এলার্জি কেন হয়, সেই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনেকেরই অজানা। আগেই বলা হয়েছে, এলার্জি কোনো রোগ নয়, বরং এটি শরীরের প্রতিরক্ষার একটি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া। তাই এলার্জি বুঝতে হলে আগে জানতে হবে—আমাদের শরীর কীভাবে নিজেকে রক্ষা করে, অর্থাৎ শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কিভাবে সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে এলার্জির মত সমস্যা তৈরি করে।
এই অধ্যায়ে আমরা খুব সহজ ভাষায় জানব— শিশুর শরীরে এলার্জি কীভাবে শুরু হয়, কোন কোন কোষ ও রাসায়নিক পদার্থ এতে ভূমিকা নেয় এবং কেন সব শিশুর এলার্জি হয় না।
এলার্জির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউনিটি নিয়ে একটি প্রাথমিক ধারণা না থাকলে আমরা এলার্জি বুঝতে পারব না। তাই প্রথমে আমরা আলোচনা করব, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যাবস্থা কি?
আগ্রহী পাঠকরা এই পরিচ্ছেদ পড়তে পারেন, অন্যথায় না পড়লেও বিশেষ অসুবিধা নেই।
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System):
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হল শরীরের নিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস (ছত্রাক), পরজীবী, টক্সিন ইত্যাদি থেকে শরীরকে রক্ষা করে। এই প্রসঙ্গে একটি দেশ এবং তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে শরীর ও তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে তুলনা করা যেতে পারে।
শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হল পুরো শরীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা একটি বড় নেটওয়ার্ক— যা তৈরি হয়
- কোষ
- টিস্যু বা কলা
- অঙ্গ বা অরগান ও কিছু
- রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে।
এরা সব মিলিয়ে একসাথে একযোগে কাজ করে।
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রধান দুটি স্তর আছে
- সহজাত বা জন্মগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (বা Innate Immunity)।
এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শিশুর জন্ম থেকেই থাকে এবং যে কোনও জীবাণুকে একইভাবে আক্রমণ করে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। Innate immunity দ্রুত কাজ করে, কিন্তু নির্দিষ্ট শত্রু চিনতে পারে না।
সহজাত বা জন্মগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হল
১। ত্বক (Skin) – শরীরের প্রথম প্রতিরক্ষা দেওয়াল।
২। মিউকাস মেমব্রেন – নাক, গলা, ফুসফুস, অন্ত্রে থাকা ঝিল্লি – যা জীবাণু আটকে দেয়।
৩। পাকস্থলির এসিড – পাকস্থলির অতিরিক্ত অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে।
৪। জীবাণু গিলে ফেলা কোষ বা Phagocytic Cells – এরা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস “গিলে” ফেলে। এর মধ্যে আছে
Neutrophil (নিউট্রোফিল)
Macrophage (ম্যাক্রোফেজ)
Dendritic Cell (ডেন্ড্রাইটিক কোষ)
৫। Natural Killer (NK) Cells, শরীরের আরভএক ধরণের কোষ, এরা ভাইরাস আক্রান্ত কোষ বা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করে।
৬। Inflammation যাকে বাংলায় বলা হয় প্রদাহ – শরীর আহত হলে বা সংক্রমণ হলে সেই স্থান লালচে হয়, গরম হয়, ব্যথা হয় —এগুলো জীবাণুর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থার কারণে হয় ।
2. অধিগত বা শেখা প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Adaptive Immunity)
জন্মের পরে এই ইমিউনিটি বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হয়। এটি জীবাণুকে চিনে নিয়ে সেই জীবানুকে নির্দিষ্ট ভাবে আক্রমণ করে। ধীরে কাজ শুরু হলেও এই ইমিউনিটি অনেক বেশি শক্তিশালী ও নির্ভুল।
Adaptive immunity নির্দিষ্ট জীবাণু চিনতে পারে এবং “মেমরি” বা স্মরণশক্তি যুক্ত কোষ তৈরি করে। তাই ভবিষ্যতে একই জীবাণু আক্রমন করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যাবস্থা গ্রহন করে। একে বলে Immunological Memory।
Adaptive Immunity এর দুটি প্রধান অংশ:
(ক)- হিউমোরাল ইমিউনিটি (Humoral Immunity)
এটি বি-লিম্ফোসাইট (B-Lymphocyte) নামক এক প্রকার কোষ নিয়ন্ত্রণ করে। B-cells জীবাণুর বিরুদ্ধে এন্টিবডি (Antibody) বা জীবানু ধ্বংসকারী রাসায়নিক প্রোটিন তৈরি করে। এই এন্টিবডি
- জীবাণুকে চিহ্নিত করে।
- জীবাণু থেকে টক্সিন নির্গত হলে সেই টক্সিন নিস্ক্রিয় করে।
- জীবাণুকে ধ্বংস করতে অন্যান্য কোষকে নির্দেশ দ।
(খ)- কোষ নিয়ন্ত্রিত ইমিউনিটিঃ (Cell-Mediated Immunity)
এটি টি-লিম্ফোসাইট (T-Lymphocyte) নামক কোষ দ্বারা পরিচালিত হয়।
T-cells আবার বিভিন্ন ধরণের হয়। এর কাজ
- Helper T-cell (CD4+) – ইমিউন সিস্টেমকে “সিগন্যাল” দেয় — কে বা কোন কোষ আক্রমণ করবে এবং কোন অ্যান্টিবডি তৈরি হবে।
- Cytotoxic T-cell (CD8+) – ভাইরাস আক্রান্ত কোষকে বা ক্যানসার কোষকে সরাসরি মেরে ফেলে।
- Regulatory T-cell – অতিরিক্ত ইমিউন প্রতিক্রিয়া (যেমন অ্যালার্জি, অটোইমিউন) নিয়ন্ত্রণ করে।
ইমিউন সিস্টেম বা আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা (Immune System) যে সব কোষ দিয়ে গঠিত এবং তাদের কাজ।
- White Blood Cells (WBCs) বা Leukocytes
- Neutrophils- ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে — শরীরের প্রধান ‘ফাইটার’।
- Lymphocytes
-
- B-cell → অ্যান্টিবডি তৈরি করে।
- T-cell → ভাইরাস আক্রান্ত কোষ ধ্বংস করে।
- NK-cell → ক্যানসার কোষ ধ্বংস ক…
- Monocytes / Macrophages – বড় জীবাণু গিলে ফেলে।
- Eosinophils – পরজীবী সংক্রমণ ও অ্যালার্জির ক্ষেত্রে সক্রিয় হয়।
- Basophils / Mast Cells – হিস্টামিন নিঃসরণ করে, ফলে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
ইমিউন সিস্টেম কীভাবে কাজ করে?
ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ধাপে ধাপে কাজ করে
প্রথম ধাপঃ
- জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে।
দ্বিতীয় ধাপঃ
- Macrophage জীবাণু গিলে ফেলে।
- Inflammation বা প্রদাহ শুরু হয়।
তৃতীয় ধাপঃ
- Macrophage জীবাণুর তথ্য T-cell কে দেয়।
চতুর্থ ধাপঃ Adaptive Immunity সক্রিয় হয়
- Helper T-cell তখন B-cell কে সক্রিয় ক…
- তারপর B-cell Antibody তৈরি করে।
- Cytotoxic T-cell আক্রান্ত কোষ ধ্বংস করে।
পঞ্চম ধাপঃ
- Memory বা স্মৃতিকোষ তৈরি হয়- পরের বার একই ক্ষতিকর জীবাণু এলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া হয়।











