গত সপ্তাহে যখন এগরা হাসপাতালে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী দের সর্পদংশন সংক্রান্ত ট্রেনিং দিতে গেলাম, সেইদিনের ঘটনা। ওখানের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ তপেন্দু আমার সহপাঠী। মেধাবী ছাত্র ও জনদরদী চিকিৎসক হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত। ট্রেনিং শুরুর আগে উনার তত্বাবধানে থাকা সাপ কামড়ের রোগীদের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র গুলি ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম। আমার উদ্দেশ্য একটাই। সাপ কামড়ের প্রতিটা রোগীর মৃত্যুই যেহেতু প্রতিরোধযোগ্য তাই প্রতি মৃত্যুর পেছনের আসল কারনগুলি খুঁজে বের করে তার সমাধানের প্রচেষ্টা করা। সেইসময় ডাঃ তপেন্দুর ডাকে কাগজপত্রের ভিড় থেকে চোখ ফেরাতেই দেখলাম, এক মধ্যবয়স্ক রোগী নিয়ে হাজির হয়েছে ও।
এম.বি.বি.এস জীবনে একসাথে পড়াশোনা করার সময় একে অপরকে প্রশ্নবানে বিদ্ধ করতাম। সেই অভ্যাসের রেশ টেনে জিজ্ঞেস করলো এই পেসেন্ট টি অনেকদিন ধরে ভুগছেন। ভালো করে দেখে বলতো কি হতে পারে? চিকিৎসকের বিস্ময়ী চোখে তাকিয়ে দেখলাম। হাত, পা ফোলা। চোখের পাতা টেনে দেখলাম রক্তাল্পতাও রয়েছে। পেটেও খানিক জল জমে আছে। জিজ্ঞেস করলাম- মাদকসেবন করেন নাকি? উত্তর এলো – না। প্রস্রাব কেমন হচ্ছে? উত্তরে ভদ্রলোক বললেন একটু কম। আমি তখন মনে মনে ডায়াগনোসিস করে ফেলেছি – ক্রনিক কিডনি ডিজিজ। যার কারনে এরিথ্রোপয়েটিন তৈরি না হওয়ার ফলে রক্তাল্পতা। আর কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার কারনে পা, মুখ,পেটে ইন্টারস্টিসিয়াল ফ্লুইড জমে গিয়ে এই ফোলা ভাব।
নিজের করা ডায়াগনোসিস প্রকাশ করতেই ডাঃ তপেন্দু বললেন- এই ডায়াগনোসিসের উপর ভর করেই পাশের রাজ্যের প্রতিষ্ঠিত মেডিক্যাল কলেজে দীর্ঘদিন ভরতি থেকে চিকিৎসা করিয়েছেন উনি। উন্নতি কিছুই হয়নি। ধীরে ধীরে চলৎশক্তি হারিয়ে অথর্ব হয়ে পড়েছেন এখন। রোগীর হাতে থাকা পুরানো ফাইলগুলো ঘেঁটে দেখলাম – সত্যিই তো। আমার ভাবনা মতই সমস্ত চিকিৎসা হয়েছে ওখানে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
ব্রেনের সিটি স্ক্যানের রিপোর্টে কয়েকটি ইস্কেমিক স্পট ছাড়া বিশেষ কিছু চোখে পড়লো না। ইসিজিতে হৃৎস্পন্দনের হার কম। সোডিয়াম, পটাশিয়ামের মাত্রা মাঝেমধ্যেই কমেছে। আবার তাৎক্ষনিক চিকিসায় খানিক ঠিকও হয়েছে। মাঝেমধ্যেই প্রস্রাবের ইনফেকশন হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগে প্রায় প্রতিবারই কিছুদিনের জন্য ভালো থেকেছেন।
কিন্তু মুস্কিল হলো- বারবার এরকম হওয়ার কারন টা কি?
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে যখন মেডিসিনের বিপুল সমুদ্রে সঠিক রোগ নির্নয়ের জন্য প্রানপনে খাবি খাচ্ছি, ঠিক তখনই ডা: তপেন্দু আর একটি রিপোর্ট হাতে ধরিয়ে দিলেন। থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা কম কিন্তু অদ্ভুত ভাবে তার জন্য যে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোনের মাত্রা ফিডব্যাক পদ্ধতিতে বেড়ে যাবার কথা, তা কিন্ত হয়নি। এছাড়াও কর্টিসলের মাত্রা যাইপরনাই ভাবে কম। অর্থাৎ কিনা যত সমস্যা – পিটুইটারি তে।
এবার ভদ্রলোককে প্রশ্ন করলাম হাটে-বাজারে তথাকথিত আয়ুর্বেদিক ওষুধের নামে যে স্টেরয়েড বিক্রি হয় তার ফাঁদে পড়ে দীর্ঘদিন স্টেরয়েড খেয়েছেন কিনা। ভদ্রলোক শূন্যদৃষ্টিতে নেতিবাচক ভাবে নির্লিপ্ততায় মাথা নাড়লেন।
আমার ডায়াগনোসিস এখন মোটামুটি একটা দিশা খুঁজে পেয়েছে। পিটুইটারির সমস্যার কারনে এইসব সমস্যা হচ্ছে।
এটা বলার পরেই, ডাঃ তপেন্দু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো- সে তো বুঝলাম। কিন্তু হঠাৎ পিটুইটারির সমস্যা হলো কোথা থেকে?
এবার আবার নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করার মুখেই, ডাঃ তপেন্দু বললো, এই অবধি আমিও বুঝেছিলাম। কিন্তু আকস্মিক ভাবে গত তিনদিন আগে উনার পাশের বেডে চন্দ্রবোড়া সাপের কামড়ের এক রোগী ভরতি হওয়ায় রোগী নিজের স্মৃতিচারন করতে গিয়ে হঠাৎ বলেছিলেন, আমাকেও চন্দ্রবোড়া সাপে কামড়েছিলো বছর তিনেক আগে।
চমকে উঠলাম আমি। খানিক বিরল হলেও চন্দ্রবোড়া সাপের কামড়ের রোগী যদি কামড়ের একশ মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ কুড়ি ভায়াল অ্যান্টিভেনাম না পান তাহলে পিটুইটারির সেলাটারসিকা প্রকোষ্ঠের সমস্যায় ‘পিটুইটারি অ্যাপোপ্লেক্সি‘ হয়ে পরবর্তী জীবনে হরমোনাল সমস্যায় জর্জরিত হতে পারেন রোগী। মাষ্টার গ্ল্যান্ড পিটুইটারিতে প্রকোপ পড়লে সেকেন্ডারি হাইপোথাইরয়েডিজম ও আপদকালীন হরমোন কর্টিসল কমে গিয়ে নানা বিপত্তি শুরু হতে পারে।
চিকিৎসা– নিয়ন্ত্রিত কর্টিসলের প্রয়োগ, থাইরক্সিন প্রয়োগ, গোনাডোট্রোপের সমস্যায় টেস্টোস্টেরন ইঞ্জেকশন।
আমার মুখ খোলার আগেই ডাঃ তপেন্দু বললো, এইসব ওষুধের প্রয়োগ করার পরেই রোগীর উন্নতি শুরু হয়েছে।
রোগীর স্ত্রী বললেন, যে মানুষটি গত দেড় বছর উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না, আজ দিন দুয়েক হলো হাঁটতে শুরু করেছেন।
আমি আমার বন্ধুর অভাবনীয় ডায়াগনোসিসে যাইপরনাই খুশি হয়ে মনে মনে তপেন্দুর বন্ধু হবার গর্বের অনুভবটিকে আপাত দৃষ্টিতে চেপে রেখে শুধু মুগ্ধতাকে সঙ্গী করে ট্রেনিং হলের দিকে রওয়ানা দিলাম।











