২৫ আগস্ট ২০২৬
আগস্ট মাসের ১ তারিখে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আচমকাই ঘোষণা করলেন ওনার কাছে খবর আছে যে ২৭ লক্ষ ডিলিটেড ভোটারের মধ্যে মাত্র ৭ লক্ষ মানুষ নাকি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন আর বাকি ২০ লক্ষ করেননি যেহেতু তাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নাতীত নয়। উনি আরও বললেন যে এই সমস্ত অনুপ্রবেশকারীদের সব বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। কিন্তু যে কাউকে চাইলেই আন্তর্জাতিক বর্ডার পার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যায় কি? মুখ্যমন্ত্রী কি জানেন না যে গত কয়েক মাসে অনেকগুলো ভিডিও তৈরি করেও কাউকে ফেরত পাঠানো যায়নি, উপরন্তু জোর করে পাঠিয়েও সুনালি খাতুনদের আবার নিজের দেশে ফেরত আনতে হয়েছে? বর্ডার গার্ড অফ বাংলাদেশ আইনসম্মতভাবে মেনে না নিলে কাউকেই এভাবে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যায় না একথা মুখ্যমন্ত্রীসহ সমস্ত নেতামন্ত্রীরাও জানেন। কাজেই এটা ভাবা অসম্ভব নয় যে বাস্তবে পুরোটাই এক বৃহৎ নাটক। ঘটনা হল এই যে ১৫৬ ইঞ্চি ছাতির হিমন্ত বিশ্বশর্মাও ৮ জুলাই আসাম বিধানসভায় স্বীকার করে নিয়েছেন যে ২০২১ সাল থেকে আসাম ৩৬০০০ জনকে বিদেশী ঘোষণা করেও বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে পেরেছে মাত্র ১৯৬ জনকে। ফলে বিজেপি-আর এস এসের এই কোটি কোটি অনুপ্রেবেশকারীর ফাঁকা আওয়াজ সবার সামনে পরিষ্কার হয়ে উঠছে সেটা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু তবু পশ্চিমবঙ্গে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী প্রমাণের চেষ্টা চলেই যাচ্ছে যার সর্বশেষ প্রকাশ হল মুখ্যমন্ত্রীর উপরোক্ত ঘোষণা। প্রশ্ন হল যে মুখ্যমন্ত্রীকে এই খবর দিল কে যে মাত্র ৭ লক্ষ ডিলিটেড ভোটার আবেদন করেছেন? মালদা, মুর্শিদাবাদ, দুই ২৪ পরগণার গ্রামগুলো জানাচ্ছে যে সবাই পাগলের মত আবেদন করেছেন আর তার ৯৯% অনলাইনে। ভোটের আগেই পঞ্চায়েত থেকে দায়িত্ব নিয়ে এগুলো করানো হয়েছে, অথবা মানুষ সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে করেছেন। এবং এই তথ্য জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে আর বড়জোর সেখান থেকে গেছে জোকার ট্রাইব্যুনালে। তাহলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে খবর গেল কি করে? খুব বেশী হলে অফলাইনে যেটুকু জমা পড়েছে ডিএম বা SDO অফিসে, সেটুকু তথ্য থাকতে পারে কিন্তু তা মোট জমা পড়া আবেদনের ১%-এর বেশী নয়। আর যা থাকতে পারে তা হল ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা থাকলেই যেহেতু মানুষ সরকারী প্রকল্প যেমন রেশনের সুবিধা পাবেন, তাই প্রমাণ হিসেবে রেশন ডিলাররা মানুষের থেকে যে আবেদনের কাগজ চেয়ে নিচ্ছেন, বড়জোর সেই তথ্য। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই সবাই স্থানীয় স্তরে কাগজ জমা করে দিয়েছেন আর রেশন ডিলার, ফুড ইন্সপেক্টর হয়ে তা সরকারের কাছে পৌঁছে গেছে এটা ভাবা যায়? ফলে এর থেকে অনেক সহজ এটা ভেবে নেওয়া যে পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি থেকে কমিয়ে হলেও অন্ততঃ ২০ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী আছেন এটা প্রমাণের এটাই সম্ভবতঃ শেষ মরিয়া চেষ্টা, অর্থাৎ আরও একটা জুমলা। আর তার সাথে হয়তো আছে বহু মানুষকে অধিকার থেকেও বঞ্চিত করার দুষ্টবুদ্ধি। গত ৩ মাসে এই সরকার শুধু ফাঁকা হুঙ্কার, বুলডোজার আতঙ্ক, সই না হওয়া গুন্ডাদমন বিল, আর হিন্দিভাষী কাকু আর ধর্ষক ছাত্রনেতাদের দিয়ে যাদবপুর দখলের ব্যর্থ চেষ্টা, ইত্যাদিই তো করেছে। কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া এই অন্যায়ের প্রতিকার কোথায়?
এই প্রতিটি সমস্যার সমাধান আসলে লুকিয়ে আছে ট্রাইব্যুনালগুলির কার্যপদ্ধতির ওপর। ২৭ লক্ষ বাতিল হয়ে যাওয়া মানুষের জন্য ৩৪ লক্ষের বেশী আবেদন জমা পড়ে আছে বেহালার জোকায় একটি অফিসেই বসা ১৯টি ট্রাইব্যুনালের কাছে। কিন্তু এই ১৯টি ট্রাইব্যুনাল চলছে কিভাবে তা জানা যাচ্ছে না, কলকাতা ও দুই ২৪ পরগণার দায়িত্বে থাকা ২জন বিচারপতি ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন, নতুন কেউ দায়িত্ব নিয়েছেন কিনা জানা নেই, সবক’টি ট্রাইব্যুনাল প্রতিদিন বসে কিনা তাও জানা নেই! আর তা জানা সম্ভবও নয়, একটি বাহিনী ঘেরা, মানুষের প্রবেশাধিকারহীন, দুর্গের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিরা বসছেন, প্রতিদিন ক’টি আবেদন, ঠিক কি পদ্ধতিতে তাঁরা বিচার করছেন তা কোনভাবেই বাইরে আসছে না। বিচারপতিদের মুখোমুখি হয়ে নিজের বক্তব্য বলা বা কোন নথি জমা করারও কোন সুযোগ নেই। সুপ্রিম কোর্টের সওয়ালের আলোচনা থেকে কোনভাবে এইটুকু মাত্র জানা গেছে যে নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনের ৭০%-ই ভোটাধিকার ফিরে পাচ্ছেন, কিন্তু কাজ হচ্ছে অতি ধীর গতিতে, গত ৪ মাসে সম্ভবতঃ মাত্র ৩৮০০০ কেসের ফ্য়সলা হয়েছে, যার অর্থ ৩৪ লক্ষ আবেদনের সুরাহা হতে ৩০ বছর লাগবে! অথচ এই অবস্থায় মানুষের হেনস্থা চলেই যাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রেশন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অন্নপূর্ণা যোজনার সুযোগও অনেকে পাচ্ছেন না, ক্ষোভ সর্বত্র। এছাড়াও যে ১১টি দস্তাবেজ SIR পর্বে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য গ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা হয়েছিল তার কোনটির জন্যেই এরা বা এদের পরিবারের লোকও আবেদন করতে গেলে বাধা পাচ্ছেন, যা ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সমাধা হওয়া দুষ্কর। আবার এইভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া মানুষের পরিবারের সন্তানেরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠলেও ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম তুলতে গেলে সমস্যায় পড়তে পারেন। এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা হল জনগণনা পর্বে এমন ডিলিটেড ভোটারদের কিভাবে দেখা হবে, তাদের কি গণনায় ধরা হবে, নাকি তাঁরা বাদ পড়বেন এবং সেক্ষেত্রে তাদের জন্য অবস্থা ক্রমশই আরও জটিল হবে? এই সমস্ত মারাত্মক অনিশ্চয়তার সম্মুখীন তাঁরা হবেন কারণ ট্রাইব্যুনাল তাদের আবেদনের নিষ্পত্তি না করে ঝুলিয়ে রাখছে, যার ওপরে ওদের কোন নিয়ন্ত্রণই নেই!
তাই সব মিলিয়ে, এস.আই.আর প্রক্রিয়ায় ডিলিটেড ভোটারদের অবস্থা খুবই সঙ্গীন। গত ১০ মাস ধরে এরা কাগজ জমা করেছেন, এ’দোর ও’দোর দৌড়েছেন, কিন্তু অনিশ্চয়তার শেষ হয়নি। তাই ‘সংগ্রামী গণমঞ্চ’ মনে করে যে এবার কাগজ দেওয়া-নেওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিককালের ছাত্রদের অভিজ্ঞতার মতই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে পথে নামা ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই। তাই আজকের পরিস্থিতিতে একটাই স্পষ্ট দাবি তোলা দরকার … ‘সমস্ত টালবাহানা বন্ধ করো। অবিলম্বে আমাদের নাম ভোটার তালিকাভুক্ত করো।’ এই দাবি আদায় করতে হলে শুধুমাত্র আইনের দরজায় কড়া নাড়লেই হবে না, আইনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ পথে নামলেই একমাত্র এই দাবি আদায় করা সম্ভব। যেহেতু ট্র্যাইবুন্যাল সচল করে নাম তোলার বিষয়টি বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির অধীনে, তাই প্রধান বিচারপতি কাছে হাজার হাজার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। সেই কর্মসূচিই গ্রহণ করেছে ‘সংগ্রামী গণমঞ্চ’। আগামী ২রা সেপ্টেম্বর, বুধবার, বেলা ১২-৩০টায় রামলীলা ময়দান (মৌলালি) থেকে হাজার হাজার ডিলিটেড ভোটারদের মিছিল শুরু হবে, ধর্মতলায় পৌঁছে প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হবে। আওয়াজ উঠবে, ‘ডিলিটেড ভোটারদের নাম নথিভুক্ত কর, ট্রাইবুন্যালের কাজ গতিশীল করো, ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ শেষ করো।’ আমরা আশা রাখি যে মহামান্য আদালত এত মানুষের সমস্যার সুরাহা করতে পদক্ষেপ নেবেন। আর সুরাহা না হলে, রাস্তার লড়াই আরও তীব্র হবে আর তেমনই প্রয়োজনে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত করার দাবীতে মানুষকে সাথে নিয়েই আমরা দিল্লীর সর্বোচ্চ আদালতেও পৌঁছে যাব। যেভাবেই হোক, এই অনিশ্চয়তা কাটাতেই হবে।
সময়পঞ্জীঃ
২৭ অক্টোবরঃ ২০০২-০৪ সালের প্রথম Special Revision of Intensive Nature-কে মাপকাঠি ধরে পশ্চিমবঙ্গে SIR ঘোষণা
৪ নভেম্বরঃ এন্যুমারেশন শুরু
১৬ ডিসেম্বরঃ ৫৮ লক্ষ মৃত, স্থানান্তরিত, নিখোঁজ মানুষের নাম বাদ দিয়ে খসড়া তালিকা প্রকাশ এবং এরপর থেকে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির শুনানি শুরু, আনুমানিক ১.৩৬ কোটি নোটিস জারি
২০ ফেব্রুয়ারিঃ পশ্চিমবঙ্গের নানা মহল থেকে নির্বাচন কমিশনের এই অদ্ভুত যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির খেলার অভিসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তখনও সমাধা না হওয়া ৬০ লক্ষর নথি যাচাই নির্বাচন কমিশনের বদলে জুডিসিয়াল অফিসারদের ওপরে প্রদান
২৮ ফেব্রুয়ারিঃ নির্বাচন কমিশনের তরফে শেষ তালিকা প্রকাশ যেখানে হিন্দুপ্রধান এলাকার ৭৬ লক্ষ শুনানি থেকে সাড়ে ৫ লক্ষ নাম বাদ
৫ মার্চঃ সংগ্রামী গণমঞ্চের তরফে খসড়া তালিকার ওপরেই ভোট করার দাবিতে হাইকোর্টে ও নির্বাচন কমিশনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান
১০ মার্চঃ জুডিসিয়াল অফিসারদের হাতে বাদ যাওয়া মানুষদের জন্য প্রাক্তন বিচারপতিদের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুপ্রিম নির্দেশ
২০ মার্চঃ বেহালার জোকার নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় ১৯ টি ট্রাইব্যুনালের অফিস শুরু
২৩ মার্চঃ জুডিসিয়াল অফিসারদের তরফে ৬০ লক্ষ শুনানির ফলাফল ধাপে ধাপে প্রকাশ ও ডিলিটেড ভোটারের ট্রাইব্যুনালে আবেদন শুরু
৯ এপ্রিলঃ জুডিসিয়াল অফিসারদের তরফে ১৮ দফা পার করে শেষ তালিকা প্রকাশ, ৬০ লক্ষ আবেদনের মধ্যে ২৭ লক্ষ বাদ
২১ এপ্রিলঃ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ১৩৯ নাম ফেরত যার মধ্যে ১ জন কংগ্রেসের প্রার্থী, ৮ জনের আবেদন বাতিল
২৩ এপ্রিলঃ প্রথম দফা ভোট
২৭ এপ্রিলঃ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ১৪৬৮ নাম ফেরত, ৫ জনের আবেদন বাতিল, ২ দফায় মোট ১৬০৭ জন ভোটাধিকার ফিরে পেলেন
২৯ এপ্রিলঃ দ্বিতীয় দফা ভোট
৪ মেঃ ভোটের ফল, বিজেপি জয়ী
৭ মেঃ কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগণার ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে থাকা প্রাক্তন বিচারপতি টি শিবজ্ঞানমের পদত্যাগ
১ জুলাইঃ দক্ষিণ ২৪ পরগণার দায়িত্বে থাকা প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জিত কুমার বাগের পদত্যাগ
১৭ জুলাইঃ সুপ্রিম কোর্টে গোপাল শঙ্কর নারায়ণনের কথায় এতদিনে ৩৪ লক্ষ আবেদনের মাত্র ৩৮০০০-এর ফয়সালা ট্রাইব্যুনাল করেছে
২ সেপ্টেম্বরঃ সংগ্রামী গণমঞ্চের মহামিছিল ও কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে ট্রাইব্যুনালের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দাবিপত্র পেশ









