
সম্ভবত ১৯৯২ সাল ছিল সেটা। আমার তৎকালিন প্রতিবেশী অগ্রজপ্রতিম এবং সরকারি কলেজের অধ্যাপক সুখেন চক্রবর্তী জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি রাহুল সাংকৃত্যায়নের আত্মজীবনীর বাংলা সংস্করণে উৎসাহী কি না? আমরা, যারা স্কুলে থাকতেই “ভোলগা থেকে গঙ্গা” পড়েছিলাম বাংলায়, তাদের মুগ্ধ না হওয়ার কোনো উপায় ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ বলেছিলাম এবং কিছু একটা গ্রাহক মূল্যও দিয়েছিলাম তৎক্ষণাৎ।
১৯৯৩ সালের নভেম্বরে হাতে পেলাম প্রথম তিন খণ্ড। প্রকাশ করেছেন রাহুল সাংকৃত্যায়ন শতবর্ষ উদযাপন কমিটি, আর বইগুলোর মুখবন্ধ লিখছিলেন কলকাতার তৎকালিন পুলিশ কমিশনার তথা এই শতবার্ষিকী কমিটির চেয়ারম্যান, শ্রী তুষার তালুকদার। আমি শুনেছিলাম এই অনুবাদের উদযোগে তাঁর ভূমিকাই প্রবলতম। বেশ অবাক লেগেছিল, তখন রাজ্যে তথা দেশে বামপন্থী লেখক তথা বুদ্ধিজীবীর কোনো শর্টেজ নেই, কিন্তু রাহুলকে নিয়ে সবচেয়ে জরুরী কাজটা করছেন একজন আই পি এস অফিসার।
পড়া শুরু করে ভারি দমে গিয়েছিলাম। সেই সময়ের আমার কাছে অনুবাদটা বেস নিরেস এবং ‘ডেন্স’ ঠেকেছিল। পরে চেষ্টা করব বলে তাকে তোলা রইল বইগুলো। অনেক বছর পরে, সম্ভবত ২০১০ এর বইমেলায় ‘দে’জ’ এর স্টলে পেলাম চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ড। কিনেও ফেললাম, আহা, সেটটা তো কমপ্লিট হবে, আর কোনো একদিন পড়েও ফেলব নিশ্চয়ই।
কমপ্লিট সেট তাকে শোভা পাচ্ছিল গত পনেরো বছর ধরে।
প্রতি বছরই জুন জুলাই নাগাদ কলকাতায় আসতেই হয়, ব্যাংকের হিসেব বোঝা, পেনশন থেকে কাটা ট্যাক্সের ১৬ নং ফর্ম, ইনকাম ট্যাক্স ইত্যাদি সব দুরূহ কাজকর্মের ঠেলায়।
এবার এসে সাহস করে পাড়লাম রাহুলজিকে। কিমাশ্চর্যম, অত নিরেস ঠেকলো না অনুবাদ। একটানেই প্রায় পড়ে ফেললাম প্রথম খণ্ড, আপাতত দ্বিতীয় খণ্ডের মাঝামাঝি পৌঁছেছি। অসমাপ্ত রেখেই ফিরতে হচ্ছে, কিন্তু এই বই শেষ করার টানেই ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি, বুঝতে পারছি।
কেদারনাথ পাণ্ডে থেকে রামউদার দাস হয়ে রাহুল সাংকৃত্যায়ন হয়ে ওঠা এক দীর্ঘ যাত্রা। আর এই যাত্রার ভূগোল যেমন বিশ্বব্যাপি, তেমনি ব্যাপ্তি তার মানসিক ধ্যান ধারণা বিবর্তনের কথা, যেটা ওঁর পথ চলার সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টাতে পাল্টাতে চলেছে।
ক’দিন আগে Swati Bhattacharjee পোস্ট করেছেন সেই সব মানুষদের কথা যাঁরা লোভের বশীভূত হ’ন নি, নিজের পথেই হেঁটেছেন কোনোরকম লোভের কাছে সমর্পণ না করে।
মেধাবী কেদারনাথকে উত্তর এবং দক্ষিণ ভারতের বহু ধনী মঠ মাথায় করে রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল। জ্ঞান ছাড়া আর কোনো তৃষ্ণা নেই তাঁর। বৈরাগী সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নিয়েও রাজনীতিতে জড়িয়েছেন সক্রিয়ভাবে, আবার একই নিরাসক্তিতে ছাড়িয়েও নিয়েছেন নিজেকে। মঠের মোহান্ত থেকে কংগ্রেসে জেলা সম্পাদক সব ভূমিকাই পালন করেছেন, কিন্তু আঁকড়ে থাকেন কিছুই, সময়মতো হাঁটা দিয়েছেন নিজের পথে। সে পথ যে কোথায় যায়নি তার হিসেব রাখা মুশকিল।
অসাধারণ এই মহাজীবনী চমকে দেয় মাঝে মাঝেই, যেমন তিব্বত বাসের পর্বের এই তথ্য, “১৯০৭ এর কাছাকাছি যখন দলাই লামা আর চিনাদের বিবাদ হয়েছিল, এবং দলাই লামাকে পালিয়ে ইংরেজদের আশ্রয়ে দার্জিলিং আসতে হয়েছিল, তখন চিনারা সরাসরি তিব্বত শাসন করতে লাগল। তং-গো-লিঙ এর লামার এটাই অপরাধ ছিল যে চিনারা তাঁকে খুব সম্মান করত। ১৯১১ র পরে যখন দলাই লামা আবার শাসন ভার নিজের হাতে নিতে সফল হলেন তখন তং -গো-লিঙ এর মঠ তিনি কামান দিয়ে উড়িয়ে দিলেন আর লামাকে কুয়োয় ডুবিয়ে মারলেন। লামার সঙ্গে যা করলেন, কিন্তু মঠ ত বুদ্ধ আর বোধিসত্ত্বের দেবালয়ে ভরা, তার ওপর কামান চালানোটা কি মহম্মদের হামলার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল?”
ইতিহাস বড় জটিল!!
(এই দলাই লামা, বর্তমান দলাই লামার পূর্বসূরি।)
প্রথম খণ্ড থেকে আরেকটা উদ্ধৃতিও দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। এটা ১৯২২ সালের ঘটনা, রাহুল বা তৎকালিন নাম রামউদার দাস তখন ছাপরা জেলা কংগ্রেসের সেক্রেটারি।
” ওকদিন ব্রজকিশোর বাবু ও রাজেন্দ্র বাবু সভাপতি দেশবন্ধু দাসের বাসস্থান থেকে ফিরে আসেন। তাঁরা জোর দিয়ে বললেন, “আমরা দাস সাহেবকে আপনার প্রস্তাব সম্পর্কে বলেছি, আপনার সম্পর্কেও বলেছি। আপনি একবার গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করুন যাতে পরিবর্তবাদী ও অপরিবর্তনবাদীদের ঝগড়ায় আপনার প্রস্তাবটি চাপা না পড়ে থাকে।
২১শে ডিসেম্বর আমি দাস সাহেব যে বাংলোয় উঠেছিলেন, সেখানে গেলাম। খবর দেওয়ার পর বারান্দায় বসার হুকুম হল। বাইরে বারান্দায় বসে রইলাম। আধ ঘন্টা পরে আবার খবর দিলাম। আবার বসার হুকুম হল। ত্রিশ চল্লিশ মিনিট পার করে আবার খবর দিলাম, আবার বসার হুকুম হল। ভেতরে অনেক স্ত্রী-পুরুষ বসে হা-হা-হী-হী করছিল এবং কাযে ব্যস্ত এই অছিলায় আমাকে বসে থাকার আদেশ দেওয়া হচ্ছিল। আমার ভীষণ রাগ হল এবং সেখান থেকে সোজা ফিরে এলাম।”
চাকরি জীবনে বহুবার দেখা চেনা একটা ছবি।
ফিরে এসে দেশবন্ধুকে সংস্কৃতে একটা চিঠি লিখেছিলেন রাহুল। তার অংশবিশেষ এরকম, “……..মহৎ কৃচ্ছয়া পদ্ময়াগচ্ছম, কিন্তু, হস্ত। ধনীক সম্প্রদায় এব দোষী ন কাচিদ ব্যক্তিঃ।………. কদাপি ন অনির্ধনঃ অশ্রমজীবী বা – শ্রমজীবী পক্ষং গ্রহিতুং সমর্থং। …….. বড় লোকদের থেকে আলাদা থাকা এবং অপরের মনোভাব খেয়াল করা এই দুই ব্যাপারে আমার এই ঘটনা থেকে ভাল শিক্ষা হয়েছিল, একরকমভাবে বড়লোকদের প্রতি চিরকালের ঘৃণা জন্মাল।”
যে প্রস্তাব নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিলেন হিন্দু সন্ন্যাসী রামউদার দাস ওরফে রাহুল সাংকৃত্যায়ন, সেটি ছিল বুদ্ধগয়ার মন্দিরটি একড়ি হিন্দু মঠের কবল থেকে উদ্ধার করে বৌদ্ধদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার। বৌদ্ধগয়ায় যাঁরা গেছেন, তাঁরা দেখে থাকবেন যে মন্দিরের ঠিক বাইরের একটি অংশ এখনো একটি হিন্দু সম্প্রদায়ের কবজায় আছে।
পড়তে পড়তে নিজেকেই প্রশ্ন করছিলাম, এবারে এতো সহজে পড়ে ফেলছি কী করে, আগের বারে পারলাম না কেন?
খুব নিশ্চিত নই, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে অবসর নেওয়ার পর দীর্ঘ হিন্দি উপন্যাস পাঠ করার যে অভ্যাসটা করছি, সেটা হয়তো কাজে দিয়েছে খানিকটা। আপাত আড়ষ্ট কিছু বাংলা বাক্যের আড়ালের সরস হিন্দি লাইনগুলো হয়তো উঁকি মারছে, হয়তো তাদের দেখতে পাচ্ছি।
এই বই আসলে দুটো সমান্তরাল যাত্রার কথা শোনাচ্ছে। একটা ভৌগলিক, যার ব্যাপ্তি সত্যিই বিশাল, প্রায় বিশ্বব্যাপী; দ্বিতীয়টা আইডিয়ার, গভীর ভাবে আস্তিক হিন্দু দর্শনে নিজেকে দীক্ষিত করে, অতৃপ্ত রাহুল পৌঁছলেন অনিশ্বর বৌদ্ধধর্মে, তারপরে সেটাকেও অতিক্রম করে মার্কসবাদে।
তাঁর মতবাদ মানি বা না মানি, এর শেষ না জানা অবধি রাহুল সাংকৃত্যায়নের সঙ্গে চলা ছাড়া উপায় নেই আমার।










