বেশিদিন না, এই মাসকয়েক আগেই এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। চিকিৎসক দম্পতি, দুটি ছেলেই লেখাপড়ায় (এবং অন্যান্য বিষয়েও) তুখোড়। ব্যাপারস্যাপার একেবারে হিংসে করার মতো। বড়টি আইআইটি-তে। ছোটটি ডাক্তারি পড়বে বলে মনস্থ করেছে। শুনে বললাম, বাহ্, ভালোই তো। এখন তো অনেক সিট। পেতে তেমন সমস্যা হবে না। ধারণাটা এক অর্থে ভুল নয়, কেননা আমরা যখন ডাক্তারি পড়েছি, তখন রাজ্যে সাতটি মেডিকেল কলেজ, সাকুল্যে সাড়ে সাতশ এমবিবিএস সিট। আর এখন এই রাজ্যে ঠিক কতগুলো মেডিকেল কলেজ এবং কত এমবিবিএস আসন, চট করে বলা মুশকিল।
কিন্তু বন্ধুটি আমার অজ্ঞতাপ্রসূত উত্তরে একেবারে হতবাক হয়ে গেল। তার কথায় বুঝলাম, আমি কিছুই খবর রাখি না। মোট নম্বর সাতশ কুড়ির মধ্যে অন্তত সাতশ না পেলে দেশের সেরা কলেজগুলোয় ভর্তি হওয়ার আশা না রাখাই ভালো, আর অন্তত ছশো সত্তর-আশি না পেলে রাজ্যের সেরা কলেজগুলোয় ভর্তির নিশ্চয়তা থাকে না। প্রায় সব বিষয়ে নিজের প্রগাঢ় অজ্ঞতা নিয়ে আমার কোনও কালেই সংশয় নেই, কিন্তু দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন যে এভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও প্রভাব ফেলেছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ কথাটুকু এতদিন জানতাম না দেখে যারপরনাই লজ্জিত হলাম।
তো এই দফায় আর অন্ধকারে থাকার সুযোগ নেই। আলোকপ্রাপ্ত হওয়াটা বাধ্যতামূলক। দেশের ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষায় সাতশ কুড়ির মধ্যে সাতশ কুড়ি পেয়ে বসেছে একেবারে সাতষট্টিজন। সাতষট্টিজনই, চলচিত্তচঞ্চরি-র ভাষায়, ‘সেকেন্ড টু নন’! পরিস্থিতি এমনই, প্রথম স্থানাধিকারী সকলেই যদি দেশের সেরা চিকিৎসা-শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করবেন বলে মনস্থ করেন, তাহলে স্থানসঙ্কুলান হবে না। অর্থাৎ, এই ফল বলবৎ থাকলে নিট-ইউজি-র কাউন্সেলিং ভিন্ন অর্থের কাউন্সেলিং হয়ে উঠবে – মানে, কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীদের বাবা-বাছা করে বোঝাবেন, যাতে তাঁরা সকলেই একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানে পড়ার ব্যাপারে জেদাজেদি না করে অন্যত্র লেখাপড়া করতে রাজি হন – বেশ পরাবাস্তব ব্যাপার, তাই না!
কিন্তু ব্যাপারটা তো নিছক রসিকতার বিষয় নয়। ডাক্তারির এই সর্বভারতীয় প্রবেশিকা, নিট-ইউজি, সে পরীক্ষা নম্বরের এমন বাড়বাড়ন্ত বেশ সাম্প্রতিক ঘটনা। মোট সম্ভাব্য নম্বর সাতশ কুড়ির মধ্যে সাতশ অতিক্রম করার ঘটনা ঘটে মাত্র পাঁচ বছর আগে – ২০১৯ সালে – তার আগে অবধি সর্বোচ্চ মার্কস ছশো আশি ছশো নব্বইয়ের ঘরেই ঘোরাফেরা করত। কিন্তু ২০২০ সাল থেকেই চমকপ্রদ ব্যাপারটি – যাকে বলে ‘স্মল স্টেপ ফর ম্যান, জায়েন্ট লিপ ফর হিউম্যানিটি’ – ঘটতে শুরু করল, অর্থাৎ সাতশ কুড়ির মধ্যে পুরোপুরি সাতশ কুড়ি পেতে শুরু করলেন কেউ না কেউ। এবং ইতোপূর্বে যে সাতশ টপকানোই দুস্তর বোধ হচ্ছিল, দেখা হলো বছর বছর সে বাধা টপকাচ্ছে আরও বেশিজন, শুরুতে একশজন, পরের বছর দুশো জন, সংখ্যাটা ক্রমবর্ধমান। এবারে তো সেই সংখ্যা বাইশশোর বেশি!
আমাদের সমস্যা হলো – ফুসকুড়ি নিয়ে মাথা না-ঘামানোটা হয়ত স্বাভাবিক প্রবণতা, কিন্তু ফুসকুড়ি পেকে এমনকি ফোঁড়া হয়ে যাবার পরেও কেউ গুরুত্ব দিই না, ফোঁড়া পেকে ঘা হয়ে চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়ানো অবধি সবকিছুই শান্তিকল্যাণ হয়ে থাকে। নইলে আগেই প্রশ্ন করা যেত – প্রশ্ন করা উচিত ছিল – দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমন কী আশ্চর্য পরিবর্তন এলো, যাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হারকেও লজ্জায় ফেলে দিচ্ছে নম্বর-বৃদ্ধির হার! ঠিক কেন বছর বছর একই কোচিং সেন্টারগুলো থেকে প্রথম দশের সিংহভাগ (বা সবাই) আসেন? এমনকি এই শঙ্কাও মনে জাগেনি, যে, প্রবেশিকা পরীক্ষার এমন কেন্দ্রীকিকরণ দুর্নীতিকেও কেন্দ্রীভূত ও জটিল করে তুলতে পারে। নইলে বিশেষ কিছু অঞ্চল থেকে বছর বছর দারুণ ফল হয় কেন? প্রশ্নগুলো করা হয়নি, তাই এবারে এই চমকপ্রদ উত্তর!
দেখুন, এরকম করে নম্বরের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির ঠেলায় কোনও না কোনও বছর একসঙ্গে পঞ্চাশজন ফুল মার্কস পেয়ে বসবেন, তা তো লজিকালি অসম্ভব নয়। এমনকি, সার্বিকভাবে নম্বরের হার বেড়ে চলেছে – মানে, সাড়ে ছ’শো নম্বর পেলে গতবার র্যাঙ্ক হতো সাতহাজার, আর এবারে তিরিশ হাজার – সেও ছাত্রছাত্রীরা পারফেকশন জাতীয় উৎকর্ষের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছে জাতীয় যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করে ফেলা যেত। গোল বাধালো অসম্ভব কিছু নম্বর। পরীক্ষায় মোট প্রশ্ন একশ আশি, সঠিক উত্তরের জন্য প্লাস চার, ভুল উত্তরে মাইনাস এক। অর্থাৎ, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নম্বর সাতশ কুড়ি (সবক’টি উত্তর সঠিক), সম্ভাব্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নম্বর সাতশ ষোলো (একটি প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া এবং বাকি সবগুলো উত্তর সঠিক), সম্ভাব্য তৃতীয় সর্বোচ্চ নম্বর সাতশ পনের (একটি ভুল উত্তর, বাকিগুলো ঠিক)। সেক্ষেত্রে সাতশ আঠারো বা সাতশ উনিশ পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। অথচ এবারে পেয়েছে।
সে নিয়ে হইচই হতেই জানা গেল, অনেকের পরীক্ষা নাকি সময়ে শুরু করা যায়নি, তাই তাঁরা ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিছু নম্বর (গ্রেস) পেয়েছেন, সেজন্যই এমন পরিস্থিতি। কিন্তু এই গ্রেস-এর কথাটা শুরুতেই বলা গেল না কেন? আপাতত সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে গ্রেস-প্রাপকদের পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তারা তো সংখ্যায় মাত্র দেড় হাজার – এদিকে এবছর নম্বরের বান ডাকার চোটে র্যাঙ্ক পিছিয়ে গিয়েছে সাঙ্ঘাতিকভাবে – সাতশ দশ পেলে গতবারে র্যাঙ্ক ছিল পঁচাত্তরের মধ্যে, এবারে চারশ থেকে ছশোর মাঝামাঝি – ছশো আশি পেলে গতবার দেড় হাজার থেকে সতেরোশো, এবারে ন’হাজারের আশেপাশে – আর ছ’শো পেলে গতবারের আটাশ-উনত্রিশ হাজার থেকে এবারে আশি হাজার – দেড় হাজার জনের পরীক্ষা নতুন করে নিয়ে সেই র্যাঙ্কে কতটুকু বদল হওয়া সম্ভব?
এছাড়া আরও কত চমক-ই না দেখলাম। গুজরাটের জনৈক পরীক্ষার্থী নিট পরীক্ষায় সাতশ পাঁচ পেয়েছেন, বাকি সব বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিজিক্সেও খুব ভালো নম্বর বাদে তা সম্ভব হয় না – কিন্তু তিনি বোর্ড পরীক্ষায় ফিজিক্সে মাত্র এক (র্যাঙ্ক নয়, মার্কস) পেয়েছেন (লজিকালি সম্ভব, নিশ্চিত)। দেখা গেল, গুজরাটের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেন্টারে পরীক্ষা দিতে গিয়েছেন ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যের ছাত্রছাত্রী (এক দেশ এক পরীক্ষা, অতএব ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে এমন করে নিজের দেশকে পরীক্ষার দিনটিতেই জানতে চাওয়ার আগ্রহও, নিশ্চিতভাবেই, লজিকালি সম্ভব)। পাটনা-র দিকে অবশ্য সত্যভাষণের একটা ধারা চিরকালই রয়েছে – সেখানে অন্তত একজন স্পষ্টভাষায় স্বীকার করে নিয়েছেন, যে, তিনি অর্থের বিনিময়ে প্রশ্নপত্র ও উত্তর পেয়ে গিয়েছিলেন। প্রশ্নপত্রের রেট ইত্যাদি ডিটেইলসও সংবাদপত্রের কল্যাণে এই মুহূর্তে অনেকেই জানেন, কাজেই সে নিয়ে আলোচনা অবান্তর – অবশ্য দেশে এখন প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের রমরমা চলছে, সারা দেশে সরকারি কলেজের তুলনায় বেসরকারি কলেজের এমবিবিএস আসন বেশি – ছেলেমেয়েদের বেসরকারি কলেজে কমপক্ষে দেড়-দুই কোটি টাকা দিয়ে ডাক্তারি পড়ানোর চাইতে পঞ্চাশ লাখে প্রশ্ন কেনাটাই ‘ভ্যাল্যু ইনভেস্টিং’।
ভরসার কথা এই, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এখনও সেভাবে দুর্নীতি হয়েছে বলেছে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি এও জানিয়েছেন, পরীক্ষায় কোনও গোলযোগ হয়ে থাকলে (অর্থাৎ আদৌ কোনও গণ্ডগোল না-ও হয়ে থাকতে পারে), পরীক্ষা-নিয়ামক সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতএব, আশা করা যায়, বিশেষ কিছুই হবে না – বা হলেও দু’চারটে চুনোপুঁটি বরখাস্ত-টরখাস্ত হয়ে পুরোটাই চাপা দিয়ে ফেলা যাবে। দুর্নীতি বা অনিয়ম দেখে দেখে ক্রুদ্ধ হতে আমরা ভুলে গেছি অনেক আগেই – সুতরাং, যাঁদের বাড়িতে নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন ছাত্রছাত্রী নেই, তাঁরাও বিশেষ বিচলিত হবেন না। সবমিলিয়ে স্থিতাবস্থা জারিই থাকবে, এমন আস্থা অমূলক নয়।
আর যাঁরা ভাবছেন, এর ফলে পরীক্ষাব্যবস্থার উপর, এমনকি ভাবীকালের চিকিৎসকদের উপরই সাধারণ মানুষ ভরসা হারিয়ে ফেলবেন, তাঁরাও মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। কোচিং সেন্টারের রমরমা, শিক্ষার বেসরকারিকরণ ইত্যকার পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার (এবং স্বাস্থ্যের) পণ্যায়ন ঘটেছে অনেক আগেই। যার পয়সা আছে, সে তত ভালো কোচিং পাবে, সে তত ভালো প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দেবে (মহার্ঘ্য কোচিং সেন্টারে সাজেশনের নামে প্রশ্ন বিক্রি হয় কিনা, সেসব তর্কযোগ্য প্রসঙ্গে আর যাচ্ছি না)। তারপরও যদি পরীক্ষায় ভালো না করে, তো যার পয়সা আছে সে তত জবরদস্ত ডিগ্রি কিনবে। মেনে নিয়েছেন তো? এবারে যার পয়সা আছে, সে তত গুছিয়ে প্রশ্ন কিনবে, বাকিদের টপকে র্যাঙ্ক করবে – কিছু মেধাবী ছাত্রছাত্রী অবশ্যই এরই মধ্যে টক্কর দিতে থাকবে, অন্তত দিতে পারছে এখনও, কিন্তু সিস্টেম যত মজবুত হবে মেধা ও পরিশ্রমের ভূমিকা ততই কমে আসবে – সবই যদি মানতে পেরেছেন, তাহলে এটুকু মেনে নিতে অসুবিধে কোথায়?











