২ ডিসেম্বর, ২০২৪
কাল বাংলার নাগরিক থেকে, পুণ্যব্রত গুণ ও তমোনাশ চৌধুরীর আহ্বানে অভয়া মঞ্চের প্রথম শিক্ষা শিবিরে গেছিলাম। সেখানে নানা জন তাদের স্ব-স্ব ক্ষেত্র থেকে নারীদের এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজের নানা অসুবিধার কথা তুলে ধরছিলেন। যেহেতু সবাইকে তাদের নামে নামে চিনি না। তাই জিজ্ঞেস করে করে সঙ্গী নবনীতাদির থেকে নাম জেনে নিচ্ছিলাম।
যাহোক প্রথমে যে দিদি কথা বলছিলেন তিনি একটি গ্রামের স্কুলের দিদিমণি (মুর্শিদা খাতুন)। তিনি বলছিলেন মুসলিম মেয়েদের দুর্দশার কথা। তাদের বাড়ী থেকে ছোট বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। তাই মাত্র ১৫ বছর বয়সেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের বিয়ে হয়ে যায়। আর শুরু হয় অপরিণত বয়সে পরিণত রুক্ষ বাস্তবের পথ চলা। এর মধ্যে তারা মা হয়ে যায়। তারপর শ্বশুরবাড়ির থেকে শারীরিক মানসিক অত্যাচারে নাকাল মেয়েটি অগত্যা বাপের বাড়ী ফিরে আসতে চায়। ইতিমধ্যে ভালবাসার পাত্র মানে বরও অন্য নারীতে আসক্ত হয় পড়ে। এরপর মেয়েটির মা আবার যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে স্কুলে মেয়েকে নিয়ে এসে দিদিমনির কাছে হাজির হন। তিনি মেয়েকে দিদিমনির কাছে পাঠিয়ে নিজে দূরে দাঁড়িয়ে থাকেন। লজ্জায়। তারপর তো কোনও শীর্ণকায়া ছাত্রী ঠিকমত আহারের অভাব, তার মধ্যে সে হয়তো রোজা রাখতে গিয়ে স্কুলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ল। এমতাবস্থায় দিদিমণি রোজা রাখতে বারণ করলে তাদের ঘর ঘিরে ধরে আক্রমণ করা হয়। নানা প্রতিবাদ জানানো হয়। এখানে বেশিরভাগ মানুষ বিষয়টি যেহেতু স্পর্শকাতর বলে এড়িয়ে যান। তাই ধর্মের দোহাই দিয়ে মেয়েগুলো ‘বলির পাঁঠা’ হয়ে ওঠে।।
পরবর্তীতে যে বক্তা, বক্তৃতা রেখেছেন, তিনি শতাব্দী দাশ। তিনিও মেয়েদের সামাজিক অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন। আসলে পিতৃতন্ত্র যে একটা ধারণা এটা বোঝার মত লোক, খুব কম। বেশিরভাগের মনে হয় পিতৃ শব্দটা যখন আছে, তারমানে ওটা পুরুষদের ব্যাপার-স্যাপার। এমনকি আমার অভিজ্ঞতা থেকে জানি একজন দিল্লী পাবলিক স্কুলের টিচার তিনিও বিশ্বাস করেন নারীবাদ মানে পুরুষবিদ্বেষী। আর ওটা পুরুষদের নয় নারীদের বিষয়। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে সার্টিফিকেট বা আপনি কোথায় কী কাজ করেন। তার দ্বারা প্রমাণিত হয় না, আপনি শিক্ষিত। আর প্রকৃত শিক্ষা না থাকলে এসব ভ্রান্ত ধারণা মনের মধ্যে বাস করবেই। দুটো ধারণা আর বাহক যেকোনও লিঙ্গের মানুষ হতে পারেন। নারী-পুরুষ, LGBTQ.
এরপর দুজন সেবিকা তাদের ক্ষেত্রের সমস্যা গুলো তুলে ধরেছিলেন। তবে তাদের মধ্যে একজন খুব নার্ভাস হলেও তার স্পষ্ট বক্তব্য ছিল। তবে এর পরের বক্তা অনুরাগ মৈত্রেয়ী কথা বলতে উঠলেন। তিনি প্রথমেই বললেন আমি রূপান্তর কামী নারী। এখানে তাঁর নামটা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি যেহেতু তার পূর্ব নামটি রেখে দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে চিত্রটা পরিষ্কার হলেও, তিনি তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন যে তিনি শুধু নারী হয়ে উঠতে চান না এখানে মৈত্রেয়ীর একটা কথা আমার খুব ভাল লেগেছে। যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের একটা ধারণা রয়েছে, যে গর্ভধারণ করলেই সে মা। তাছাড়া সে কিছুতেই মা হতে পারবেনা। বিষয়টা একদমই তা নয়। যে সৃষ্টি করছে বা করেছে। সেই মা। লিঙ্গ যাই হোক। এমনকি নারী হয়েও সে যদি সন্তান ধারণ না করে কিন্তু তার যদি কিছু সৃষ্টি থাকে। সেখানে সে মাতৃ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মৈত্রেয়ী বিষয়টা পরিষ্কার করে বললেন আমি লেখালেখি করি। আমি আমার লেখাগুলো রোজ সৃষ্টি করি। তাই আমিও একজন মা। যে পুরুষ সৃষ্টি করছেন তিনিও মা। এ সম্পর্কে আমার একটি অভিজ্ঞতার কথা জানাই। আমি একবার হোয়াতে আসা কথা শেয়ার করেছিলাম। কথাগুলো ছিল, যেমন এই কথাগুলো যদি তুমি ১০ জনকে দাও তাহলে তুমি খুব ভাল মা। আমার নিজের প্রমাণের দায় নেই, তাও ওই মজার জন্য এরকম একটি মেসেজ আমি আমার এক আত্মীয় বোনকে দিয়েছিলাম। তখন সে লিখে পাঠাল দিদি আমি তো এখনো সন্তান জন্ম দেইনি। আমি কীভাবে মা হব!!?? মেয়েটি উচ্চ শিক্ষিত সন্দেহ নেই। কারণ সে ইউপিএসসির জন্য পরীক্ষায় বসেছে কিন্তু সে ওই পিতৃতান্ত্রিক ধারণা থেকে বেরোতে পারেনি। তখন আমি তার ভুল না ভাঙ্গিয়ে আর কিছু বলিওনি। তবে কথাটা আমার মনে থেকে গেছে। এখন তো পুরুষও গর্ভধারণ করছেন। তাই সে বিষয়টা ছেড়েই দিলাম। মৈত্রেয়ী আরেকটা কথা বলেছেন, যে সমাজে একটা ধারণা আছে কম মেয়ে কম ছেলে। এই একটা বীভৎস ধারনা আমরা অজান্তে মনের মধ্যে পুষে রাখি।। যেমন সমাজে কোনও মেয়ের যদি বক্ষদেশ স্ফীত না হয়। সেখানে সে অন্য মেয়েদের বা পুরুষদের কাছে সে কম মেয়ে বলে গণ্য হয়। বা কিছু খারাপ কথা শোনে। আবার রূপান্তরকামীদের কম মেয়ে বলে ছোট করতে সেই মেয়েটিয়ো মুহূর্তকাল সময় নষ্ট করে না। তাহলে বিষয়টা একই জায়গায় রয়ে যাচ্ছে।। তবে পরবর্তী ক্ষেত্রে বন্যা বলতে উঠে দাঁড়ালেন। তিনিও রূপান্তরকামী কিন্তু তাকে নারী বললে তিনি বেশী খুশি হন। এটা নয় যে মৈত্রেয়ী বলেছেন বলে সবাই রূপান্তরকামী শুনতে পছন্দ করবে। আরেকটি কথা মৈত্রেয়ী খুব ভাল বলেছেন যে রূপান্তরকামী মানেই কিন্তু হিজড়া নয় । ওটার একটা আলাদা ইতিহাস আছে, ওটা একটা প্রফেশন। কোনও ছোটবড় হওয়ার প্রশ্নই নেই।
এরপর মাহফুজা দিদি বললেন তিনি যেহেতু পরপর দুটি বিয়ে করেছেন তাই পরের দিকে ঘর করা ভদ্রলোকের দোষ বেশী না দেখার চেষ্টা করে যেতেন। কিন্তু তার মেয়ে হাসপাতালে ১০ দিন পরে থাকলেও ভদ্রলোক বাবা হয়েও একটা দিন মেয়েকে দেখতে আসেননি।। তার প্রশ্ন ছিল বাবা কী এরকম হয়!!!! এই সময় আমার খুব চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, দিদি আমি এমন এক বাবাকে চিনি। যে তার পাঁচ দিনের কন্যাকে আট তলার উপর থেকে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিল। বলিনি। এই মাহফুজা দিদির প্রতিটি কথায় দর্শক বা শ্রোতারা হাততালি দিয়ে সমর্থন জানাচ্ছিলেন। খুব সুন্দর ভাবে মানসিক অসুস্থতা নিয়ে বক্তব্য রাখলেন রত্নাবলীদিদি। তিনি জানালেন লোকজন এখনও ভাবে মানসিক সমস্যা মানে ব্যক্তিটি আর র্যাশানাল নন। কেউ মানসিক হতাশা বিরক্তি বা নানা সমস্যার মধ্যে ওষুধ খেলেও তাকে লুকিয়ে খেতে হয়। না হলে কোম্পানি তাকে রাখবে না। অথচ টার্গেট টার্গেট টার্গেট এর চাপে ব্যক্তিটি মানসিক চাপে জর্জরিত হয়েও মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারবেন না। হয়তো এর পেছনে বড় কারণ আমাদের গুণী, জ্ঞানী কবিদের ই মনে হয়, ডিপ্রেশন মানে মন খারাপ। এসব কবিতায় হাসি ছাড়া কিছু আসে না। আবার অপরদিকে তিনি জানালেন যে মেয়েরা এম আর হলে, একটা টয়লেট পর্যন্ত তারা ব্যবহার করতে পারেনা। সেখানে পুরুষের রাজত্ব। আমি বলি আরে বাবা জমি ছাড়ার দরকার নেই। কমসে কম সহযোদ্ধা মানুষ ভাবতে আপত্তি কোথায়!!? যাক সেকথা, কারণ আমার কথা শুনছে কে?
এরপর ডক্টর সৌম্য তার বক্তৃতায় জানালেন যে জন্মের সময় যে লিঙ্গ নির্ধারণ করা হয়তা আল্টিমেট নয়। অনেক সময় এক্স এক্স বা এক্স ওয়াই এর মধ্যে অন্য আরেকটি বাড়তি ক্রোমোজোম ঢুকে থাকতে পারে। তিনিও সুন্দরভাবে কথার মাধ্যমে আমাদের জানালেন যে ওই যে প্রথম সন্তান দেখিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করা হয় বলুন তো ছেলে না মেয়ে এখান থেকেই এই ধারণার উৎপত্তি ঘটে। ছেলে হলে বন্দুক খেলনা আর মেয়ে হলে পুতুল। এর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় পুরুষ মানেই হিংস্র হতে হবে। যা আদতেই একদম তা নয়। অথচ সবার মুখে এক কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে যে পুরুষ মানেই ধর্ষক নয়। তবে শতাব্দী দাস বলেছিলেন কালচার বা সংস্কৃতি বলতে আমরা আসলে গান নাচ আবৃত্তি এসব বুঝে থাকি। তা কিন্তু বাস্তব নয়। কালচার হল আপনার আমার যাপন। তাই রেপ কালচার বলা হচ্ছে মানে ছোট ছোট চুটকি হাসির মধ্যেও মেয়েদের ছোট করা বা ভোগপণ্য প্রতিপন্ন করার ইঙ্গিত থাকতে পারে। এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলো বোঝার সময় এসেছে। আর এটাও ঠিক যে পুরুষ মানেই ধর্ষিত হয় না। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। শেষে একজন বক্তার বক্তৃতার কথা থাকলেও সময়ের জন্য বেরিয়ে যেতে হয়েছিল।
মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে দেখি মাহফুজা দিদি। তাকে যখন বললাম আপনি তো খুব ভাল বলেছেন। তখন তার সঙ্গীরা বলে উঠলেন মাহফুজা রক্স। সত্যি তাই। আমি একটু করুণ মুখে জিজ্ঞেস করলাম “আমাকে তো সবাই ঝগড়ুটে বলে আপনাকে বলে না!?” উনি নির্বিকার মুখে জানালেন “কিছু বললে সরাসরি বলি পোষালে কাজে রাখবে না পোষালে নয়। প্রতিবাদ আমি করবোই।”
বিঃদ্রঃ এখানে বলে রাখা দরকার যে কার মুখে শুনেছিলাম ঠিক মনে নেই। তবে একটা কথা খুব পরিষ্কার শুনতে ভাল লাগল। যে আমাদের অভয়া কাণ্ডে শুধুমাত্র মেয়েটির ওপর নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় আটকে নেই। অনেক শাখা প্রশাখা ডালপালা মেলেছে। সবাই পরিষ্কার ভাষায় নিজের অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আর বলছে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে, আমারও সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার আছে।










সবার বক্তব্য খুব ভাল তুলে ধরেছেন।
খুব সুন্দর লিখেছ। মুগ্ধ হলাম ।❤️👌🙏