কোনো মানে হয়না তাও একেবারে যোগসূত্রহীন কয়েকটা ঘটনা তুলে ধরার অবান্তর ইচ্ছে হলো……………
১৯৬৮ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য প্রাচীন সমরসচিব, ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্যতম রূপকার ও তৎকাসলীন ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারাকে কোলকাতায় যেভাবে অভ্যর্থনা দেওয়া হয়েছিল’ সেটাই almost headline ছিল’ সেযুগের New York Timesএ ২১ নভেম্বর তারিখে। সংবাদপত্রের বিবরণ বলছে, McNamara rescued from Calcutta mob by helicopter lift. আশা করি, ম্যাকনামারা সাহেবও তার প্রথম ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে বিস্মৃত হননি।

আমার প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। ভারত সফরের এই তিনদিনে ইস্রায়েলের ঐ অর্থমন্ত্রী মহাশয় কি কোথাও কোনো অসুবিধা বা বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছেন বা ভারতীয় প্রশাসনের উদ্বেগের কারণ ঘটেছে? সম্ভবতঃ, কয়েকটি শহরে সংগঠিত ছাত্রবিক্ষোভের কর্মসূচী পালিত হয়েছে। কিন্তু তা আর যাই হোক ঐ মন্ত্রীমহোদয়ের সফরে বা কাজে বিন্দুমাত্র বিঘ্ন ঘটানোর অভিপ্রায়ে নয়। বামপন্থী দলগুলি অবশ্য কড়া বিবৃতি দিয়েছেন।
সময় পাল্টেছে, পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, নিশ্চয়ই একই ধরণের কার্যপ্রণালী সব সময়েই অনুসরণ করতে হবে তার কোনো মানে নেই। নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি বা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ পথ যে একেবারেই পরিত্যাজ্য বা অন্যায্য তা তো কখনোই নয়। কিন্তু এটাও মেনে নেওয়া ভালো যে চিরকালই এর আকর্ষণী ক্ষমতা অনেক সীমিত।
ইদানীংকালে নেপালের ঘটনাতেও নিয়মতান্ত্রিক বা ‘স্বাভাবিক’ পথ অনুসরণের বিপজ্জনক দিকটাই প্রকট হয়ে উঠেছে। সেখানের কমিউনিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা তো এই উপমহাদেশের সমস্ত শাসক দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাহলে, তফাৎটা কোথায়? বস্তুতঃ, এই তফাৎ বা পার্থক্যটা বজায় রাখতে না পারাটাই বোধহয় বামপন্থীদের সবচেয়ে বড় বিপদ !!
১৯৪৯ সালে কোলকাতায় গঠিত হয় নেপালের কমিউনিষ্ট পার্টি, পুস্পলাল শ্রেষ্ঠার উদ্যোগে।নেপালের রাণাশাহীর বিরুদ্ধতা করায় পুস্পলালের দাদা গঙ্গারামের প্রাণদণ্ড কার্যকরী করা হয়েছে কয়েক বছর আগেই। প্রথম কয়েক বছরে পার্টির কাজও চলে এখান থেকে এবং নেপালের প্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারলেও দেশ ছাড়তে হয় অল্পদিন পরেই। প্রবাসে অসুস্থ হয়ে ভর্তি হন দিল্লির গোবিন্দবল্লভ পন্থ হাসপাতালে। ভারতের অনেক নেতার সঙ্গে পরিচয় থাকলেও, কারুর সাহায্য ছাড়া ভর্তি হন সাধারণ (জেনারেল) ওয়ার্ডে বিশেষ কোনো সুবিধা নেবেন না বলে, এবং সেখানেই মারা যান। নেপালের রাজতন্ত্র তার মৃতদেহ নেপালে ফেরাতে অনুমতি না দেওয়ায়. দিল্লিতে যমুনা নদীর ধারে নিঘমবোধ ঘাটে তার অন্তিম সৎকার হয় ১৯৭৮ সালে। এর পরে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন ঘটে। প্রায় এক দশক ধরে চলা সেনা-বিদ্রোহী গেরিলা মারাত্মক প্রাণঘাতী যুদ্ধের পর কমিউনিস্টরা অংশগ্রহণ করে শাসনক্ষমতায় ও বিগত দুই দশকের কাছাকাছি সময়ে ক্ষমতায় থেকেছে প্রায় প্রধান শক্তি হিসেবেই। আজ সেই নেতাদেরই আক্রান্ত হতে হচ্ছে চরম দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের(nepotism) এর দায়ে। ঠিকই, বাংলাদেশ, নেপাল প্রভৃতি দেশগুলিতে যা ঘটেছে ও ঘটছে তার পিছনে নিশ্চিত ভাবে অনেক বড় শক্তি রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রিত করে চলেছে অসংগঠিত জনগণকে। কিন্তু অভিযোগগুলো সব মিথ্যা তা তো নয়, বহুলাংশে না হলেও অনেকাংশে সত্যি বলেই বরং এতো সহজ হয়ে যাচ্ছে স্বার্থান্বেষীদের অবাধ পদচারণা। সঠিক ভাবে দুর্নীতির পরিমাপ করা সম্ভব না হলেও, নেপালের এককালের বিপ্লবী নেতাদের শাসক হিসেবে বিলাসবহুল জীবনযাত্রা নিয়ে চর্চা বেশ অনেক দিনেরই। তার মধ্যে কতটা স্বোপার্জিত আর কতটা জনগণের বা সরকারি তহবিল কাছ থেকে, সেটা বলা মুশকিল।
মুশকিল হলো, নেপালে আক্রান্ত শুধু বামপন্থীরা নয় নেপাল কংগ্রেসসহ সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রায় একই ব্র্যাকেটে ফেলে দিচ্ছে বর্তমান আন্দোলনকারীরা। Gen Z (Generation brought up in digital era) এর কাছে নাকি সব পার্লামেন্টারিয়ান দলই এক!
জানা নেই, নেপালের খেটে খাওয়া মানুষের বক্তবও এক কিনা। আসলে এটা একটা সোজা পদ্ধতি কাউকে discredit করার, লাল-নীল-সবুজ সব এক !! আলাদা করে বোঝানোর দরকার নেই, কেন? তাতে আবার সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার দায়ও অনেক কমে যায়।
আর, সমস্যাটা সবচেয়ে বেশি সেইখানেই। অরাজনৈতিক বলে এক চরম রাজনৈতিক খেলা, যেখানে কোনো দল বা রাজনীতিই answerable নয়।
ভবিষ্যতে নেপালের কী হবে জানিনা, কিন্তু বামপন্থীরা যদি মানুষের কাছে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বা অন্যদের সঙ্গে পার্থক্য হারিয়ে ফেলে, তাহলে তার মতো বিপজ্জনক যে কিছু হতে পারে না, এটা বোধহয় একেবারে সুনিশ্চিত ……………………..









