ক্যানসারের চিকিৎসা করি। কাজেই, অসুখের নিরাময়ের পাশাপাশি উপসর্গের প্রশমন যে সমান গুরুত্বপূর্ণ এটুকু বুঝি।
আমরা যখন ছাত্র, তখন একটি কোম্পানি ব্যথার উপশমের জন্য নতুন একরকম ওষুধ বাজারে এনেছিল। তারা চমৎকার একটি পোস্টার বানিয়েছিল। যন্ত্রণাকাতর এক ভদ্রমহিলার ছবি – নিচে লেখা, Its not the cancer, but the pain which is killing me. মানে, ক্যানসারটা নয়, এই মারাত্মক যন্ত্রণাই আমাকে বেশি ভোগাচ্ছে।
অতএব, ক্যানসার সারানোর পাশাপাশি সে অসুখের যন্ত্রণার উপশম করাটাও ক্যানসার-চিকিৎসকের দায়িত্ব।
তো সেকারণেই, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ জাতীয় প্রকল্পকে আমি ভিক্ষে ইত্যাদি বলে ভাবতে পারি না। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো যতদিন না পূরণ হচ্ছে, ততদিন এমন অনুদানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এবং স্বাধীনতার এই এতগুলো বছর পার হয়েও যাদের এই সাধারণ চাহিদাগুলো পূরণ হলো না, তাদের এই টাকাটা (হয়ত আরও বেশিই) ন্যায্য প্রাপ্যের মধ্যেই পড়ে। অন্তত একে ভিক্ষা বলার প্রশ্নই ওঠে না।
কিন্তু যে ক্যানসার-চিকিৎসক রোগের চিকিৎসার দিকে বিন্দুমাত্র মন না দিয়ে শুধুই উপসর্গের প্রশমনে উদ্যোগী, তাঁকে সুচিকিৎসক বলা মুশকিল। অন্তত তাঁর চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদে রোগীর ভালো থাকা বা সেরে ওঠা মুশকিল।
ঠিক এ কারণেই, দুর্নীতি ইত্যাদি প্রসঙ্গ সরিয়ে রেখেও যদি বিচার করি, আমি তৃণমূলের শাসন-দর্শন বা তাদের বিবিধ তথাকথিত জনমুখী সিদ্ধান্ত সমর্থন করতে পারি না (আবার সেগুলোকে ভিক্ষেও বলি না)।
অর্থাৎ কন্যাশ্রী বা সবুজসাথীর সাইকেল কিংবা ছাত্রসাথীর মাধ্যমে স্কুলব্যাগ-জুতো দেওয়া প্রকল্প হিসেবে খুবই ভালো হতো, যদি তার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের সত্যিসত্যিই স্কুলমুখী করা যেত, ড্রপআউটের সংখ্যা কমিয়ে আনা যেত, স্কুলগুলোতে ভালো করে লেখাপড়ার ব্যবস্থা থাকত। কিন্তু আমরা জানি, তা হয়নি। আমরা জানি, অজস্র সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে – বন্ধ হয়েছে মূলত ছাত্রছাত্রীর অভাবে – অনেক স্কুলেই পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, শিক্ষক প্রায় নেইই – আর ড্রপআউট যে বাড়ছে, তার প্রমাণ বছর বছর মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দেখলেই মিলবে।
এমতাবস্থায় খুবই স্পষ্ট, যে, সরকার উপসর্গের প্রশমনে যতখানি মনোযোগী – বা যেটুকু মনোযোগী – তার ছিটেফোঁটা মনোযোগও অসুখের চিকিৎসায় দেন না।
আবার অনেক দিন আগে একটি অঙ্কোলজি বইয়ে পড়েছিলাম – পুরনো এডিশনের বই, নইলে এখন কেউ আর এভাবে ভাবতে শেখায় না – সেখানে ক্যানসার প্রতিরোধে ধূমপান বন্ধ করা নিয়ে লেখা ছিল, যতদিন না অবধি গরীব মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে, ততদিন অবধি তাঁরা সুদূর কোনও সুফলের আশায় (অর্থাৎ ক্যানসার থেকে বাঁচার আশায়) তাৎক্ষণিক আনন্দের উপাদানগুলো (যেমন ধূমপান মদ্যপান ইত্যাদি) পরিত্যাগ করবেন না, এবং ততদিন অবধি ধূমপান বন্ধ করার সচেতনতা বৃদ্ধি জাতীয় প্রোগ্রামগুলো সাফল্য পাবে না।
অতএব, বিভিন্ন অনুদানমূলক সরকারি প্রকল্পগুলোর গুরুত্ব বা আকর্ষণ কমবে না – কেননা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও শিক্ষার মান এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যেখানে তাঁরা অনুদানের অর্থে খুশি না থেকে নিজেদের প্রাপ্য অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হতে পারবেন।
কিন্তু, প্লিজ, আবারও বলি – স্বাধীনতার পর ছিয়াত্তর বছর কাটল, এতদিনের মাথায় অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো সাধারণ চাহিদাটুকু দেশের সব নাগরিকেরই পূরণ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল – সেটা যখন হয়নি, অনুদানের টাকাটা তাঁদের অধিকারের মধ্যেই পড়ে। অন্তত আমরা যারা অপেক্ষাকৃত সুখে আছি, তাদের তরফে ওই টাকাটুকুকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেখুন। অন্তত আর যা-ই হোক, ভিক্ষে হিসেবে দেখবেন না।
বিরোধী হয়ে উঠতে গেলে, প্রধান কর্তব্য – সরকারি প্রকল্পের সুবিধেগুলো যাতে যথাস্থানে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা। এবং সরকার যাতে আরও বেশি করে জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ নেয়, সে ব্যাপারে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা। প্রকল্পের সুবিধে যাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তাঁদের ভিখারি ইত্যাদি বলে কর্তব্য পালন হয় না।
দুঃখের ও হতাশার (আপনার তো বটেই, আমারও) দিনে এই কথাটুকু মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি বলে মনে হলো।











