শিল্প থেকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গণ পরিবহন সমস্ত ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনা তুলে বা নষ্ট করে দিয়ে সব কিছুর বেসরকারিকরণ (Privatization), ব্যক্তি বা পারিবারিক মুনাফাকরণ (Profiteering) এবং কর্পোরেটকরণ (Corporatization) শাসকদের আজকের নয় বহুদিনের পরিকল্পনা। কেন্দ্রে কংগ্রেস ও রাজ্যে বাম সরকার চালু করে। তবে ধীর লয়ে, কায়দা করে ও ঘুরপথে। বর্তমান কেন্দ্রের বিজেপি ও রাজ্যের তৃণমূল সরকারের বৈশিষ্ট্য তারা প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত করেছেন শুধু নয় একদম খুল্লাম খুল্লা সরাসরি ভাবে করেছেন ও করছেন। কোন পরিকল্পিত দুষ্কর্ম করলে নির্বাচিত সরকার কে তার জন্য সেরকম অজুহাত খাড়া করতে হয় এবং ভোটদাতাদের সেইভাবে বোঝাতে হয়। যদি ‘ বি এস এন এল ‘ কে নিষ্কর্মা না করি তাহলে মুকেশ আম্বানির জিও র কাছে তার মূল্যবান সম্পদ গুলি তুলে দেই কি করে? যদি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সেক্টরের প্রাইম সংস্থাগুলিকে অকেজো না করি তাহলে দেশ বিদেশের সমস্ত বরাত গৌতম আদানি কি করে পাবেন? যদি রাজ্যের সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলি অব্যবস্থাসম্পন্ন না হয় তাহলে মাত্র এক টাকায় জমি দিয়ে ই এম বাইপাসের পাশে ব্যাঙের ছাতার মত বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে তুলে মানুষের পকেট কাটা যাবে কি করে? সরকারি বিদ্যায়তন গুলি যদি নরক বা ভূতের বাসা না বানাই তাহলে গ্রাম শহরে মানুষ বাচ্চা দের নিয়ে প্রাইভেট স্কুলের দিকে ছুটবে কেন? সরকারি গণ পরিবহন ব্যবস্থা যদি ভেঙে না ফেলি তাহলে মানুষ বেশি খরচের প্রাইভেট ক্যাব আর ভলভো বাসে চড়বে কেন? এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। থাক।
এই প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবে তাই প্রথমে চলল সরকারি সংস্থাগুলিকে পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু করে দেওয়া র অভিযান। কাজ ও কাজের বরাত এবং আর্থিক বরাদ্দ না দিয়ে, নীতি পঙ্গুত্ব নীতি নিয়ে, ম্যানেজমেন্টে ধ্বংসাত্মক ব্যক্তিদের বসিয়ে, কর্ম সংস্কৃতি নষ্ট করে, নিষ্ঠাবান কর্মীদের মনোবল নষ্ট করে, কর্মীদের অবসরের পর গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক নিয়োগ না করে, প্রশিক্ষণ ও সুপারভিশন বন্ধ করে, পেটোয়া কিছু দালালকে দিয়ে সংস্থার মধ্যে অশান্তি ও নৈরাজ্যের পরিবেশ তৈরি করে, বছরের পর বছর সংস্থার লোকসান দেখিয়ে সেগুলির অবসান (Liquidation) ঘটানো। তারপর গোপন বোঝাপড়ায় সেটির অমূল্য সব সম্পদ জলের দরে শিল্পপতি ও কর্পোরেট দের হাতে তুলে দেওয়া। নতুন জমানায় এর সঙ্গে যুক্ত হল কোন ক্ষেত্রেই স্থায়ী দক্ষ কর্মী ও শ্রমিক নিয়োগ না করে বিভিন্ন কায়দায় টাকা পয়সা নিয়ে কিছু অদক্ষ কর্মীকে অনেক কম পারিশ্রমিকে অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক হিসাবে নিয়োগ, কাজগুলি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে (Outsourcing) করানো ও কমিশন সংগ্রহ; শনি, রবি এবং অন্যান্য বিশেষ দিন অথবা উৎসবে ছুটি থাকা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ছুটি দিয়ে সরকারি অফিসগুলিতে প্রচুর কর্মদিবস নষ্ট করে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিষেবা একেবারে সংকুচিত করে ফেলা ইত্যাদি। দুর্নীতি, দালালি, আমলাতন্ত্র, শ্লথতা, অকারণে বারবার ঘোরানো এগুলিতো আছেই।
এরফলে মানুষ যেমন সরকারি প্রতিষ্ঠানবিমুখ হন, তেমনই গাঁটের বেশি অর্থ খরচ করে বেসরকারি সংস্থায় যান। এসবই ঠিকঠাক চলছিল, নিবার্চন গুলিতে পর পর জিতে ক্ষমতা ও অর্থের মধু ভাণ্ডারও কুক্ষিগত করা যাচ্ছিল। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে জ্বালিয়ে গেল কিছু রাজ্য সরকারি কর্মচারী মহার্ঘ্য ভাতা (Dearness Allowance বা DA) দাবি করে অনমনীয় আন্দোলন চালিয়ে। এদের পুলিশ দিয়ে যথেচ্ছ পেটানো হল, চাকরি জীবনে চিরস্থায়ী ক্ষতি করা হল (Breakage of Service), উত্তরবঙ্গ থেকে সুন্দরবন দূর দূরান্তে বদলি করে দেওয়া হল, কয়েকজনের উপর এমন চাপ দেওয়া হল যে তাদের মৃত্যুও হল, তথাপি তারা হাল ছাড়লেন না। আইনি লড়াই চালিয়ে গেলেন, এমনকি কালীঘাটের সুরক্ষিত ক্ষমতা কেন্দ্রের কাছ থেকে বড় মিছিল নিয়ে গেলেন, প্রবল ঝড়বৃষ্টি দাবদাহের মধ্যেও শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ধর্না চালিয়ে গেলেন। ক্রুদ্ধ ক্ষমতার তরফ থেকে তাঁদের রাস্তার কুকুরের সঙ্গে তুলনা করে ‘ ঘেউ ঘেউ, ফেউ ফেউ করবেন না ‘ কত কি বলা হল। কতরকম সবক শেখানোর চেষ্টা হল। রাজ্যের দুঃস্থ রাজকোষ (রাজকোষ নামকরণ হলেও আসলে এটি জনগণের অর্থ) থেকে কোটি কোটি টাকা উকিল ফি, যাতায়াত ইত্যাদি খরচ করে, ১০ বছর ধরে মামলা ঝুলিয়ে ও টেনে নিয়ে, নানারকম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে, ভয় ভীতি দেখিয়ে, তাঁদের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি করে তাঁদের নিবৃত্ত করার যাবতীয় চেষ্টা হল।
কিন্তু তাঁরা ২০১৬ থেকে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের পাশাপাশি চাঁদা তুলে প্রথমে State Administrative Tribunal (SAT), তারপর Kolkata High Court, তারপর Supreme Court, New Delhi তে মামলা চালিয়ে গেলেন।
এরপর এদের দুর্বল ও কালিমালিপ্ত করার জন্য পরিকল্পিত ভাবে ‘ এটা সরকারি কর্মচারী দের কোন অধিকারই নয় ‘ ইত্যাদি প্রচার করা শুরু হল। সর্বত্র সাধারণের মধ্যে ভাসিয়ে দেওয়া হল ‘ এরা এমনিতেই কাজ করে না, এত টাকা মাইনে পায়, এবার দেখো গরীব মানুষের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে হাত দিতে চাইছে ‘ , ‘ এদের (মামা বাড়ির) আবদারের পিছনে এত কোটি টাকা ঢাললে রাজ্যের উন্নয়ন কর্মসূচি গুলি সব মার খাবে ‘। এভাবে রাজ্য সরকারের নিজেরই কর্মীদের বিরুদ্ধে অন্য বর্গ ও উপভোক্তাদের ক্ষিপ্ত করে তোলার ষড়যন্ত্র হল।
সুধী, আমরা এবার আসছি এই বিষয়টি নিয়ে। তার আগে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর সুপ্রিম সওয়ালের ঠিক পরের দিন এবং বিধানসভা ভোটের মুখে খয়রাতিময় জনবাদী রাজ্য বাজেট পেশের দিন, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সুপ্রিম কোর্ট ডি এ মামলা নিয়ে যে ঐতিহাসিক রায় দিলেন তার নির্যাস টি একবার দেখি:
(১) ডি এ পাওয়া আইনসম্মত অধিকার
(২) সর্বভারতীয় খুচরো বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সূচক ধরে রাজ্যকে ডি এ দিতে হবে।
(৩) বকেয়া ডি এ (২০০৮ থেকে ২০১৯) রাজ্যকে মেটাতে হবে।
(৪) ১৬ মে, ২০২৫ এর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল বকেয়া ডি এ – র অন্তত ২৫% ছয় সপ্তাহের মধ্যে দিয়ে দিতে হবে (রাজ্য সেই নির্দেশ অমান্য করেছে) সেটি অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে (অর্থাৎ ১৮ মার্চ ‘ ২৬ এর মধ্যে)।
(৫) এটি কার্যকর করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট একটি কমিটি করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা র নেতৃত্বে, যেখানে Comptroller and Auditor General of India (CAG)ও থাকবেন।
(৬) ৬ মার্চ ‘২৬ এর মধ্যে কমিটি তার কাজ শেষ করবে।
(৭) কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বকেয়ার প্রথম কিস্তি ৩১ মার্চের মধ্যে মেটাতে হবে। (৪ ও ৭ নাম্বার অনুচ্ছেদে ব্যাখ্যা দুরকম হতে পারে। রাজ্য সরকার যদি দেনও বকেয়ার ২৫% নাও দিতে পারেন।)
(৮) এই রায় বেরোনোর আগে যারা অবসর নিয়েছেন তারা বকেয়া ডি এ পাবেন।
(৯) রায় কার্যকর করার যাবতীয় বিষয় নিয়ে রাজ্যকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট কে রিপোর্ট দিতে হবে।
রাজ্য সরকার এখনও কোন প্রতিক্রিয়া দেন নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগে রায়ের কপি দেখি বলে এড়িয়ে গেছেন। তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় রায়ের Review Petition এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। রাজ্য সরকারি কর্মচারী রা এখন ১৮% ডি এ পান যেখানে কেন্দ্রের ডি এ ৫৮% অর্থাৎ এই মুহূর্তে ঘাটতি ৪০%। রাজ্য এপ্রিল’২৬ থেকে ৪% ডি এ বৃদ্ধি ঘোষণা করেছে এবং সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের কথা বলেছে। এই হারে ডি এ থাকলে এপ্রিল থেকে সেটা হবে ২২%। ২০১৬ সালে ভোটের আগে রাজ্য ষষ্ঠ বেতন কমিশনের কথা বললেও সেটি কার্যকর হয় ২০২০ তে পরের নির্বাচনের আগে। সপ্তম বেতন কমিশনের ভবিষ্যত যথেষ্টই অনিশ্চিত। কেন্দ্র শীঘ্র ২% ডি এ বাড়িয়ে নতুন বেতন কমিশনের দিকে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে বর্তমান ডি এ – র ক্ষেত্রে কেন্দ্রর সঙ্গে রাজ্যের এপ্রিলের পরেও ৩৮% ঘাটতি থাকবে এবং কেন্দ্রের পে স্কেল বেড়ে যাবে।
রাজ্যের বয়ানে রাজ্যের বকেয়া ডি এ মেটাতে লাগবে ৪১ হাজার কোটি টাকা, আর তার ২৫% মেটানোর জন্য লাগবে ১০,৪০০ কোটি টাকা।
২০২৫ – ‘২৬ এবং ২০২৬ – ‘২৭ অর্থ বর্ষ দুটিতে রাজ্যের সংশোধিত বাজেট ও বাজেট (এটি বিলক্ষণ বাড়ার সম্ভাবনা) যথাক্রমে (কোটি টাকায়):
(১) রাজস্ব ঘাটতি: ৪১,১৬৪ ও ২১,৭৬৯
(২) রাজকোষ ঘাটতি: ৬৭,৭৭৪ ও ৬২,৪২৩
(৩) পুঞ্জীভূত ঋণ: ৭,৬২,৩২৭ ও ৮,১৫,৮৯১
(৪) ধার শোধের খরচ: ৮৩,১৫৯ ও ৯৭,৬৪০
(৫) মোট আয় (কেন্দ্র প্রদেয় ৫২% ও ৫৬%): ২,৪৪,৮৬৭ ও ২,৮৭,৭৯২
(৬) মোট ব্যয়: ২,৮৬,০৩১ ও ৩,০৯,৫৫১
রাজ্য গত আর্থিক বর্ষে বাজেটের বাইরে গিয়ে ১৭,ooo কোটি টাকা বেশি খরচ করেছে।
এই বাজেটে রাজ্যের নিজের আয় দেখানো হয়েছে ১,১৮,৬৬৯ কোটি টাকা, সামাজিক খাতে বা খয়রাতি তে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১,২০, ৯৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও ঋণ করতে হবে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ১৫০০০ কোটি বাড়িয়ে ৪২,৫০০ কোটি টাকা। নতুন প্রকল্প ‘ বাংলার যুব সাথী ‘ তে ৫০০০ কোটি টাকা, ‘ ক্ষেত মজুর প্রকল্পে ‘ ৪০০০ কোটি টাকা এবং ‘ মহাত্মাজী ‘ প্রকল্পে ২০০০ কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য প্রকল্প (মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায় প্রকল্পের সেঞ্চুরি), অনুদান, ভাতা বৃদ্ধি, মেলা, উৎসব, ধর্ম, ক্লাব, রূপসজ্জা, উপহার ইত্যাদি তো আছেই। এছাড়া খয়রাতি বাজেটে গৌণ হয়ে পড়া কর্মী বর্গের বেতন, পরিকাঠামো গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নয়ন মূলক কাজ, দৈনন্দিন প্রশাসন চালানো, রাজ্য সরকারের প্রতিষ্ঠান ও বিভাগগুলির বরাদ্দ ইত্যাদির খরচ।
যেহেতু কেন্দ্রের ভাগ, জি এস টি, পেট্রল – ডিজেলে সেস এবং মদ বিক্রি ছাড়া রাজ্যের আর কোন উল্লেখযোগ্য আয় নেই বা নেই বলার মত কোন বিনিয়োগ; আবার পরিকাঠামো, শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, রপ্তানি, মানব সম্পদ ইত্যাদির উন্নতি করে রাজ্যের আয়ের কোন সদিচ্ছা, পরিকল্পনা ও সক্ষমতা প্রতিভাত নয়, মনযোগ কেবলই ধার করে খয়রাতির অর্থনীতি চালিয়ে নির্বাচনগুলি জিতে চলা, সুতরাং বিপুল ঋণ করেই তার অর্থনীতি চলছে ও চালিয়ে যেতে হবে। এবং স্বয়ং রাজ্য সরকারই তার প্রাথমিক বাজেটে সুদ সহ ঋণের পরিমাণ ঘোষণা করেছেন ৯,১৩,৫৩২ কোটি টাকা, যেখানে খয়রাতি সহ বিভিন্ন অনুৎপাদন খাতে ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা (পরিসংখ্যান আগে দেওয়া হয়েছে), যেখানে একের পর এক নতুন অনুৎপাদন প্রকল্প চালু করা হচ্ছে, প্রচলিত অনুৎপাদক প্রকল্প গুলির বিপুল বাজেট বরাদ্দ করা হচ্ছে, সেখানে সরকারের নিজের কর্মচারীদের ন্যায্য ও আইনসম্মত ডি এ সঠিক হারে না দেওয়াটা এবং ডি এ বকেয়া রেখে দেওয়াটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য তো নয়ই এবং একেবারেই অনৈতিক।
৭.০২.২০২৬










