এত জ্ঞানী, অভিজ্ঞ এবং বিখ্যাত হয়েও এমন মাটির কাছাকাছি থাকা যায় কিভাবে?
তার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবার সমৃদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অবাকও হতাম। এমন সুন্দর করে হেসে কথা বলতেন, তার প্রতি শ্রদ্ধা না হয়ে থাকা যায় না এমন একজন মানুষ ছিলেন তিনি। অধ্যাপক ডক্টর বরুণ কাঞ্জিলাল।
খুব বেশি দিনের পরিচয় নয়, ২০২২ হবে বোধহয়। কিন্তু হলফ করে বলতে পারি তাঁকে দেখে মানুষের যে ছবিটা প্রথম মাথায় আসে, তাহল তাঁর সদা হাস্যময় মুখ টি। স্বাস্থ্য অর্থনীতির জন্য জগৎজোড়া তাঁর নাম। এমন পন্ডিত মানুষ, তবু কখনো মুখ গম্ভীর দেখিনি। সব সময় একটা স্মিত হাসি লেগে থাকত তাঁর মুখে, যা ছিল ভীষণ সদর্থক আর ছোঁয়াচে।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন।অসুস্থতার সময়কালেও সেই হাসি তাঁর মুখ থেকে সরতে দেন নি। যতবার দেখা হয়েছে, আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের কাজের খোঁজ খবরের সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছেন। বলেছেন তোমরা কাজ করো, আমি পাশে আছি, তোমরা ভালো কাজ করছো। আমার মতন সামান্য এনজিও কর্মীকেও যত্ন করে কত কি শিখিয়েছেন। প্রজেক্ট এর শেষেও যখন হোয়াটসঅ্যাপে কথা হতো, যতবার প্রশ্ন করেছি স্যার হাসিমুখে উত্তর দিয়েছেন, কাজের খবরা-খবর নিয়েছেন। শেষ কথা হয়েছিল এ বছরের জানুয়ারিতে।
কয়েক বছর ধরে ইউনিসেফ এর সঙ্গে ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের হয়ে মা ও শিশু নিয়ে প্রজেক্টের কাজ করার সময় ওনার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পাই। কলকাতা পুরসভার টেংরা, তপসিয়া এবং খিদিরপুরের কয়েকটি ভাল্নারেবল পকেটে আমরা কাজ করছিলাম। তখন সবেমাত্র কোভিড পিরিয়ড শেষ হয়েছে, কিন্তু জনস্বাস্থ্যে তার প্রভূত রেশ পড়েছিল। কোভিড পিরিয়ডে কিভাবে বিশেষ কিছু কাজের মাধ্যমে আমরা নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের ওই এলাকাগুলিতে জনস্বাস্থ্যের সূচককে বজায় রাখতে পেরেছিলাম সেটা নিয়েই উনি লিখেছিলেন। আমাদের প্রজেক্টটিকে একটি মডেল হিসেবে দেখিয়েছিলেন । কলকাতা পুরসভার কাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলা ভালো, পুরসভার স্বাস্থ্য পরিষেবকে ত্বরান্বিত করতে আমাদের মডেলটি দারুণ উপযোগী বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন উনি।
দ্বিতীয়বার মহেশতলার প্রজেক্টের প্রজেক্ট প্রোপোজালটি লিখতে সাহায্য করেছিলেন স্যার, তাই বেশ কয়েকবার ওনার সঙ্গে ফিল্ডে ঘোরার অভিজ্ঞতাও আছে। মানুষ জ্ঞানী হলে কতটা বিনয়ী হতে পারে, সত্যিই ওনাকে দেখে শিখেছি, জেনেছি। শুধু আমাদের প্রজেক্টের কর্মীদের সঙ্গে নয়, ফিল্ডে গিয়ে সাধারণ মানুষদের সঙ্গেও কি অমায়িক ব্যবহার করতে দেখেছি তাঁকে। আমরা সব সময়ই সাহায্য পেয়েছি ওনার কাছ থেকে। আমার ধারণা এমন অনেক সাহায্য অনেকেই পেতেন।
তাঁর সম্পর্কে বলতে গেলে প্রত্যেকে হয়তো তার জনস্বাস্থ্যের অর্থনীতির উপর কাজ, জ্ঞানচর্চা, শিক্ষকতা বা বাগ্মীতার কথাই প্রথমে বলবেন, কিন্তু আমি বলবো এই সব কিছু ছাপিয়ে উনি একজন অসাধারণ ভালো মানুষ ছিলেন। যাকে আমি কিছুদিনের জন্য শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। সঙ্গের ছবিটি গত বছরের আগস্ট মাসে তোলা। আগামী প্রজেক্ট এর বিষয়ে আলোচনা করতে দক্ষিণ কলকাতার এক কফি ঠেকে ছবিটি আমার তোলা। স্যারের অন্য সব ছবির থেকে একটু অন্যরকম। সেদিনও আজকের মত বৃষ্টি মুখর একটা দিন ছিল। স্যার বাইরের বারান্দায় অপেক্ষা করছিলেন বৃষ্টি থামার।









