কয়েকটা কথা। কথাগুলো এই সময়েই বলার, যদিও ঠিক এই মুহূর্তে কথাগুলো বলার মানে হয় না। তবু বলি।
হ্যাঁ, আমি কুখ্যাত সেকু-মাকু গোষ্ঠীভুক্ত। অর্থাৎ সেকুলার এবং বামপন্থী। এমনকি লিবেরাল, থুড়ি লি-বেড়াল-ও। অর্থাৎ বলতে পারেন, দেশ ও জাতির যা যা সমস্যা – ‘ওদের’ বাড়াবাড়ি থেকে শুরু করে জঙ্গীহানা বা দাঙ্গা – এসবের জন্য যাদের যাদের দায়ী করা যায়, সেই মানুষগুলোর একজন।
আমার যাবতীয় লেখাপত্র ওই দৃষ্টিকোণ থেকেই লেখা। এই পোস্টও। কমেন্টবক্স খোলা রইল। যা যা বলার, বলে যেতে পারেন।
জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও আমি কোনও রকম ধর্মাচরণ করি না। নিজেকে সম্পূর্ণ ঈশ্বরে অবিশ্বাসী নাস্তিক বলব কিনা জানি না, তবে ঈশ্বর থাকা বা না থাকা নিয়ে আমার বিশেষ চিন্তা নেই। ধর্মগ্রন্থ খুব বেশি পড়েছি এমনও নয়। কেননা আমার ধারণা, ধর্মগ্রন্থ পাঠ ধর্মানুশীলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আলগাভাবে গল্প-কবিতার মতো করে খানিক গীতা-উপনিষদ পড়লাম বা মসনবি নেড়েচেড়ে দেখলাম আর তারপর সে নিয়ে মতামত জাহির করলাম, ওভাবে হয় না। (যদিও ওইভাবেই পূর্বোক্ত বইগুলো সহ কিছু কিছু বই পড়ে দেখেছি অবশ্যই।)
ধর্ম বলতে যদি কিছুতে আগ্রহ থাকে, তাহলে তা বৌদ্ধধর্ম – যদিও নিজেকে বৌদ্ধ বলতে পারি না। কোনও একটি পথ-ই লক্ষ্যে পৌঁছে দেবার ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা নিশ্চিত – সুতরাং সর্বোৎকৃষ্ট – এই বিশ্বাস ছাড়া কোনও ধর্মে আস্থা রাখা যায় না। এবং আমার পথটি সর্বোৎকৃষ্ট মানার অর্থ বাকিরা… অর্থাৎ সাধারণত ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে অপর ধর্মের প্রতি… সবক্ষেত্রে বিদ্বেষ এমন নয় অবশ্যই, কিন্তু উপেক্ষা অশ্রদ্ধা, নিদেনপক্ষে করুণা (ঈশ্বর ওদের ক্ষমা করো, ওরা জানে না কী ভুল করছে টাইপের)….
হ্যাঁ, এটুকু জানি যে ধর্মীয় দাঙ্গার মুহূর্তে আমার বাকি সবকিছু ছেড়ে ওই জন্মসূত্রে প্রাপ্ত ধর্মপরিচয়টিই একমাত্র বিচার্য হবে – তেমনটাই হয়ে থাকে, তেমনটাই প্রথা – তবু আমি কিছুতেই, আমার বাকি সমস্ত চিন্তাভাবনা শিক্ষাদীক্ষা বিসর্জন দিয়ে, নিজের (কিংবা অন্য কারও) ধর্মীয় পরিচিতিটিকে অগ্রাধিকার দিতে পারি না। পারিনি, পারছি না, আগামী দিনেও পারব না।
আমার বন্ধুবৃত্তের মানুষগুলোকেও আমি সেভাবেই দেখি। হিন্দু কিন্তু পুজোআচ্চা করে না কিংবা মুসলমান কিন্তু কথাবার্তায় বোঝা যায় না, এভাবে নয় – আমি দেখার চেষ্টা করি তার হিন্দু-মুসলমান পরিচিতি ব্যতিরেকে। ছেলেবেলা থেকে তেমন শিক্ষাই পেয়ে এসেছি – জীবনের হাফটাইম পার হয়ে সেকেন্ড হাফের খেলা চলছে, রেফারি কখন খেলাশেষের বাঁশি বাজিয়ে দেবে জানি না – এখন আর নিজেকে পালটে ফেলার সময় নেই।
আমি জানি, আমার আশেপাশের সকলে এভাবে ভাবেন না। তাঁরা আমার তুলনায় মনুষ্য হিসেবে নিকৃষ্টতর এমন দাবি করি না – কিন্তু আমি তাঁদের মতো নই এবং তাঁরাও আমার মতো নন, এটুকু বলতেই পারি। সুতরাং, কাশ্মীরের আদিল হোসেন শেখ বা বাঙালি সেনা ঝণ্টু আলি শেখ আমার চোখে “ভালো মুসলমান”-এর উদাহরণ নন, বড় মানুষের উদাহরণ। কোনও ধর্মমত বা কোনও মতবাদই – বইয়ে যা-ই লেখা থাকুক – অন্যকে বাঁচানোর জন্য নিজের প্রাণ দেওয়া শেখাতে পারে না (তবে প্রাণ নিতে “উদ্বুদ্ধ” করতেই পারে)। আমার বিশ্বাস, এমন কাজ মানবচরিত্রে নীতিবোধ ও মানবিকতাবোধের চরম উৎকর্ষ আত্তীকৃত হলে তবেই সম্ভব – এবং তেমন আত্তীকরণ অতি বিরল। অতি বিরল বলেই উদাহরণযোগ্য।
আগে ভাবতাম, ধর্মীয় গোঁড়ামির সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। ভুল ভাবতাম। অন্তত শিক্ষা বলতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বুঝলে, ভুল তো বটেই। গোঁড়ামি ও মতান্ধতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বিশেষে, ক্রমবর্ধমান। একপক্ষের মতান্ধতা বাড়তে থাকলে অপরপক্ষেরও মতান্ধতা বাড়ে। কারা শুরু করেছিল, এই চাপানওতোর ডিম-আগে-না-মুরগি-আগে তর্কের মতোই অবান্তর ও নিষ্ফলা – কিন্তু সমাজের অধিকাংশ মানুষ যখন ধর্মপরিচয়কেই আশ্রয় করতে থাকেন, তখন এই চাপানওতোরের মধ্যে দিয়েই বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস গভীর থেকে গভীরতর হয়।
এই পরিস্থিতিতে আলো দেখানোর দায়িত্ব থাকে যাঁরা নিজেদের কোনও পক্ষের মানুষ হিসেবে মনে করেন না, তাঁদের। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব সেই কণ্ঠস্বরগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার। সম্মিলিতভাবে সেই কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার। মিডিয়ারও তেমন সামাজিক দায় থাকা উচিত।
রাষ্ট্র ও মিডিয়া যদি সেই দায় পালন না করে, বুঝতে হবে তারা সচেতনভাবেই তা পালন করছে না। বুঝতে হবে, শোক ও ক্রোধ যখন দ্রুত পরিণত হচ্ছে বিদ্বেষ ও অবিশ্বাসে – সেই অশান্তির প্রশমন কেউ চাইছে না।
আর হ্যাঁ, আমি শান্তিকামী। এই ঘটনায় হতচকিত ও স্তম্ভিত হয়ে গেছি – কথাগুলো, শোকের দৃশ্যগুলো কিছুতেই ভুলতে পারছি না – তবু আমি যুদ্ধ চাই না।
বাইবেল শিখিয়েছিল – “fracture for fracture, eye for eye, tooth for tooth.” (Leviticus 24:19-21)
আর আমার দেশেরই এক নাগরিক বলেছিলেন – “An eye for an eye makes the whole world blind.”
দুই উচ্চারণের মাঝখানে ব্যবধান প্রায় দু’হাজার বছরের। সভ্যতার ব্যবধানের পরিমাপে, সম্ভবত, দূরত্বটা অনেক অনেএএক বেশি।











