মাঝেমাঝে খুব ধন্দে পড়ে যাই। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই পড়ি, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বোধহয় বেশি করে। আমার নিজের মূর্খতাই এর জন্য দায়ী।
অভ্যুত্থান / বিদ্রোহ / বিপ্লব (যে শব্দগুলোকে আমি পৃথক অর্থের দ্যোতক বলে ভাবতাম) নিয়ে প্রায় সবার নির্দিষ্ট মতামত আছে, যা (বাই ডিফল্ট) অভ্রান্ত কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে মেলে না৷ সব গুলিয়ে যায় আমার মতো হাঁদা পাব্লিকের, যারা তাৎক্ষণিক অভিমত তৈরি করে উঠতে পারে না, জিগস পাজলের সবদিক মেলাতে গিয়ে হোঁচট খায়।
একটা শিবিরের মানুষের মত হল, যেকোনো স্থানে যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো অভ্যুত্থানই ‘মহান’ এবং সমর্থনযোগ্য, যদি তা যথেষ্ট মিলিট্যান্ট হয় এবং আপাতদৃষ্টিতে তাতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ থাকে৷ এঁরা সাধারণত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বা প্রতিরোধকে সন্দেহের চোখে দেখেন, যে কারণে গত এক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চে অভয়া আন্দোলনকে সন্দেহ করেছেন এবং কটূক্তি করে গেছেন৷ এঁদের প্রেমিস এবং যুক্তিপরম্পরা নিয়ে আমার অস্বস্তি হয় কিন্তু এঁরা এতটাই জোরের সঙ্গে নিজেদের কথা বলেন যে ভেবে ফেলি, আমিই নির্ঘাত সব ভুলভাল ভাবি।
বিপরীত মেরুতে বহু মানুষ সবরকম প্রতিবাদ, প্রতিরোধকেই অপ্রয়োজনীয় এবং সন্দেহজনক ভাবেন। এঁদের নিয়ে বেশি কথা খরচ না করাই ভালো।
যাঁরা সব গণ-অভ্যুত্থানকেই সাধারণত বিপ্লব বলে থাকেন… মিশর থেকে বাঙলাদেশ সর্বত্র তাই বলেছেন, লিবিয়ার স্বৈরশাসকের পতনে ততটাই আনন্দ করেছেন, যতটা করেছিলেন ৯/১১ টুইনটাওয়ার পতনে, তাঁরা পরবর্তীকালে গোপনে ঢোঁক গিলেছেন বারবার। এঁদের একটা অংশও এবার নেপালের ঘটনায় দ্বিধান্বিত, কারণ ক্ষমতা হারানো শাসকেরা অন্তত নামে কম্যুনিস্ট। যে বিদ্রোহের আঁচ আমরা কদিন আগেও পাইনি, সেটা যে নিশ্চিতভাবে ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদীদের অথবা হিন্দুত্ববাদীদের অথবা দুয়েরই চক্রান্ত, সেই বিষয়ে নিশ্চিত হতে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় নেননি অনেকেই। কীভাবে ‘মেটিক্যুলাস ডিজাইন’টা হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ দুই ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশিত হতে দেখে মনে হল, এত তথ্য যাঁরা জানতেন, তাঁরা তার কিছুটা অন্তত আগে শেয়ার করলেন না কেন? তাহলে নেপাল সরকার সচেতন হতে পারত। তাঁরা এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে স্পষ্টতই, তবু নেপালে পছন্দের সরকারকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করলেন না, ঘটনা ঘটার পরে ফেসবুকে লিখবেন বলে! (এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অনেকিটাই সত্যি হতে পারে, কারণ আম্রিগা ৮০ টার মতো রেজিম চেঞ্জ অপারেশন ঘটিয়েছে দুনিয়া জুড়ে, কিন্তু আরেকটু সময় সামগ্রিক বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, কারণ প্রতিটি ঘটনার নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে।)
দক্ষিণপন্থী যাঁরা সাধারণত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পক্ষে, রাষ্ট্রশক্তিকে ঈশ্বরতুল্য মনে করেন, সামান্য প্রশ্নের মুখে পড়লেই ‘সিডিশন’, ‘দেশদ্রোহ’ ইত্যাদি বলে চেঁচান, তাঁদের অনেকে দেখছি উদ্বাহু নৃত্য জুড়েছেন, কারণ ক্ষমতা হারানো দলটি অন্তত নামে কম্যুনিস্ট (যদিও তাদের বিরুদ্ধে বিলাসবহুল জীবনযাপনের অভিযোগ তোলা হচ্ছে)। একবারও তাঁদের থমকে গিয়ে ভাবতে হচ্ছে না, সত্যিই যদি এটা আম্রিগার ডিজাইন হয়, তাহলে ভারতের ওপর তার কী প্রভাব পড়তে পারে! দেশপ্রেম গয়া তেল লেনে।
একটা বিদ্রোহের এতরকম অভ্রান্ত বিশ্লেষণ শুনে আমি বিভ্রান্ত। কম্যুনিস্ট কেলিয়েছে বলে একদল উৎফুল্ল, পশুপতিনাথ মন্দিরে তাণ্ডব চালিয়েছে বলে আরেকদল। গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেওয়ায় কারা খুশি? অনেকেই হয়ত, কিন্তু প্রকাশ্যে সেটা স্বীকার করে বিবুধসমাজের বিদ্রূপের মুখে পড়ার ঝুঁকি যাঁরা নিতে পারেন, তাঁরা সাধারণত ফেসবুকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেন না। আমি নিজে বইপত্র এড়িয়ে চলি কিন্তু গ্রন্থাগারকে মন্দিরের মতো দূর থেকে প্রণাম করি। সুতরাং লাইব্রেরি পোড়ানোর কারণে খুশি কেউ নন, কিন্তু লাইব্রেরি পোড়ানো সত্ত্বেও খুশি অনেকেই। এমনিতে আনন্দিত মানুষ দেখতে আমি খুবই ভালোবাসি কিন্তু একসঙ্গে এতরকম কারণে উৎফুল্ল এতজনকে দেখলে ঘাবড়েও যাই মাঝেমাঝে।
বৈশ্বিক রাজনীতি (জিওপলিটিক্স) আমি খুব একটা ভালো বুঝি বলে মনে হয় না। ২০২৪-এ বাঙলাদেশের অভ্যুত্থানকে অনেকের মতো আমিও প্রথমে ছাত্র আন্দোলন বলেই ভেবেছিলাম। দু’একটা বিষয়ে খটকা থাকলেও সেগুলোকে অগ্রাহ্য করেছিলাম। ভুল ভাঙলো ইউনুসবাবুর আগমনে। এই সুদের কারবারি ভদ্রলোকের সম্বন্ধে কিছু ধারণা ছিল। যাইহোক, ওই অভিজ্ঞতার পর থেকে দুম করে কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাবার সাহস আমার বুক থেকে পুরোপুরি হাওয়া হয়ে গেছে।
এতদ্বারা আমি কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করলাম না, বরং সেটা যে করছি না এবং করার ক্ষমতাই আমার নেই, সেটাই বললাম।
(জেন জি সম্বন্ধে এখানে কিছু বলছি না, কারণ সেটা একটা পৃথক, গুরুত্বপূর্ণ এবং বিরাট বিষয়।)








