কখনও কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে বমি হতে পারে।
- শরীরের কোনো অংশে তীব্র ব্যথার কারণে শরীরে যে প্রতিক্রিয়া হয় তার ফলেও বমি বমি ভাব মনে হতে পারে।
- খাবার দেখলেই খেতে ইচ্ছে করাটা খুব স্বাভাবিক । তবে অনেকসময়ই অতি ভোজন ন্যসিয়া বা বমি ভাব এবং বমির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বমি হবার পর শরীর আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়।
- ভয় বা আশঙ্কা থেকেও বমির উদ্রেক হতে পারে। অঙ্ক পরীক্ষার আগে আতঙ্কে শারীরিক অস্থিরতা ও বমি খুব স্বাভাবিক পরিণতি।
- অতিরিক্ত মদ্যপান করলে নেশাতুর মানুষের বমির আশঙ্কা বেড়ে যায়।
- অনেক সময় কোনো বিশেষ উৎস থেকে দুর্গন্ধ বের হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা বলেন সুগন্ধের তুলনায় দুর্গন্ধ অনেক দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। এমন গন্ধ নাকে গেলে বমি পেতে পারে।
ন্যসিয়া তথা বমির এবম্বিধ বহুতর কারণের মধ্যে কোনটি সঠিক কারণ তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামান্য কয়েকটি বিধি নিয়ম মেনে চললেই এই সমস্যাকে কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। বাড়ির অভিজ্ঞ মানুষেরা তাঁদের অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান থেকেই এতোকাল এমনসব ঘরোয়া সমস্যা সামলে নিয়েছেন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো। তবে বড়োদের তুলনায় ছোটদের বমি করার প্রবণতা তুলনামূলক ভাবে বেশি হয় । শিশুদের ক্ষেত্রে বমির বিভিন্ন কারণ হতে পারে, যেমন –
- শিশুদের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা যথাযথ ভাবে গড়ে উঠতে খানিকটা সময় লাগে। ফলে তারা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ভাইরাস ঘটিত সংক্রমণের শিকার হয়। এমন হলে বমি হতে পারে।
- অনেক সময় শিশুর খাবার কোনোভাবে সংক্রমিত হলে তা শারীরিক অস্থিরতা সহ বমির কারণ হতে পারে।
- এই সময়ের শিশুদের অনেক সময় মহার্ঘ্য মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়। আধুনিক মায়েরা,বিশেষত অতিরিক্ত ফিগার সচেতন শহুরে মায়েরা নিজেদের শিশুকে নিজের বুকের দুধ দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন। সেক্ষেত্রে শিশুকে খাওয়ানো হয় বহুজাতিক কোম্পানির তৈরি কৌটোর দুধ। এই দুধ থেকে এ্যালার্জি হলে শিশুর বমি হতে পারে।
- অনেক সময় একালের মায়েরা নিজেদের বাচ্চাদের খাবারের সঠিক পরিমাণ ঠিক করতে পারেন না। অতিভোজন থেকে বমি হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়।
- শিশুর বুকে অতিরিক্ত কফ জমে কাশির উদ্রেক করে। কাশতে গিয়ে বমি করে ফেলা অস্বাভাবিক নয় মোটেই।
- সর্দি কাশি জ্বর শিশুর তিন সমস্যা। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বমি।
- অনেক সময়েই শিশুর নবীন পাকস্থলী অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করতে নারাজ হলে তা পেট খারাপ করে। এরসাথে হতে পারে বমি।
মা হলেন একজন শিশুর সেরা চিকিৎসক। মাকে সবসময়ই খেয়াল রাখতে হবে শিশুর শারীরিক অবস্থার প্রতি। সমস্যার পেছনের কারণগুলো জানা থাকলে সমাধান সহজ হবে।
অন্যদিকে আমাদের মতো পূর্ণবয়স্ক মানুষের গ্যাস্ট্রোইন্টারাইটিসের সমস্যা থাকলে তার বমি হওয়াটা এক রকম স্বাভাবিক ঘটনা।
চিকিৎসকদের মতে আমাদের শরীরে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার পেছনে ব্যাক্টেরিয়ার খুব বড়ো ভূমিকা রয়েছে। বড়োদের মধ্যে এই সমস্যাকে “stomach flu”বলে যদিও তথাকথিত ফ্লু এর সঙ্গে এই বমি বমি ভাবের কোনো সম্পর্ক নেই। পূর্ণবয়স্ক মানুষদের মধ্যে ন্যসিয়া এবং বমির প্রকোপ আর যে সব কারণে দেখা যেতে পারে, সেগুলো হলো-
- মহিলাদের মধ্যে গর্ভসঞ্চার।
- খাদ্যে বিষক্রিয়ার প্রভাব।
- মাইগ্রেন।
- লেবিরিন্থাইটিস বা অন্তঃকর্ণের সংক্রমণ জনিত সমস্যা।
- অ্যাপেন্ডিসাইটিস।
- গাড়ি, নৌকা, বিমান ইত্যাদিতে পরিভ্রমণের সময় বমনেচ্ছা।
- পাকস্থলীর ক্রনিক সমস্যা যাঁদের মধ্যে রয়েছে তাঁদের মধ্যেও বমি বমি ভাবের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে যাঁরা GERD বা Gastroesophageal Reflux Disease এ ভুগছেন তাঁরাও ন্যসিয়া এবং বমির সমস্যায় ভুগতে পারেন। এছাড়া যাঁদের IBS বা Irritable Bowel Syndrome বা Crohn’s Disease রয়েছে তাঁরাও এমন সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন।
আলোচনার শুরুতেই বলা হয়েছে যে ন্যসিয়া এবং বমি কোনো রোগ নয়, বরং বলা যায় এই দুই উপসর্গ হলো অন্যান্য অনেক জটিল রোগের প্রাথমিক পূর্বাভাস। কিন্তু এই কথায় মন মানবে কেন? সারাদিন ধরে বমি বমি ভাব থাকলে শরীর আর মন কাহাতক ভালো থাকে? তাই এবার এই সমস্যার সমাধান বাতলে দেবার চেষ্টা করে দেখি।
ন্যসিয়া বা বমি ভাব থেকে কে কীভাবে স্বস্তি ফিরে পাবে তা কিন্তু সবার বেলায় এক হবে না। ন্যসিয়ার পেছনের কারণগুলো যেহেতু বহুবিধ তাই সাধারণ কতগুলো উপায়ের কথাই কেবল উল্লেখ করতে পারি আমরা। মুশকিল আসান চিকিৎসকের কাছে যাবার আগে এই অস্বস্তিকর উপসর্গগুলো কাটিয়ে উঠতে আমরা সবাই যা করতে পারি তাহলো–
১) পরিশ্রুত ঠাণ্ডা জল অথবা ঠাণ্ডা পানীয় জল পান করুন।
২) হালকা খাবার খান।
৩) দোকান থেকে কিনে আনা ভাজাভুজি, অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার অথবা মিষ্টি খাবার খাওয়া বন্ধ করুন।
৪) খাবার সময় তাড়াহুড়ো করবেন না। অল্প খান এবং চেষ্টা করুন অল্প অল্প করে বেশ কয়েকবার খাবার।
৫) কখনও ঠাণ্ডা এবং গরম খাবার একসাথে খাবেন না।
৬) মদ জাতীয় পানীয় পান করার সময় ধীরে ধীরে পান করুন।
৭) খাবার পরে দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করুন।
৮) একই ধরনের খাবার না খেয়ে নানান ধরনের পুষ্টিকর খাবার মিলিয়ে মিশিয়ে খান।
এতো সময় ধরে যে কথাগুলো বললাম সেই কথাগুলো একেবারে আনকোরা নতুন, অশ্রুতপূর্ব এমন কিন্তু নয়। আমাদের বাড়িতে যখনই এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে তখনই মা, ঠাকুমা, দিদিমার মুখ থেকে এমন সব সাবধান বাণী উচ্চারিত হয়েছে বারংবার। সেগুলো যখন সমস্যায় পড়েছি তখন মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। আবার যেই একটু সুস্থ হয়েছি অমনি এইসব পালনীয় বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই মেজাজ দেখিয়ে বলেছি – আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, বিধিনিষেধের বেড়া দিয়ে আমার ইচ্ছেটাকে বাতিল করে দিওনা। বেশ মনে পড়ে, শরীরের এমনই এক নাকাল সময়েই বিবমিষা কথাটা প্রথম শুনেছিলাম আমার এক দিদির মুখ থেকে। সেই সব দিন পেরিয়ে এসেছি কিন্তু সমস্যার যন্ত্রণাগুলোকে বিস্মৃত হইনি। হয়তো তাই চন্দ্রিল ডাক্তারের চেম্বারে গুণধরকে দেখে এতো কথা মনে পড়ে গেল শুধু আপনাদেরকে শোনাবার জন্য।




















এমন বিষয়ে নিয়েও এতো ডিটেইলে লেখা যায়! খুব ভালো লাগলো।
অনেক কিছু জানলাম। 🙂