১৯৯৫ সালে ২০ মার্চ কানোরিয়া জুট সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়নের স্বাস্থ্য কর্মসূচি শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন, পথ চলা শুরু ২১ মার্চ। পঁচিশ বছর আগে ১৯৯৯সালের নভেম্বর মাসে গড়ে ওঠে চিকিৎসক অচিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সংগঠন শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ। শ্রমিক ইউনিয়ন বহুধাবিভক্ত হয়ে গেলে এই সংগঠন স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। মুরগির চালাকে বেড়া দিয়ে ঘিরে শুরু হয়েছিল চেঙ্গাইলে শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসা পরিষেবা। আজ পশ্চিমবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বিভিন্ন প্রান্তে ১৩ টি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ। শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ স্বাস্থ্য পরিষেবা ও চিকিৎসার বিকল্প মডেল তৈরির কাজে, ব্যবসায়ীকরণের বিরুদ্ধে সবার জন্য স্বাস্থ্যের জন্য প্রচার আন্দোলনে এবং সামাজিক ন্যায়ের সংগ্রামে নিরলস বিরামহীন কাজ করে চলেছে। গত ৭ এপ্রিল শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ৩০ বছরের পথ চলার উদযাপনে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ থেকে প্রকাশিত হল স্মারক গ্রন্থ- ‘সংঘর্ষ ও নির্মাণের আখ্যানঃ শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ৩০ বছর’। পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল এই বই।
আন্দোলনকারী শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যকে আলাদা গুরুত্ব দেবার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক শঙ্কর গুহ নিয়োগীর নেতৃত্বে ছত্তিশগড়ের দল্লী রাজহরায় ১৯৭৭ সালে গড়ে ওঠে শ্রমিক আন্দোলন। এই আন্দোলন কারখানা ইউনিয়নের বাইরে ব্যক্তিজীবন, বিনোদন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য নিয়ে সামগ্রিক ভাবে উন্নত জীবনযাপনের এক দিশা তৈরি করে। এর মধ্যে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শ্রমিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য গড়ে তোলা শহীদ হাসপাতাল। ১৯৯১ এ গুপ্ত ঘাতকের দেশি পিস্তলের ছররা গুলি ছিনিয়ে নেয় শঙ্কর গুহ নিয়োগীর জীবন। আরও তিন বছরের কিছু বেশি সময় দল্লী রাজহরা আর ভিলাই এ থেকে সাংগঠনিক বিচ্যুতি ও অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে কলকাতায় ফিরে আসেন শহীদ হাসপাতালের অন্যতম চিকিৎসক ডঃ পুণ্যব্রত গুণ।
(শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগী)
১৯৯৩ সালে হাওড়ার ফুলেশ্বরে কানোরিয়া জুট মিলের শ্রমিক দের সংগ্রাম দানা বাঁধছিল। যৌথ রান্নাঘর,বয়স্ক শিক্ষার কর্মসূচি, নেশাগ্রস্তদের নেশা ছাড়ানোর প্রয়াস এই সবের মধ্যে দিয়েই সংহত হচ্ছিল শ্রমিক ঐক্য। এই আন্দোলনের মূল প্রেরণা ছিলেন ছত্তিশগড়ের কিংবদন্তী নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগী। ছত্তিশগড় থেকে ফেরার সময় শ্রমিকদের নিজেদের উদ্যোগে সংগঠিত রেল অবরোধে আটকে পড়েন শঙ্কর গুহ নিয়োগীর অনুগামী কয়েকজন পশ্চিমবঙ্গবাসী ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠক। এঁরা ট্রেন থেকে নেমে যোগাযোগ তৈরি করেন অবরোধকারী শ্রমিকদের সঙ্গে। শুরু হয় মত বিনিময়, সভা, আলাপ আলোচনা। মালিক পক্ষের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির ব্যর্থতা শ্রমিকদের নতুন ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামী সংগঠন গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে। কানোরিয়া জুট এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়ন (KJISSU) নতুন শক্তিতে মালিক পক্ষের মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নেয়। ১৯৯৫ এ এই আন্দোলনে যোগ দেন ডঃ পুণ্যব্রত গুণ।
কানোরিয়া আন্দোলনের প্রতি এলাকার মানুষের ভালোবাসা, মমতা, ও সমর্থনের প্রতিদানে কানোরিয়া শ্রমিকরা ২ রা অক্টোবর ১৯৯৪ বিজয়দিবসে তাঁদের জন্য একটি হাসপাতাল উপহার দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ১৯৯৩ এর নভেম্বর এ আন্দোলনের শুরুর দিকে ফুলেশ্বরের রথতলায় স্বাস্থ্য শিবির শুরু হয়। সেই স্বাস্থ্য শিবিরের ধারাবাহিকতাতেই গড়ে ওঠে চেঙ্গাইলের ‘শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র। দল্লী রাজহারার মত হাজার হাজার শ্রমিকের অর্থ সাহায্যে এবং শত শত শ্রমিকের স্বেচছা শ্রমে পুরোদস্তুর একটা হাসপাতাল গড়ে ওঠার সুযোগ এখানে হয়নি। কিন্তু তার সুত্রপাত হয়েছিল। শ্রমিক কৃষক স্বাস্থ্য পরিষেবার কাজ শুরু হল শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ার কাজে অগ্রণী ভুমিকা নিলেন ডঃ পুণ্যব্রত গুণ। শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র সংগঠিত রূপ নিলেএই স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে চালানোর জন্য ডঃ পুণ্যব্রত গুণ, ডঃ সুমিত দাশ এবং ডঃ অমিতাভ চক্রবর্তী গড়ে তোলেন একটি নতুন সংগঠন – শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগসূত্র রচনা করার জন্য শ্রমজীবীর চিকিৎসক রা তাঁদের পুরানো সংগঠন মেডিক্যাল কলেজ ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশান (MCDSA) এর সুত্রে যোগাযোগ করেন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রী দের সঙ্গে। মেডিক্যাল কলেজের নবীন ছাত্র ছাত্রীরা যুক্ত হন শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে। শুরু হয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের ও গণ আন্দোলনের এক বহমান ধারা।
(মুরগীর চালায় মনোরোগবিদ সুমিত দাশ ও মনস্তত্ববিদ মৌসুমী কর)
এক দীর্ঘ সময়কালের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এই গ্রন্থে। শুধু শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তিরিশ বছরের ইতিহাসই নয়, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠার বাস্তব ও আদর্শগত সূত্র গুলিও বিশদে আলোচিত হয়েছে। শুরুর কথায় ডঃ সুমিত দাশ সংক্ষেপে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ আর তার পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে লিখেছেন। এই ইতিহাসকেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এই সংকলনের বিভিন্ন লেখায়। ডঃ দীপঙ্কর জানা ১৯৯৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ইতিহাসের একটি মূল্যবান ক্যালেন্ডার তৈরি করেছেন যেখানে শ্রমজীবী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্ম থেকে শুরু করে ২০২৪ এর ৯ অগাস্ট অভয়া হত্যাকাণ্ড পরবর্তী গণ আন্দোলনের কালপঞ্জি ও যুক্ত করা হয়েছে। অভয়া মঞ্চের জন্ম ও অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে ৯ মার্চ ২০২৫ এর মিছিল পর্যন্ত অভয়া আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই কালপঞ্জিতে উল্লেখ আছে।
ডঃ অমিতাভ চক্রবর্তী তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন সত্তর দশকের শেষ বা আশির দশকে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা শহরের প্রান্তে, মফস্বলে বা গ্রামে নিয়মিত ক্লিনিক করতে যেতেন মেডিক্যাল কলেজ ডেমোক্র্যাটিক অ্যাসোসিয়েশানের (MCDSA) উদ্যোগে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা দুর্ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতেন। এই ভাবেই সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হত। ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ডঃ পুণ্যব্রত গুণ, ডঃ জ্যোতির্ময় সমাদ্দার বা জয়ন্ত দাশের মত মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের ভুমিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল । ড্রাগ অ্যাকশান ফোরামের যুক্তিসঙ্গত চিকিৎসার জন্য প্রচার, ডেভিড ওয়ার্নারের বই ‘যেখানে ডাক্তার নেই’, বাংলাদেশে জাফ্রুল্লা চৌধুরীর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দৃষ্টান্ত মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের গণমুখী স্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ছত্তিশগড়ের শহিদ হাসপাতাল এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দেয়। এর সঙ্গে একে একে যুক্ত হন মেডিক্যাল কলেজের ডঃ চঞ্চলা সমাজদার, ডঃ পুণ্যব্রত গুণ, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের ডঃ আশিস কুণ্ডু, ডঃ শৈবাল জানা। এই ভাবে ছাত্র আন্দোলনের ধারা কি ভাবে মিশে গেল গণ স্বাস্থ্যআন্দোলনে আলোচনা করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।
(শহীদ হাসপাতাল, দল্লী-রাজহরা, ১৯৮৭)
এই গণ স্বাস্থ্যআন্দোলনেরই ফসল শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ। কানোরিয়া জুট মিলের গৌরবোজ্জ্বল শ্রমিক সংগ্রামের ইতিহাস এবং শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে ওঠার ইতিহাস আলোচনা করেছেন দীপক পিপলাই।
ভোপালের গ্যাস দুর্ঘটনা এবং গ্যাসপীড়িতদের জন্য গণস্বাস্থ্য আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন ডঃজয়ন্ত দাশ।
(ভোপালের ইউনিয়ন কার্বাইড প্রাঙ্গণে জন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ১৯৮৫)
শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত নবীন প্রজন্মের তিন চিকিৎসক ডঃ আত্রেয় মণ্ডল , ডঃ বুবাই মণ্ডল ,ডঃ আপন সামন্ত সংগঠনের কর্ম পদ্ধতি, আদর্শ এবং চিকিৎসা পরিষেবা সংক্রান্ত নানা তত্ত্ব এবং উদাহরণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন এই উদ্যোগ কী ভাবে বর্তমান প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছে।
(১৯৮৩-র এ বি জে ডি এফ আন্দোলন)
আশির দশকের স্বাস্থ্য আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন ডঃ সুব্রত রায়, যিনি ১৯৮৭ তে জুনিয়র চিকিৎসক আন্দলনের সংগঠক ছিলেন। ভাতা বৃদ্ধি ও সরকারি পরিকাঠামোর উন্নতির দাবি তে ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ তে আন্দোলন করেন মেডিক্যাল ছাত্র ও জুনিয়র চিকিৎসকরা। এই আন্দোলন থেকেই প্রথম জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ দাবি গুলি উঠে আসে – স্বাস্থ্য ভিক্ষা নয়, অধিকার। তখন সমাজমাধ্যম গড়ে ওঠেনি , জনগণ ও সংবাদ মাধ্যমের অংশগ্রহণ কম থাকায় এই আন্দোলন সীমিত ছিল মূলত হাসপাতাল গুলির মধ্যেই। আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সরকার ও নমনীয় হতে বাধ্য হয়। জুনিয়র চিকিৎসকদের সংগঠন ABJDF এর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী আলোচনায় বসেন। মণি ছেত্রী কমিটির রিপোর্ট অনুসারে ভাতা বৃদ্ধি হয়। হাসপাতাল পরিকাঠামোর ও উন্নতি হয় কিছুটা। লেখক আশির দশকের আন্দোলনের সঙ্গে অভয়া আন্দোলনের তুলনা করে দেখিয়েছেন সময়ের সঙ্গে কখনো পক্ষ বদলায়, গণ আন্দোলনের অভিমুখ ও বদলে যায়। সেদিন সরকারের সমর্থনে ABJDF আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন যাঁরা, তাঁরা অনেকেই এখন তখনকার ABJDF এর সংগঠক দের সঙ্গে এক সাথে অভয়া আন্দোলনে সহযোদ্ধা হিসাবে লড়ছেন। আবার তখন যারা আন্দোলনের সমর্থনে ছিলেন তাদের কেউ কেউ বর্তমান সরকারের পক্ষে যোগ দিয়ে অভয়া আন্দোলনের বিরোধিতা করছেন, যদিও পুরনো ABJDFএর সংখ্যাগরিষ্ঠই অভয়া আন্দোলনের সমর্থনে পথে নেমেছেন।
ডঃ সুমিত দাশের লেখায় ১৯৯৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় কী ভাবে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়। আয়লা, আম্ফান, ইয়াস, নেপালের ভূমিকম্প বা বিভিন্ন জায়গায় বন্যার সময় শ্রমজীবী একধিক প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে দুর্গতদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে।
(১৯৯৯ উড়িষ্যার সুপার-সাইক্লোনের পর ত্রাণদলে ডা সুমিত দাশ, স্বাস্থ্যকর্মী সঞ্জয় প্রসাদ ও সজল পাঁজা)
শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের মূল দাবি সবার জন্য স্বাস্থ্য বা ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন সংগঠনের সম্পাদক মৃন্ময় বেরা। ১৯৩৭ এ সোভিয়েত রাশিয়ার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা বিশ্বে স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণা কে আমূল বদলে দেয়। এর পর থেকে নিউজিল্যান্ড,অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, বেলজিয়াম, কানাডা ইংল্যান্ড, চিন ,কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং সারা পৃথিবীর অসংখ্য দেশে ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার চালু হয়। ২০০০ সালে দরিদ্র দেশ শ্রীলঙ্কা তেও চালু হয়েছে এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। ভারতে ১৯৪৬ সাল থেকে এর প্রস্তুতি ছিল। ১৯৭৮ এ আলমা আটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ঘোষণাপত্র ও ২০০০ সালে সেই ঘোষণাপত্রে ভারতের স্বাক্ষর এবং ১৯৮২ র জাতীয় স্বাস্থ্য পরিকল্পনা ভারত কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল লক্ষ্য পূরণের দিকে। কিন্তু আশির দশকের শেষ থেকে বিশ্ব ব্যাপী নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভারত ও পা বাড়ায় উদারীকরণের লক্ষ্যে । ক্রমশ জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা সীমাবদ্ধ হয়ে আসে টিকাকরণ ও নানা কেন্দ্রীয় প্রকল্পে। বেসরকারি নার্সিং হোম আর বিমা প্রকল্পের রমরমা শুরু হয়। ২০১০ এ যোজনা কমিশন দ্বারা নিযুক্ত উচ্চ স্তরীয় বিশেষজ্ঞ দলের রিপোর্ট উপেক্ষা করা হয়। শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের পথ চলা শুরু সেই ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার এর দাবিকে সামনে রেখেই।
(২০ এপ্রিল, ২০১৪ সবার জন্য স্বাস্থ্য-এর প্রচারে ডা পুণ্যবত গুণ বাঁশবেড়িয়ায়)
স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানকর্মী দীপক চক্রবর্তী শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ক্লিনিকগুলি নিয়ে লিখেছেন। চেঙ্গাইল শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র তৈরি হবার পর শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের পরিচালনায় এবং সহায়তায় আর মোট ১২ টি মডেল ক্লিনিক গড়ে ওঠে -বাউরিয়া ও বাইনান শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র, বাঁকুড়ায় বেলিয়াতোড়ে মদন মুখার্জি জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও মাথাভাঙ্গাতে যুক্তিসঙ্গত চিকিৎসা কেন্দ্র, চণ্ডীপুর পাটনায় ডাক্তার নরম্যান বেথুন জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র, বারাসাত সিটিজেনস ফোরাম , অশোক নগরে দ্বিজেন চক্রবর্তী স্মৃতি সেবা সদন, হাওড়া রামরাজাতলায় অভিজিৎ মিত্র চ্যারিটেবল সোসাইটি, অরিজিৎ স্মৃতি জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র সল্টলেক এবং সহজ পাঠ স্বাস্থ্য কেন্দ্র পূর্ব চিল্কা। এই ক্লিনিকগুলির কাজ শুধু সাধারণ মানুষ কে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেয়াই নয়, সরকার এবং মানুষের কাছে স্বল্প মূল্যে আধুনিক যুক্তিসঙ্গত চিকিৎসা পরিষেবা দেবার মডেল তৈরি করাই এর মুল উদ্দেশ্য। মডেল ক্লিনিকগুলি ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ার এর দাবির স্বপক্ষে শক্তিশালী হাতিয়ার।
শ্রমিক কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কাজের এলাকায় সব চেয়ে অসংগঠিত শিল্প হল জরি শিল্প। জরি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের সমস্যা নিয়ে লিখেছেন ডঃ দীপঙ্কর জানা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত শ্রমিক দের পেশাগত অসুখ নিরাময় ও নিয়ন্ত্রনের জন্য বিশেষ সরকারি উদ্যোগ চালু করার দাবি জানান।
এই সংকলনের নয়টি প্রবন্ধ লিখেছেন ডঃ পুণ্যব্রত গুণ। ১৯৮০ র দশকে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনে র আগে হাসপাতালের শোচনীয় অবস্থা, জনস্বাস্থ্যের দাবি তে ৮০ র দশকের আন্দোলন , ছত্তিশগড়ের শ্রমিক স্বাস্থ্য আন্দোলন এবং শহীদ হাসপাতাল, মডেল স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালানোর যৌক্তিকতা, সকলের জন্য সমপরিষেবা আর সুপারিশহীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, রোগী পরিষেবা উন্নত করার মাধ্যমে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের উন্নত সুরক্ষা, জুট ও কটন মিলের শ্রমিকদের পেশাগত অসুখ শ্বাসকষ্ট নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে ডাক্তারি পাঠক্রমে পেশাগত রোগের গুরুত্ববৃদ্ধি, চিকিৎসক দের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন ডঃ গুণ। শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম গণচেতনা তৈরির কাজ করে চলেছে নিরলস। অসুখবিসুখ ও স্বাস্থ্যের বৃত্তে পত্রিকা এবং ডক্টরস ডায়লগ নামক ওয়েব বুলেটিন সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে একটি প্রবন্ধে। ডঃ পুণ্যব্রত গুণ ছত্তিশ গড়ের দীপ জ্বালিয়ে ছিলেন কানোরিয়া জুট মিলের স্বাস্থ্য আন্দোলনে । ২০২৪ এ অভয়ার নৃশংস হত্যাকাণ্ডর পর গড়ে ওঠা গণ আন্দোলনের তিনি অন্যতম নেতা, অভয়া মঞ্চের অন্যতম আহবায়ক। তাই অত্যন্ত সঙ্গত কারনেই শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের এই সংকলন এর শেষ লেখা অভয়া আন্দোলন নিয়ে। আন্দোলনের গতি প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে ডঃ গুণ দেখিয়েছেন কী ভাবে এই আন্দোলন চিকিৎসক দের আন্দোলন থেকে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে- “অভয়ার বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন ৯ অগাস্ট ২০২৪ থেকে শুরু হয়েছে তার মত বড় আন্দোলন যাতে মানুষের বিপুল অংশগ্রহণ এমন টা আমাদের জীবৎকালে দেখিনি “।
এক বিরাট ক্যানভাসে স্বাস্থ্য আন্দোলন ও গণ আন্দোলন নিয়ে আলোচনা এবং বিশ্লেষণ আছে এই মূল্যবান বইটিতে। এই বই শুধু স্বাস্থ্যের আন্দোলনের বই নয়, নতুন ভোরের স্বপ্নে উজ্জীবিত করে অবিরাম সংঘর্ষ ও নির্মাণের এই আখ্যান । শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের সাধুবাদ প্রাপ্য এই অমূল্য সংকলনের জন্য।





















তথ্যবহুল নিবন্ধটি পড়লাম। ভাল লাগল। একটা বিষয়ের আলোচনা পেলাম না। বিপ্লবী পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা আছে, কিন্ত বিপ্লব পরবর্তী চীন দেশের কথা পেলাম না। লেখিকাকে অনুরোধ করব বিষয়টির উপর কিছু আলোকপাত করতে।