(লং পোস্ট অ্যালার্ট)
১
নতুন বছর অপ্রত্যাশিত হিম নিয়ে নেমে এসেছিল আমার নিঃসঙ্গ যাপনের আঙিনায়। তারই মধ্যে একদিন মামাতো দিদির বিপন্ন, কিছুটা বিভ্রান্ত গলা পেলাম ফোনের ওপারে। “শোন না, আমার নাম এসেছে এসআইআরের শুনানির জন্য — ম্যাপিং করা যাচ্ছে না নাকি!”
বন্ধ্যা মনের জমিনে আজকাল আশঙ্কার চেয়ে রাগ বেশি সহজে জন্ম নেয়। যে মানুষটার ঠাকুর্দা স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৬২তে মৃত্যু পর্যন্ত রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য, পূর্বপুরুষদের যে বাড়িতে দিদির জন্ম, সেই বাড়িটির বয়সই দেড়শো পেরিয়েছে – এমন মানুষের মানচিত্র মেলাতে পারছে না অর্বাচীন নির্বাচন কমিশন? দিদিকে আশ্বস্ত করে বললাম, দেখছি।
রাগ প্রশমিত হওয়ার পরে ভাবতে বসলাম, যে প্রমাণগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছি মনের অন্দরে, তার পাথুরে অস্তিত্ব দাখিল করতে হবে। চিৎকার আর গা-জোয়ারি করে রাজনৈতিক অধিকার হাসিল করা গেলেও যেতে পারে, নাগরিক অধিকার ছিনিয়ে আনা সম্ভব নয়।
দিদির পাসপোর্ট রয়েছে জানতাম। নিজের না থাকলেও এটা জানি, পাসপোর্টে বাবার নাম থাকা আবশ্যিক। এবারে যদি বহু পুরোনো ভোটার তালিকায় দিদির বাপঠাকুর্দা সহ গুষ্টির নাম বের করে আনতে পারি, সেটা হয়ত দিদির পক্ষে ‘ঠোস সবুত’ হবে।
২
আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য না নিলে এহেন গুরুতর কাজে সফল হওয়া অসম্ভব। অগত্যা, গুগল। তামাদি হয়ে যাওয়া ভোটার লিস্টের সন্ধানে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম মোবাইলের স্ক্রিনে। ১৯৫২ থেকে খোঁজ আরম্ভ হলো।
কাজটা সহজ নয়। বাড়ির ঠিকানা স্থবির থাকলেও বিধানসভা কেন্দ্র সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা যুবকের মতো অস্থির — কখনো বৌবাজার, কখনও মুচিপাড়া তো কখনো শিয়ালদায় পিছলে পিছলে গিয়েছে এক এক বছরে। স্টেট আর্কাইভের সযত্নরক্ষিত নথি সতর্কভাবে ডিজিটাইজ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হলদেটে পোকায় কাটা কাগজে অসংখ্য কালো কালো পিঁপড়ের মতো নাম আর রাস্তার সারণি থেকে হারানো পূর্বজদের উদ্ধার করা রীতিমতো কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। সন্ধেবেলায় আরম্ভ করে সাফল্য পেলাম মধ্যরাত্রে। রাত বারোটায় ১৯৫৬, ১৯৬১ আর ১৯৬৬ সালের তালিকার কপি পাঠিয়ে দিলাম দিদির হোয়াটস্যাপে। এর মধ্যে ছেষট্টিতে নিজের মায়ের নামও দেখতে পেলাম সেই লিস্টে। উনিশশো একষট্টিতে তো মায়ের আঠারো, তবে সেই তালিকায় নাম নেই কেন ভাবতে ভাবতে ঝাঁ করে মনে পড়ে গেল তখন ভোটাধিকারের ন্যূনতম বয়স ছিল একুশ বছর। অনেক পরে, সম্ভবত ১৯৮৯ সালে সেটা আঠারো বছর করা হয়।
ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। ঘুম কিন্তু এলো না চোখে। নানারকম উল্টোপাল্টা চিন্তাস্রোতে ঘুরে বেড়িয়ে মন থিতু হয়ে বসল হাঁটু গেড়ে। আবদার রাখল আমার কাছে — দিদিরটা তো খুঁজে দিলে দিব্যি, তোমার নিজের বাপঠাকুর্দার নাম দেখতে ইচ্ছে হোলো না যে বড়?
৩
আবার উঠে আলো জ্বালিয়ে বসলাম। কিন্তু এবারে বুঝলাম, সন্ধান তত সহজ নয়। শহর কলকাতার ভোটার লিস্ট অতকাল আগের হলেও অনেক পরিচ্ছন্নভাবে তৈরি, অনেকটা গুছোনো — বাড়ির নম্বর, রাস্তার নাম ধরে সেখানে খোঁজ করা সোজা। মফস্বলে সেই কাজই শতগুণে কঠিন।
বাবা মায়ের বৈবাহিক শ্রেণীবৈষম্য তাদের চিরতরে হারিয়ে ফেলার এতকাল পরে দিব্যি অনুভব করতে পারলাম। যতই পিনকোড ৭০০০৫৮ হোক, মনে পড়ে গেল ছেলেবেলায় শোনা মামার বাড়ির টিপ্পনি — আগরপাড়া? ওটা আবার প্রপার ক্যালকাটার মধ্যে পড়ে নাকি?
তা, তারা সে কথা বলতেই পারে। শিয়ালদা আর হাওড়া স্টেশন, মেডিক্যাল কলেজ আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে যে বাড়ি অবস্থিত, তার বাসিন্দাদের নিজেদের বাসস্থান নিয়ে দেমাক থাকা অস্বাভাবিক নয়। দেড়শো বছরের প্রাচীন মামার বাড়ি এখনো সাবেক ঠিকানায় অবস্থিত, রাস্তার নামও পরিবর্তিত হয়নি।
আমার বুড়োদাদুর বাড়ি তো বিক্রিই হয়ে গিয়েছে বত্রিশ তেত্রিশ বছর আগে। পথের নাম মনে রয়ে গিয়েছে, কারণ আমার ডাক্তারি পাশের পরে মেডিক্যাল কাউন্সিলের প্রদত্ত সার্টিফিকেটে সেই ঠিকানাই লেখা ছিল। পরে তা পালটে নেওয়া হলেও প্রথম সার্টিফিকেটটি আজও যত্নে তুলে রাখা আছে আলমারিতে। না থাকলেও হরিমোহন চ্যাটার্জি রোডকে ভুলে যাওয়া এই জীবনে আমার পক্ষে সম্ভব হবে না কখনও।
খুঁজতে খুঁজতে হাল্লাক হলেও তাই হাল ছেড়ে দিতে পারিনি। শেষকালে, ১৯৬১তে এসে আবিষ্কার করলাম, সে ঠিকানা রয়েছে বটে, তবে স্বনামে নয়, বেনামে। তখন সে রাস্তার নাম ছিল মুখার্জি পাড়া রোড। বিধানসভা কেন্দ্র খড়দহ, পৌরসভা পানিহাটি, ডাকঘর আগরপাড়া। সেই তালিকা বাংলায় লেখা – পদবীর বর্ণানুক্রমে সাজানো। না না, কোনও জাতপাতের হিসেবে নয়, স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণের হিসেবে। বাড়ির নম্বর টম্বরের বালাই নেই।
বুড়োদাদুর নামের সঙ্গে তাঁর চতুর্থ ও পঞ্চম পুত্রের নাম পাওয়া গেল তালিকায়। আর ১৯৫৬র লিস্টে পাওয়া গেল বুড়োদাদু, সেজজ্যাঠা আর ন’জ্যাঠার নাম (বাবার তখনও একুশ হয়নি) — সেই সেজজ্যাঠা, ব্যবসা করবেন বলে ঠাকুমার গয়না নিয়ে ডুব দিয়েছিলেন বলে বুড়োদাদু যাঁকে ত্যজ্যপুত্র করেছিলেন, মুখ দেখেননি আমৃত্যু।
নামগুলোর উপর হাত বোলাতে বোলাতে আমার ভীষণ শীত করে উঠল হঠাৎ। মনে হলো, আমার সমস্ত পূর্বপুরুষরা যেন জেগে উঠেছেন আমার আঙুলের দরদী ছোঁয়ায় — অন্য কোনও পৃথিবীর রাত্রির অন্তরাল থেকে তাঁরা যেন নেমে এসেছেন এই জড়জগতের হিমেল ভোরে। জানলার কাঁচে বাষ্প জমেছে, বাইরে পাতলা হচ্ছে অন্ধকার। আর আমি বসে বসে ভাবছি, অশ্রুতর্পণের এত জোর থাকতে পারে? নাকি সবই আমার কল্পনা?
৪
সেই বিবর্ণ কাগজের ফোটোকপি আমাকে হাত ধরে অর্ধশতাব্দী পিছিয়ে নিয়ে চলে গেল অনায়াসে। ঐ তো, বাবাদের নামের পাশেই জ্বলজ্বল করছে চাটুয্যেদের পুরো জ্ঞাতিগোষ্ঠীর নাম — যাদের ক্লাইভের আমলের কেল্লার মতো বাড়িতে থাকত আমার ছোট্ট বন্ধু শুভ। কোন শরিকের ছেলে ছিল সে আজ আর মনে নেই, তবে ওদের বাড়িতেই প্রথম এবং শেষবার দেখেছিলাম খাটা পায়খানা আর পাতালে ঢুকে যাওয়া বিরাট চৌকোণা পাথরের মেঝে। যেন স্পষ্ট শুনতে পেলাম শুভ-র গলা — ‘দ্যাখ দ্যাখ খুকুদি, বাড়িটা কেমন বসে যাচ্ছে – একদিন আমরা সব্বাই ঘুমের মধ্যেই অতলে তলিয়ে যাব, দেখিস!’
লিস্টের নিচের দিকে খুঁজে পেলাম নন্দীদের নাম, আমাদের বাড়ির পশ্চিমদিকে থাকত তারা — যাদের বাড়ি সংলগ্ন গোয়ালের গন্ধ নিয়ে মায়ের অনুযোগের অন্ত ছিল না, আবার যাদের দোকানের মুদিখানার জিনিসপত্র আর গোরুর দুধ না হলে চলতোও না মায়ের।
আরও একটু হাতড়ে পেয়ে গেলাম আমার শিশুবেলার পাড়ার ইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কর্ণধার আর তাঁর কড়া হেডমিস্ট্রেস স্ত্রীর নাম। বাবা ডাকতো শম্ভুদা আর বৌদি বলে — তাঁর বড়ছেলের বিয়ের নেমন্তন্নে খেতে গিয়েছিলাম সপরিবার, মনে পড়ল সেটাও।
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চললেও বাস্তবে ফিরতে ইচ্ছে করছিল না একটুও। তাই ১৯৬৬র লিস্ট খুঁজতে বসে পড়লাম। মা থাকলে বলতো — সগুষ্টি পাগল!
৫
তখন অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা। আর্কাইভ থেকে আপলোড করা তালিকায় নতুন একটি বিধানসভার নাম দেখলাম, পানিহাটি। পার্ট নম্বর পালটে গেলেও হরিমোহন চ্যাটার্জির নামের রাস্তাকে খুঁজে পেলাম এবার। কিন্তু বাবা-জেঠু কিংবা বুড়োদাদু, হদিশ পেলাম না কারোরই। সংশোধিত অতিরিক্ত তালিকাও আঁতিপাঁতি করে খুঁজলাম। নেই।
হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল, ১৯৬৬তে জেঠু কাজ করতেন রূপনারায়ণপুরে, হিন্দুস্তান কেবলসে। মায়ের কাছে শুনেছি, ১৯৭২এ মারা যাওয়ার আগে অবধি বুড়োদাদু বছরে ছ’মাস করে সেখানে গিয়ে থাকতেন।
কি ভেবে খুলে ফেললাম ছেষট্টি সালের বর্ধমান জেলার তালিকা। অত বড় জেলা, কোথায় খুঁজব ছোট্ট রূপনারায়ণপুরকে? শুনেছিলাম আসানসোলের কাছে, কিন্তু সারা আসানসোল ঘেঁটেও খোঁজ পেলাম না সে জায়গার। অগত্যা ফের গুগলের শরণাপন্ন হলাম এবং জানতে পারলাম রূপনারায়ণপুর বারাবনি বিধানসভার অন্তর্গত — এই তালিকা খোঁজার আগে যে নাম আমি শুনিইনি মোটে।
বারাবনি বিধানসভার কোনও একটা অখ্যাত পার্টে হিন্দুস্তান কেবলসের কোয়ার্টারবাসী নির্বাচক তালিকায় ন’জেঠু, জেম্মা আর বুড়োদাদুর নাম পেলাম। কিন্তু বাবা কই?
মায়ের কাছে শুনেছিলাম বিয়ের আগে বাবার ছন্নছাড়া, উড়নচণ্ডী জীবনযাপনের কথা। তখন বাবা দিনের বেলা সোদপুরের সুকচরে একটা ইশকুলে পড়াতো আর সারা সন্ধে পার্টি অফিসে চা সিগারেট ধ্বংস করবার পরে পাড়ার ল্যাম্পপোস্টে পোস্টার মেরে বেড়াতো। কোনওদিন বাড়ি ফিরত, কোনওদিন ফিরত না। কলেজের চাকরিটা তখনও পায়নি।
বুড়োদাদু বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য একঘর ভাড়াটে বসিয়েছিলেন। তারা ছিল পগেয়া পাজি। হয়ত লিস্ট তৈরি করতে আসা লোকেদের বলেছিল, মালিক অন্যত্র থাকে — এখানে কোনও ওয়ারিশ নেই।
আমার বেচারা, গৃহহীন হয়ে থাকা ভবঘুরে বাবাটার জন্য আবার গাল গড়িয়ে জল নামল আমার।
চব্বিশ পরগণার ১৯৬৮ সালের ভোটার লিস্ট হলো ১৯৬৬র অনুরূপ, তাই সেটা খুঁজেও লাভ হলো না কিছু।
এরপর খুঁজতে হলে ১৯৭০-৭১ খুঁজতে হবে। (তারপর আর্কাইভের ওয়েবসাইটে আর তখনকার তালিকা নেই। পরবর্তী লিস্ট ১৯৯৩ সালের)।
আন্তর্জালে ১৯৭১ সালের তৎকালীন চব্বিশ পরগণার ভোটার লিস্ট খুঁজতে গিয়ে চূড়ান্ত হতাশা গ্রাস করল আমায়। প্রায় পঞ্চাশটি বিধানসভা কেন্দ্রের নাম থাকলেও ঐ তালিকায় পানিহাটি কেন্দ্রের কোনও উল্লেখ নেই।
অতীতের গলিঘুঁজি দিয়ে হোঁচট খেয়ে চলতে চলতে হঠাৎই যেন একটা বন্ধ দেওয়ালের সামনে এসে রুদ্ধ হয়ে গেল আমার পথ। আর কোনও উপায় রইল না খোঁজার।
৬
অর্থহীন সন্ধানের প্রয়োজন নেই, জানি। কোনও সরকারের কোনও নির্বাচন কমিশন আমার অস্তিত্বের বৈধতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলেনি। তুললেও আমার কিছু যাবে আসবে না। কারণ আমার সম্পত্তির রত্নভাণ্ডার আমার হৃদয়ে – সেখানে বসত করে আমার সমস্ত আপনজন, আমার ফেলে আসা চিনেমাটির টুকরো বসানো মোজাইকের মতো জীবন, আমার বাবা মায়ের খেলনাবাড়ির মতো পরিযায়ী সংসার, যার সবটুকু আদর আর স্বপ্ন মেখে আমার বড় হওয়া। সেই সাকিন ছিনিয়ে নেওয়ার সাধ্য নেই কোনও শাসনযন্ত্রের।
তবু, একবারের জন্য হলেও লালচে ছেঁড়া ছেঁড়া কাগজে কোনও বিস্মৃতপ্রায়, অধুনা বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রেসে যত্নে ছেপে আসা থুত্থুড়ে ভোটার তালিকায় সেই খেলনাবাড়ির সংসারের দুই কুশীলবের নাম একসঙ্গে দেখার আকুলতায় ঝাপসা হয়ে আসে আমার প্রৌঢ় দু’চোখ।
শীত চলে যাচ্ছে। পলাশ ফুটছে একটা দুটো করে। মায়ামাখা ভোরের কুয়াশা ছিঁড়ে চটপট উঠে পড়ছে কেজো রোদ্দুর। ছুটির বিজন দুপুরে কোকিলের অশান্ত ডাক আমাকে নিয়ে যেতে চাইছে ঠিকানাহীন নিরুদ্দেশে – সেখানে পৌঁছলেই হয়ত দেখতে পাবো, কোনও অনামা ইশকুলবাড়ির রংচটা পলেস্তারা খসা দেওয়ালের একলা পেরেক থেকে ঝুলে রয়েছে ঝুরঝুরে কাগজের ওপর কীটদষ্ট অক্ষরমালায় সাজানো একটা নিখোঁজ নামপঞ্জী, যার মুকুটে গোটা গোটা করে লেখা রয়েছে –
পানিহাটী বিধানসভা কেন্দ্রের নির্ব্বাচক তালিকা, ১৯৭১
এমনটা তো হতেই পারে, তাই না?










