ক’দিন আগে একখান পোস্টে বলেছিলাম, সরকারি চাকরি করব না। সেই সূত্রে একটা প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েছি, সবাই যদি দায় ঝেড়ে ফেলে, তাহলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা চলবে কীভাবে! আজ এই প্রশ্নটা প্রাসঙ্গিক। কারণ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধুঁকতে ধুঁকতে হলেও চলছে। আজ এই একই প্রশ্ন সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কেউ করতে পারবে! সম্ভবত পারবে না। আগামী দিনে স্বাস্থ্যব্যবস্থাও সেই দিকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন, সরকারি কাজে যোগ দাও, প্রাইভেটে তো কাজের সুযোগ থাকছেই। যদিও চাকরি কেন, সামান্য বন্ড পোস্টিং দিতেও তিনি অপারগ, তবুও বলে রাখা ভালো সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেটে কাজ করার এই স্কিমটা শুধু এই দেশেই চলে। সহজভাবে বলতে গেলে সরকার ঠিকমতো মাইনে দিতে অক্ষম হওয়ায় তাকে নিজের চাকুরে ডাক্তারকে বাইরে কাজে ছাড়তে হয়, নয়তো তার চাকরি কেউ করবে না। বলা ভালো, কোনো কোয়ালিটি লোক করবে না। এমনি নেতা মন্ত্রীদের হাফ পাস করা ছেলেমেয়েগুলো হাসপাতাল টেনে দিতে পারে অবশ্য, তাদের তো নিজের জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে বাইরে রোগী দেখার ক্ষমতা নেই, তাদের এই দিয়েই কাজ চালাতে হবে…
যাইহোক, আমি যখন মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে বেরোই, আমার
জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এম.ডি. পাশ করে কলেজে যোগদান করা। তখনও চাকরি বাকরি মিলত আর কি, আর ছাত্রাবস্থায় সরকারি হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নগ্ন রাজনীতি আমার জানা ছিল না। তারপর পিজি হাসপাতালের নীল সাদা কারাবাসে সাত বছর কাটিয়ে আমার সরকারি চাকরির যে কীরূপ মোহভঙ্গ হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুর্বিষহ। আমার থেকে যারা বয়ঃকনিষ্ঠ, যাদের জীবনে ভালো কিছু করার আকাঙ্ক্ষা এখনও বেঁচে আছে, তাদের উদ্দেশ্যে কয়েকটা কথা বলতে চাই, যার মূলমন্ত্র এটাই সরকারি বা বেসরকারি কোনো শিকল পায়েই কোনো ভালো কাজ করা সম্ভব নয়।
কেন সম্ভব নয়, সে কথায় পরে আসছি। প্রথমে কথাটা দায়বদ্ধতার। সরকারি কলেজে পড়েছি বলে সরকারি হাসপাতালে কাজ করতে হবে, এটা কি একটা কর্তব্য! এমবিবিএস পড়ার আগে আমরা কেউ পাড়ার মোড়ে মাইক বাজিয়ে বলিনি এমবিবিএস পড়ার জন্য আমাদের নির্বাচন করুন, আমরা সারা জীবন আপনাদের সার্ভিস দেব। আপনি বিড়ি ফুঁকে হার্ট অ্যাটাকে মরবেন, আমি রেডিয়েশন খেয়ে আপনার স্টেন্ট বসাবো। আপনি মদ খেয়ে লিভার ফোটাবেন, আমি আপনার পেটের জল বের করবো। এসব মুচলেকা আমরা দিই নি, আমরা নিজেদের জীবনপাত করে পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়েছি। এক বছর নামমাত্র মাইনে দিয়ে হাসপাতালের সব বিভাগে বেগার খেটেছি, তারপর এমবিবিএস কমপ্লিট হয়েছে। তারপর আমরা পড়তে গেছি এম ডি। নিজেদের যোগ্যতায় পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়েও আমাদের মুচলেকা দিতে হয়েছে, রাজ্যের যে প্রান্তে পাঠাবে, আমাদের তিন বছর বন্ড সার্ভিস দিতে হবে। নয়তো বাৎসরিক দশ লক্ষ টাকা জরিমানা। অর্থাৎ কেউ যদি বন্ড না করে ত্রিশ লক্ষ টাকা দিয়ে তাকে ডিগ্রি কিনতে বাধ্য করেছে সরকার, পরীক্ষায় যোগ্যতা প্রমাণের পরও। তারপর এই বন্ডের জায়গা নির্ধারণ করার অধিকারও আমাদের দেওয়া হয়নি। কার কী পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনার জায়গাই নেই, তাকে কোথাও একটা বন্ড ধরিয়ে দেওয়া হলো। সব চেয়ে হাস্যকর তো এবার হয়েছে, সাত মাসের উপর লোকে বন্ডের আশায় বসে আছে, পোস্টিং নেই। তার বন্ডের জন্য তাকে কেউ চাকরিও দেবে না, সে পোস্টিংও পাবে না, বেসিক্যালি সে ঝুলবে, তার লোন শোধ করার থাকলে কীভাবে করবে সেও জানে না। ডাক্তারদের জীবন নিয়ে সরকারের এবং সেই সরকার নির্বাচনকারী জনগণের কোনো মাথাব্যথা আছে কি! কোনো নির্বাচনের ইস্যু কি আমরা কোনোদিন হতে পারবো! তা যদি না হয়, আমাদের দায় কীসের!
তাও তো আমরা করেছি। ইন্টার্নশিপের সময়, রেসিডেন্সির সময় সকালের আউটডোর থেকে মাঝ রাতের খারাপ পেশেন্টের সিপিআর অব্দি সবই তো করেছি। গত দশ বছর ধরে আমি আন্ডারপেইড স্টাফ হিসাবে কাজ করছি, আমার সিনিয়ররা করছেন যুগ যুগ ধরে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তো আর একশটা কলেজ চলছে, কোনটায় পাশ করে মানুষ এরকম বেগার খাটছে! আমাদের ছোটবেলা থেকে গড কমপ্লেক্স ধরানো হয়েছে, সেই ইগোর হাড্ডি খানা লক্ষ্য করে ল্যাজ উঁচিয়ে দৌড়াচ্ছি। এসব ধ্যাসটামো বন্ধ হওয়া উচিত।
এবার কথা হলো সারাজীবন জনগণের জন্য উৎসর্গ করে আন্ডারপেইড থেকে চাকরি করেও কেন একজন ডাক্তার এই কুকুরের লেজ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সোজা করতে পারবে না, সেটাও বলে দি। তার প্রথম যুক্তি সেটা এখনো সোজা হয়নি, হওয়ার হলে এতদিনেই হতো। বড় বড় মহারথী পারেনি, আমরাও কেউ পারব না।
কেন পারব না? পরিকাঠামো অপ্রতুল। বাড়ানোর ইচ্ছাও নেই। আচ্ছা ধরুন সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার অসংখ্য, বেড অসংখ্য, গেলেই চিকিৎসা পাওয়া যায়, দরকার হলে ভর্তি হওয়া যায়। এরকমটা যদি হতো, আপনি অসুস্থ হলে হাসপাতালে যাওয়ার আগে নেতার কাছে হাত পাততে যেতেন? সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ দেখাতে পারত? সোজা কথায় বেডের দালালগুলোই নেতা হয়, তারপর রয়াল স্ট্যাগ চশমা পরে মদ খায়। এই সামান্য সত্যিটা কি দেখেও দেখা যাচ্ছে না? সরকারের বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা নেই এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে উন্নত করার। কঙ্কালসার বিল্ডিং দাঁড় করাবে, সেগুলোর দালালি খাবে, কাজের লোক নিয়োগ হবে না। সারাজীবন তাই হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও তাই হবে।
মানুষ পরিষেবা পাবে না। দোষ হবে ডাক্তারের। ধুঁকতে থাকা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে টানতে টানতে ক্লান্ত ঘোড়ার পিঠেই চাবুক পড়বে, সরকারেরও, জনগণেরও। মিডিয়ার সামনে স্বাস্থ্য কর্মীদের অপমান করা হবে, মানুষ হাততালি দিয়ে বলবে “দেখেছো কী দিচ্ছে আমাদের নায়ক!!” কেউ বুঝবে না ইমার্জেন্সিতে ইন্টিউবেশন করা দূর অস্ত, একটা রোগীকে রিসাসিটেট করতে শুরু করলে আরও দশটা রোগী দেখার লোক নেই ইমার্জেন্সিতে। আমরা মেডিক্যাল কলেজে ইমার্জেন্সিতে ঢুকলে কখন রাত নামতো, আর কখন রাত কেটে দিন আসতো বোঝার সুযোগ পেতাম না। তাও দোষ ডাক্তারের।
চোখ নাক বুজে কাজ করতে শুরু করবে, যা চাইবে ফান্ড নাই গাইজ 🙏 এখন ফান্ড সত্যিই অপ্রতুল, অস্বীকার করে লাভ নেই। কিন্তু পেশেন্ট ক্যাচ বেরোলে ফান্ড চলে আসবে ঠিক। রিটায়ার্ড আইএএস অফিসার, তার আবার স্বাস্থ্য সাথী কার্ডে অপারেশন হচ্ছে, দামি যন্ত্রপাতি চলে আসছে নিমেষে। এদিকে যন্ত্রের অপেক্ষায় ইন্ডেন্ট এই টেবিল ওই টেবিল ঘুরতে ঘুরতে বেঘোরে মারা যাচ্ছে মানুষ, সবাই নির্বিকার। এই তো কদিন আগে অব্দি একটা ভারতীয় কোম্পানির পেসমেকার আসতো সাপ্লাই। সবাই জানে এর কোনো বিশ্বাস নেই, যে কোনো সময় নিজেও অফ হবে, পেশেন্টও অফ হবে। এই এত বড় বড় জনদরদী সরকারি ডাক্তারেরা কী উদ্ধার করতে পেরেছিল! নেহাত একজন পেশেন্ট পার্টি সব তথ্য মিডিয়ার হাতে তুলে দেওয়ায় জারিজুরি বন্ধ হয়ে নতুন টেন্ডার ডাকতে হলো… কার্ডিওলজিতে একবার একজন হার্ট এ্যাটাক রোগী ভর্তি নিতে পারিনি, তৎকালীন এইচ ও ডি কোনো ভাবে সেটা জানতে পেরে আমায় তলব করেন, ইমার্জেন্সী পাঁচটা বেড থাকা সত্ত্বেও রোগী ভর্তি নাওনি কেন! স্যারেরা যে কোনো কারণে হোক এটা মানতে পারেন না, এক্সিস্টিং সব মেডিক্যাল কলেজের সিট আজ এই মুহূর্তে দ্বিগুণ করলেও এসব হার্ট এ্যাটাক রোগী ভর্তি করা সম্ভব নয়। শেষে স্যারকে সেই পাঁচটা ইমার্জেন্সী বেডের খাতা আর ওই রোগীর ইমার্জেন্সী টিকিট এনে দেখাতে হলো যে সেই বেডের শেষ পেশেন্ট এই রোগীর আগে ভর্তি হয়ে গেছিল। আমার হাতে আর বেড ছিল না। তখন ইন্টার্ন ছিলাম। একটা পয়সনিং কেস, এট্রোপিন দিয়ে কোনোমতে ধাতস্থ করা হয়েছিল। তার স্থান হয়েছিল দরজার কোণায়। রাতে ইনফিউশনটা চলছিল কি চলেনি কেউ দেখেনি, সকালে রোগী আবার খারাপ, আবার গুচ্ছের ইনজেকশন, শেষরক্ষা হয়নি। আমাদের একিউট মেডিসিনে শখানেক রোগী, তিনজন সিস্টার – তারা ওয়ার্ডের একপ্রান্তে ইনজেকশন টানতে শুরু করে শেষ প্রান্তে দেওয়া শেষ করতে করতে প্রথম প্রান্তে আবার নতুন ইনজেকশন দেওয়ার সময় হয়ে যেত। কে খবর রেখেছে, কার পক্ষে খবর রাখা সম্ভব! তাই মানুষ মরবে, বিলো স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসা পেয়ে মরবে। সেটা মেনে নেওয়ার ক্ষমতা থাকলে ইউ আর ওয়েলকাম 😊 কিন্তু দিনের শেষে ভিলেন কিন্তু তুমিই বস। তবে তোমাকে পজিটিভ হতে হবে। ক্লোরোকুইন দিয়ে ম্যালেরিয়া সারিয়ে, হার্ট অ্যাটাকের তিন দিন পর স্টেন্ট বসিয়ে যদি খুশি থাকা যায়, তবে চলে যাবে…
তারপর স্বগোত্রীয় লোকেদের থেকে যা যা আক্রমণ সহ্য করতে হবে, তার হাল হকিকত তো আর দিলাম না 🙏 ডিপ্রেশন বাড়বে। তেলবাজি, লবিবাজি, অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের লোক দেখলেই হাত কচলিয়ে পায়ে পড়ে যাওয়া এসব করতে পারলে ভালো, নইলে কপালে প্রচুর দুঃখ বেদনা অপেক্ষা করছে। নেতাদের এক ফোনে মূত্র সংক্রমণের রোগী আইসিসিইউ তে ঢুকে যাবে, জেলের দাগি আসামি উডবার্ন ওয়ার্ডের ক্রনিক পেশেন্ট হয়ে যাবে – এসব করতে পারলে তবে তুমি হিরো, নইলে পাহাড়ের পাদদেশে হাওয়া খাও, নিজের ডিপার্টমেন্টই নেই, এমন জায়গায় গিয়ে ডুগডুগি বাজাও। আর এই স্বজনপোষণ আর আক্রোশের বদলি সারাজীবন চলেছে, চলছে, চলবে… মুক্তি নেই, স্বেচ্ছাবসর নেই, শুধু মুক্তির পথ একটাই – মরিয়া প্রমাণ করিতে হইবে তুমি সত্যিই অসুস্থ….
পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ডাক্তারের চাকরি শুধু একটা চাকরি নয়, একটা রোমাঞ্চকর অভিযান, যা আমার মতো দুর্বল হৃদয়ের মানুষদের জন্যে একদমই স্বাস্থ্যকর নয় 🙏









