কোনো জনগোষ্ঠী বা জনপদের ভাষা ও সংস্কৃতি হাতে হাত রেখে চলে। নির্দিষ্ট ভাষাভাষী মানুষের সংস্কৃতি, পোশাক, চাল চলন, খাদ্যাভ্যাসও নির্দিষ্ট।
একই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস যে বিভিন্ন হতে পারে – ভারতবাসীর থেকে বেশী সে আর কোন দেশের মানুষ জানে? এই দেশে প্রতি ২০০ কিলোমিটার দূরত্বের দুটো জায়গার মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাসের কোনো মিল নাও থাকতে পারে । এতটাই বৈচিত্রময় দেশ। যে দেশ যুগের পর যুগ ধরে অসংখ্য বহিঃশত্রুর আক্রমণ সামলেও ঐক্যবদ্ধ আছে।
তবুও কিছু কিছু শ্রেণীর, বিশেষত শাসকের মদতে, নিজের ভাষা অন্য জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা স্বাধীনতার আগে থেকেই আছে। সঙ্গে সঙ্গত করেছে বাণিজ্যিক সিনেমা এবং গান বাজনা। ইদানিং তার সাথে যুক্ত হয়েছে নিজের খাদ্যাভাস অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ।
যে খাদ্য যে ভৌগলিক অঞ্চলে সহজলভ্য সেই অঞ্চলের মানুষ সেই খাদ্যই বেশী খাবে- এটাই নিয়ম । যেমন, সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, স্কুইড খাবে – এটাই স্বাভাবিক। যেমন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভিয়েতনামের মানুষ বা জাপানের মানুষ গম বা ভুট্টার তৈরী খাবার খাবে, নাকি ভাত বা ভাতের সমতুল্য খাবার? সহজ উত্তর হল ভাত। কারণ এই দুই দেশে ধান উৎপাদনের ছড়াছড়ি। তেমনি ভারতের কেরালা, কোঙ্কন উপকূল বা বাংলায় সাধারণ মানুষ সামুদ্রিক খাদ্য বা মাছ খাবে- এটাই স্বাভাবিক। কারণ এগুলো সমুদ্র তীরবর্তী বা নদীমাতৃক অঞ্চল।
ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকতে পারে। কিন্তু এখানকার আপামর জনসাধারণকে কোনও ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতা বা ফিল্মস্টার যদি বলে সবাইকে ‘রাজমা-চাওল’ বা ‘পনির-পরোটা’ খেতে হবে, মাছ খাওয়া চলবে না- সেটা হল গা-জোয়ারি। তেমনি হরিয়ানার সব লোককে যদি বলা হয় রোজ মাছের ঝোল -ভাত খেতে হবে, সেটাও গা-জোয়ারি।
এবার এক ঘটনায় আসি। বছর দেড়েক আগে টাকি বেড়াতে গেছি। ইছামতীর গায়ে নিতান্ত মাঝারি মানের হোটেল। নৌকা বিহার করে শান্তিতে দুপুরের খাবারের জন্য বসে আছি। পেটে ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে। আগে যারা এসেছে তাদের আগে পরিবেশন করছে। সেটাই স্বাভাবিক।
অত্যন্ত কষ্টের সাথে খালি পেটে অন্যদের খাওয়া দেখছি। এমন সময় ডাইনিং হলের পিছনের দিকে চেঁচামচি শুনে সেদিকে ফিরলাম। কাঁচা-পাকা চুল দাড়ি মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি একটা ওয়েটারকে হিন্দিতে খুব বকছে। ‘খানা খতম হোনে কে বাদ পাঁপড় কিউ দিয়া? ইতনা ঘাটিয়া সার্ভিস হ্যায় তুমহারা ! খানে কে শুরু মে পাঁপড় খাতে হ্যায় হামলোগ।’
সত্যিই তাই! গোটা ভারতের হিন্দি বেল্টে পাঁপড় খাওয়া হয় ডালের পাতে, খাওয়ার শুরুর দিকে। কেউ কেউ রায়তা-র সাথে খায়। কিন্তু বাংলার এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা এক কারণে সাধারণ হোটেলের ওয়েটার সেকথা জানবে কি করে? সে হয়ত কোনদিন বাংলার বাইরেই যায় নি?
এই লোকটাকে আগেরদিন দেখেছি। হোটেলের দোতলায় আমাদের উল্টো দিকের ঘরে আছে। কথা শুনে মনে হল লোকটা মারাঠি। প্রচন্ড দাম্ভিক।
নাসিকে থাকে। কিন্তু এ ব্যাটা টাকির মত এত প্রত্যন্ত জায়গায় কি করছে?
আজ বুঝলাম রহস্যটা। খাওয়ার টেবিলের উপরে রাখা টেলিলেন্স লাগানো ডিএসএলআর ক্যামেরা। পরনে ফটোগ্রাফারের জ্যাকেট। ‘ভদ্রলোক’ ফটোগ্রাফার। সেই কারনে এত দূরে টাকীতে ইছামতী-র তীরে এসেছে। ছবি তুলতে।
হোটেলের গ্রাম্য ওয়েটারকে গলা উঁচিয়ে প্রচন্ড ধমক দিচ্ছে লোকটা। একতরফা। অক্ষম ও ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে ব্যপারটা বোঝানোর চেষ্টা করছিল ছেলেটা। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বাংলায় বলল, ‘সবাইতো চাটনির সাথেই পাঁপড় খায়। তাই দিয়েছি।’
‘বঙালমে কিঁউ বাত করতে হো। হিন্দি মে বাতাও।’
‘হিন্দি জানি না।’
তারপর সেই অমোঘ বক্তব্য, ‘তুম জানতে হো ম্যায় কৌন হুঁ?’
বুকের ছাতি ফোলানো হাস্যকর কথাবার্তা। টাকীর গ্রাম্য হোটেলের ওয়েটার জানবে কি করে যে, ‘উনি কে?’
কোনো উত্তর না পেয়ে আবার বলল, ‘ম্যায় ডেপুটি কালেক্টর থা। তুমহারা ব্যান্ড বাজা দুঙ্গা।’
হোটেলের অন্য সব অতিথিরা চুপচাপ খাচ্ছে। কারো কোনো উচ্চবাচ্য নেই। যেন বিষয়টা অন্য কোনো গ্রহ সংক্রান্ত।
আমি চুপ করে থাকতে না পেরে বললাম, ‘ও ছেলেটা তো ভুল কিছু করেনি। এখানে বাংলায় কেউ ডালের সাথে পাঁপড় খায় না। খাওয়ার শেষে চাটনির সাথে খায়।’
লোকটা আমার কথায় কান দিল না।
কথা কাটাকাটির মধ্যে হোটেলের ম্যানেজার এসে ঝামেলা থামানোর চেষ্টা করছিল। এমনকি, লোকটাকে কিছুতেই বোঝাতে না পেরে ওয়েটারের হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিল।
‘আপনারা ক্ষমা চাইছেন কেন? লোকটা তো ভুলভাল দাবী করছে!’
‘ছাড়ুন, ঝামেলা যত কমানো যায় তত-ই ভাল।’
তখনকার মত ঝামেলা মিটল ঠিকই। কিন্তু অনেক বিবাদের মীমাংসা বাকি রয়ে গেল।
সামান্য বিষয়, আবার তত সামান্যও নয়।
বাংলায় বেড়াতে এসে স্থানীয় লোককে হিন্দি বলতে বাধ্য করার চেষ্টা।
পূর্ব ভারতের প্রত্যন্ত এলাকায় এসে উত্তর বা পশ্চিম ভারতের খাদ্যের জন্য জোরাজোরি করা।
এর শেষ কবে হবে? বাঙালিরা যেমন ভীতু ও স্বার্থপরের মত চুপ করে থাকে এবং সব মেনে নেয় – তাতে এর মীমাংসা কি কোনোদিন হবে ?
নাকি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হিন্দি বলয়ের পেটে চলে যাবে?
সময়ই বলবে।











