আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে যে বই পড়ে বা গান শুনে আমার ঠিক কি রকম অপার্থিব আনন্দ হয় সেটা বলে বোঝাতে হবে, আমি পারব না। ঠিক তেমনি, যাঁরা বয়স্ক ও শিশুদের সহ্যশক্তির তোয়াক্কা না করে, পথের ও গৃহপালিত পশুদের শ্রবণেন্দ্রিয় ও হৃদযন্ত্রের ক্ষতি সম্পর্কে ন্যূনতম সংবেদ না দেখিয়ে বেপরোয়া ভাবে শব্দবাজি ফাটিয়ে চলেছেন যুগ যুগ ধরে, তাঁদের কাছেও এই প্রশ্নটা করলে একটা আবছা উত্তর মিলবে, ‘মজ়া আতা হ্যায়’ কিংবা ‘দারুণ লাগে’! এর বেশি বিশদ করার ক্ষমতা এই আমোদপ্রেমীদের নেই। সম্ভবত, অসহায় শিশু বা অসুরক্ষিত মহিলাকে ধ* র্ষ* ণ করার সময়ও একই রকম তূরীয়ানন্দ ভোগ করে থাকে সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তেরা। কিংবা বো* মা, গু* লি, ছো* রাছুরির আঘাতে শিকারের শরীর থেকে গরম রক্তের ধারা বের হতে দেখলে একই রকম নির্ভেজাল প্রফুল্লতায় ভরে ওঠে আততায়ীর মন।
উৎসবের রাতে দিশি-বিলিতি সুরার গ্লাস হাতে অনাবিল উল্লাসে মেতে ওঠেন যারা, তারাও বোঝাতে পারবেন না যে মায়ের হাতের নতুন গুড়ের পায়েসের রসনাবিলাসে হৃদয় বেশি রসসিক্ত হয়ে ওঠে, নাকি কারণবারির অনুপম আস্বাদে?
স্বাদকুঁড়িরা ফুল হয়ে ফুটে লোভনীয় লালার ধারা অদৃশ্য পরাগরেণুর মতো ছড়িয়ে দেয় কি মনোমাঝে? জানা নেই।
আত্মঘাতী জাতির শ্বাসের বাতাসে দূষণের মাত্রা তিনশো, চারশো, পাঁচশো ছাড়িয়ে যাক না, ‘হেসে নাও, দু’দিন বৈ তো নয়!’
যতই ঝলমলে আলোর মোড়কে সেজে উঠুক পাড়া থেকে মহল্লা, গ্রাম থেকে শহর, দেবীরঙ রাতের সবটুকু কালিমা মেখে আজ রাত্রেও কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনও নারী ধ*র্ষি*তা হবে, আতশবাজি-শহিদ হবে কোনও প্রতিবাদী প্রাণ, মদমত্ত আনন্দোচ্ছ্বাসের বাঁধ ভেঙে দুর্ঘটনার বলি হবে কোনও মায়ের সন্তান অথবা সন্তানের মা বাবা, বেআইনি বাজির প্রকোপে বেঘোরে হারিয়ে যাবে উলুখাগড়ার মতো অকিঞ্চিৎকর কোনও জীবন।
মণ্ডপে নরমুণ্ডের মালা গলায় দুলিয়ে করালবদনী দেবী হাসবেন। কারও ভিটের ছাদ থেকে বীভৎস আলোর রোশনাইয়ে পূর্বপুরুষদের মহাপ্রস্থানের পথটি চিনে নিতে ভুল করবে কোনও মিটমিটে আকাশপ্রদীপ। রোগা বউটির পরিশ্রমের ফসল নিরাভরণ মাটির প্রদীপ ঔজ্জ্বল্যে দশ গোল খেয়ে হেরে ভূত হয়ে যাবে এলইডি বালবের ঝুলন্ত আলোকমালার কাছে।

গন্ধক-সোরা-বারুদের নিষ্ঠুর আক্রমণে বধির হয়ে যাচ্ছে ন্যায়পালিকা, অন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রশাসন, প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছে শুভবুদ্ধি। তবু, উৎসব চলছে, চলবে।
আলোকোজ্জ্বল পৃথিবীর সহস্র দীপের নিচে জমাট বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমি আকুলভাবে খুঁজে চলেছি রূপকথার কোনও জাদুকরকে — যার জাদুদণ্ডের একটি ইঙ্গিতে হলাহলমন্থনের এই বহ্ন্যুৎসব নিমেষে স্তব্ধ হয়ে যাবে, থেমে যাবে সব দামামা, শান্ত হবে বাতাবরণ।
কেউ তো চিৎকার করে বলুক –দ্য শো মাস্ট নট গো অন, ইট নিডস টু স্টপ — স্টপ ইমিডিয়েটলি, ইফ নট ফর এভার।









